15/02/2026
সবার মতামতকে উপেক্ষা করে রাশিয়াতে আক্রমণ করে বসল হিটলারের নাৎসি বাহিনী। উপদেষ্টারা বারবার হিটলারকে সতর্ক করলেন। কিন্তু তাদের মতামতকে পাত্তাই দিলেন না তিনি। এমনকি জার্মান সেনারা যখন সোভিয়েত বাহিনীর হাতে পরাস্ত হতে শুরু করল, তখনো হিটলার মানতে চাইলেন না যে, তার সিদ্ধান্ত ছিল ভুল। বহু চেষ্টা করেও হিটলারকে বোঝানি যায়নি যে তিনিও ভুল করতে পারেন। হিটলার থেকে শুরু করে আপনি, আপনার বস, সহকর্মী, বন্ধু কিংবা জীবনসঙ্গী কাউকেই বোঝানো যায় না যে, "You are wrong."
হিটলারকে একপেশে দোষ দিয়ে লাভ নেই, বিশ্বাস করুন আমরা সবাই কমবেশি এরকম। আপনার জীবনে কখনো এমন হয়নি যেখানে আপনার বন্ধু বা প্রিয়জনকে কোনো একটি বিষয়ে যথেষ্ট যুক্তি বা ব্যখ্যা দিয়েও তার ভুল ভাঙাতে পারেননি? অথবা সব সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করার পরেও আপনি নিজেই মেনে নিতে পারেননি যে আপনি ভুল। তুচ্ছ বিষয় থেকে শুরু করে রাজনীতি, ধর্ম বা অন্য যে কোনো আলোচনায় মানুষ এমন আচরণই করে থাকে। মজার ব্যাপার কি জানেন, আমরা এমন অনেক তর্কে জড়াই যেখানে আমরা শুধু অন্যদেরকেই নয়, নিজেকেও বোঝানোর চেষ্টা করি যে, আমিই সঠিক।
কিন্তু কেন?
আমরা প্রায়ই আমাদের চিন্তাভাবনা, বিশ্বাস ও আচরণে এক ধরনের অন্তর্দ্বন্দ্বে ভুগি। আপনি প্রতিদিন এমন অনেক কিছু দেখেন, যা আপনার নিজস্ব বিশ্বাস এবং মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক। এই সংঘর্ষ থেকে আমাদের মস্তিষ্কে এক ধরনের অস্বস্তি সৃষ্টি হয় যাকে মনোবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন "Cognitive dissonance"। আপনার মস্তিষ্ক এই অস্বস্তি বা মানসিক চাপ একেবারেই সহ্য করতে পারে না। এই মানসিক চাপ দূর করতে মস্তিষ্ক তখন নানা ধরনের অজুহাত তৈরি করতে শুরু করে। বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে আমরা নিজেদেরকে বোঝাতে থাকি যে, আমরাই সঠিক।
আচ্ছা ধরে নিচ্ছি, আপনি ধূমপান করেন। ধূমপানের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কথা জেনে এবং বুঝেই করেন। কিন্তু কেন? আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই দেখা যায়, অন্তর্দ্বন্দ্ব মেটানোর জন্য আপনার নানারকম অজুহাত তৈরির চেষ্টা।
কই এত বেশি ধূমপান তো করছি না!
এই বয়সে খাব না তো কখন খাব?
কিংবা সমস্যা হলে ছেড়ে দেয়া যাবে — এমন হাজারো অজুহাত। এগুলো নিজেকে শান্ত করার আমাদের মস্তিষ্কের একটি বিশেষ কৌশল। সত্যকে মেনে নেওয়া বা আচরণ বদলানোর চেয়ে অপ্রাসঙ্গিক যুক্তি সিদ্ধ করার মাধ্যমে নিজের বিশ্বাসকে ন্যায্যতা দেওয়া তুলনামূলক সহজ।
আপনি চারপাশে তাকালে এরকম অসংখ্য ঘটনা দেখতে পাবেন, যেখানে তর্কবিতর্ক চলাকালে কোনো পক্ষের প্রমাণিত ভুল যুক্তি থাকার পরও তিনি তার অবস্থানে অনড়। "Cognitive dissonance" আমাদের এমন অবস্থায় নিয়ে যায় যেখানে আমরা আমাদের ভুলত্রুটিগুলো দেখতে পাই না বা মানতে চাই না। বিপরীতধর্মী বিশ্বাসকে অবজ্ঞা করেই আমরা নিজেদের সঠিক প্রমাণ করতে চাই।
আপনি হয়তো কফি খেতে খুব ভালোবাসেন। গুগলে আপনি সার্চ দিলেন, কফি কি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী? গুগল আপনাকে পরিমিত কফিপানের নানা উপকারিতা দেখাবে। আপনি তো মহাখুশি। তবে একই সময় যদি আপনি সার্চ দেন কফি কি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, গুগল আপনাকে দেখাবে অতিরিক্ত কফি পানের ক্ষতিকর দিকগুলো।
মনোবিজ্ঞানীরা দেখেছেন মানুষ কিভাবে নিজের ভেতরের দ্বন্দ্ব কমাতে বিপরীতধর্মী সব চিন্তাভাবনাকে বাদ দিয়ে নিজের চিন্তাভাবনাকেই সঠিক হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করে। এটাকে বলে "Confirmation bias"। আমরা শুধুমাত্র এমন তথ্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করি যা নিজের বিদ্যমান বিশ্বাসকে সমর্থন করে। যখন একটি ধারণা আমাদের মস্তিষ্কে গেঁথে যায়, তখন নতুন কোনো সঠিক তথ্য আসলেও আমরা সেটাকে গ্রহণ করি না। আপনি হয়তো খুঁজে খুঁজে এমন তথ্যই বের করবেন যা আপনার চিন্তাভাবনাকে সমর্থন করে। যেমনটা আমরা দেখি রাজনীতিতে। আমরা সেই প্রার্থী বা দলের সমর্থনে থাকা বক্তব্যগুলি গ্রহণ করি যাকে আমরা পছন্দ করি আর বিপক্ষ দল সম্পর্কে কোনো ইতিবাচক তথ্য থাকলেও আমরা সেটাকে মিথ্যা বা প্রোপাগান্ডা বলে মনে করি।
এই "Confirmation bias" এর কারণেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সারাদিন নিউজ ফিডের অ্যালগরিদমে আপনি আপনার পছন্দের বিষয়গুলোই দেখেন। আলগরিদম তৈরিও করা হয়েছে "Confirmation bias" এর তত্ত্ব অনুসরণ করেই। ফলে মানুষ তার একচেটিয়া ভুল বিশ্বাসে আটকে পড়ে থাকে, কখনও বের হতে পারে না। নিজের ভুল স্বীকার করার অস্বস্তি এড়ানোর জন্যও আমাদের মধ্যে ভুল কাজকে সঠিক হিসাবে তুলে ধরার প্রবণতা তৈরি হয়। নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা বা ভুল স্বীকার করার লজ্জা এড়ানো সহ বিভিন্ন কারণে মানুষ তাদের ভুল কাজকে যুক্তি দিয়ে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করে।
এমনকি মানুষ তার ইগোকে সন্তুষ্ট জন্য কারণে মিথ্যার আশ্রয় নিতেও দ্বিধা করে না।
নিজেকে সবসময় সঠিক প্রমাণ করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা বা ভুল যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে তর্কে জেতার প্রাণপণ চেষ্টা করা বা নিজের ভুল স্বীকার না করে অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আমরা সাধারণত নিজেদের ইগো রক্ষাই করে থাকি। যাদের মধ্যে আপনি নিজেদের ইগো প্রটেকশনের ঘন ঘন চেষ্টা দেখতে পাবেন, যেকোনো আলোচনাই তাদের কাছে একটি প্রতিযোগিতার মতো, যেখানে তাদেরকে সবসময় জিততেই হবে। কার কি ক্ষতি হচ্ছে না হচ্ছে সেটি নিয়ে তাদের সাধারণত খুব বেশি কিছু আসে যায় না। আপনি যতই বিনয়ের সাথে বুঝিয়ে বলুন না কেন, তাদের চোখের সামনে যতই প্রমাণ থাকুক না কেন, কোনোভাবেই তারা নিজেদের নিয়ে সমালোচনা মেনে নিতে পারে না।
এবার আসা যাক "Group polarization" এর প্রসঙ্গে। যখন কিছু সমমনা ব্যক্তি তাদের নিজস্ব গ্রুপে আলাপ আলোচনা করে, তখন তাদের মতামত আরো বেশি চরমপন্থী হয়ে ওঠে। সোশ্যাল মিডিয়ায় "Group polarization" আরো বেশি শক্তিশালী। একজন মানুষ যতই অন্যায় বা যুক্তিহীন চিন্তাধারার হোন না কেন, সহজেই সে এখানে তার মতো চিন্তাধারার লোকজন খুঁজে পাবে, যারা তার অন্যায়কে সমর্থন করবে। তার মানে নিজেকে সঠিক মনে করার পিছনে দায়ী কিন্তু আশেপাশের গোষ্ঠী বা সমাজও, যেখানে একজন ক্ষতিকর ব্যক্তি "Group polarization" এর মাধ্যমে আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এজন্যই স্টিফেন হকিং একবার বলেছিলেন, "অজ্ঞতা নয়, জানার পথে সবচেয়ে বড় শত্রু হচ্ছে জ্ঞানের বিভ্রম।" আর আমি বলি এটা শুধুই জ্ঞানের বিভ্রম নয়, বরং জ্ঞানের বিভ্রম থেকে নিজেদের অজ্ঞতাকে বুঝতে না পারার ব্যর্থতা। অল্পস্বল্প জ্ঞানধারী লোকেরা নিজেদের বিশ্বাসকে অতিরিক্ত মূল্যায়ন করে থাকে। একারণে কিছু লোক খুব সীমিত জ্ঞান নিয়েও এমনভাবে আপনার সাথে তর্ক করে যেন সে সবকিছু জানেন। আশেপাশে খেয়াল করলে দেখবেন আমাদের সমাজটা এমন মানুষ দিয়েই ভর্তি।
#কপিট
#ভেড়ামারা #কুষ্টিয়া
#সৈরাচার ゚viralシfypシ゚viralシalシ