02/06/2026
জীবনের ভরা মৌসুমে নুর জাহান বেগমের বড় ছেলে যখন বিসিএস ক্যাডার হয়েছিল, নিশ্চয়ই তিনি অনেক খুশি হয়েছিলেন।
সবাইকে মিষ্টিমুখ করাইছেন।
তার সারাজীবনের সাধনা আজ সফল হইছে।
ছেলে বড় চাকরি পাইছে।
হয়ত ছেলেকে কষ্টেসৃষ্টে পড়াশোনা করাইছেন, হয়ত না। সেই গল্পও মানুষের মুখে মুখে চাউর হইছে।
ছেলে আজকে যুগ্ম সচিব! চাট্টিখানি কথা না।
তারপর একে একে ছেলেমেয়েদের কপাল খুলতে শুরু করেছে। ছোট ছেলেও বুয়েটের শিক্ষক।
মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, মেয়ের জামাইও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক।
লোকে বলে-নুর জাহান বেগম চানকপাইল্লা। তার মত ঘরভর্তি সোনার সন্তান কয়টা ঘরে জন্মায়?
সেই নুর জাহান বেগম মারা গেছেন। মিরপুরের এক নির্জন ঘরে।
ঘরটা অগোছালো। হয়ত সারাজীবন সংসারের ঘানি টেনে এই সত্তোরোর্ধ বয়সে ঘরসংসার গুছাইতে ভালো লাগে না। শরীরও সায় দেয় নাই হয়ত।
তাই মৃত্যুর পর দেখা গেল তার ঘরটা ভীষণ অগোছালো। যৌবনটা যেমন গোছালো ছিল, এর ঠিক বিপরীত।
নুর জাহান বেগমের লাশটা উদ্ধার হয়েছে তার মেয়ের বাড়ি থেকে। কবে মারা গেছেন কেউ জানেও না।
এমনকি সন্তানরাও না।
পুলিশ ধারণা করছে অন্তত আট-দশদিন আগে মারা গেছেন উনি। কারণ তার মৃতদেহে পোকা ধরেছে!
ঈদ গেল চারদিন হয় নাই।
ছেলেমেয়ে যত শিক্ষিতই হোক, যত অসামাজিকই হোক, যত দূরেই থাকুক, বছরে অন্তত ঈদের দুইটা দিনে মায়ের খোঁজ খবর নেয়।
মা যদি অনেক খারাপ, দুনিয়ার সবচেয়ে খারাপও হয়ে থাকে, তিন-তিনটা প্রতিষ্ঠিত সন্তান মাকে অন্তত একটা কাজের বুয়া রেখে দিতে পারত।
এতে সন্তানদের কী এমন ক্ষতি হত?
মাসে লাখ টাকা কামানো ছেলেমেয়েদের পকেট থেকে মায়ের জন্য হাজার বিশেক টাকা যেত হয়ত! সেটাও জুটল না কপালে!!
আট-দশদিন আগে মারা গিয়ে থাকলে নুর জাহান বেগম ছেলেসন্তানদের মায়া ত্যাগ করেছেন ঈদের অন্তত তিন-চারদিন আগে।
ঈদের দিন একবার খোঁজ নিলেও ছেলেমেয়েরা জানতে পারত যে মা আর নেই! অন্তত বাসি জানাজাটা হলেও পাইত।
ছেলেমেয়েরা সব পয়সাওয়ালা। বিশাল বিশাল কুরবানি দিছে নিশ্চয়ই। পাড়াপড়শিকে পয়সার গরম আর হ্যাডম দেখাইতে হবে না?
পাতিল ভর্তি মাংস উদরে পুরে, ঢেকুর তুলতে তুলতে, অতিভোজনে যেন গাজন নষ্ট না হয়, সেজন্য কোল্ড ড্রিংসে চুমুক দিতে দিতে হয়ত অতিশয় প্রভাবশালী ও শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা আড্ডা দিচ্ছিল-বুঝলেন ভাই...
ওদিকে না খেয়ে বৃদ্ধ মা মরে পড়ে আছে। শরীর তার পোকায় খাচ্ছে!
আহারে মা!
মূল লেখা © রাকিবুল হাসান