05/06/2026
জীবন চলছে না, শুধু দিন কেটে যাচ্ছে।" — মধ্যবিত্তের ডায়েরির পাতা থেকে উঠে আসা এই চিরন্তন সত্যটি নিয়ে একটি আবেগঘন ও বাস্তবমুখী গল্প নিচে দেওয়া হলো:
শূন্য পকেটের দীর্ঘশ্বাস
বিকেলের সূর্যটা তখন বাঁশঝাড়ের মাথায় গিয়ে ঠেকেছে। চৈত্রের তপ্ত হাওয়া জুড়িয়ে শান্ত একটা বাতাস বইছে নদীর পাড় ঘেঁষে। কিন্তু সেই শীতল বাতাস আরিয়াদের মনের ভেতরের আগুনটাকে নেভাতে পারছিল না। নদীর ঘাটে একটা ভাঙা নৌকার ওপর চুপচাপ বসে ছিল সে। চোখের সামনে দিগন্তজোড়া নদী, অথচ তার নিজের জীবনটা যেন একটা বদ্ধ ড্রেনে এসে আটকে গেছে।
আরিয়াদ একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর। নিজের একটা ভাঙাচোরা ক্যামেরা আর ভাঙা ল্যাপটপ নিয়ে দিন-রাত এক করে কাজ করত সে। স্বপ্ন ছিল নিজের মেধা দিয়ে একদিন একটা বড় জায়গায় পৌঁছাবে। কিন্তু বাস্তবতা বড় নিষ্ঠুর। গত কয়েক মাস ধরে কোনো কাজের পেমেন্ট ঠিকঠাক আসছে না। জমানো যা ছিল, তাও শেষ। পকেটের অবস্থা এখন এতটাই করুণ যে, মোবাইলের ইন্টারনেট রিচার্জ করার টাকাটাও আজ বন্ধুর কাছ থেকে ধার করতে হয়েছে।
সেদিন রাতে মায়ের মলিন মুখের দিকে তাকাতে পারছিল না আরিয়াদ।
মা এসে পাশে বসলেন, আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "বাবা, চালের ড্রামটা তো আজ একেবারেই খালি হয়ে গেল। কালকের দিনটা কীভাবে চলবে?"
আরিয়াদ কোনো উত্তর দিতে পারল না। মাথা নিচু করে রইল। একটা সময় ছিল যখন তার মাথায় কত শত আইডিয়া গিজগিজ করত। নতুন ভিডিওর স্ক্রিপ্ট, দারুণ সব সিনেমাটিক শটের পরিকল্পনা—সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। এখন মাথায় শুধু একটাই চিন্তা ঘোরে—টাকা। টাকা ছাড়া এই শহরে, এমনকী এই গ্রামেও যেন শ্বাস নেওয়া বারণ।
সে তার ভাঙা ল্যাপটপটা খুলল। স্ক্রিনের আলোয় নিজের ক্লান্ত ফ্যাকাশে মুখটা ভেসে উঠল। এডিটিং সফটওয়্যারটা খোলা, কিন্তু আঙুলগুলো কিবোর্ডে চলছে না। মাথায় কোনো নতুন ভাবনা নেই, কোনো সৃজনশীলতা নেই। অভাব মানুষের শুধু পকেট শূন্য করে না, মানুষের চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতাকেও মেরুদণ্ডহীন করে দেয়।
আরিয়াদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার বাইরে তাকাল। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে চলছে। দিন আসছে, দিন যাচ্ছে। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আরিয়াদের জীবনের চাকাটা একই জায়গায় জং ধরে আটকে আছে। তার মনে হলো—তার জীবন আসলে চলছে না, শুধু দিনগুলো কোনোমতে কেটে যাচ্ছে।
পরদিন সকালে আরিয়াদ আবার নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়াল। পকেটে হাত দিয়ে দেখল মাত্র কয়েকটা খুচরো কয়েন পড়ে আছে। সে নদীর বহমান জলের দিকে তাকাল। নদীটা কিন্তু থেমে নেই, হাজারো বাধা পেরিয়ে সে ঠিকই বয়ে চলেছে।
আরিয়াদ নিজের মনের ভেতর থেকে সব ক্লান্তি আর হতাশা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করল। সে নিজেকে বলল, "জীবন হয়তো থমকে গেছে, কিন্তু সময় তো থেমে নেই। দিন যখন কাটছেই, তখন এই অন্ধকার দিনগুলোকেও একদিন পার করে দেব।"
সে তার ক্যামেরাটা হাতে তুলে নিল। আজ সে কোনো কাল্পনিক গল্প বানাবে না। আজ সে ক্যামেরাবন্দি করবে নিজের এই থমকে যাওয়া চারপাশকে, এই নিঃশব্দ একাকীত্বকে। কারণ সে জানে, সবচেয়ে বড় শিল্প তৈরি হয় সবচেয়ে গভীর কষ্ট থেকে।
একটি অনুভূতির কথা: গল্পটা হয়তো অনেকের জীবনের সাথে মিলে যায়। তবে মনে রাখবেন, জীবনের গল্পে 'থেমে যাওয়া' অধ্যায়টা কখনোই শেষ অধ্যায় নয়। এটি কেবল একটি কঠিন পর্ব মাত্র। আপনার ভেতরের সৃজনশীলতাই আপনাকে আবার নতুন পথে ফিরিয়ে আনবে।