04/09/2015
ভোলায় বন্যা, দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি
ঝুঁকির মুখে শহর রক্ষা বাঁধ, এক'শ টন চাল ও ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ
৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ খ্রিঃ
পূর্ণিমার প্রভাবে সৃষ্ট অস্বাভাবিক জোয়ারে এবং গত দুই দিনের ভারী বর্ষণের ফলে ভোলায় বৃহস্পতিবারও মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এতে করে ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা, ধনিয়া, কাচিয়া, রাজাপুর, শিবপুর ও রামদাসপুর ইউনিয়ন এবং বোরহানউদ্দিন, দৌলতখান, চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলার নদী তীরবর্তী প্রায় ৪০টি গ্রাম ও নিম্মাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে অন্তত দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। পানিবন্দি এসব মানুষ দুর্ভোগে রয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে সদর উপজেলার ইলিশা ও রাজাপুর ইউনিয়নের মেঘনার পাড়ে সরেজমিনে গেলে রাজাপুর ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোঃ রফিক, একই ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম, উত্তর ইলিশা ইউনিয়নের কালুপুর গ্রামের বাসিন্দা স্থানীয় ব্যবসায়ী ইসমাইল কবিরাজসহ স্থানীয়রা জানান, মেঘনা নদীর ভাঙনে মাত্র দুই সপ্তাহে প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা, ওই এলাকার সহস্রাধিক ঘর-বাড়ি, দুইটি মসজিদ, ৫টি মক্তব, পুলিশ ফাঁড়ি, ইসলামিক মিশন, তিন শো একর ফসলী জমি, দুই শতাধিক ব্যবসায়ী দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভেসে গেছে দুই শতাধিক পুকুর ও শতাধিক ঘেরের মাছ। ভেসে গেছে অন্তত একশো গুরু-ছাগল মহিষসহ গবাদি পশু।
এতে প্রায় তিন শো কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলেও জানান স্থানীয়রা। স্থানীয় ব্যবসায়ী ইসমাইল কবিরাজ, ওমর ফারুক, জয়নাল আলী পাটওয়ারী মোতাহার হোসেনসহ স্থানীয়রা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্থানীয় এমপি বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার অনিসুল ইসলাম মাহমুদ সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনকালে বলেছেন, যত টাকাই খরচ হোক নদী ভাঙনের হাত থেকে ভোলাকে রক্ষা করা হবে। অথচ ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ড এ বিষয়ে কোন আমলেই নিচ্ছেনা। পাউবো কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নদীর তীরে জিইও ব্যাগ ফেলানো বন্ধ করে দিয়েছেন। আর এর ফলে ভাঙনের তীব্রতা দেখা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহি কর্মকর্তা আব্দুল হেকিম বলেন, ভাঙন রোধে মেঘনার পাড়ে এ পর্যন্ত ৫০ হাজার জিইও ব্যাগ ফেলানো হয়েছে। এখন পানির চাপ কিছুটা কম বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জেলা প্রশাসক মোঃ সেলিম রেজা জানান, বন্যাকবলিত ও পানিবন্দি ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ভোলা সদর উপজেলায় একশো মেট্রিক টন চাল ও নগদ ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। আজ শুক্রবার বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এমপি তার নির্বাচনী এলাকা ভোলা সদর উপজেলায় এসে সরকারি বরাদ্দকৃত চাল ও নগদ অর্থ ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিতরণ করবেন বলেও জানান ডিসি। মেঘনার ভাঙনও তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। মেঘনার তীব্র ভাঙনের মুখে গত দুই দিন ধরে ভোলা-লক্ষীপুর নৌ রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন ভোলা-লক্ষীপুর রুটে চলাচলকারী ফেরির ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) আবু আলম হাওলাদার। তিনি বলেন, মেঘনা নদীর প্রবল স্রোতের তোড়ে সদর উপজেলার ইলিশা বিশ্ব রোডের মাথার ফেরিঘাট ভেঙে যাওয়ায় ভোলা-লক্ষীপুর নৌ রুটে অনির্দিষ্টকালের জন্য ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে। ভোলা-লক্ষীপুর রুটের ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত দুই দিন ধরে ভোলার সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রাম, লক্ষীপুর, নোয়াখালী, যশোর, ময়মনসিংহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এদিকে মেঘনার তীব্র ভাঙনে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ভোলা শহর রক্ষা বেড়িবাঁধটিও।
যে কোনও মুহূর্তে শহর রক্ষা বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পুরো জেলা শহর তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে শহরের মানুষ। সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের কালিকীর্তি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ মনির উদ্দিন জানান, জলাবদ্ধতায় স্কুলটি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে করে স্কুলের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। সদর উপজেলায় বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ভোলা সদর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আলহাজ্ব মোঃ ইউনুছ মিয়া জানান, অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে এবং মেঘনার তীব্র ভাঙনের ফলে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, মেঘনার ভয়াবহ ভাঙনের ফলে ইতিমধ্যেই ইলিশা-রাজাপুর ইউনিয়নের প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা রাস্তা ও মূল বেড়িবাঁধ বিলীন হয়ে গেছে। ঝুঁকির মুখে রয়েছে ভোলা শহর রক্ষা বেড়িবাঁধটিও। তবে, সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রানসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।