30/06/2026
"তাকওয়া (تقوى) ও হেদায়াহ (هداية) : আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে মানব জীবনের আলোকবর্তিকা"
# আলহাজ্ব মোঃ নূর ইসলাম খান অসি
ইসলামের দৃষ্টিতে তাকওয়া (تقوى) ও হেদায়াহ (هداية) কী?
ভূমিকা
ইসলামে মানুষের সফলতা কেবল পার্থিব জ্ঞান, সম্পদ বা মর্যাদার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং আল্লাহ তায়ালার প্রতি বিশ্বাস, তাঁর নির্দেশনা অনুসরণ এবং সৎ পথে জীবন পরিচালনার ওপর নির্ভরশীল। এই পথচলার দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তাকওয়া (تقوى) ও হেদায়াহ (هداية)। একটি মানুষকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করে, অন্যটি তাকে সেই পথের সন্ধান ও চলার তাওফিক দান করে।
তাকওয়া (تقوى):
তাকওয়া শব্দটি আরবি ধাতু وَقَى (ওয়াক্বা) থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো—রক্ষা করা, বাঁচানো, নিজেকে সংযত রাখা। ইসলামী পরিভাষায় তাকওয়া বলতে বোঝায়:
আল্লাহ তায়ালার প্রতি গভীর সচেতনতা, ভালোবাসা ও ভয় রেখে এমনভাবে জীবন পরিচালনা করা, যাতে মানুষ আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে নিজেকে রক্ষা করে এবং তাঁর সন্তুষ্টির পথে অগ্রসর হয়।
তাকওয়ার অর্থ শুধু ভয় নয়; বরং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর প্রতি দায়িত্ববোধ এবং নিজের কাজের জন্য জবাবদিহিতার অনুভূতিও এর অন্তর্ভুক্ত। একজন মুত্তাকি ব্যক্তি গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহর বিধান মেনে চলার চেষ্টা করেন এবং পাপ, অন্যায় ও অনৈতিক কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখেন।
তাকওয়া সম্পর্কে হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.)-এর একটি বিখ্যাত উদাহরণ রয়েছে। হজরত উমর (রা.) তাঁকে তাকওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন—একটি কাঁটাযুক্ত পথে চলার সময় মানুষ যেমন সতর্কতার সঙ্গে নিজের কাপড় ও শরীরকে কাঁটা থেকে রক্ষা করে, তেমনি আল্লাহর বান্দা জীবনপথে সতর্কতার সঙ্গে নিজেকে গুনাহ থেকে রক্ষা করবে। এটাই তাকওয়া।
তাকওয়ার প্রধান বৈশিষ্ট্য:
আল্লাহ সর্বদা আমাদের দেখছেন—এই বিশ্বাস ও সচেতনতা রাখা।
আল্লাহর আদেশ পালন করা এবং তাঁর নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বিরত থাকা।
গোপনে ও প্রকাশ্যে নৈতিকতা বজায় রাখা।
নফসের (প্রবৃত্তির) খারাপ আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করা।
মানুষের প্রতি ন্যায়, দয়া ও উত্তম আচরণ করা।
হালাল-হারাম ও বৈধ-অবৈধ বিষয়ে সতর্ক থাকা।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সে-ই অধিক সম্মানিত, যে অধিক তাকওয়াবান।"
(সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১৩)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলামে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা বংশ, সম্পদ বা বাহ্যিক পরিচয়ে নয়; বরং তাকওয়া ও সৎকর্মের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
হেদায়াহ (هداية):
হেদায়াহ শব্দটি আরবি هداية (হিদায়াহ) থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো—পথ দেখানো, সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং সঠিক পথে পরিচালিত করা।
ইসলামী পরিভাষায় হেদায়াহ হলো মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে মানুষের প্রতি এমন এক বিশেষ অনুগ্রহ, যার মাধ্যমে মানুষ সত্যকে চিনতে পারে, সঠিক বিশ্বাস গ্রহণ করতে পারে এবং ন্যায় ও সৎকর্মের পথে চলার তাওফিক লাভ করে।
হেদায়াহ শুধু সঠিক পথের পরিচয় পাওয়া নয়; বরং সেই পথে চলার জন্য আল্লাহর সাহায্য ও অন্তরের দৃঢ়তাও এর অন্তর্ভুক্ত।
হেদায়াহর প্রধান দুটি দিক
১. সত্য পথের পরিচয় লাভ:
আল্লাহ মানুষকে বিবেক, বুদ্ধি, নবী-রাসুল এবং আসমানি কিতাবের মাধ্যমে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বোঝার সুযোগ দিয়েছেন।
২. সত্য পথে চলার তাওফিক লাভ:
শুধু সত্য জানা যথেষ্ট নয়; সেই সত্যকে গ্রহণ করে জীবন পরিচালনা করার শক্তি, আগ্রহ ও স্থিরতা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ।
হেদায়াহর বিভিন্ন স্তর রয়েছে। যেমন—
১. আল্লাহ প্রদত্ত সহজাত জ্ঞান ও বিবেক, যার মাধ্যমে মানুষ ভালো-মন্দের প্রাথমিক ধারণা লাভ করে।
২. নবী-রাসুল ও আল্লাহর কিতাবের মাধ্যমে সত্যের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা লাভ।
৩. আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ বা তাওফিক, যার মাধ্যমে মানুষের অন্তরে ঈমানের আলো দৃঢ় হয়।
পবিত্র কুরআনে আমরা প্রতিদিন প্রার্থনা করি:
"আমাদের সরল পথ দেখান।"
(সূরা আল-ফাতিহা ১:৬)
তাকওয়া ও হেদায়াহর সম্পর্ক
তাকওয়া ও হেদায়াহ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
হেদায়াহ মানুষকে সঠিক পথ চিনতে সাহায্য করে, আর তাকওয়া মানুষকে সেই পথে অবিচল থাকতে সাহায্য করে।
পবিত্র কুরআনের শুরুতেই আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"এই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই; মুত্তাকিদের জন্য এটি পথনির্দেশ।"
(সূরা আল-বাকারা ২:২)
এখানে বোঝানো হয়েছে যে, আল্লাহর বাণী থেকে প্রকৃত উপকার লাভের জন্য মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি, বিনয় ও সত্য গ্রহণের মানসিকতা থাকা প্রয়োজন।
তাকওয়া ও হেদায়াহ অর্জনের বাস্তব উপায়:
তাকওয়া ও হেদায়াহ আল্লাহ তায়ালার বিশেষ অনুগ্রহ হলেও মানুষকে তা অর্জনের জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা করতে হয়। তাকওয়া অর্জনের জন্য প্রথমত প্রয়োজন আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ঈমান, তাঁর আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন এবং নিয়মিত আত্মসমালোচনা করা। কুরআন তিলাওয়াত, সালাত আদায়, দোয়া ও জিকিরের মাধ্যমে অন্তরকে আল্লাহর স্মরণে জীবন্ত রাখা তাকওয়া বৃদ্ধিতে সহায়ক। একই সঙ্গে গুনাহের কারণ ও প্রবৃত্তির খারাপ প্রবণতা থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে হবে।
হেদায়াহ লাভের জন্য প্রয়োজন সত্য অনুসন্ধানের মানসিকতা, আল্লাহর বাণী ও নবী-রাসুলদের শিক্ষা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন এবং বিনয়ের সঙ্গে সত্যকে গ্রহণ করা। মানুষ যখন আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে সঠিক পথের জন্য প্রার্থনা করে, নিজের ভুল সংশোধনের চেষ্টা করে এবং সৎকর্মে অগ্রসর হয়, তখন আল্লাহর রহমতে তার অন্তর হেদায়াহর আলোয় আলোকিত হয়।
তাই তাকওয়া ও হেদায়াহ অর্জন কোনো একদিনের বিষয় নয়; বরং এটি সারাজীবনের একটি আত্মশুদ্ধির যাত্রা। একজন মুমিনের কর্তব্য হলো জ্ঞান, আমল, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসার মাধ্যমে এই পথে অবিচল থাকা।
উপসংহার
সংক্ষেপে বলা যায়, হেদায়াহ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত সঠিক পথের দিশা, আর তাকওয়া হলো সেই পথে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সতর্কতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে চলার জীবনব্যবস্থা।
যে ব্যক্তি হেদায়াহ লাভ করে এবং তাকওয়ার সঙ্গে জীবন পরিচালনা করে, সে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের পথে অগ্রসর হয়।
মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক হেদায়াহ দান করুন, তাকওয়ার সঙ্গে জীবন পরিচালনার তাওফিক দিন এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ দান করুন—আমিন।
* লেখক পরিচিতি : আলহাজ্ব মোঃ নূর ইসলাম খান অসি
অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক (অপারেশন),
ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি),
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়,
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।
মোবা: ০১৭১১৫৮৫৮৭৫।