10/12/2025
সড়ক নিরাপত্তা সংকট:
সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অদক্ষ চালক, এবং অকার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সমস্যায় ভুগছে।
প্রতিদিন যে পরিমাণ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় বা আহত হয়, তা শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়—এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার এক গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ।
সড়ক দুর্ঘটনার মূল উৎস, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা, ট্রাফিক আইন কার্যকরের ঘাটতি এবং পথচারী–যাত্রীদের নিরাপত্তা হুমকিগুলো।
১. সঠিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই লাইসেন্স প্রদান: দুর্ঘটনার মূল উৎস
সড়ক পরিস্থিতি বিশৃঙ্খল হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো অদক্ষ চালকদের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি।
ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতা ও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রেই পরীক্ষার আনুষ্ঠানিকতা যান্ত্রিক, যেখানে বাস্তব প্রশিক্ষণের ঘাটতি স্পষ্ট।
ফলস্বরূপ, লাইসেন্সধারী বহু চালক যথাযথ দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও রাস্তার আচরণবিধি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ছাড়াই যানবাহন চালাচ্ছে।
এই অদক্ষতা প্রতিফলিত হয়—
• বেপরোয়া গতি
• নিয়ম না মেনে ওভারটেক
• অসতর্কভাবে ইউ-টার্ন
• সংকীর্ণ রাস্তায় অযথা হর্ন ও গতি বাড়ানো
এগুলো সড়কে একটি স্থায়ী ঝুঁকি তৈরি করে, যার মোকাবিলা করার সক্ষমতা পথচারী বা সাধারণ যাত্রীদের নেই।
২. ট্রাফিক আইন না মানার সংস্কৃতি
একটি সাংস্কৃতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে যেখানে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকে খুব সাধারণ ঘটনা হিসেবে দেখা হয়।
নিয়ম ভাঙ্গাকে “ঝুঁকি” নয়, বরং “সাহস” বা “দৈনন্দিন অভ্যাস” হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা দেখা যায়।
সড়কে নিয়ম ভাঙ্গার সাধারণ চিত্র:
সিগন্যাল মানা হয় না
রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ থামানো
দুই লেন থেকে তিন লেন তৈরি করা
জেব্রা ক্রসিং উপেক্ষা
বাস–ট্রাক–অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা
ফুটপাথ দখল ও পথচারীর চলাচল ব্যাহত করা
ফলাফল: পথচারী, মোটরসাইকেল আরোহী, এবং যাত্রী—সবাই উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে।
৩. ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার প্রশাসনিক দুর্বলতা
সড়ক নিরাপত্তা সংকটকে আরও গভীর করেছে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার চরম সীমাবদ্ধতা।
৩.১ সিগন্যাল ব্যবস্থার অকার্যকারিতা
বেশিরভাগ সিগন্যাল–পোস্টই
• অকেজো,
• ভুল সময়ে কাজ করে, অথবা
• চালকরাই মানে না।
৩.২ ট্রাফিক পুলিশের কাজের বহুমাত্রিক বিচ্যুতি
অভিযোগ রয়েছে
নিয়ম প্রয়োগের বদলে কোথাও কোথাও অবৈধ, লাইসেন্সবিহীন ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন থেকে সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
মাসিক মানতির বিনিময়ে বহু অবৈধ যানবাহনকে সড়কে চলাচলের অঘোষিত অনুমতি দেওয়া হয়।
এতে সড়কে নানান রকম যানবাহন কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই চলাচল করে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়।
৪. অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের আধিপত্য
সড়কে এমন বহু বাস, মিনিবাস, পিকআপ, সিএনজি, অটোরিকশা এবং তিন–চাকার যান রয়েছে যেগুলোর
ফিটনেস নেই
লাইসেন্স নেই
অতিরিক্ত যাত্রী বহন করে
নিয়ম না মেনে যেকোনো জায়গায় থামে
এই যানবাহনগুলো সাধারণত:
বেশি মুনাফা
কম নিয়ন্ত্রণ
ট্রাফিক কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা
এই তিন কারণে টিকে থাকে।
ফলস্বরূপ, দুর্ঘটনার হার প্রতিনিয়ত বাড়তেই থাকে।
৫. পথচারী ও যাত্রী নিরাপত্তার ভয়াবহ সংকট
সড়ক নিরাপত্তার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ হচ্ছে পথচারী।
ফুটপাথ দখল হয়ে থাকে
জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার কম
দ্রুতগতির যানবাহন রাস্তা পারাপারের ঝুঁকি বাড়ায়
একজন সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন—এই নিশ্চয়তা নেই।
৬. জনবল সংকট ও প্রযুক্তির অভাব
প্রয়োজনীয় স্থানে পর্যাপ্ত সংখ্যক ট্রাফিক সদস্য নেই।
আধুনিক প্রযুক্তি যেমন—CCTV, স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিস্টেম, ডিজিটাল ফিটনেস চেক—এগুলোর ব্যবহার সীমিত।
সড়ক ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ফাঁক রয়েছে।
৭. জবাবদিহিতা ও এনফোর্সমেন্টের ঘাটতি
দুর্ঘটনা ঘটলে সাধারণত
দায় নির্ধারণ হয় না
প্রতিষ্ঠান দায় নেয় না
তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ হয় না
প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গৃহীত হয় খুব কম
এই অনিয়ম প্রশাসনিক শিথিলতা বাড়ায় এবং চালকদের মধ্যে দায়হীন আচরণের সংস্কৃতি তৈরি করে।
উপসংহার
সড়ক পরিস্থিতি শুধু একটি ট্রাফিক সমস্যা নয়—এটি একটি সামগ্রিক নিরাপত্তা, প্রশাসন, মানসিকতা এবং ব্যবস্থাপনা সংকট।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন—
মানসম্মত ড্রাইভিং ট্রেনিং
কঠোর লাইসেন্সিং ব্যবস্থা
সিগন্যাল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন
অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ
প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি
সড়ক প্রশাসনে জবাবদিহিতা
নিয়ম মানার সংস্কৃতি তৈরিতে জনসচেতনতা
এই পরিবর্তনগুলো ছাড়া সড়ক ব্যবস্থাপনার উন্নতি সম্ভব নয় এবং দুর্ঘটনার হারও কমবে না।