13/01/2026
গাছে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে নাদুসনুদুস একটি মহিষ। ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ নিরীক্ষা শেষে বাঘটি সিদ্ধান্ত নিল, "এই সুযোগ!" প্রথমে উরু খেলো, মহিষের কোনো নড়চড় নেই। তারপর পেট খেলো, মহিষ অনড়। নিমেষেই কলিজা, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস সাবাড় করে দিল বাঘ, কিন্তু মহিষের ধ্যান ভাঙে না। অত:পর ঘাড়ে কামড় বসাতেই, ফাঁদে আটকে গেল বাঘটা! মহিষটা ছিল টোপ।
বাঘটাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে শিকারি — সার্কাসে কিংবা চিড়িয়াখানায়। এই পথ, সেই ঝাড়, এই নদী, সেই নালা ডিঙিয়ে, গোপন পথে নিজের ডেরায় নিয়ে পুরলো সে বাঘটাকে। এবং, তার পিছুপিছু এসে হাজির হলো পুলিশবাহিনী! বাঘটার দেহে জিপিএস ট্রান্সমিটার অ্যাটাচ করা, বাঘশিকারি ধরার জন্য ওটা পুলিশের প্রশিক্ষিত প্রাণী। বাঘটা ছিল টোপ।
চারদিক থেকে ঘিরে ধরা পুলিশের সুপ্রশিক্ষিত ভয়ানক ইউনিটটি ঢুকে গেলো শিকারির আস্তানায়। ঢুকতেই, বুম! কেল্লা আকৃতির বিশাল বাড়িটা বিস্ফোরিত হয়ে ধুলায় মিশে গেলো মুহূর্তেই! ভেতরের একটি পিঁপড়াও বেঁচে নেই। চোরা শিকারির বাড়ির ভিতরে রাজার খাস গোয়েন্দাবাহিনী এই বোমাটা পুঁতে রেখেছিল আজকের জন্য। পুলিশের যে ইউনিটটি শিকারিকে ধরতে ঢুকেছিল, সেটার উপর রাজপরিবারের মারাত্মক ক্ষোভ, এরা রাজপরিবারের অনেক লম্পট, বকধার্মিক, দুর্নীতিবাজকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে। তাই এদের সমূলে উপড়ে ফেলল রাজ কূটনীতি। শিকারিটা ছিল টোপ।
রাণী তার রাজপ্রাসাদের ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে অদূরের টলটলে কাকচক্ষু জলের ঝিলে ভাসন্ত শাপলা, হাঁটন্ত পানকৌড়ি, লাফন্ত মাছ, ছুটন্ত ব্যাঙ আর ফুটন্ত পদ্মফুলের অপার্থিব শোভাময় দৃশ্যাবলির দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন, হাতে বৈকালিক চায়ের কাপ ঝুলিয়ে! এতোদিন ওই ঝিলটির শোভা দেখতে রাণীর অসুবিধা হচ্ছিলো মাঝখানে কেল্লা আকৃতির বিশাল বাড়িটা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকায়। বাড়িটা ভেঙে ফেলার জন্য রাজহুকুম প্রয়োগ করাও যাচ্ছিলো না, ওটা ব্যক্তিমালিকানাধীন বৈধ সম্পত্তি বলে। অতএব, রাণী তার মহলের দুর্নীতিবাজ সদস্যদের তালিকা তৈরি করে পুলিশবাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তালিকাটি ছিল টোপ।
বহুদিন পরে অন্তরঙ্গতায় রাণীর পাশে বসে তার মুখে অকৃত্রিম হাসি দেখে রাজার বুকটা ভরে গেল আনন্দে। যদিও, কেবল তিনিই জানেন এই আনন্দের মূল কারণ রাণীর হাসিমুখ নয়, কারণটা হচ্ছে ঝিলের ওই রূপ দেখার জন্য এতো বছর পরে আবার ঝুলবারান্দায় আনাতে পেরেছেন তিনি রাণীকে, একটু পরেই যাকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেবেন তিনি, আরেকটা বিয়ের বাসনা বুকের ভিতর চাগাড় দিয়ে ওঠায়। রাণীটা তার ভয়ানক নারী, সতীন আনতে দিচ্ছেই না প্রাসাদে! ঠিক আজকের এই মুহূর্তের জন্যই এতো পরিশ্রম করে ঝিলটায় ব্যাঙ-মাছ-শাপলা-পদ্মের চাষ করেছেন রাজা। ঝিলটা ছিল টোপ।
মহাবিশ্ব আর এর অনুষঙ্গগুলো একে অন্যের জন্য পেতে রাখা একেকটি টোপের সিঁড়ি বেয়েই এগিয়ে চলেছে বিলিয়ন বছর ধরে। এর ইতিহাস টোপের ইতিহাস।