28/04/2026
নীল খামের চিঠি
কমলাপুর রেলস্টেশনে মালেক ভাই কুলি। ২৫ বছর ধরে মানুষের ব্যাগ টানে। বয়স ৫৫, কিন্তু শরীর এখনো শক্ত। সবার কাছে সে "মালেক ভাই", কেউ কেউ মজা করে ডাকে "স্টেশনের মেয়র"। কারণ পুরা স্টেশনের খবর তার নখদর্পণে।
মালেক ভাইয়ের একটা অভ্যাস আছে। ট্রেন ছাড়ার পর প্ল্যাটফর্মে পড়ে থাকা কাগজ, বোতল, ছেঁড়া টিকিট সব কুড়ায়। বলে, "স্টেশনটা আমার ঘর। ঘর নোংরা থাকলে ভাল্লাগে না।"
২০১৮ সালের ডিসেম্বর। শীতের সকাল। চট্টগ্রাম মেইল ছাড়ার পর মালেক ভাই ৭ নাম্বার প্ল্যাটফর্ম ঝাড়ু দিচ্ছে। হঠাৎ বেঞ্চের নিচে একটা নীল খাম চোখে পড়লো। মুখ বন্ধ, উপরে নাম লেখা: *"আব্বা"*।
খামটা ভারী। ভিতরে কিছু আছে মনে হয়। মালেক ভাই আশেপাশে তাকালো। কেউ নাই। পকেটে ঢুকায় রাখলো। ভাবলো, "যার জিনিস সে খুঁজতে আসবে।"
এক সপ্তাহ গেলো। কেউ আসলো না। মালেক ভাইয়ের মন খচখচ করে। শেষে খামটা খুললো। ভিতরে ৫০ হাজার টাকা, আর একটা চিঠি।
চিঠিতে লেখা:
*_"আব্বা,
আমি সৌদি যাইতেছি। দালাল বলছে ৩ লাখ টাকা লাগবে। ২ লাখ ৫০ জোগাড় হইছে। বাকি ৫০ হাজার তোমার কাছে রাখলাম। তুমি চিন্তা কইরো না। আমি পৌঁছে ফোন দিবো। আমার জন্য দোয়া কইরো।
ইতি, তোমার রাসেল"_*
মালেক ভাইয়ের বুকটা ধক করে উঠলো। এই টাকা হারাইলে পোলাডার বিদেশ যাওয়া বন্ধ। সে স্টেশন মাস্টার, জিআরপি থানা, মাইকিং—সব জায়গায় খবর দিলো। "নীল খাম পাওয়া গেছে, মালিক এসে নিয়া যান।"
দুই মাস গেলো। কেউ আসলো না। টাকাটা মালেক ভাই ট্রাঙ্কে ভরে রাখলো। প্রতি রাতে গুনে দেখে।
একদিন রাত ১১টা। লাস্ট ট্রেন চলে গেছে। স্টেশন ফাঁকা। একটা শুকনা মতো বুড়া লোক লাঠিতে ভর দিয়ে আসলো। চোখে পানি।
"ভাই, শুনলাম আপনি একটা নীল খাম পাইছেন?"
"হ, পাইছি। আপনার পোলার নাম কী?"
"রাসেল। আমার পোলা রাসেল।"
মালেক ভাই ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করলো, "চিঠিতে আর কী লেখা ছিলো, কন তো?"
বুড়া হুবহু বলে দিলো। এমনকি দালাল ৩ লাখ চাইছে সেই কথাও বললো।
মালেক ভাই ট্রাঙ্ক খুলে খামটা দিলো। বুড়া টাকাটা হাতে নিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। "ভাই, আপনি আমার পোলার জীবন বাঁচাইলেন। আমি দুই মাস ধরে পাগলের মতো খুঁজতেছি। রাসেল সৌদি যাইতে পারে নাই। দালাল টাকা ছাড়া নেয় নাই।"
"এখন যান, পোলারে বিদেশ পাঠান।" মালেক ভাই শুধু এইটুকু বললো।
বুড়া জোর করে মালেক ভাইয়ের হাতে ৫ হাজার টাকা গুঁজে দিতে চাইলো। মালেক ভাই হাসলো, "চাচা, আমি কুলি। মানুষের ব্যাগ টাইনা খাই।মমানুষের স্বপ্ন টাইনা খাই না। টাকাটা রাখেন। পোলারে ফোন কিনে দিয়েন। বিদেশ গেলে যেন আপনারে ফোন দিতে পারে।"
৩ বছর পরের ঘটনা। মালেক ভাই প্ল্যাটফর্মে বসে চা খাচ্ছে। হঠাৎ স্যুট-কোট পরা এক যুবক এসে পা ছুঁয়ে সালাম করলো।
"মালেক ভাই, চিনছেন? আমি রাসেল।"
"আরে তুমি! বিদেশ কেমন?"
"আপনার দোয়ায় ভালো। চাচা, আপনার জন্য একটা গিফট।"
একটা ছোট বাক্স। ভিতরে একটা সোনার চেইন, আর আরেকটা নীল খাম।
খামে লেখা: "আব্বা মারা গেছে গত বছর। মরার আগে কইছে, মালেক ভাইয়ের ঋণ শোধ করিস। এই চেইনটা আপনার। আর খামের ভিতর ৫০ হাজার টাকা। এইটা স্টেশনের কুলিদের শীতের কম্বল কিনে দিয়েন। আপনার মতো মানুষের জন্যই দুনিয়াটা এখনো টিকে আছে।"
মালেক ভাই সেদিনও কাঁদে নাই। শুধু আকাশের দিকে তাকায়া বলছে, "আল্লাহ, ঘরটা সাফ রাখার দাম তুমি এত দিবা জানতাম না।"
এখনো ৭ নাম্বার প্ল্যাটফর্মে নীল খামের গল্প লোকের মুখে ঘোরে। আর মালেক ভাই? সে এখনো কাগজ কুড়ায়। বলে, "কে জানে, কার স্বপ্ন পইড়া থাকে