07/10/2014
দ্বীপের হাজারো সম্ভবনা,
উন্নয়ন কোন পথে ?
সেই শুরু থেকেই সম্ভাবনার দ্বীপ বলা হয়ে আসছে ভোলাকে। সম্ভাবনা থাকলেও এ দ্বীপের নদী ভাঙ্গন একটি বড় সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে। তারপরেও প্রকৃতির দুর্যোগের সাথে সঙ্গে যুদ্ধ করেই প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকতে হচ্ছে উপকূলীয় জেলার মানুষকে। গ্যাসের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে এ জেলাকে একটি আধুধিক মডেল জেলা হিসাবে রুপান্তর করা সম্ভব। আর সে পথ ধরেই কয়েক বছর ধরে এগুচ্ছে জেলাটি। এ জেলার সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে - শিমূল চৌধূরী’র বিশেষ প্রতিবেদন।
প্রাকৃতিক সম্পদ আর অর্থনৈতিকভাবে একটি সম্ভাবনাময় জেলা ভোলা। এ জেলায় রয়েছে কোটি কোটি টাকার প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ শাহবাজপুর গ্যাস ক্ষেত্র। ইকোনমিক জোন হিসাবে ঘোষনা করাও বাস্তবায়নের পথে । একই সাথে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে উপকূলীয় এ জেলায়।
কৃষকের বিস্তীর্ন ফসলের ক্ষেতে ধান, সুপারি ও ইলিশের ব্যাপক সমারোহ নিয়েই ভোলা। কিন্তু এখন আর সেই আগের মত গোলা ভরা ধান নেই। নেই সুপারি ও মরিচ। উপকূলীয় দ্বীপ জেলা ভোলার প্রধান সমস্যা হচ্ছে নদী ভাঙন। নদী ভাঙনে ক্রমেই যেন ছোট হয়ে আসছে জেলার মানচিত্র। এ ছাড়া প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করেই বেঁচে থাকতে হচ্ছে উপকূলীয় এ জেলার মানুষকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেড়ে নেয় এ অঞ্চলের ঘর-বাড়ি, ফসল, জীবন-জীবিকা। সর্বস্ব হারিয়ে আবার শুরু করে নতুন জীবন। তাই দেশের অন্যান্য জেলার চেয়ে ভোলা জেলায় দারিদ্রের হার যেমন বেশী, তেমনি শিার হারও সর্বনিম্নে অবস্থান করছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়নি আজও। যোগাযোগের দিক থেকে এ জেলার মানুষ এখনো সেই মান্ধাতার আমলেই রয়ে গেছে। এখানকার মানুষ যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে নদী পথেই রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করছে। এ অঞ্চলের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ কৃষিজীবী।
মেঘনা ও তেতুঁলিয়া নদী বেষ্টিত সম্ভাবনাময় এ জেলায় দেশের অন্যতম ব"হৎ গ্যাসকূপ শাহবাজপুর গ্যাস বাণিজ্যিকভাবে ব্যাবহার হলেও গড়ে ওঠেনি গ্যাসভিত্তিক ভারী কোন শিল্প, কল-কারখানা। ফলে দীর্ঘ প্রায় আড়াই যুগ ধরে মাটির নীচেই থেকে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার এ প্রাকৃতিক সম্পদ। আওয়ামীলীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি সরকারের আমলে এ জেলায় বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিলেন। এর পরেও দেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা ভোলা উন্নয়নের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। অবহেলিত ও উন্নয়নবঞ্ছিত ভোলার উন্নয়ন ও শিল্পায়নের জন্য নদী ভাঙন রোধ, শাহবাজপুর গ্যাসভিত্তিক শিল্প-কল-কারখানা গড়ে তোলা, ভোলার সঙ্গে অন্যান্য জেলায় যাতায়াতের জন্য ভোলা-বরিশাল সড়ক পথ নির্মান, ভোলা-লীপুর রুটে ব্রিজ নির্মানের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিা ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য ভাল মানের শিাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, টিএন্ডটি টেলি যোগাযোগের মাধ্যমে অপটিক্যাল সাইবার জোন, কৃষকদের জন্য কৃষি ভর্তুকির ব্যবস্থা করা, কৃষকদের মাঝে স্বল্প সুদে ঋনের ব্যবস্থা করা, কৃষি উপকরন সহজলভ্য করা, কৃষি যন্ত্রপাতি (সেচ যন্ত্রপাতিসহ) কৃষকদের ক্রয়মতার মধ্যে আনা, খাল খননেন মাধ্যমে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, কৃষকদের কৃষি বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিনের ব্যবস্থা করা, সয়াবিন ও সূর্যমূখী চাষে মার্কেটিংয়ের ব্যবস্থা করা, পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনসহ একটি বাস্তবমূখী পরিকল্পনা প্রনয়নের দাবি এ অঞ্চলের মানুষের।
ভোলা জেলা উন্নয়ন স্বার্থ রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব অমিতাভ অপু বলেন, বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের মূল কেন্দ্র বিন্দু হচ্ছে ভোলা। এ জেলাই দণিাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের সংযোগ স্থাপন করছে। ভোলার উপর দিয়ে চট্রগ্রাম ও যশোরসহ ২১টি জেলায় সড়ক পথে যাতায়াতে ৪৫০ কিলোমিটার দূরত্ব কমে যায়।
তিনি আরো বলেন, ভারতের আগরতলা থেকে পশ্চিমবঙ্গে যেতে সময় লাগে চার দিন। কিন্তু ভোলায় ট্রানজিট দিয়ে বাংলাদেশে আসতে সময় লাগবে মাত্র ১২ ঘন্টা। এতে ভারত-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরো সুদৃঢ় হবে। মেঘনার গভিরতার কারনে নদী পথে এবং সড়ক পথে চট্রগ্রাম ও মংলা থেকে অন্য জেলার চেয়ে এ জেলায় কাঁচা মালসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে যাতায়াতের সুবিধা রয়েছে অনেক বেশী। আর সে কারনেই অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভোলা একটি সম্ভাবনাময় জেলা।
জেলা দূর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি এম ফারুকুর রহমান কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের প্রেেিত উপকূলীয় জেলাসমূহে মৎস্য খাতে দ্রুত অর্থ ছাড়সহ পরিকল্পিত ও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ এবং নদী পাড়ের বেড়িবাধ, সাইকোন সেল্টার পূনঃনির্মান, খাল-বিল, পুকুর গুলোর সংস্কারের দাবি জানান। উন্নয়নের দাবি জানান জেলা কমিউনিষ্ট পার্টির সভাপতি মোবাশ্বির উল্যাহ চৌধুরী।ভোলায় প্রাপ্ত শাহবাজপুর গ্যাস কাজে লাগিয়ে গ্যাসভিত্তিক শিল্প ও কল-কারখানা গড়ে তোলা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ ভোলার সার্বিক কৃষিপ্রধান এ দেশে কৃষিজমি রারও দাবি জানান তিনি।
ভোলার সাবেক মেয়র ও চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব গোলাম নবী আলমগীর বলেন, বৃহত্তর দণি-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য ভোলায় পর্যাপ্ত পরিমান গ্যাস রয়েছে। এখানে মাটির নীচে আরো পর্যাপ্ত গ্যাস মজুদ আছে। বাপেক্সের কোটি কোটি টাকা মাটির নীচে পড়ে থাকলেও এটা কোন কাজে আসছে না। গ্যাস প্রাপ্তির কয়েক যুগ পেরিয়ে গেলেও ভোলা শহরে ঘরে ঘরে গ্যাস ও নামমাত্র গ্যাসভিত্তিক ৩৪ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন ছাড়া আর কিছুই হয়নি। ৩৪ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটিও প্রায় দিন বিকল হয়ে পড়ে থাকে। এ ছাড়া গড়ে ওঠেনি ভারী কোন শিল্প, কল-কারখানা। বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটাতে হলে এ জেলায় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন। ভোলার গ্যাস কাজে লাগিয়ে এসব অঞ্চলে শিল্প, কল-কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। বাপেক্সকে শক্তিশালী করে ভোলার মজুদকৃত গ্যাস ড্রিলিং এর মাধ্যমে পরিকল্পিত উন্নয়ন করা উচিৎ বলে মনে করেন তিনি। এ ছাড়া নদী ভাঙন ভোলার প্রধান সমস্যা। নদী ড্রেজিং করে উপকূলীয় অঞ্চলের নাব্যতা কমিয়ে আনারও দাবিও জানান তিনি।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রিজের সাবেক সভাপতি ফজলুল কাদের মজনু মোল্লা বলেন, প্রাকৃতিক সম্পদ ও খাদ্যে ভরপুর সমৃদ্ধশালী ভোলায় ধান, সুপারি, আলু, গম, তরমুজ, ভুট্টা, আখ, সোয়াবিন, সূর্যমূখী ও সবজিসহ সব ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমানে খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে। পুকুরে মাছের চাষ হয় ব্যাপকহারে। বাংলাদেশে যে পরিমান ইলিশ রপ্তানি হচ্ছে তার বেশীর ভাগ ইলিশ উপকূলীয় জেলা ভোলা থেকে রপ্তানি হচ্ছে। প্রাপ্ত গ্যাস দিয়ে ভোলায় ইউরিয়া সার কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, স্টিল মিল, শিপ বিল্ডিং, টেক্সটাইল মিল, কোল্ড স্টোরেজ, অটো রাইচ, অটো ব্রিক ফিল্ড সহ বিভিন্ন শিল্প, কল-কারখানা তৈরীর সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যেই কাজি গ্রুপ নামের একটি কম্পানি শহরের খেয়াঘাট এলাকায় ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ফিস ফিড ও পোল্ট্রি ফিড কারখানা তৈরীর কাজ শুরু করেছেন। ভৌগলিক দিক থেকে এ জেলার অবস্থান চট্টগ্রাম ও মংলা পোর্টের মাঝামাঝিতে রয়েছে। তাই এখানে নাইটোরেজ মেন্টার করা হলে চট্টগ্রাম ও মংলা থেকে চাপও অনেকটা কমে যাবে। ভোলা থেকে সড়ক পথে বিভিন্ন মালামাল সরবরাহ সম্ভব হবে। জেলার অভ্যন্তরীন যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত উল্লেখ করে মজনু মোল্লা বলেন, অন্যান্য জেলার সঙ্গে যোগাযোগ উন্নত করার লক্ষ্যে ভোলা-বরিশাল সড়কের মাটির কাজ শেষ হয়েছে। কয়েকটি ব্রিজসহ বাকি কাজও শেষ হয়ে যাবে। ভোলায় এখন বেশ কয়েকটি আর্ন্তজাতিক মানের উন্নত আবাসিক হোটেলও গড়ে উঠেছে। উপকূলীয় এ জেলার চর কুকরি-মুকরি, ঢালচর, পাতিলার চরসহ বিভিন্ন নয়নাভিরাম চরে ইকোপার্ক তৈরীর মাধ্যমে পর্যটনের ক্ষেত্র গড়ে তোলারও দাবি জানান তিনি।
ভোলা সদর আসনের এমপি বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, এ জেলায় গ্যাসেেত্রর দুটি কূপ খনন করা হয়েছে। তৃতীয় কূপ খননের কাজও শুরু হয়েছে। এ থেকে ৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। বাপেক্স ও রাশিয়ান জয়েন্ট ভেনচার আরো চারটি কুপ খননের কাজ শুরু করবেন। প্রাপ্ত শাহবাজপুর গ্যাস দিয়ে সরকার এখানে একটি সারকারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যার মাধ্যমে বছরে পাঁচ লাখ টন সার উৎপাদন সম্ভব। তিনি বলেন, ইতমধ্যেই ভোলাকে বিশেষ ইকোনমিক জোন ঘোষনা করা হয়েছে। এ ছাড়া নদী ভাঙনের হাত থেকে ভোলাকে রার করতে ‘শাহবাজপুর গ্যাসফিল্ড রক্ষা’ প্রকল্প ও ‘ভোলা শহর রক্ষা’ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ভোলা হবে দেশের সবচেয়ে উন্নত ও সমৃদ্ধশীল একটি আধুনিক ডিজিটাল শিল্পান্নয়ন জেলা। ভোলা বিনিয়োগ করার উত্তম ¯'ান উল্লেখ করে তোফায়েল আহমেদ দেশ-বিদেশের বড় বড় শিল্পপতিদের এ জেলায় বিনিয়োগ করার আহ্বান জানান। (লেখক: ভোলা প্রতিনিধি, দৈনিব কালের কন্ঠ)