12/07/2026
সেনাসদস্যের ১০ দিনের কঠিন জীবনের গল্প
ইউনিফর্মের পেছনের অদৃশ্য যুদ্ধ
অনেকেই শুধু একজন বাংলাদেশ সেনাসদস্যের পরিপাটি ইউনিফর্ম দেখে মুগ্ধ হয়। কাঁধের চকচকে ব্যাজ, বুকের নামফলক আর চারপাশের মানুষের দেয়া সম্মান দেখে সবাই গর্ব অনুভব করে। কিন্তু এই সম্মানের পেছনে কত হাজার ফোঁটা ঘাম, কত না-ঘুমের রাত, কত তীব্র ক্ষুধা, আর কতশত মানসিক ও শারীরিক কষ্ট লুকিয়ে আছে—সেটা খুব কম মানুষই জানে।
প্রথম কদমেই প্রকৃতির নিষ্ঠুর পরীক্ষা
১০ দিনের এই মিশন বা অনুশীলনের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয় এক চরম পরীক্ষা। পিঠে চেপে বসেছে ২০ কেজিরও বেশি ওজনের বিশাল এক ‘প্যাক’ (ব্যাগ)। সেই ব্যাগে রয়েছে ১০ দিন টিকে থাকার সমস্ত রসদ—শুকনো খাবার, পোশাক, তাঁবু খাটানোর সরঞ্জাম, রান্নার জিনিসপত্র, পানির বোতল এবং ভারী অস্ত্রশস্ত্র। কোনো বাহন নেই, কোনো শর্টকাট রাস্তা নেই। সামনে শুধু মাইলের পর মাইল বিস্তৃত ধূ ধূ পথ কিংবা দুর্গম পাহাড়।
কষ্টের শুরুটা ঠিক তখনই, যখন ২০ কিলোমিটারের দীর্ঘ হাঁটা শুরু করতেই আকাশ ভেঙে ঝুম বৃষ্টি নামল।
আকাশের মেঘ যেন প্রথম মুহূর্তেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। কোনো ছাউনি নেই, থামার কোনো উপায় নেই। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা যখন তীরের মতো শরীরে বিঁধতে থাকে, তখন মুহূর্তেই গায়ের ইউনিফর্ম ভিজে সিক্ত হয়ে যায়। পিঠের ২০ কেজির ব্যাগটা পানি শুষে নিয়ে হয়ে ওঠে দ্বিগুণ ভারী—যেন আস্ত একটা পাথরের চাঁই কাঁধে চেপে বসেছে। সেই ভেজা কাপড়ে, ভারী ব্যাগ পিঠে নিয়ে, বুটের ভেতর জমে যাওয়া পানিতে পা ডুবিয়ে শুরু হয় মাইলের পর মাইল হাঁটা।
কিছুদূর যাওয়ার পর কাঁধ অবশ হয়ে আসে। পিঠের চামড়া যেন ছিলে যেতে থাকে। বুটের ভেতরে পা ভিজে নরম হয়ে যাওয়ায় চামড়া উঠে গিয়ে একেকটা বিশাল ফোস্কা পড়ে। প্রতিটা কদমে সেই ফোস্কাগুলো যখন বুটের ভেতরের শক্ত চামড়ায় ঘষা খায়, মনে হয় যেন কেউ জীবন্ত পায়ে সুই ফোটাচ্ছে। তবুও থামা বারণ। কারণ একজন সেনাসদস্যের কাছে ‘আদেশ’ আর ‘কর্তব্য’ জীবনের চেয়েও বড়।
কাদা-মাটি আর গভীর খাদের লড়াই
বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি বা কাঁচা রাস্তাগুলো মুহূর্তেই রূপ নেয় মরণফাঁদে। চারদিকে শুধু পিচ্ছিল কাদা। কোথাও খাড়া ঢাল, কোথাও আবার ডানপাশে হাজার ফুটের গভীর খাদ। ভারী ব্যাগ নিয়ে পা পিছলে গেলেই নির্ঘাত বড় দুর্ঘটনা। ভেজা বুট দিয়ে সেই পিচ্ছিল কাদার ওপর ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে পায়ের পেশিতে তীব্র টান ধরে, রগগুলো ছিঁড়ে যাওয়ার মতো ব্যথা হয়। শরীর যখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তে চায়, ঠিক তখনই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু ছোট ছোট ছেলে-মেয়ের দিকে চোখ পড়ে।
কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে থাকা সেই নিষ্পাপ শিশুদের কেউ একজন যখন ছোট্ট হাতটা কপালে ঠেকিয়ে স্যালুট দেয়, সেই মুহূর্তেই যেন ম্যাজিক ঘটে যায়। বুকটা গর্বে ভরে ওঠে, সব কষ্ট যেন নিমেষেই উধাও হয়ে যায়। মনে হয়—এই দেশের মানুষ, এই শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্যই তো আমাদের এই নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া।
২০ কিলোমিটার অবিরাম হাঁটার পর জোটে মাত্র ১০ মিনিটের সংক্ষিপ্ত বিশ্রাম। সেই ১০ মিনিটে কাদার ওপরেই কেউ ব্যাগটাকে বালিশ বানিয়ে পিঠটা সোজা করার চেষ্টা করে, কেউ বা একটু চোখ বন্ধ করে। মনে হয়, যদি আর একটা মিনিট বেশি ঘুমানো যেত! কিন্তু বাঁশির তীক্ষ্ণ শব্দ হওয়া মাত্রই সব মোহ ত্যাগ করে আবার বুট ঠুকে দাঁড়িয়ে যেতে হয়।
নিঝুম জঙ্গল, টর্চের আলো আর বৃষ্টির গর্জন
হাঁটতে হাঁটতে ঘড়ির কাঁটা যখন রাত ৩টার ঘর ছোঁয়, তখন দলবলসহ পৌঁছাতে হয় লোকালয় থেকে বহু দূরে, এক জনমানবহীন গভীর জঙ্গলে। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার, ৩ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো মানুষের চিহ্ন নেই। শরীর তখন ক্লান্তির শেষ সীমায়, চোখ দুটো ঘুমে বুজে আসছে। কিন্তু সেখানে পৌঁছেই বিশ্রামের কোনো সুযোগ নেই।
জঙ্গল পরিষ্কারের যুদ্ধ: ঘন বাঁশঝাড়, কাঁটাঝোপ আর বুনো লতাপাতা কেটে প্রথমেই নিজেদের থাকার জায়গা তৈরি করতে হয়।
অন্ধকারের চ্যালেঞ্জ: এলাকায় কোনো বিদ্যুৎ নেই। জঙ্গল এতটাই অন্ধকার যে নিজের হাতটাও দেখা যায় না। একমাত্র ভরসা হাতের ছোট্ট টর্চ লাইট বা হেডলাইট। সেই টিমটিমে আলো জ্বেলে, একহাতে অস্ত্র সামলে অন্যহাতে দা-কোদাল দিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করতে হয়।
তাঁবু খাটানোর ধকল: কাদা মাটির ওপর ভেজা বাঁশ আর পলিথিন দিয়ে খাটাতে হয় থাকার তাঁবু। ভেজা হাত-পায়ে যখন কাদা আর পোকা-মাকড় কামড়ায়, তখন উফ শব্দটা করারও শক্তি থাকে না।
এই গভীর জঙ্গলে রাতের বেলা যখন ঝুম বৃষ্টি নামে, তখন চারপাশের বুনো পরিবেশ এক ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। পাতার ওপর বৃষ্টির একটানা গর্জন, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর বুনো বাতাসের শব্দে এক গা ছমছমে পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
এরই মধ্যে পেটের ক্ষুধা মেটানোর তাগিদ। ভেজা কাঠ, কাদা আর বৃষ্টির ছাঁটের মধ্যেই কোনোমতে আগুন জ্বালানোর আপ্রাণ চেষ্টা চলে। ধোঁয়ায় চোখ অন্ধ হয়ে আসে, জল পড়তে থাকে চোখ দিয়ে। আধা-সেদ্ধ চাল বা শুকনো রুটি যা-ই জুটুক না কেন, ওটাই তখন অমৃত। খাওয়া শেষ হতে হতে ঘড়িতে ভোর ৪টা বেজে যায়।
অনিদ্রা আর ত্যাগের মহাকাব্য
তাঁবু খাটানো শেষ হলেও ঘুমানোর কোনো জো নেই। এবার শুরু হয় সেন্ট্রি (পাহারার) ডিউটি। বৃষ্টির শব্দের আড়ালে কোনো শত্রু বা বুনো হিংস্র জন্তু যেন আক্রমণ করতে না পারে, সেজন্য কান খাড়া করে রাখতে হয়। ৪ দিন, ৫ দিন, এভাবে করতে করতে ১১ দিন পার হয়ে যায়।🫠🫠
অমানবিক ক্লান্তি: টানা কয়েকদিন গোসল নেই, গায়ে ঘাম আর বৃষ্টির পানি শুকিয়ে চর্মরোগের মতো অবস্থা হয়। ভেজা কাপড় গায়েই শুকিয়ে যায়, আবার ভিজলে ওভাবেই থাকতে হয়।🥹🥹
যখন শরীর পুরোপুরি জবাব দিয়ে দেয়, পেশিগুলো আর সায় দেয় না, মস্তিষ্ক বলে "আর পারছি না"—ঠিক তখনই ভেতর থেকে সেনাবাহিনীর সেই চিরন্তন মন্ত্রটি জেগে ওঠে: "দেশের জন্য আরও একটু, দেশের মানুষের জন্য আর একটু কষ্ট নাহয় করলাম।"🥲🥲
আপনারা যখন রাতে নিশ্চিন্তে এসি বা ফ্যানের বাতাসে নরম বিছানায় ঘুমান, তখন হয়তো কোনো এক সেনাসদস্য জঙ্গল-পাহাড়ে ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে, টর্চের আলোয় মশার কামড় সহ্য করে দেশের সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন 🥹🫡🫡