10/07/2026
হিল উইমেন্স ফেডারেশন রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ শাখার ১৫ তম সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত
রাঙ্গামাটি, ১০ জুলাই ২০২৬: "সকল প্রকার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে বৃহত্তর আন্দোলনে নারী সমাজ অধিকতর সামিল হউন" শ্লোগানে আজ ১০ জুলাই ২০২৬, রাঙামাটি সরকারি কলেজ শাখার হিল উইমেন্স ফেডারেশন ১৫ তম বার্ষিক শাখা সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
উক্ত বার্ষিক শাখা সম্মেলন ও কাউন্সিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি স্টাফ সদস্য রুমেন চাকমা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হিল উইমেন্স ফেডারেশন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ম্রানুচিং মারমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রিনা চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সজল চাকমা প্রমুখ।
হিল উইমেন্স ফেডারেশন রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ শাখার সভাপতি এলি চাকমা সভাপতিত্বে এবং বিদায়ী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সূচনা চাকমা সঞ্চালনায় উক্ত সম্মলেন ও কাউন্সিলে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন রেশমি চাকমা।
রুমেন চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। শাসকগোষ্ঠী ভাগ কর শাসন কর নীতির মধ্য দিয়ে জুম্মদেরকে নিপীড়ন ও শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট করে রেখেছে। সেজন্য জুম্ম নারী সমাজকে মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব থেকে বের হয়ে এসে পুরুষের পাশাপাশি আন্দোলন সংগ্রামের হাল ধরতে হবে। এই দায়িত্ব পালনে নিয়মতান্ত্রিক কিংবা অনিয়মতান্ত্রিক উভয় পথে ছাত্র কিংবা ছাত্রী সমাজকে অধিকতরভাবে সামিল হওয়ার জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে যেকোন ষড়যন্ত্র নির্মূলকরণ তথা জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে সেভাবেই এগিয়ে নিয়ে যেতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ১৯৭১ বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও তার কোনো পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় নি। বরং পার্বত্য চট্টগ্রামে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা, গণহত্যাসহ ইসলামি সম্প্রসারণবাদ, উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রসার ঘটেছে, যেগুলো এখনও চলমান। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি কমিশন কার্যকর করার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা সমাধানপূর্বক পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী স্থায়ী জণগণকে নিয়ে স্থানীয় ভোটার তালিকা প্রণয়ণের মাধ্যমে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ নির্বাচন, স্থানীয়দের নিয়ে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন নিয়োগ, অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের কথা থাকলেও কোনো সরকার এগুলো বাস্তবায়নের সদিচ্ছা দেখায় নি। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীর ক্ষমতায়ন, নারী মুক্তি তথা সমগ্র জুম্ম জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লক্ষ্যে নারী-পুরুষ উভয়ের এগিয়ে আসতে হবে।
ম্রানুচিং মারমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম নারীসমাজ একদিকে বিজাতীয় শাসন-শোষণ অপরদিকে পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার দ্ধারা সমাজের শাসন-শোষণের শিকার। তবে এইটাও সত্যি, ইতিহাসে প্রতিটি অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নারীদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। কিন্তু বর্তমানে জুম্ম নারীদের মধ্যে রাজনীতি বিমূখতা লক্ষ্য করা যায়। সেজন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম নারীদের পরিবার ও সমাজের নানা বাঁধা অতিক্রম করে রাজনীতিতে আসতে হবে। এইচডব্লিউএফ হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম নারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র লড়াকু রাজনৈতিক সংগঠন। তাই এইচডব্লিউএফের সকল নেতাকর্মীদের আরো রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ হয়ে ওঠতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ ২৪ বছরের ও অধিক রক্তক্ষয়ী লড়াই সংগ্রামের পর ১৯৯৭ সালে যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয় নি। সেই চুক্তিকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম নারী সমাজ তথা সমগ্র জুম্ম জণগণের ঐক্য সুদৃঢ় করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন জোরদার করতে হবে।
রিনা চাকমা বলেন, হিল উইমেন্স ফেডারেশন শুধু একটি সংগঠন নয় এটি একটি শিক্ষার পাঠশালা এবং অন্যায় প্রতিবাদের কন্ঠস্বর। ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়া হিল উইমেন্স ফেডারেশন আজ ৩৮ বছর এখনো তার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে দুর্বার গতিতে। হিল উইমেন্স ফেডারেশন জুম্ম নারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন তাই এইচডব্লিউএফের সকল নেতাকর্মীদের আরো রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ হয়ে ওঠতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আদিবাসী নারীদের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং সর্বোপরি নারীদের অধিকার আদায়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে বাস্তবতা বিরাজমান রয়েছে আর এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে ভয়ের সংস্কৃতি থেকে আমাদের তরুণ জুম্ম নারী সমাজকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং লড়াই সংগ্রামে নিজেদের নিয়োজিত করতে হবে।
সজল চাকমা, শুরুতেই তিনি জুম্ম সমাজে নারীদের রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা কেন তা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও উন্নত সমাজ গড়তে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ একটি জাতির উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমান সময়ে বিশ্ব জগতে অনেকাংশে নারীদের নেতৃত্ব অবস্থান দেখা যায় কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস্তবতা ভিন্নরূপ।
তিনি আরও বলেন,পাহাড়ের সমাজ ব্যবস্থা এখনো সামন্তীয় ঘুণেধরা। এখানে নারীদেরকে এখনো দমিয়ে রাখা হয়, তাদের মুক্ত চিন্তার স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়। ফলে অনেক নারী অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলেও একটা ভয়ের দ্বিধায় ভুগে। তাই প্রান্তিক সমাজ থেকে যারা উঠে এসে যারা কলেজে ভর্তি হবেন তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে।
সম্মেলন ও কাউন্সিল ২য় অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে সেবিকা চাকমা, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সুষ্টি চাকমা এবং সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে জগতী চাকমাকে নির্বাচিত করে ১১ সদস্য বিশিষ্ট হিল উইমেন্স ফেডারেশন, রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ শাখার ১৫তম কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটিকে শপথ বাক্য পাঠ করান হিল উইমেন্স ফেডারেশন, রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক কাঞ্চনমালা চাকমা। পরিশেষে বিদায়ী কমিটির সভাপতি এলি চাকমার বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে সম্মেলন ও কাউন্সিল সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।