30/07/2026
নিষিদ্ধ বাড়ির শেষ দরজা
পর্ব–২ : ধুলোর ওপর লেখা নীরবতা
আরিয়ান কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
মোবাইলের টর্চের সাদা আলো সিঁড়ির ধাপ বেয়ে ধীরে ধীরে ওপরে উঠছিল। আলো যত সামনে এগোচ্ছিল, ততই অন্ধকার যেন আরও ঘন হয়ে তার চারপাশে নেমে আসছিল।
তার দৃষ্টি তখনও আটকে ছিল ধুলোর ওপর ফুটে থাকা পায়ের ছাপগুলোর দিকে।
ছাপগুলো একেবারে স্পষ্ট। যেন কয়েক মিনিট আগেই কেউ খালি পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠেছে।
কিন্তু...
নিচে নামার কোনো চিহ্ন নেই।
আরিয়ান হাঁটু গেড়ে বসল। আঙুলের ডগা দিয়ে ধুলো ছুঁয়ে দেখল। ধুলো শুকনো, বহুদিনের জমে থাকা। অথচ পায়ের ছাপের ভেতরের অংশে ধুলোর স্তর ভেঙে গেছে। এর মানে ছাপগুলো পুরোনো নয়।
তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক চাপা উত্তেজনা কাজ করছিল।
ভয় নয়।
বরং এমন এক অনুভূতি, যা কেবল একজন অনুসন্ধানী মানুষই বুঝতে পারে—যখন সে জানে, বহুদিনের চাপা পড়ে থাকা কোনো সত্যের দরজায় সে এসে দাঁড়িয়েছে।
সে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল।
প্রথম ধাপ।
কাঠের ভেতর থেকে কর্কশ শব্দ উঠল।
দ্বিতীয় ধাপ।
মনে হলো, পুরো বাড়িটাই যেন নিঃশব্দে তার ওজন অনুভব করছে।
তৃতীয় ধাপ...
ঠিক তখনই বাইরে হঠাৎ বাতাসের ঝাপটা এল।
ভাঙা জানালার কাঁচে হাওয়া লেগে শিসের মতো এক দীর্ঘ শব্দ ছড়িয়ে পড়ল পুরো বাড়িজুড়ে।
এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, কেউ যেন খুব দূর থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আরিয়ান থামল না।
দোতলায় উঠে সে চারদিকে তাকাল।
দীর্ঘ বারান্দা। সারি সারি কাঠের দরজা। কোথাও রং নেই, কোথাও পালিশ নেই। ছাদের কোণ জুড়ে বিশাল মাকড়সার জাল, যার ওপর জমে থাকা ধুলো চাঁদের আলোয় রুপালি হয়ে উঠেছে।
বারান্দার এক কোণে একটি কাঠের দোলনা।
নিঃশব্দ।
তবু...
সেটি খুব ধীরে, প্রায় অদৃশ্য গতিতে দুলছিল।
আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।
বাতাস?
না কি...
সে নিজেই মাথা নাড়ল।
"আগে প্রমাণ, তারপর বিশ্বাস।"
নিজেকেই যেন মনে করিয়ে দিল সে।
দোলনার পাশ কাটিয়ে এগোতেই চোখে পড়ল দেয়ালে ঝুলে থাকা কয়েকটি বিবর্ণ প্রতিকৃতি।
একজন গম্ভীর চেহারার ভদ্রলোক।
সম্ভবত রশীদ চৌধুরী।
তার পাশে এক নারী।
আর মাঝখানে দশ-এগারো বছরের একটি মেয়ে।
তিনজনের মুখেই অদ্ভুত স্থিরতা।
কিন্তু ছবিটির এক কোণ ছিঁড়ে গেছে।
মেয়েটির ডান হাতের অংশ যেন ইচ্ছে করেই কেটে ফেলা হয়েছে।
কেন?
আরিয়ান ছবিটি খুলে পেছনটা দেখতে গিয়ে থমকে গেল।
ক্যানভাসের পেছনে পেন্সিল দিয়ে কাঁপা হাতে মাত্র দুটি শব্দ লেখা—
"দরজা খুলবে না।"
বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল।
এবার প্রথমবারের মতো সে অনুভব করল—
এই বাড়ির প্রতিটি জিনিস যেন কাউকে কিছু বলতে চায়।
ঠিক তখনই...
বারান্দার একেবারে শেষ প্রান্তে একটি দরজা ধীরে ধীরে কঁকিয়ে খুলে গেল।
কেউ তাকে স্পর্শ করেনি।
কোনো বাতাসও ওদিকে পৌঁছানোর কথা নয়।
দরজার ভেতরটা অন্ধকার।
কিন্তু সেই অন্ধকারের গভীর থেকে যেন ক্ষীণ হলুদ আলো একবার জ্বলে উঠল...
আবার নিভে গেল।