05/06/2026
একটা সময় ছিল— প্রেম মানেই আকাশ ছেঁড়া এক টুকরো তারা।
যে পেত, সে নিজেকে ভাবত ভাগ্যের রাজপুত্র।
প্রেম ছিল নীরব চিঠি, অপেক্ষার ফল্গুধারা, একটা গোটা জীবন উৎসর্গ করার সাহস।
তখন প্রেমিক মানেই পাগল আর সাধক একাকার।
কারণ, এই প্রেম মানেই প্রতিশ্রুত জীবনসঙ্গী..
যে পেত সে সত্যি ভাগ্যমান।
আর এখন?
এখন প্রেম মানে সুপারশপের সেলফে সাজানো প্যাকেটজাত অনুভূতি।
সোয়াইপের আঙুলে এক রাতেই জন্ম নেওয়া ‘ভালোবাসি’,
যার শেলফ লাইফ সূর্যোদয়ের আগেই ফুরিয়ে যায়।
তাই কেউ যখন বলে, “আমি এই যুগে কোন প্রেম করি না”,
তখন সত্যি সত্যি মনে হয়—
এই লোকটা এখনকার এই ভেজাল বাজার থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছে মানে;
লোকটা আসলেই ভাগ্যবান।
বর্তমানের প্রেম মানে “প্যারাডক্স অফ চয়েস”।
যেখানে বিকল্প যত বেশি, সেখানে তৃপ্তি তত কম।
সোশ্যাল মিডিয়ার অফুরান আর নিত্য নতুন অপশনে মস্তিষ্কে ডোপামিনের ঝড় তোলে বটে,
কিন্তু সেটা নেশার চক্র ছাড়া আর কিছু নয়— একে বলে “ডোপামিন লুপ”।
প্রতিটি নতুন মুখ ক্যাসিনোর স্লট মেশিনের মতো মস্তিষ্ককে পুরস্কারের আশায় ব্যতিব্যস্ত রাখে।
ফলে একজন মানুষ নিছক “অপশন” হয়ে পড়েন, অনুভবের পূর্ণাঙ্গ মানুষটি আর আবিষ্কৃতই হন না।
সম্পর্কে তৈরি হয় “ফেয়ারওয়েল ইফেক্ট”—
একজনকে ছেড়ে পরবর্তীজনের দিকে ঝোঁক, কখনোই বর্তমানের গভীরে ডুব না দেওয়া।
আগেকার প্রেম ছিল গভীর নদী— ওপরে ঢেউ কম, তলায় স্রোত প্রবল।
ভালোবাসার মানুষটির জন্য অপেক্ষা ছিল এক ধরনের আরাধনা।
একটা দীর্ঘশ্বাসের দাম ছিল টানা এক মাসের বৃষ্টির সমান।
আর এখনকার প্রেম ডিসপোজেবল কাপের চায়ের মতো— চুমুক শেষ, ছুড়ে ফেলো।
ইমোশনের বাজার গরম, অথচ অনুভবের দাম নিতান্তই সস্তা।
মানুষ ঠিক যেন চটজলদি নুডলস রাঁধার মতো সম্পর্ক গড়ে,
আর অপেক্ষা না করেই সেটা গলাধঃকরণ করে হজমের গুলি খায়।
এই “ইমোশনাল কমোডিফিকেশন”-এর পেছনে কাজ করে স্বল্পমেয়াদি পুরস্কারের মনস্তত্ত্ব।
যে সম্পর্কে সমস্যার মুখোমুখি হলেই সঙ্গী বদলে ফেলার সুযোগ থাকে,
সেখানে মানুষের মধ্যে “গ্রাস ইজ গ্রিনার” প্রবণতা মাথাচাড়া দেয়;
অথচ দীর্ঘস্থায়ী সুখের মূল উপকরণ “কমিটমেন্ট”-এর স্নায়বিক স্থাপত্য তখনই গড়ে ওঠে,
যখন মস্তিষ্ক জানতে পারে— এই সম্পর্কই শেষ, এখানেই বিনিয়োগ।
কিন্তু “সলাঙ্কি এফেক্ট” অনুযায়ী কেউ যখন খুব সহজলভ্য ও প্রতিস্থাপনযোগ্য, তখন তার মূল্য কমে যায়।
আধুনিক প্রেমের বাজারে প্রেম তাই দিন দিন এমনই সস্তা হয়ে উঠে।
আগে ভালোবাসার অর্থ ছিল ‘তোমার জন্যই আমার শেষ অপেক্ষা’।
এখন ভালোবাসার সংজ্ঞা দাঁড়িয়েছে ‘তোর পরে নেক্সট’।
বড় অদ্ভুত সময়— দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি হলেও, কিন্তু
প্রেমের বাজারে মূল্যস্ফীতির ভরাডুবি।
আগে যেখানে একটা হাত ধরে রাখার অর্থ ছিল জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি,
সেখানে এখন বিছানা ভাগ হলেও হৃদয় ভাগ হয় না।
তাই এই সস্তা প্রেমের বাজারে যে নিজেকে একা রাখতে পেরেছে,
বুঝতে হবে সে সস্তার সয়লাব থেকে নিজের মূল্য আঁচড়ে বাঁচিয়ে তুলেছে।
এখন তাই বিনা প্রেমে থাকাটাই বোধহয় শেষ ভালোবাসা। যন্ত্র না হয়ে সত্যিকারের সেই মানুষটাকে খুঁজা—
যাকে সরাসরি পরিণয়ের স্বীকৃতি দিয়ে ভালোবাসার যাত্রা শুরু করা।
কারণ, যে মূল্যস্ফীতি প্রেমের বাজার থেকে উধাও,
তার একমাত্র প্রতিষেধক নিজের সংবেদনশীলতাকে তীক্ষ্ণ রাখা,
আর খাঁটি অনুভবের ন্যূনতম মূল্যটুকু বাঁচিয়ে তোলা— প্রতিটি
স্পর্শে, প্রতিটি যত্নে, আজীবন পাশে থাকার সাহসী অঙ্গীকার নিয়ে।
সংগৃহীত।