13/03/2026
নাজাশীর দরবারে কুরায়েশ প্রতিনিধি দল
হাবশায় গিয়ে যাতে মুসলমানগণ শান্তিতে থাকতে না পারে, সেজন্য কুরায়েশ নেতারা তাদেরকে ফিরিয়ে আনার ষড়যন্ত্র করল। এ উদ্দেশ্য সফল করার জন্য তারা কুশাগ্রবুদ্ধি কূটনীতিবিদ আমর ইবনুল ‘আছ এবং আব্দুল্লাহ ইবনু আবী রাবী‘আহকে দায়িত্ব দিল।
এ দু’জন পরে মুসলমান হন। ১ম জন ৭ম হিজরীর প্রথম দিকে এবং ২য় জন ৮ম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের পর। আব্দুল্লাহ ছিলেন আবু জাহলের বৈপিত্রেয় সহোদর ভাই। নাম ছিল বুহায়রা )بُخیری(। ইসলাম গ্রহণের পর আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তার নাম রাখেন ‘আব্দুল্লাহ’ (ইবনু হিশাম ১/৩৩৩, টীকা-১)।
তারা মহামূল্য উপঢৌকনাদি নিয়ে হাবশাযাত্রা করেন এবং সেখানে গিয়ে প্রথমে খ্রিষ্টানদের নেতৃস্থানীয় ধর্মনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাদের ক্ষুরধার যুক্তি এবং মূল্যবান উপঢৌকনাদিতে ভুলে দরবারের পাদ্রী নেতারা একমত হয়ে যান।
পরের দিন আমর ইবনুল ‘আছ উপঢৌকনাদি নিয়ে বাদশাহ নাজাশীর দরবারে উপস্থিত হলেন। অতঃপর তারা বললেন,
হে বাদশাহ! আপনার দেশে আমাদের কিছু অজ্ঞ-মূর্খ ছেলে-ছোকরা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে। যারা তাদের কওমের দ্বীন পরিত্যাগ করেছে এবং তারা আপনাদের ধর্মেও প্রবেশ করেনি। তারা এমন এক নতুন দ্বীন নিয়ে এসেছে, যা আমরা কখনো শুনিনি বা আপনিও জানেন না।
আমাদের কওমের নেতৃবৃন্দ আমাদেরকে আপনার নিকটে পাঠিয়েছেন, যাতে আপনি তাদেরকে তাদের সম্প্রদায়ের কাছে ফেরৎ পাঠান।
তাদের কথা শেষ হলে উপস্থিত পাদ্রী নেতাগণ কুরায়েশ দূতদ্বয়ের সমর্থনে মুহাজিরগণকে তাদের হাতে সোপর্দ করার জন্য বাদশাহকে অনুরোধ করেন।
তখন বাদশাহ রাগত স্বরে বলেন,
আল্লাহর কসম! এটা কখনোই হতে পারে না। তারা আমার দেশে এসেছে এবং অন্যদের চাইতে আমাকে পছন্দ করেছে। অতএব তাদের বক্তব্য না শুনে কোনরূপ সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
ফলে তাঁর নির্দেশক্রমে জা‘ফর বিন আবু তালিবের নেতৃত্বে মুসলিম প্রতিনিধি দল বাদশাহ্র দরবারে উপস্থিত হয়ে তাঁকে সালাম দিলেন। কিন্তু সিজদা করলেন না।
বাদশাহ তাদের জিজ্ঞেস করলেন,
তোমরা প্রথানুযায়ী আমাকে সিজদা করলে না কেন? যেমন ইতিপূর্বে তোমাদের কওমের প্রতিনিধিদ্বয় এসে করেছে?
বাদশাহ আরও বললেন,
বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করে এমনকি আমাদের ধর্ম গ্রহণ না করে নতুন যে ধর্মে তোমরা দীক্ষা নিয়েছ, সেটা কী, আমাকে শোনাও।
জা‘ফর বিন আবু তালিব বললেন,
হে বাদশাহ! আমাদের ধর্মের নাম ‘ইসলাম’। আমরা স্রেফ আল্লাহর ইবাদত করি এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করি না।
বাদশাহ বললেন,
কে তোমাদের এসব কথা শিখিয়েছেন?
জা‘ফর বললেন,
আমাদের মধ্যেরই একজন ব্যক্তি। ইতিপূর্বে আমরা মূর্তিপূজা ও অশ্লীলতা এবং অন্যায় ও অত্যাচারে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিলাম। আমরা শক্তিশালীরা দুর্বলদের শোষণ করতাম।
এমতাবস্থায় আল্লাহ মেহেরবানী করে আমাদের মধ্যে তাঁর শেষনবীকে প্রেরণ করেছেন। তাঁর নাম ‘মুহাম্মাদ’। তিনি আমাদের চোখের সামনে বড় হয়েছেন। তাঁর বংশ মর্যাদা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারী, সংযমশীলতা, পরোপকারিতা প্রভৃতি গুণাবলী আমরা জানি।
নবুঅত লাভের পর তিনি আমাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন এবং মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে সর্বাবস্থায় এক আল্লাহর ইবাদত করার আহবান জানিয়েছেন। সাথে সাথে যাবতীয় অন্যায়-অপকর্ম হতে তওবা করে সৎকর্মশীল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
আমরা তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং এক আল্লাহর ইবাদত করছি ও হালাল-হারাম মেনে চলছি। এতে আমাদের কওমের নেতারা আমাদের উপর ক্রুদ্ধ হয়েছেন এবং আমাদের উপর প্রচণ্ড নির্যাতন চালিয়েছেন।
সে কারণে বাধ্য হয়ে আমরা সবকিছু ফেলে আপনার রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছি আপনার সুশাসনের খবর শুনে। আমরা অন্যস্থান বাদ দিয়ে আপনাকে পছন্দ করেছি এবং আপনার এখানেই আমরা থাকতে চাই। আশা করি আমরা আপনার নিকটে অত্যাচারিত হব না।
অতঃপর জা‘ফর বললেন,
হে বাদশাহ! অভিবাদন সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) আমাদের জানিয়েছেন যে, জান্নাতবাসীদের পরস্পরে অভিবাদন হল ‘সালাম’ এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদেরকে পরস্পরে সালাম করার নির্দেশ দিয়েছেন।
বাদশাহ বললেন,
ঈসা ও তাঁর দ্বীন সম্পর্কে তোমরা কি বলতে চাও?
উত্তরে জা‘ফর বিন আবু তালিব সূরা মারিয়ামের শুরু থেকে ৩৬ পর্যন্ত আয়াতগুলি পাঠ করে শুনান। যেখানে হযরত যাকারিয়া ও ইয়াহইয়া (আঃ)-এর বিবরণ, মারিয়ামের প্রতিপালন, ঈসার জন্মগ্রহণ ও লালন-পালন, মাতৃক্রোড়ে কথোপকথন ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা রয়েছে।
বাদশাহ ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক এবং তাওরাত-ইনজীলে পণ্ডিত ব্যক্তি। কুরআনের অপূর্ব বাকভঙ্গি, শব্দশৈলী ও ভাষালংকার এবং ঘটনার সারবত্তা উপলব্ধি করে বাদশাহ অঝোর নয়নে কাঁদতে থাকলেন।
সাথে উপস্থিত পাদ্রীরাও কাঁদতে লাগলেন। তাদের চোখের পানিতে তাদের হাতে ধরা ধর্মগ্রন্থগুলি ভিজে গেল।
অতঃপর নাজাশী বলে উঠলেন,
إِنَّ هَذَا وَالَّذِي جَاءَ بِهِ عِيسَى
“এই কালাম এবং ঈসার নিকটে যা নাযিল হয়েছিল—দুটি একই আলোর উৎস থেকে নির্গত।”
বলেই তিনি কুরায়েশ দূতদ্বয়ের দিকে ফিরে বললেন,
انْطَلِقَا فَلَا وَاللهِ لَا أُسْلِمُهُمْ
“তোমরা চলে যাও! আল্লাহর কসম! আমি কখনোই এদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দেব না।”
আমর ইবনুল ‘আছ এবং আব্দুল্লাহ ইবনু আবী রাবী‘আহ দরবার থেকে বেরিয়ে গেলেন।
আমর বললেন,
কালকে এসে এমন কিছু কথা বাদশাহকে শুনাবো, যাতে এদের মূলোৎপাটন হয়ে যাবে এবং এরা ধ্বংস হবে।
একথা শুনে আব্দুল্লাহ বললেন,
না, না এমন নিষ্ঠুর কিছু করবেন না। ওরা আমাদের স্বগোত্রীয় এবং নিকটাত্মীয়।
কিন্তু আমর ওসব কথায় কর্ণপাত করলেন না।
পরের দিন বাদশাহ্র দরবারে এসে তিনি বললেন,
أَيُّهَا الْمَلِكُ إِنَّهُمْ يَقُولُونَ فِي عِيسَى قَوْلًا عَظِيمًا
“হে সম্রাট! এরা ঈসা ইবনে মারিয়াম সম্পর্কে ভয়ংকর সব কথা বলে থাকে।”
একথা শুনে বাদশাহ মুসলমানদের ডাকালেন। মুসলমানেরা একটু চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। কেননা নাছারারা ঈসাকে উপাস্য মানে। কিন্তু মুসলমানরা তাকে ‘আল্লাহর বান্দা’ বলে থাকে।
যাই হোক, কোনরূপ দ্বৈততার আশ্রয় না নিয়ে তারা সত্য বলার ব্যাপারে মনস্থির করলেন।
অতঃপর আল্লাহর উপর ভরসা করে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জা‘ফর বললেন—
هُوَ عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ وَرُوحُهُ وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَى مَرْيَمَ الْعَذْرَاءِ الْبَتُولِ وَلَمْ يَمَسَّهَا بَشَرٌ
“তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। তিনি আল্লাহ প্রেরিত রূহ এবং তাঁর নির্দেশ। যা তিনি মহীয়সী কুমারী মাতা মারিয়ামের উপরে নিক্ষেপ করেছিলেন। কোন পুরুষ তাকে স্পর্শ করেনি।”
তখন নাজাশী মাটি থেকে একটি কাঠের টুকরা উঠিয়ে নিয়ে বললেন—
আল্লাহর কসম! তুমি যা বলেছ, ঈসা ইবনে মারিয়াম তার চাইতে এই কাঠখণ্ড পরিমাণও বেশি ছিলেন না।
তিনি জা‘ফর ও তার সাথীদের উদ্দেশ্যে বললেন—
اذْهَبُوا فَأَنْتُمْ سُيُومٌ بِأَرْضِي وَالسُّيُومُ الْآمِنُونَ
“যাও! তোমরা আমার দেশে সম্পূর্ণ নিরাপদ।”
مَنْ سَبَّكُمْ غَرِمَ (ثلاث مرات)
“যে ব্যক্তি তোমাদের গালি দিবে, তার জরিমানা হবে।” (তিনবার)
مَا أُحِبُّ أَنَّ لِي دَبَرًا مِنْ ذَهَبٍ وَأَنِّي آذَيْتُ رَجُلًا مِنْكُمْ
“তোমাদের কাউকে কষ্ট দেওয়ার বিনিময়ে যদি কেউ আমাকে স্বর্ণের পাহাড়ও দেয়, আমি তা পছন্দ করব না।”
অতঃপর তিনি কুরায়েশ দূতদ্বয়ের প্রদত্ত উপঢৌকনাদি ফেরত দানের নির্দেশ দিলেন।
ঘটনার বর্ণনাদানকারিণী প্রত্যক্ষ সাক্ষী হযরত উম্মে সালামাহ (রাঃ) বলেন—
فَخَرَجَا مِنْ عِنْدِهِ مَقْبُوحَيْنِ
“অতঃপর ঐ দু’জন ব্যক্তি চরম লাঞ্ছিত অবস্থায় দরবার থেকে বেরিয়ে গেল…”
এবং আমরা উত্তম প্রতিবেশীর সাথে উত্তম গৃহবাসীরূপে বসবাস করতে থাকলাম।
#রাসূল(স.) #এর #জীবনী
#অধ্যায়২৩)