24/04/2026
টিফিনের টাকায় 'মিসাইল' বানিয়ে ফেললেন দুই শিক্ষার্থী
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার উত্তর শিহিপাশা গ্রাম। তার চারপাশে সবুজ ধানক্ষেত, টিনের ছাউনির ঘর। বিকেলের আলো নামলে শান্ত হয়ে আসে পুরো এলাকা। কিন্তু একটি ঘরের টেবিলজুড়ে ছড়ানো তার, সার্কিট আর নকশা বলে দিচ্ছে সেখানে চলছে ভিন্ন এক স্বপ্ন বুবনের গল্প।
সেই গ্রামেই দুই তরুণ তৈরি করেছেন একটি বিশেষ ধরনের রকেট-মিসাইলের পরীক্ষামূলক মডেল। নাম দিয়েছেন 'থান্ডারবোল্ট'।
তাদের দাবি, জিপিএসের মাধ্যমে এটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে। গতি ঘণ্টায় প্রায় ৩০০ কিলোমিটার, রেঞ্জ পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত।
তবে এখনো এটি পরীক্ষামূলক পর্যায়েই আছে। পুরোপুরি পরীক্ষা করা হয়নি। তাদের ভাষায়, এটা শুধু একটা প্রজেক্ট না, একটা স্বপ্ন।
টিফিনের টাকায় যাত্রা
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সুজন চন্দ্র পাল। আর প্রিতম পাল পড়ছেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। তারা সম্পর্কে মামা-ভাগ্নে।
দুজনের পরিচয় শুধু আত্মীয়তায় নয়, আগ্রহেও রোবটিক্স। স্কুলজীবন থেকেই বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া, প্রজেক্ট তৈরি, পরীক্ষানিরীক্ষার সাধ্যমে ধীরে ধীরে তাদের পথ এগিয়েছে। রোবট বানানো থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া। এই ধারাবাহিকতারই নতুন ধাপ 'থান্ডারবোল্ট'।
এই কাজের পেছনে নেই কোনো বড় ল্যাব, নেই সরকারি অর্থায়ন। আছে টিফিনের টাকা জমানো, আর পরিবারের সাধ্যমতো সাহায্য। সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে প্রায় সাত লাখ টাকা।
প্রিতম পাল বলেন, রোবটিক্স থেকে আমাদের যাত্রা শুরু। পরে রকেট নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়। ইউরোপিয়ান রকেট্রি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বিষয়টা আরও ভালোভাবে বুঝি।
কী এই 'থান্ডারবোল্ট'
তাদের দাবি, এটি রকেট-মিসাইলের সমন্বিত একটি মডেল। জিপিএস গাইডেন্স দিলে নির্দিষ্ট লক্ষ্য বরাবর যেতে পারবে। গতি ঘণ্টায় প্রায় ৩০০ কিলোমিটার, রেঞ্জ পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত।
কিন্তু এখানেই থেমে যাচ্ছে বাস্তবতা। আকাশে উড়িয়ে দেখা হয়নি এখনো। কারণ অনুমতি নেই। আকাশসীমা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে সরকারি অনুমতি ছাড়া এটি পরীক্ষা করা সম্ভব নয়।
সুজন পাল বলেন, আমরা একটি ডেমো তৈরি করেছি। গাইডেন্স সিস্টেম দিলে সেটি নির্দিষ্ট টার্গেট অনুযায়ী চলবে। কিন্তু এই ধরনের যন্ত্র উড্ডয়নের জন্য প্রয়োজন সরকারি অনুমোদন। নিরাপত্তা, আকাশসীমা আর ঝুঁকি মিলিয়ে কঠোর নিয়মের ভেতরেই পড়ে এই প্রযুক্তি।
স্বপ্ন, নাকি অতিরঞ্জন
এই দুই তরুণের অর্জনের তালিকা ছোট নয়। জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহে পুরস্কার, বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে সাফল্য, আইডিইএ প্রকল্প থেকে তহবিল মিলিয়ে তাদের কাজ ইতিমধ্যে নজরে এসেছে।
সুজন তৈরি করেছিলেন আগুন ও গ্যাস লিকেজ শনাক্তকারী রোবট। প্রিতম জাতীয় বিজ্ঞান মেলায় স্বর্ণপদক পেয়েছেন।
তবে তাদের এই নতুন উদ্যোগ যেমন কৌতূহল জাগাচ্ছে, তেমনি প্রশ্নও তুলছে। একটি গ্রাম থেকে, সীমিত সম্পদে তৈরি 'মিসাইল'টি কতটা প্রযুক্তিগতভাবে নির্ভরযোগ্য? কিংবা এটা কতটা নিরাপদ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রকেট বা মিসাইল প্রযুক্তি অত্যন্ত জটিল এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের বিষয়। গাইডেন্স, প্রপালশন, সেফটির মতো প্রতিটি ধাপেই দরকার উচ্চমানের পরীক্ষা ও অনুমোদন। তাই এই প্রকল্পকে অনেকেই দেখছেন একটি 'লার্নিং প্রোটোটাইপ' হিসেবেই।কারণ এটি শুরু হয়েছে, কিন্তু এখনো শেষ পথ অনেক দূর।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. খোরশেদ আলম বলেন, দুজনেই অত্যান্ত মেধাবী। এই ধরনের উদ্যোগকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা জরুরি।
ড্যাফোডিলের শিক্ষক আমির সোহেলও বলছেন, প্রিতম নতুন কিছু শেখার ক্ষেত্রে খুবই আগ্রহী। আমরা ল্যাব সুবিধা দিয়ে সহযোগিতা করছি। তবে বড় পর্যায়ে যেতে হলে আরও সহায়তা দরকার।
মাটিতে দাঁড়িয়ে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন
আগৈলঝাড়ার সেই ঘরে বসে আঁকা নকশা হয়তো এখনো পূর্ণতা পায়নি। কিন্তু গ্রামের তরুণদের স্বপ্ন বদলাচ্ছে, চিন্তার পরিসর বাড়াচ্ছে তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তরুনদের রকেট আকাশে উঠবে কি না, তা সময় বলবে। কিন্তু এই গল্প ইতিমধ্যেই একটি নতুন প্রশ্ন তুলেছে, আমাদের তরুণদের স্বপ্ন কত দূর যেতে পারে, যদি সঠিক সহায়তা পায়?
মামা-ভাগ্নের কথায়, আমরা চাই দেশের জন্য কিছু করতে। যদি সুযোগ পাই, তাহলে আরও ভালো কাজ করা সম্ভব।
তাদের স্বপ্নের ভাষা অত্যান্ত সহজ। কিন্তু বাস্তবের পথ ততটাই কঠিন। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এই গল্প। যেই গল্পে একটু কৌতূহল, একটু সাহস, আর অনেকটা অজানা পথের দিকে হাঁটা।