17/09/2026
একজন শিল্পীর হাতে আঁকা একটি প্রচ্ছদ কখনো কখনো একটি বইকে পাঠকের কাছে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়। বাংলাদেশের বইয়ের প্রচ্ছদশিল্পে ধ্রুব এষ এমনই এক নাম। তাঁর আঁকা প্রচ্ছদে পাঠকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে অসংখ্য বইয়ের। এর মধ্যে রয়েছে হুমায়ূন আহমেদের বহু জনপ্রিয় বইও। আর এই দীর্ঘ যাত্রার শুরু হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্র থাকা অবস্থায়।
ধ্রুব এষের জন্ম ১৯৬৭ সালের ১৭ জানুয়ারি সুনামগঞ্জে। শৈশব থেকেই ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। বই পড়ার অভ্যাসও তৈরি হয় মায়ের কাছ থেকে। স্কুলে পড়ার সময়ই বইয়ের প্রচ্ছদ তাঁকে আকৃষ্ট করত। একসময় সিদ্ধান্ত নেন, প্রচ্ছদশিল্পকেই নিজের কাজ হিসেবে বেছে নেবেন। সেই লক্ষ্যেই ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায়।
১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় তাঁর প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু। মোস্তাক আহমেদের ছড়ার বই ‘ছুটোছুটি’ ছিল তাঁর প্রথম দিকের কাজগুলোর একটি। তখনও তিনি ছাত্র। পড়াশোনার পাশাপাশি বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকার কাজ শুরু করেছিলেন।
চারুকলার শিক্ষার্থী ধ্রুব এষের জন্য প্রচ্ছদ আঁকা কেবল একটি পার্শ্বকাজ হয়ে থাকেনি। ধীরে ধীরে সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর পেশা ও শিল্পচর্চার প্রধান ক্ষেত্র। নিজের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁর ইচ্ছা ছিল শুধু বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়ে কাজ করার। চারুকলায় পড়ার সিদ্ধান্তও সেই ইচ্ছার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
শুরুতে তিনি ইমদাদুল হক মিলনের বইয়ের প্রচ্ছদ করতেন। পরে প্রকাশকদের মাধ্যমে পরিচয় হয় হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে। নব্বইয়ের দশকে হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের প্রচ্ছদ করতে শুরু করেন তিনি। এরপর দুজনের দীর্ঘ সৃজনশীল সম্পর্ক বাংলাদেশের বইয়ের প্রচ্ছদশিল্পের ইতিহাসের আলোচিত অধ্যায় হয়ে ওঠে।
হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের প্রচ্ছদে ধ্রুব এষকে বেশ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। ধ্রুব এষ নিজেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, হুমায়ূন আহমেদ তাঁকে প্রচ্ছদে প্রচলিত চরিত্র বা ফিগার আঁকার বাধ্যবাধকতা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই স্বাধীনতা তাঁর কাজকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
হুমায়ূন আহমেদের ‘১৯৭১’ বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়েও রয়েছে একটি স্মরণীয় ঘটনা। ধ্রুব এষ তখন চারুকলার ছাত্র। প্রকাশকের মাধ্যমে হুমায়ূন আহমেদের একটি বইয়ের প্রচ্ছদ করার সুযোগ পান। পরে হুমায়ূন আহমেদ সেই প্রচ্ছদটি পছন্দ করেন। ধ্রুব এষের নিজের বর্ণনায়, সেই সময় তিনি চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার সেই ছাত্র থেকে ধ্রুব এষ পরিণত হয়েছেন বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত প্রচ্ছদশিল্পীতে। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘দ্য ডেইলি স্টার’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, তখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ হাজার বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন। পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর করা প্রচ্ছদের সংখ্যা ২৫ হাজারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংখ্যাটির দিকে তাকালে তাঁর কাজের ব্যাপ্তি বোঝা যায়। তবে ধ্রুব এষের কাছে প্রচ্ছদের কাজ শুধু সংখ্যার হিসাব নয়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, একটি কাজকে অন্যটির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে করার ধারণায় তিনি বিশ্বাসী নন। প্রতিটি বইয়ের প্রচ্ছদকেই তিনি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে চান।
প্রচ্ছদশিল্পের পাশাপাশি ধ্রুব এষ লেখালেখিও করেছেন। কবিতা, গল্প ও শিশুতোষ বই লিখেছেন তিনি। শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য ২০২২ সালে পান বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার।
তবে তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে আছে বইয়ের প্রচ্ছদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার একজন শিক্ষার্থী হিসেবে যে কাজের শুরু, কয়েক দশক পরে সেটিই তাঁকে নিয়ে গেছে হাজার হাজার বইয়ের প্রচ্ছদে। তাঁর নিজের হিসাব অনুযায়ী, সেই সংখ্যা ২৫ হাজার পেরিয়েছে।
বাংলাদেশের বইয়ের জগতে তাই ধ্রুব এষের গল্পটি শুধু একজন শিল্পীর সাফল্যের গল্প নয়। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার একজন শিক্ষার্থীর নিজের পছন্দের একটি শিল্পমাধ্যমকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার এবং দীর্ঘ সময় ধরে সেই কাজের মধ্যেই নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করার গল্প।
কপি পোস্ট : পাবলিকিয়ান
Chinair School & College Alumni Association আমাদের অহংকার মৌলভী মো. অজীহুল ইসলাম চৌধুরী স্মৃতি পাঠাগার