20/04/2026
গাজীপুরের সাম্প্রতিক এই বর্বরোচিত ঘটনাটি আমাদের বিচারব্যবস্থা, সামাজিক নৈতিকতা এবং মানবিক বিবেকের মুখে এক সজোর চপেটাঘাত। একজন ইমামের কন্যাকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া, থানায় বসিয়ে ব()ন্দুকের নলের মুখে পরিবারের জীবনের হু()মকি দিয়ে জবানবন্দি আদায় করা এবং জোরপূর্বক নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ের নাটক সাজানো—কোনো সভ্য দেশের চিত্র হতে পারে না। এটি নিছক কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের বিচারিক কাঠামোর চরম ব্যর্থতার এক জাজ্বল্যমান প্রমাণ।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো প্রশাসনের ভূমিকা। যখন একজন নাগরিক বিপদে পড়ে শেষ আশ্রয় হিসেবে থানায় যান, সেখানে তাকে সুরক্ষা দেওয়ার বদলে উল্টো ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। জবানবন্দি যদি স্বেচ্ছাচারের বদলে ভয়ের আধারে তৈরি হয়, তবে সেই আইনের ভিত্তিই তো নড়বড়ে হয়ে যায়। একজন ছাত্রীকে তার বাবা-ভাইকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে যে বয়ান নেওয়া হয়েছে, তা আইনত যেমন অকার্যকর, তেমনি নৈতিকভাবেও ঘৃণ্য। পুলিশ যদি অপরাধীর ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, তবে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের জন্য কোথায় যাবে?
এখানেই শেষ নয়, আমরা দেখলাম সমাজের এক শ্রেণির মানুষের কদর্য রূপ। অপরাধীর বিচার চাওয়ার বদলে তারা ব্যস্ত হয়ে পড়লো ভিকটিমের চরিত্র হননে। মেয়েটি মাদ্রাসার ছাত্রী, তার বাবা একজন আলেম—শুধু এই পরিচয়ের কারণেই কি একদল মানুষ অন্ধ আক্রোশে ফেটে পড়ছে? জামায়াত ইসলাম বা রাজনৈতিক তকমা লাগিয়ে একটি জঘন্য অপহরণের ঘটনাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রেমের অভিযোগ তুলে একটি অপহরণ ও জোরপূর্বক বিয়ের অপরাধকে ধামাচাপা দেওয়া কি সুস্থ মস্তিষ্কের কাজ?
এই ঘটনা আমাদের কিছু রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে:
আলেম বা ধর্মপ্রাণ পরিবারের সদস্য হওয়া কি এখন বাংলাদেশে অপরাধ? এই বিদ্বেষী মনোভাবই কি অপরাধীকে সাহস যোগাচ্ছে না?
যখন অপরাধীরা রাজনৈতিক বা পেশিশক্তির ছত্রছায়ায় থাকে, তখন তারা প্রশাসনকে হাতের পুতুল বানিয়ে ফেলে।
আমরা এমন এক জাতিতে পরিণত হচ্ছি যারা সত্যকে নয়, বরং নিজেদের রাজনৈতিক বা আদর্শিক ভিন্নতাকে প্রাধান্য দিই। একজন নিরপরাধ মেয়ের সম্ভ্রমের চেয়ে যখন আমাদের কাছে দলীয় পরিচয় বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন বুঝতে হবে জাতির বিবেক পচে গেছে।
যারা অপরাধীর পক্ষ নিয়ে আজ ফেসবুকে বা রাজপথে সাফাই গাইছে, তারা কি একবারও ভেবেছে কাল তাদের বোন বা মেয়ের সাথেও এমনটি হতে পারে? ন্যায়বিচার কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা দলের জন্য নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের অধিকার।
গাজীপুরের এই ঘটনায় জড়িত প্রতিটি ব্যক্তির কঠোর শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। সেই সাথে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা ভয় দেখিয়ে মিথ্যা জবানবন্দি নিয়েছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। আলেম বা সাধারণ মানুষ—পরিচয় যাই হোক, একজন নাগরিকের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আমরা যদি আজ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হই, তবে এই আগ্রাসী সংস্কৃতি একদিন আমাদের সবার ঘর গ্রাস করবে। অপরাধীকে যারা প্রশ্রয় দেয়, তারাও সমান অপরাধী। গাজীপুরের ইমামের মেয়ের কান্নার প্রতিটি ফোঁটা আমাদের বিচারব্যবস্থাকে অভিশপ্ত করছে। এই অন্ধকার থেকে বের হতে হলে আমাদের দলীয় চশমা খুলে সত্যের পথে দাঁড়াতে হবে। ন্যায়বিচার কি তবে শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি আমরা সত্যি একটি সভ্য জাতি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে পারব?
সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, সময় এসেছে রুখে দাঁড়ানোর।