15/08/2026
চাঁদপুর থেকে ঢাকা— লঞ্চে আমার যাত্রাগুলো কখনোই শুধু এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌঁছে যাওয়ার গল্প নয়।
লঞ্চে উঠলে কেবিন কিংবা বিজনেস ক্লাসের এসি রুমের আরাম বেশিক্ষণ আমাকে আটকে রাখতে পারে না। কোনো এক অজ্ঞাত আকর্ষণে বেরিয়ে আসি ডেকে। তারপর পুরো লঞ্চজুড়ে হেঁটে বেড়াই। কখনো এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে, কখনো রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকি।
কেন করি, তার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই।
হয়তো চলন্ত লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে বাতাসকে অনুভব করার মধ্যে এমন এক অদৃশ্য প্রশান্তি আছে, যা কোনো কেবিনের নিরিবিলি আরামেও পাওয়া যায় না।
নদীর বুক চিরে লঞ্চ এগিয়ে চলে। পেছনে ফেলে যায় চাঁদপুর, সামনে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে ঢাকা। মাঝখানে শুধু বিস্তীর্ণ জলরাশি, দূরের চর, আকাশ আর অবিরাম বাতাস।
মাঝে মাঝে হাতে থাকে এক কাপ চা কিংবা কফি।
এক চুমুক নিই।
তারপর অনেকক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে থাকি।
কখনো মনে হয়, এই নদী কোনো দৃশ্য নয়; এটি যেন এক বিশাল, দুর্বোধ্য দর্শন। তার স্রোতের মধ্যে কত অপ্রকাশিত কথা, কত অনির্ণেয় গন্তব্য, কত অদৃশ্য বিদায় যে বহমান,তার কোনো হিসাব নেই।
লঞ্চের ইঞ্জিনের গর্জন, পানির অভিঘাত, বাতাসের পিসপিস শদ্ধ, আর যাত্রীদের বিচ্ছিন্ন কথাবার্তার শদ্ধ মিলে ডেকের ওপর এক অদ্ভুত সিম্ফনি তৈরি করে।
আর আমি হাঁটতে থাকি...
কোনো প্রয়োজন নেই। কোনো তাড়া নেই। শুধু হাঁটি।
কখনো মনে হয়, এই অর্থহীন পদচারণাই হয়তো সবচেয়ে অর্থপূর্ণ সময়গুলোর একটি। কারণ তখন কোথাও পৌঁছানোর তাগিদ থাকে না; শুধু পথটাকে অনুভব করার অবকাশ থাকে।
দূরের কোনো নৌকা চোখে পড়ে। কোনো জেলে নদীর বুকে নিজের নীরব জীবিকার সঙ্গে লড়ছে। কোথাও চর জেগে আছে, কোথাও জলরাশি একেবারে অনন্তের মতো বিস্তৃত।
অতঃপর আমি দাঁড়িয়ে থাকি।
চায়ের শেষ চুমুকটা নিই ☺
বাতাসটা আরেকবার মুখ ছুঁয়ে যায়।
লঞ্চ তখনও ছুটে চলছে ঢাকার দিকে...
ভাবি, মানুষ সারাজীবন কত আরামের সন্ধান করে। অথচ কখনো কখনো সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত প্রশান্তিটা লুকিয়ে থাকে সেই জায়গাতেই, যেখানে কোনো বিলাসিতা নেই—আছে শুধু মুক্ত বাতাস, চলমান নদী আর কিছুটা নির্জনতা।
তাই হয়তো চাঁদপুর থেকে ঢাকা আমার প্রতিটি লঞ্চযাত্রায় কেবিন আমাকে বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারে না।
নদী ডাকলে আমি ডেকে উঠে আসি।
পুরো লঞ্চ হেঁটে বেড়াই।
আর চলন্ত লঞ্চের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা পথ নিজের ভেতরেও ভ্রমণ করে আসি।