14/09/2025
কাওমী ঘরানার আলেম
ইজহারুল ইসলাম কাউসারীর সুন্দর বিশ্লেষণ ।
বিদয়াতের সঠিক সংজ্ঞা না জেনে যারা এটা নিয়ে মাতামাতি করে এরা নানাভাবে সুস্পষ্ট স্ববিরোধিতা করে থাকে। কিন্তু তারা এই স্ববিরোধিতা উপলব্ধি করতে পারে না তাদের আক্বল ও ফাহামের দুর্বলতার কারণে।
যেমন, মডার্ণ এলিট সালাফিরা পূর্ববর্তী উলামাদের থেকে প্রচলিত আমলগুলোকে তাদের বস্তুবাদী পশ্চিমা রুচির কারণে অপছন্দ করে। বিভিন সময় এগুলো নিয়ে ট্রলও করে। কিন্তু এদেরকেই দেখবেন, একই কাজ একটু পশ্চিমা ধাচে করলে খুব খুশি হয়।
যেমন, আপনি যদি রবিউল আওয়াল মাসে সিরাত ওয়ার্কশপ করেন, পডকাস্ট করেন, সেমিনার করেন বা জাক-জমকপূর্ণ টিভি শো করেন, তাহলে এরা কোন আপত্তি করে না। এমনকি নিজেরা এগুলো করে। কারণ, এগুলো তাদের পশ্চিমা রুচি-বোধের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু আপনি যদি একই মাসে পশ্চিমা রুচির বাইরে মিলাদ - মাহফিল করেন, তাহলে বিদয়াত বিদয়াত বলে চিৎকার শুরু করে। অথচ মূলনীতির দিক থেকে দু'টোই এক।
যে রবিউল আওয়াল মাসে সীরাত মাহফিল করতেছে, সপ্তাহ ব্যাপী ওয়ার্কশপ করছে, আর যে সপ্তাহ বা মাসব্যাপী মিলাদ করছে, মূলনীতির দিক থেকে উভয় কাজের কী পার্থক্য?
মিলাদকে বিদয়াত বলার মূল কারণটা কি তাহলে এদের কাছে? কোন মাস, দিন বা সপ্তাহকে নির্দিষ্ট করা যদি বিদয়াত বলার কারণ হয়, তাহলে একই কাজ তারা সিরাত মাফহিলেও করছে। রবিউল আওয়ালকে সামনে নিয়ে তারা সপ্তাহ ব্যাপী আয়োজন করছে। শরীয়াতের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট নয়, এমন দিন, মাস, বা সপ্তাহকে নির্দিষ্ট করা যদি বিদয়াত হওয়ার মূল কারণ হয়, তাহলে এই মাসকে উপলক্ষ্য করে সিরাত ওয়ার্কশপ, সিরাত মাহফিল, অনলাইন লাইভ বা পডকাস্ট, সবই বিদয়াত হওয়ার কথা। আর যদি কোন দিন, সপ্তাহ বা মাসকে নির্দিষ্ট করাটা বিদয়াত বলার মূল কারণ না হয়, তাহলে প্রচলিত মিলাদ-মাহফিল বিদয়াত কেন হবে আর পশ্চিমা - স্টাইলের ওয়ার্কশপ, পডকাস্ট কেন বৈধ হবে? মাসব্যাপী বই-মেলা করাই বা বৈধ হবে কেন? নাকি যেসব কাজ পশ্চিমা রুচির সাথে মিলবে অথবা নিজেদের পকেট ভারী করবে সেগুলো জায়েজ আর এর বাইরে গরীবের জিলাপি খাওয়া বিদয়াত?
কেউ কেউ আরেক হাস্যকর যুক্তি এনেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু এর মিলাদ থেকে যেহেতু আমাদের জন্য শিক্ষণীয় কিছু নেই, সিরাত থেকে শিক্ষণীয় আছে এজন্য আমরা মিলাদ না করে সিরাত করব।
এটাও খুবই মারাত্মক পর্যায়ের অজ্ঞতাপূর্ণ বক্তব্য। এমনকি অনেক সময় এধরণের বক্তব্য কুফুরী পর্যায়েও চলে যেতে পারে। নবীজীর আজমত ও মহব্বত স্বতন্ত্র ইবাদত। নবীজীর শুধু জন্ম বা পৃথিবীতে আগমন কেন, নবীজীর সাথে সংশ্লিষ্ট যে কোন কিছুর আলোচনা, তার প্রতি আজমত ও মহব্বত আমাদের ঈমানের অংশ। কেউ যদি মনে করে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের ওই বিষয়গুলোই শুধু আলোচনা করা যাবে বা উচিৎ যেগুলো থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারব বা আমরা আমল করব, অন্য বিষয়ের আলোচনা করা উচিৎ নয় বা এগুলোর আলোচনা থেকে অনুৎসাহিত করে, তাহলে এটি কুফুরী হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিু ওয়াসাল্লামের পেশাব-পায়খানার আলোচনা নিয়েও কেউ যদি অপছন্দ বা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, তাহলে সেটিও কুফুরী হবে। এজন্য এর চেয়ে ধৃষ্ঠতাপূর্ণ কথা আর কী হতে পারে যে, সিরাত শিক্ষণীয় এজন্য সিরাতের আলোচনা করা যাবে আর মিলাদ থেকে শিক্ষার কিছু নেই, এজন্য এটা করা যাবে না। ইন্নালিল্লাহ।
পবিত্র কুরআনে বেশ কয়েক জায়গায় নবীগণের জন্মের দিনকে বিশেষভাবে উল্লেখ করে তাদের উপর সালাম দেয়া হয়েছে। শান্তি ও নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে।
যেমন হযরত ইয়াহইয়া আ: এর ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনের আয়াত,
وَسَلَامٌ عَلَيْهِ يَوْمَ وُلِدَ وَيَوْمَ يَمُوتُ وَيَوْمَ يُبْعَثُ حَيًّا
একইভাবে হযরত ঈসা আ: এর ক্ষেত্রে কুরআনের আয়াত,
وَالسَّلَامُ عَلَيَّ يَوْمَ وُلِدتُّ وَيَوْمَ أَمُوتُ وَيَوْمَ أُبْعَثُ حَيًّا
বিভিন্ন তাফসীরে হাসান বসরী রহ: থেকে একটি বর্ণনা এসেছে,
وقال الحسن البصري: التقى يحيى وعيسى، فقال يحيى لعيسى: أنتَ خير مني، فقال عيسى ليحيى: بل أنت خير مني، سلَّم الله عليك، وأنا سلَّمتُ على نفسي. وقال سعيد بن جبير مثله، إِلا أنه قال: أثنى الله عليك، وأنا أثنيت على نفسي
অর্থাৎ হাসান বসরী রহ: বলেন, হযর ইয়াহইয়া ও হযরত ঈসা আ: পরস্পর সাক্ষাৎ করলেন। তখন হযরত ইয়াহইয়া হযরত ঈসা আ: কে বললেন, আপনি আমার চেয়ে উত্তম। উত্তরে হযরত ঈসা আ: বললেন, বরং আপনি আমার চেয়ে উত্তম। আপনাকে আল্লাহ তায়ালা সালাম জানিয়েছেন, আর আমি নিজে নিজের উপর সালাম জানিয়েছি।
সাইদ ইবনে জুবায়ের রহ: ও একই কথা বলেছেন। তবে শেষে বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা আপনার প্রশংসা করেছেন আপনার জন্মের দিনে আর আমি নিজে নিজের প্রশংসা করেছি।
এখানে জন্মের দিনে সালাম দ্বারা আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি - নিরাপত্তা, শয়তানের ক্ষতি থেকে হেফাজত থাকা সহ বিভিন্ন অর্থ হতে পারে। তবে মূল বিষয় হলো, নবীগণের জন্মের দিনে তাদের উপর সালাম পেশ করা এটি সাধারণ কোন বিষয় নয়। একথা বলার সুযোগ নেই যে, জন্মের দিন থেকে তো আমাদের শিক্ষার কিছু নেই এজন্য আমরা সেটা নিয়ে আলোচনা, দুরুদ, সালাম কিছুই করি না। সিরাত থেকে যেহেতু শিক্ষণীয় বিষয় আছে, এজন্য সিরাত ওয়ার্কশপ করি। এধরণের কথা চরম মূর্খতা ছাড়া কিছুই নয়। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন।