28/02/2025
আলোর ভুবনঃ
সুচরিতাসু,
এ চিঠি যখন পৌঁছাবে আপনার হাতে, আমি তখন মাটি ছেড়ে অনেক উপরে।দেশের সীমানার বাইরেও হয়তবা। হ্যাঁ, অজন্তা, চলে যাচ্ছি দেশ ছেড়ে। বলতে পারেন, পালিয়ে যাচ্ছি, নিজের কাছ থেকে।
জানেন, চিঠি লেখার অভ্যাস ছিল না তেমন। যাদের কাছে মানুষ নিয়মিত চিঠি লেখে, সেই বাবা-মায়ের কাছেই বলতে গেলে লিখতামই না। আর, এখন তাদের কাছে লিখতে খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু, তারা চলে গেছেন এমন এক দেশে, যেখানে চিঠি কোনদিন আর পৌঁছাবে না। যাক, এগুলো একান্তই ব্যক্তিগত কষ্ট, নাইবা শুনলেন।
আপনার সাথে যেদিন প্রথম দেখা হল, মনে হয়েছিল, মানুষটি ভাল। দ্বিতীয়বার দেখা হলে কেমন জানি মনে হল আপনি খুব ভাল একজন বন্ধু হতে পারেন বোধহয়। এর পরের দেখাটি আমার ভেতরটাকে ওলটপালট করে দিয়ে গেল একেবারে। কি এক তীব্র আকর্ষণ অনুভব করলাম আপনার জন্য। অথচ, এরকম তো হওয়ার কথা নয়!মেয়েদের প্রতি কোন উৎসাহই ছিল না আমার কখনও। বন্ধুরা এনিয়ে রসিকতা করত বেশ। সেই আমি কেন এরকম করছি! কোন উত্তর পেলাম না। কিন্তু, ভাল লাগার গতিটাকে কোনভাবেই বশে আনা গেল না। আবার, আপনাকে কিছু বলতেও পারছিলাম না। এক অদ্ভুত দ্বিধার মধ্যে হাবুডুবু খাওয়া শুরু হল। শেষমেষ বেহায়ার মত আপনাকে বলেই ফেললাম সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে। কোন উত্তর না পেয়ে পড়ে গেলাম বিশাল এক লজ্জ্বায়। "কিছু বলবেন না?" - জিজ্ঞেস করলাম। ভেতরে ভেতরে ঘেমে নেয়ে উঠছি। অনেক্ষণ পরে বললেন, "পরে জানাব, টেলিফোনে"। শুরু হল আশা-নিরাশার দ্বন্দ্ব নিয়ে অপেক্ষা। যদি ফিরিয়ে দেন! অবশেষে এল সেই ক্ষণ, আপনার ফোন। ছোট্ট দুটো শব্দ, " ঠিক আছে"। আমার পৃথিবী যেন হঠাৎ করেই ঝলমল করে উঠল। পরবর্তি কয়েকটা দিন হাওয়ায় উড়ে যেতে লাগল। আপনার হাত ধরে আলোতে ফেরার প্রচন্ড ইচ্ছে পেয়ে বসল। সাথে সাথে একটা অপরাধবোধও কাজ করতে লাগল। একজন সন্ত্রাসী ক্যাডার আমি, অন্ধকার জগতের সিটিজেন। কেন আপনাকে জড়ালাম নিজের জিবনের সাথে! কিন্তু, আলোর জগতে ফেরার অদম্য আকর্ষণ তখন আমাকে পেয়ে বসেছে। সিদ্ধান্ত নিলাম, দেশের বাইরে চলে যাব আপনাকে নিয়ে। আরো সিদ্ধান্ত নিলাম, আমার সবকিছু আপনাকে খুলে বলব। আপনি নিশ্চয়ই ক্ষমা করে দিবেন, এ আস্থাটুকু ছিল। স্টুডেন্ট ভিসাও হয়ে গেল। ঠিক তখনই জানলাম, আমার বন্ধু হাসনাইনকে ডেকে বলেছেন, আমি যেন আপনার সাথে আর কখনও দেখা করার চেষ্টা না করি। আপনি নিজেকে ধিক্কার দিয়েছেন একজন সন্ত্রাসী ক্যাডারের সাথে সম্পর্কে জড়ানোর জন্য। আমি আপনার সাথে প্রতারণা করেছি।
হাসনাইনের কাছে কথাগুলো শুনে অনেক্ষণ কোন কথা বলতে পারিনি। আমার কিছুদিন আগে ঝলমল করে ওঠা পৃথিবীটা হঠাৎ করেই যেন আঁধারে ডুবে গেল। যন্ত্রনায় নীল হয়ে গেল ভেতরটা। কিন্তু, আপনার কথাগুলো তো প্রচন্ড সত্যি। শুধু চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছিলো, "আমি আপনার সাথে প্রতারণা করতে চাইনি৷ সেজন্যই সব খুলে বলতে চেয়েছিলাম"। কিন্তু, কিছু বলতে পারলাম না; আপনি তো চুড়ান্ত রায় ঘোষনা করেই দিয়েছেন। কঠিনভাবে বুঝতে পারলাম, অন্ধকার জগতে যাদের বাস, তাদের অনেক কিছুই চাইতে নেই।
কিভাবে কয়েকটা দিন কাটল, জানি না। এ এমন এক কষ্ট, যা নিজেকেই বয়ে বেড়াতে হয়। ভাবলাম, বাবা-মা গ্রামের বাড়িতে শুয়ে আছেন, সেখান থেকে ঘুরে আসি, যন্ত্রনার লাঘব হবে হয়ত কিছুটা। এক রাতে সেখানে স্বপ্ন দেখলাম, মা বলছে," খোকা, তোর খুব কষ্ট হচ্ছে? তুই দেশে থাকিস না, বাইরে চলে যা"। ঘুম ভেঙে গেল। খেয়াল করলাম, চোখের পানিতে বালিশ ভিজে গেছে। চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম,বাইরে চলে যাব। দেশে থাকলে সবসময়ই মনে হবে, এই দেশে আপনিও আছেন, অথচ, আপনার সাথে আমি নেই। আর, এখানে থাকলে আলোর ভুবনে ফেরা হবে না, যে আলোতে ফিরতে চাইছিলাম আপনার হাত ধরে।
বুবুকে বললাম সিদ্ধান্তের কথা। মা চলে যাওয়ার পর বুবুই আমাকে মায়ের আদরটুকু দিত। বুবু কেঁদে ফেলল। কিন্তু,বাধা দিল না।বুবু কিছুটা জেনে গিয়েছিল আমার অন্ধকার জিবনের কাহিনী। বলল, তুই চলে গেলেই তোর জন্য ভাল, চয়ন। বড় ভাইয়েরাও সম্মতি দিল।
আপনি হয়ত বিশ্বাস করতে চাইবেন না, আমার আসলে সন্ত্রাসের কন্টকাকীর্ণ পথে আসার কথা নয়। বাবা-মা দুজনই ছিলেন শিক্ষক, বুবু- দুলাভাইও শিক্ষক দম্পতি, ভাইয়েরাও চাকুরীজিবী। ভদ্র হিসেবে এলাকায় পরিচিত আমাদের পরিবার। সেই পরিবারেরই এক ব্ল্যাকশিপ আমি। সঙ্গদোষে অন্ধকার জগতে প্রবেশ করেছিলাম। দায় আমার নিজেরই। সময় এসেছে শুদ্ধ হওয়ার। আর, শুদ্ধ হওয়ার তীব্র স্পৃহাটা প্রবেশ করিয়েছেন আপনি। আপনার কাছে আমি ঋণী তাই চিরজীবনের জন্য। আপনি শুধুমাত্র ভালবাসার মানুষই ছিলেন না, একজন দূর্লভ বন্ধুও ছিলেন। আপনার ভালবাসার যোগ্য আমি নই, একথা দিনের আলোর মতই সত্য। কিন্তু, সারাজীবন মিস করব, খুঁজে ফিরব সেই সুপরিচ্ছন্ন বন্ধুত্বকে। নিজেকে মনে হয় সেই পাখিটির মত, যার ইচ্ছে হয় ডানা মেলে উড়িবার সুদূর নীল আকাশে। কিন্তু, ডানা যে তার ভাঙা!
এয়ারপোর্টে বসে লিখছি। বুবু, দুলাভাই, ভাগ্নে দুটো আর দুই ভাই, ভাবি আর তাদের দুই ছেলেমেয়ে এসেছে বিদায় জানাতে। হাসনাইনও আছে, চলে যাবে কিছুক্ষণ পরেই, জরুরি কাজ আছে ওর। চিঠিটা ওই পৌঁছে দিবে আপনার কাছে আজই।
বাকিটা জীবন একাই পথ চলব। কোন মেয়ের প্রতি উৎসাহ তো আগেও ছিলনা। কিভাবে যেন একমাত্র ব্যতিক্রম হয়েছিলেন আপনি। ব্যতিক্রমই থাকবেন। আপনাকে "তুমি" করে লিখিনি, সে সূযোগ আমিই হারিয়েছি।
ভীষণ মিস করব হলে কাজ করা এক পিচ্চিকে। আদর করতাম ওকে। পিচ্চি খুব আপন হয়ে গিয়েছিল। ওর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসার সময় পিচ্চি আমাকে জড়িয়ে ধরে যেভাবে কেঁদেছিল, আমি অনুভব করলাম, ভালবাসার শক্তি সন্ত্রাসের চাইতে অনেক বেশি। ওর বাড়ির ঠিকানা নিয়ে এসেছি, সম্ভব হলে ওর জন্য কিছু করার ইচ্ছে আছে।
ফাগুন আসছে। টিএসসির কৃষঞ্চূড়া গাছটি আগুনে লাল হতে শুরু করবে। বন্ধুরা আড্ডা জমাবে সেখানে। সবাই থাকবে সেই আড্ডায়। অনুপস্থিত শুধু আমি।
আর, আমার অনুভবে মিশে রইবে প্রিয় স্বদেশ।
অজন্তা, ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আপনার যন্ত্রণার কারন হওয়ার জন্য। সম্ভব হলে, ক্ষমাটুকু দিয়েন। আর, কখনও দেখা হবে কিনা জানিনা, দেশে হয়ত ফেরা হবে না আর। যদি কখনও দেখা হয়ে যায়, এটুকু বলার সূযোগ দিবেন কি, "কেমন আছেন"?
বন্ধু বিদায়
শুভেচ্ছান্তে
চয়ন।
অজন্তা বিকেলে ক্লাস থেকে বেরিয়ে দেখল হাসনাইন দাঁড়িয়ে আছে। চিঠিটা দিয়ে হাসনাইন বলল, " চয়ন খুব কষ্ট নিয়ে দেশ ছেড়েছে",। কোন কিছু বলল না অজন্তা। চয়নের প্রতি ঘৃণাটা তখনও বেশ তীব্র। কিছুটা ইতস্তত: করে চিঠিটা নিল।
বাসায় গিয়ে কিছুটা বিরক্তি, কিছুটা কৌতুহল নিয়ে চিঠিটা পড়া শুরু করল। পড়া শেষ হলে অজন্তা দেখল ওর চোখ থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে চিঠির উপর। চয়নকে আর ঘৃণা করতে পারছেনা। বুকের মধ্যে একটা কষ্ট মোচড় দিয়ে উঠল, গলার কাছে এসে আটকে রইল। চিৎকার করে বলতে চাইল, আমাকে ক্ষমা করে দাও, চয়ন। আমি বুঝতে পারিনি তুমি এতটা সুন্দর একজন মানুষ। আমি ভুল বুঝেছিলাম। আমাকে ফেলে রেখে একটু সূযোগও না দিয়ে কিভাবে চলে যেতে পারলে তুমি? চয়ন, আমি আবার তোমার সেই দূর্লভ বন্ধু হতে চাই। হঠাৎ বিমানের শব্দ শুনতে পেয়ে দৌড়ে বারান্দায় গেল, আকাশের দিকে চাইল অজন্তা। এই বিমানেই কি চয়ন চলে যাচ্ছে দেশ ছেড়ে? বিমানটি যতক্ষণ দেখা যায়, অজন্তা একদৃষ্টে বিমানটির দিকে তাকিয়ে থাকল। কেমন যেন শুন্যতাবোধ করছে সে, দিশেহারা লাগছে।
অজন্তা কালই কথা বলবে হাসনাইনের সাথে। চয়নের বুবুর সাথে দেখা করতেই হবে। বুবুকে সব খুলে বলবে। ওর সমস্ত অনুভুতি বেষ্টন করে আছে চয়নের কষ্টগুলো।
নোটঃ বহুদিন আগে টিভিতে দেখা একটি নাটক খুব দাগ কেটেছিল মনে। নাটকের সেই কাহিনী থেকে গল্পের থিমটি নেয়া হয়েছে।
অন্ধকারের চোরাগলিতে হারিয়ে যায় অনেক সম্ভাবনাময় তরুন। সেখান থেকে ফিরে আসার কাহিনীও রয়েছে অনেক। শুদ্ধতার পথ রুদ্ধ হয়ে যায় না কখনও। অন্ধকার জগতের মানুষেরা একটু ভালবাসা, সহানুভূতি পেলে ফিরেও আসতে পারে আলোকিত ভুবনে
Bangladeshi Australian Community, @ ছোট গল্প, @ প্রেমের গল্প, @ভালবাসার গল্প