10/10/2025
হাজীগঞ্জে ৩৭ তম পবিত্র ওরছে ইমামে রাব্বানী (রাঃ) অনুষ্ঠিত।
চাঁদপুর জেলাধীন হাজীগঞ্জ ইমামে রাব্বানী দরবার শরীফে আল্লামা আবু নসর সৈয়দ আবেদ শাহ্ মোজাদ্দেদী আল্ মাদানী (রাঃ)’র ৩৭ তম পবিত্র ওরছে ইমামে রাব্বানী (রাঃ) অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুুধবার (৮ অক্টোবর) ইমামে রাব্বানী দরবার শরীফের পীরে কামেল ইমামে আহলে সুন্নাত আওলাদে রাসূল হযরতুল আল্লামা সৈয়দ বাহাদুর শাহ্ মোজাদ্দেদী আল আবেদী (মা.জি.আ.) এর সভাপতিত্বে বাদ আসর হতে নাতে মুর্শীদি বাদ মাগরিব রওজা শরীফে গিলাপ পরিবর্তন শেষে সারা রাত ব্যাপী ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। মাদ্রাসায়ে আবেদীয়া মোজাদ্দেদীয়ার সুপার- মাওলানা মোহাম্মদ আলী নক্সেবন্দী ও বাংলাদেশ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত গাজীপুর জেলার সাধারন সম্পাদক মাওলানা মো. আল আমিন দেওয়ান আল আবেদী এর যৌথ সঞ্চালনায় ওরছ মাহফিলে অন্যান্যের মধ্যে তাকরীর পেশ করেন- ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মহা সচিব- আল্লামা অধ্যক্ষ জয়নুল আবেদীন জুবাইর, চট্রগ্রাম বিশ্ব বিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগীয় প্রধান- আল্লামা ড. এ এইচ এম বোরহান উদ্দিন, ইমামে রাব্বানী দরবার শরীফের খলিফা- হযরতুলহাজ¦ আল্লামা মোশারফ হোসেন হেলালী, আল্লামা মুফতি আলা উদ্দিন জিহাদী, আল্লামা মুফতি আবুল হাশেম শাহ্ মিয়াজী, চুনারুঘাট সদর হাজি আলীম উল্লা আলিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল- মাওলানা এ.কে. আফছার আহমাদ তালুকদার, চুনারুঘাট সদর হাজি আলীম উল্লা আলিয়া মাদ্রাসার সহকারী অধ্যাপক মাওলানা শেখ মোঃ মোশাহিদ আলী, হযরত শাহজালাল বোখারী রহ. হাফিজিয়া মাদ্রাসার পরিচালক- মাওলানা শাহ্ রমজান আলী, আলহাজ¦ মাওলানা মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান খাঁন আবেদী আল কাদেরীসহ দেশ বরেণ্য বিশিষ্ট বুজুর্গানেদ্বীন ও সুন্নি ওলামায়ে কেরামগন তাকরির পেশ করেন। এ সময় দরবারের শাহজাদা সৈয়দ আলমগীর শাহ্ মোজাদ্দেদী ও সৈয়দ মাহমুদ শাহ্ মোজাদ্দেদীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় পঞ্চাশ হাজারের অধিক মুসল্লী সাধারন উপস্থিত ছিলেন।
বক্তাগন ওরছে ইমামে রাব্বানীতে আল্লামা আবু নসর সৈয়দ আবেদ শাহ্ মোজাদ্দেদী আল্ মাদানী (রাঃ)’র জীবনাদর্শ নিয়ে আলোচনা করেন। এ সময় বক্তাগন বলেন, ইমামে রাব্বানী কাইউমে জামান, খলীফাতুর রাসূল, আওলাদে রাসুল (সাঃ) মুফতিয়ে আজম হযরতুল আল্লামা সৈয়দ আবু নসর মোহাম্মদ আবেদ শাহ্ মোজাদ্দেদী আল্ মাদানী (রাঃ) ছিলেন ইসলাম জগতের দ্বিতীয় খলিফা আমীরুল মোমেনীন হযরত ওমর ফারুক (রাঃ)’র খান্দানের ৩৬ তম বংশধর বাবার দিক দিয়ে। আর মায়ের দিক থেকে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর ৪০ তম বংশধর। ভারতের রামপুর স্টেটের নবাব কলবে আলী খাঁ পবিত্র হজ্বব্রত পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফ গমন করেন এবং তথা হতে মদীনা শরীফ গিয়ে তিনি ইমামে রাব্বানী সৈয়দ আবেদ শাহ মুজাদ্দেদী সাহেবের আপন চাচা মোঃ ইব্রাহীমের (তিনি তখন মসজিদে নববীর ইমাম ছিলেন) উনার কাছে বরকতের জন্য মোজাদ্দিদে আল্-ফেছানী (রাঃ) এর খান্দান হতে কিছু লোক তাঁর সাথে নেয়ার প্রস্তাব করলে, ইমামে রাব্বানী (রাঃ) সাহেবের চাচা তাতে রাজী হলেন। (তখন সৌদি আরব তথা মদিনার আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল), নবাব ইমামে রাব্বানী সাহেবের ওয়ালেদাইগণ সহ ও তাঁর আরেক চাচা মাওলানা এরশাদ হোসাইন মোজাদ্দেদী সাহেবকে সাথে নিয়ে ভারতের রামপুরে আসেন এবং তথায় নবাব তাদেরকে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করার জন্য বহু জায়গা সম্পত্তি দেন। হযরত মোজাদ্দেদী আল্-ফেছানী (রাঃ)’র নবম সুযোগ্য বংশধর হলেন, হযরতুল আল্লামা সৈয়দ আবু নসর মোহাম্মদ আবেদ শাহ্ মোজাদ্দেদী আল্ মাদানী(রাঃ)।
তিনি ১২৮৪ হিঃ সাবান মাসে পবিত্র শবে বরাতের সুবেহ সাদেকের শুভণে, মদীনা শরীফের জান্নাতুল বাকী মহল্লায় জন্মগ্রহন করেন। আটাশ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি সেখানে দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করেন ও পরে হিন্দুস্থানের সিরহিন্দে আগমন করেন। হিন্দুস্থানে তিনি সাতান্ন বছর ইলমে হাদীস ও ইলমে তাফসীর এবং ইলমে ফিকাহ’র খেদমতে নিয়োজিত থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ইসলামের ভিতর অনৈক্য সৃষ্টিকারী বিভিন্ন ফেরকা বিশেষ করে ওহাবী জামাত, লা-মাযহাবি, দেওবন্দী, কাদিয়ানী, তাবলিগী, বাহাইয়া, জামাতে ইসলামী, আওর মুহাম্মদীয়া প্রভৃতি ফেরকা এবং ইসলামের বাইরের শক্র ইহুদী, খৃষ্টান ও অন্যান্য দলের বাতিল আকিদা সমূহের বিরুদ্ধে বাহাছ ও মুনাজেরার অবিরাম জিহাদে নিয়োজিত ছিলেন।
হিন্দুস্থানে তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন “গজনফীর আহলে সুন্নাত” ও “গজনফীর হিন্দ”- হিন্দের সিংহ উপাধিতে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত এবং দেওবন্দীদের মধ্যে যে সকল মাসলা মাসায়েল নিয়ে মত পার্থক্য ছিল, (তিনি তাদের সাথে বাহাস করে, তাদেরকে পরাজিত করেছিলেন)। তখন ভারতবর্ষের সকল সুন্নি উলামায়ে কেরাম ও আলা হযরতের বড় সাহেবজাদাসহ সকলে উনাকে একটা জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে “আবু নছর” খেতাবে ভূষিত করেন। আবু নছরের অর্থ হলো, সাহায্যকারির পিতা। বতর্মানে আলা হযরত (রহঃ) এর দরবার থেকে ওনার সম্পর্কে কিতাব লেখা হয়েছে উর্দু ভাষায়, কারা কারা উপমহাদেশ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত এর খেদমত করেছে। যেটার লেখক আল্লামা রাহাত কাদরী। তিনি প্রথম এই উপমহাদেশে বায়া’তে রাসূল (দঃ) এর মৃত সুন্নাতকে জিন্দা করেন। এর ফলে সকল বিদআতী বায়া’তের মূলোচ্ছেদ ঘটলো। তাঁর ভূমিকা হলো দ্বীনের তাজদীদের ভূমিকা, তাই তিনি হলেন মোজাদ্দিদ। তাঁর তাজদীদের কাজ শুরু হল হিজরীর চৌদ্দ শতকের শেষ ভাগে ও পঞ্চদশ হিজরীর প্রথম ভাগে। তাজদীদের ক্ষেত্রে তিনি একক, সুন্নী জামাতকে জিন্দা করার ক্ষেত্রেও তিনি একক, তাই তিনি ছিলেন ইমামে আহলে সুন্নাত।
বায়া’তে রাসূল (দঃ) এর সন্ধানকারী, তাই তিনি ইমামে রাব্বানী। বাতিলের বিরুদ্ধে এ জিহাদে তাঁকে তিন বার কারাবরণ করতে হয়। একবার হিন্দুস্থানে, দুই বার বাংলাদেশে। দুই বার দুশমনে রাসূলেরা (দঃ) তাঁকে খাদ্যের সাথে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল। আল্লাহর অশেষ রহমতে বহু কষ্টের পরে উক্ত বিপদ থেকে মুক্তি পান। এরপরেও তিনি সত্যের পথে মানুষকে আহবানের মাঝে অসংখ্য বাঁধার সম্মুখীন হন। এত বাঁধার পরও তিনি ছিলেন আপোষহীন সংগ্রামী মুজাহিদ ও রাসূল (দঃ) প্রেমিক সৈনিক।
১৯৪৭ খৃষ্টাব্দের ১৪ই আগস্ট যখন অখন্ড ভারত ও পাকিস্থান বিভক্ত হয়ে যায়, তখন তিনি রাসূলে করীম (দঃ) এর গায়েবী নির্দেশে ১৯৪৮ ইং সনে হিজরত করে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশে) চলে আসেন হাজীগঞ্জের ঐতিহাসিক বড় মসজিদে ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব নেন (১৯৪৮-১৯৬৫)। পরে চাঁদপুর জেলাধীন হাজীগঞ্জ উপজেলার, মোজাদ্দেদ নগর (ধেররা) গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। সেখান থেকেই তিনি এদেশের সকল ইসলাম বিকৃতিকারীদের বিরুদ্ধে দুর্বার সুন্নী ইসলামী আন্দোলন শুরু করেন। স্বাধীনতার পরে ১৯৭৩ সালে সর্বপ্রথম এ দেশে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতকে সাংগঠনিক রূপ দেন, তিনি আজীবন এই সংগঠনের সভাপতি হিসেবে সর্বসম্মতিক্রমে ছিলেন। বহু বাহাসের মাধ্যমে ইসলাম বিকৃতিকারীদেরকে বিভিন্ন জায়গায় নাস্তানাবুদ করেছেন এবং সুন্নাতে মুতাওয়ারিসা বায়া’তে রাসূল (দঃ) কে এদেশে পুনরায় পুনরুজ্জীবিত করে লাখ লাখ মুসলমানগণকে বায়া’তে রাসূলে অন্তর্ভূক্ত করেন। অবশেষে তিনি ১২৬ বছর বয়সে ২৫ শে সফর ১৪০৯ হিজরী মোতাবেক ৮ ই অক্টোবর ১৯৮৮ ইং, ২৩ শে আশ্বিন ১৩৯৫ বাংলা, রোজ শনিবার সকালে ঢাকার গেন্ডারিয়াস্থ তাঁর জামাতার বাস ভবনে ইন্তিকাল করেন (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন)। তাঁর মাজার শরীফ বর্তমানে চাঁদপুর জেলাধীন হাজীগঞ্জ পৌরসভার ধেররাস্থ ইমামে রাব্বানী দরবার শরীফে স্থাপিত হয়। প্রতি বছরের ন্যায় ২৩শে আশ্বিন ৮ই অক্টোবর বুধবার তাঁর মাজার শরীফ প্রাঙ্গণে তাঁরই নামে “ওরসে ইমামে রাব্বানী (রাঃ)” উদযাপিত হয়।
বার্তা প্রেরক
সৈয়দ মাহমুদ শাহ্ মোজাদ্দেদী
সাহজাদা, ইমামে রব্বানী দরবার শরীফ
হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর।
মোবাইলঃ- ০১৮৩৫-৫৪৬৬৫৮