26/06/2026
সাফা আর মারওয়ার মাঝখানে দাঁড়ালে আমার বারবার মনে হয়েছে, পৃথিবীর সব পথ আসলে পায়ের পথ নয়। কিছু পথ বুকের ভেতর দিয়ে যায়।
আজ এখানে সবকিছু আধুনিক। আলো আছে, এসি আছে, ঠান্ডা মেঝে আছে। এত ঠান্ডা যে জুতা বা মোজা ছাড়া হাঁটলে পায়ের পাতায় কেমন শিরশির করে ওঠে। চারপাশে মানুষের ভিড়। কেউ হাঁটছে, কেউ দোয়া পড়ছে, কেউ চুপচাপ চোখ মুছছে। বৃদ্ধ মানুষ হুইলচেয়ারে বসে আছেন। কেউ তাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ ক্লান্ত, কেউ অসুস্থ, কেউ হয়তো জীবনের শেষ শক্তিটুকু নিয়ে এসেছে এই পবিত্র জায়গায়।
হুইলচেয়ারেরও এখানে ব্যবস্থা আছে। সাধারণ সময়ে যেটা হয়তো ৭০ রিয়ালে হয়ে যায়, হজের দিনগুলোতে সেটাই ৪০০ রিয়ালে উঠে যায়। হজের সময় মক্কায় সবকিছুরই যেন আলাদা হিসাব। মানুষের ভিড় বাড়ে, কষ্ট বাড়ে, খরচ বাড়ে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, এসবের মাঝেও মানুষের চোখে অভিযোগ কম; আল্লাহর কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়ার ধৈর্য আর শান্তি বেশি।
আমি সাফা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, আজ আমরা যে পথ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করিডোরে হাঁটছি, এই পথ একদিন ছিল মরুভূমির পথ। কোনো এসি ছিল না, কোনো ঠান্ডা মেঝে ছিল না, কোনো হুইলচেয়ার ছিল না। ছিল এক মা। ছিলেন হাজেরা (আ.)। আর ছিল তাঁর তৃষ্ণার্ত শিশু ইসমাইল (আ.)।
একজন মা যখন সন্তানের তৃষ্ণা দেখে, তখন পৃথিবীর কোনো মরুভূমিই তার কাছে মরুভূমি থাকে না। সে দৌড়ায়। সে খোঁজে। সে হারে না।
সাঈ শুরু করার আগে সাফা পাহাড়ে উঠতে হয়। সেখানে দাঁড়িয়ে কাবার দিকে মুখ করলে বুকের ভেতর কেমন নরম হয়ে আসে। এত মানুষ, এত ভাষা, এত দেশ, এত গল্প, অথচ সবার চাওয়া প্রায় একই।
আল্লাহ, তুমি কবুল করো।
আল্লাহ, তুমি ক্ষমা করো।
আল্লাহ, তুমি সহজ করে দাও।
সাফায় উঠে সাঈ শুরু করার সময় যে কথাগুলো পড়া হয়, তার অর্থ খুব সুন্দর।
“আল্লাহ যা দিয়ে শুরু করেছেন, আমিও তা দিয়ে শুরু করছি। নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত।”
এই কথাগুলো বলার সময় মনে হয়, আমি শুধু হাঁটা শুরু করছি না। আমি এক ইতিহাসের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছি। এক মায়ের ব্যাকুলতার ভেতরে। এক শিশুর পিপাসার ভেতরে। এক নবীর আনুগত্যের ভেতরে।
সাফা বা মারওয়ায় উঠে কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়াতে হয়। কাবার দিকে হাত বাড়িয়ে ইশারা করা নয়। সাধারণ দোয়ার মতো দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে চাইতে হয়। প্রথমে তিনবার তাকবির বলা হয়:
আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার।
তারপর পড়া হয় সেই মহান জিকির:
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর।
অর্থাৎ "আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক বা অংশীদার নেই। রাজত্ব একমাত্র তাঁরই এবং সমস্ত প্রশংসাও তাঁরই। আর তিনি সব কিছুর ওপর পূর্ণ ক্ষমতাবান।"
এরপর মানুষ নিজের ভাষায় কথা বলে। কেউ আরবিতে দোয়া করে। কেউ বাংলায়। কেউ কিছু বলতে পারে না, শুধু কাঁদে। আমার মনে হয়, আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাতে কোন ভাষা লাগে না। আল্লাহ তা বুঝেন।
তারপর শুরু হয় সাঈ।
সাফা থেকে মারওয়া গেলে এক চক্কর। মারওয়া থেকে সাফায় ফিরলে আরেক চক্কর। এভাবে সাত চক্কর। মোটামুটি ৩ কিলোমিটারের বেশি পথ। কিন্তু এই হিসাবটা আসলে কিলোমিটারের না। এই হিসাব হলো বিশ্বাসের। এই হিসাব হলো মায়ের চোখের পানির। এই হিসাব হলো আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে যাওয়ার।
হাঁটার সময় বারবার মনে হচ্ছিল, হাজেরা (আ.) পানি খুঁজছিলেন। অথচ তিনি জানতেন না পানি কোথায়। তিনি জানতেন শুধু এটুকু, চেষ্টা থামানো যাবে না।
সাঈর পথে হাঁটতে হাঁটতে একটি দোয়া পড়া হয়:
“হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার প্রতি দয়া করুন। নিশ্চয়ই আপনি সবচেয়ে সম্মানিত ও মর্যাদাবান।”
এই দোয়াটা খুব ছোট। কিন্তু এর ভেতরে মানুষের পুরো জীবন ঢুকে যায়। আমরা সবাই তো আসলে এই দুটো জিনিসই চাই। ক্ষমা আর দয়া।
এরপর আসে সবুজ বাতি দেওয়া জায়গা। এই অংশে পুরুষেরা একটু দ্রুত চলে। কেউ ধীরে দৌড়ায়। কেউ বয়সের কারণে পারে না, তবু চেষ্টাটা করে। সেই মুহূর্তে মনে হয়, হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও একজন মায়ের ব্যাকুলতা এখনও বাতাসে রয়ে গেছে। আমরা শুধু তার ছায়াটা ছুঁয়ে যাই।
সবুজ বাতির ওই অংশে পড়ার জন্য সুন্দর একটি দোয়া আছে:
“হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন, দয়া করুন এবং আমাকে সরল-সঠিক পথ প্রদর্শন করুন।”
এই দোয়াটা পড়তে পড়তে মনে হলো, মানুষ আসলে শুধু গন্তব্যে পৌঁছাতে চায় না। মানুষ সঠিক পথে পৌঁছাতে চায়। কারণ ভুল পথে খুব দ্রুত হাঁটলেও লাভ নেই। আল্লাহ যদি পথ দেখান, ধীরে হাঁটলেও মানুষ ঠিক জায়গায় পৌঁছে যায়।
সাফা-মারওয়ার এই চলাচল করতে করতে আমার মনে হয়েছে, আল্লাহ মানুষকে শুধু বসে থাকতে বলেন না। শুধু কাঁদতে বলেন না। শুধু অপেক্ষা করতে বলেন না। তিনি মানুষকে চেষ্টা করতে বলেন। হাঁটতে বলেন। খুঁজতে বলেন। দরজায় দরজায় যেতে বলেন। তারপর একসময় এমন দরজা খুলে দেন, যেটা মানুষ কল্পনাও করেনি।
হাজেরা (আ.) পানি খুঁজছিলেন পাহাড়ের মাঝে। আর আল্লাহ পানি বের করলেন শিশুর পায়ের কাছে। মানুষ চেষ্টা করবে নিজের সামর্থ্য দিয়ে। ফলাফল আসবে আল্লাহর রহমত দিয়ে।
সাফা-মারওয়া তাই শুধু দুটি পাহাড়ের নাম নয়। এটি এক মায়ের গল্প। এক শিশুর পিপাসার গল্প। এক নবীর আনুগত্যের গল্প। আর আল্লাহর রহমতের এমন এক গল্প, যার ধারা জমজম হয়ে আজও বয়ে যাচ্ছে।
হাজার বছর ধরে মানুষ সেই পানি পান করছে। তৃষ্ণা মেটাচ্ছে। বোতলে ভরে নিয়ে যাচ্ছে। ঘরে রাখছে। অসুস্থের মুখে দিচ্ছে। প্রিয়জনের জন্য নিয়ে যাচ্ছে।
তবু জমজম ফুরায় না। কারণ কিছু দান কূপ থেকে আসে না। আসে করুণা থেকে।
সাঈ শেষ করে মনে হলো, এই হাঁটা আসলে হাঁটা নয়। এটি বিশ্বাসের পথে চলা। এটি চেষ্টা করার শিক্ষা। এটি মায়ের ভালোবাসার সামনে মাথা নত করা।
আর সবচেয়ে বড় কথা, এটি মনে করিয়ে দেয়, মানুষ যখন আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে চেষ্টা করে, তখন মরুভূমির বুকেও পানি উঠে আসে।
---
রিজওয়ান
২৪ জুন ২০২৬