25/08/2026
বিদ্যালয়ের আঙিনা থেকে সরকারি উদ্যোগে লাগানো গাছের চারা গাছ উধাও!
শিমুল অধিকারী সুমন চাঁদপুর
চাঁদপুরের হাইমচরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনায় ঘটা করে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগানো হয়েছিল। উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। কিন্তু গাছ লাগানোর এক মাসের মধ্যেই সেই জায়গা এখন প্রায় ফাঁকা। রোপণ করা একটি গাছও নেই সেখানে।
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় গত ১৫ জুলাই হাইমচর উপজেলার ৮ নম্বর দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এসব গাছ রোপণ করা হয়। তবে কে বা কারা রাতের আঁধারে গাছগুলো তুলে নিয়ে গেছে—এমন অভিযোগ করেছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
২৩ আগস্ট সরেজমিনে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে দেখা যায়, যে স্থানে আনুষ্ঠানিকভাবে গাছগুলো রোপণ করা হয়েছিল, সেখানে এখন নেই কোনো গাছ। রোপণ করা জায়গাগুলো পড়ে আছে ফাঁকা। শিক্ষকরা জানান, গাছগুলো রোপণের পর কয়েক দিন নিয়মিত পরিচর্যা করা হয়েছিল। সেগুলোও ভালোভাবে বেড়ে উঠতে শুরু করেছিল। পরে এক সকালে বিদ্যালয়ে এসে তারা দেখতে পান, গাছগুলো আর নেই।
বিদ্যালয়টির নিজস্ব কোনো সীমানাপ্রাচীর না থাকায় যেকোনো সময় বহিরাগতরা বিদ্যালয়ের আঙিনায় প্রবেশ করতে পারেন। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই সুযোগ কাজে লাগিয়েই রাতের আঁধারে গাছগুলো তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিএস খতিয়ানভুক্ত ১২১৪, ১২১৫, ১২১৬, ১২১৭ ও ১২১৯ নম্বর দাগে মোট ৫৫ শতাংশ জমির ওপর ১৯৬১ সাল থেকে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে ১২১৪ দাগে ১৬ শতাংশ, ১২১৫ দাগে ৪ শতাংশ, ১২১৬ দাগে ৩ শতাংশ, ১২১৭ দাগে ২৮ শতাংশ এবং ১২১৯ দাগে ৪ শতাংশ জমি রয়েছে।
বিদ্যালয়ে রয়েছে দুটি ভবন। এর মধ্যে নতুন ভবনের আয়তন ১ হাজার ৩৩০ বর্গফুট এবং পুরোনো ভবনের আয়তন ৪ হাজার ২০০ বর্গফুট। বিদ্যালয়ের মোট জমির পরিমাণ ২৩ হাজার ৯৮০ বর্গফুট হলেও চারপাশে নেই কোনো বাউন্ডারি। ফলে খেলার মাঠসহ বিদ্যালয়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় মানুষের অবাধ যাতায়াত রয়েছে।
শিক্ষকরা জানান, বিদ্যালয়ের পরিবেশ সুন্দর রাখতে তারা দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের উদ্যোগে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়ে আসছেন। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারি কর্মসূচির আওতায় গত ১৫ জুলাই নতুন করে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগানো হয়।
সহকারী শিক্ষক সরদার মোহাম্মদ শামিম বলেন, “আমি গাছ অনেক ভালোবাসি। তাই স্বউদ্যোগে কয়েকটি বৃক্ষ রোপণ করেছিলাম। কিন্তু কে বা কারা যেন সেই গাছগুলো তুলে ফেলেছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।”
সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ শামসুদ্দিন বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নিয়ে বেশ কয়েকটি বনজ, ফলজ ও ঔষধি বৃক্ষরোপণ করা হয়। কয়েক দিন পরিচর্যার পর গাছগুলো সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে শুরু করেছিল। কিন্তু একদিন সকালে বিদ্যালয়ে এসে দেখি, কে বা কারা গাছগুলো তুলে নিয়ে গেছে।”
সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ সোহেল হোসেন কালবেলাকে বলেন, “গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। আমরা বিদ্যালয়ের আশপাশে বহু বছর ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। সম্প্রতি কিছু দুষ্কৃতিকারী আমাদের লাগানো গাছ তুলে ফেলছে। যারা আমাদের গাছ তুলে ফেলছে, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।”
বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ২১৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। নয়টি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন সাতজন শিক্ষক-শিক্ষিকা। পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা তৈরিতেও বিদ্যালয়টি কাজ করে আসছে বলে জানান শিক্ষকরা।
হাইমচর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাজহারুল হুদা বলেন, উপজেলার ৭২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরকারি উদ্যোগে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগানো হয়েছে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রায় পাঁচটি করে গাছ রোপণ করা হচ্ছে এবং কর্মসূচি চলমান রয়েছে। প্রতিটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক, দপ্তরি, নৈশপ্রহরী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের গাছের সঠিক পরিচর্যা ও সংরক্ষণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
হাইমচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত রায় কালবেলাকে বলেন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সফল করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ইউপি সদস্য, গ্রাম পুলিশসহ এলাকাবাসীর মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে উপজেলা প্রশাসন কাজ করছে। গাছ মানবজীবন ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে রোপণ করা গাছের সঠিক পরিচর্যা ও সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে রোপণ করা গাছ রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা শুধু কয়েকটি গাছ হারিয়ে যাওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সরকারি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্দেশ্য ও পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ। একটি বিদ্যালয়ে গাছ লাগানোর পর যদি সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে এমন কর্মসূচির সুফল কতটা টেকসই হবে—এ প্রশ্নও তুলছেন তারা।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত বিদ্যালয়টির সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, গাছ রক্ষায় নিয়মিত নজরদারি এবং গাছগুলো তুলে নেওয়ার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে নতুন করে গাছ লাগিয়ে সেগুলোর পরিচর্যা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।