17/03/2026
পার্বত্য চট্টগ্রামের তরুণ প্রজন্ম নিয়ে একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা ও আত্মসমালোচনা
শিরোনামটি প্রথমে শুনলে অনেকের কাছেই অদ্ভুত লাগতে পারে— “আদিবাসী পাহাড়ি ছেলে-মেয়েরা কুকুরের বাচ্চা, আর বাঙালি ছেলে-মেয়েরা বিড়ালের বাচ্চা।” কেউ হয়তো একটু রাগও করতে পারেন। কিন্তু অনুরোধ থাকবে, দয়া করে পুরো লেখাটি মন দিয়ে পড়বেন। এখানে কাউকে অপমান বা হেয় করার উদ্দেশ্য নেই। এটি মূলত একটি ধর্মীয় আলোচনায় শোনা একটি উপমা এবং সেই উপমার ভেতরে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতা নিয়ে কিছু কথা।
২০১৫ সালের সময়ের কথা। তখন আমি নবম শ্রেণিতে পড়ি। পড়াশোনার সুবিধার জন্য খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙা উপজেলার চৌধুরী পাড়ায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতাম। সেখান থেকেই প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া-আসা করতাম। নতুন জায়গা হলেও ধীরে ধীরে আশেপাশের মানুষদের সঙ্গে পরিচয় হয়ে যায়।
আমাদের আশেপাশে বেশিরভাগ ভাড়াটিয়াই ছিল আদিবাসী মারমা সম্প্রদায়ের মানুষ। তাদের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও আচরণ সবকিছুই ছিল আমার কাছে নতুন এবং আকর্ষণীয়। প্রথমদিকে একটু দূরত্ব থাকলেও দুই-এক বছরের মধ্যেই তাদের সঙ্গে আমার বেশ ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিশেষ করে আমার বয়সী কয়েকজন মারমা মেয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যায়। আমরা একসাথে গল্প করতাম, হাসতাম, মাঝে মাঝে তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কেও অনেক কিছু জানতে পারতাম।
আমাদের বাসা থেকে প্রায় দুই থেকে তিনশ গজ দূরে মাটিরাঙা পৌরসভার সদর এলাকার চরপাড়ার পাশে একটি বৌদ্ধ বিহার ছিল। সেই বিহারটিতে মাঝে মাঝে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান হতো। একদিন বিকেলে আমার কয়েকজন বান্ধবী এসে বলল, “আজকে বিহারে খুব সুন্দর একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান হবে। চল আমরা সবাই মিলে গিয়ে অনুষ্ঠানটা দেখে আসি।”
তখন আমরা কিশোরী, নতুন কিছু দেখার আগ্রহ সবসময়ই বেশি থাকে। তাই আর দেরি না করে আমরা পাঁচ-ছয়জন বান্ধবী মিলে প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। যেহেতু আমাদের মধ্যে কয়েকজন মারমা বান্ধবী ছিল, তাই আমরা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে সেজে গুজে অনুষ্ঠানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
সবাই প্রস্তুত হয়ে আমরা একসাথে বিহারের দিকে রওনা দিলাম। বিহারে পৌঁছে প্রথমেই আমরা মোমবাতি জ্বালিয়ে ভগবান বুদ্ধের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করলাম। পরিবেশটা ছিল খুব শান্ত, পবিত্র এবং প্রশান্তিময়। চারদিকে মানুষের ভক্তি, প্রার্থনার ধ্বনি এবং উৎসবের আবহ মিলিয়ে এক অপূর্ব অনুভূতি তৈরি হয়েছিল।
এরপর আমরা মূল অনুষ্ঠানের স্থানে গিয়ে বসতে চাইলাম। কিন্তু তখন অনেক মানুষ হয়ে গিয়েছিল। আমরা একটু দেরিতে পৌঁছেছিলাম বলে বসার জায়গাও তেমন পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত আমরা একটি কোণায় গিয়ে গাদাগাদি করে বসে পড়লাম।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সম্মানিত অতিথি বক্তব্য দিচ্ছিলেন। তারা ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা এবং নৈতিকতা নিয়ে অনেক সুন্দর ও শিক্ষণীয় কথা বলছিলেন। আমরা মন দিয়ে তাদের বক্তব্য শুনছিলাম।
এক পর্যায়ে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিতে মঞ্চে উঠলেন একজন সম্মানিত বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু। অনেকেই তাদেরকে ভান্তে বলে সম্বোধন করেন, কিন্তু আমি সবসময় শ্রদ্ধা করে তাদেরকে ‘বন্দনা’ বলে সম্বোধন করি।
তিনি অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে ধর্মীয় আলোচনা শুরু করলেন। তার কথাগুলো ছিল সহজ কিন্তু গভীর অর্থপূর্ণ। তিনি মানুষের জীবন, নৈতিকতা, শিক্ষা এবং সমাজের বাস্তবতা নিয়ে কথা বলছিলেন।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি একটি উদাহরণ দিলেন, যা আজও আমার মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে।
তিনি বললেন—পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী ছেলে-মেয়েদের জীবন অনেকটা কুকুরের বাচ্চার মতো দিয়ে শুরু হয়। জন্মের পর কুকুরের বাচ্চাগুলো যেমন খুব সুন্দর, গোলগাল এবং আদুরে লাগে, ঠিক তেমনি পাহাড়ি শিশুরাও জন্মের পর খুব সুন্দর এবং সবার আদরের হয়। তাদের দেখলে সবাই স্নেহ করতে চায়।
তিনি আরও বললেন, পাহাড়ি শিশুদের মধ্যে মেধাও কম থাকে না। স্কুলের প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অনেক পাহাড়ি ছেলে-মেয়ে খুব ভালো পড়াশোনা করে। অনেকেই মেধা তালিকায় থাকে এবং শিক্ষক-অভিভাবকদের কাছ থেকে প্রশংসা পায়।
কিন্তু সমস্যাটা শুরু হয় যখন তারা কলেজে ওঠে।
কলেজে উঠার পর অনেকেই বাবা-মায়ের কাছে একটি মোবাইল ফোন চায়। মোবাইল পাওয়ার পর ধীরে ধীরে তাদের জীবনে নতুন একটি জগৎ খুলে যায়—ফোনে আড্ডা, সামাজিক যোগাযোগ, নতুন বন্ধুত্ব, প্রেম ইত্যাদি।
এগুলো শুরুতে হয়তো খুব সাধারণ মনে হয়, কিন্তু ধীরে ধীরে পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ কমে যেতে থাকে। অনেকেই প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ প্রেমে আঘাত পেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।
আবার অনেক তরুণ-তরুণী খারাপ বন্ধুর প্রভাবে পড়ে যায়। তখন ধীরে ধীরে কেউ কেউ মদ, সিগারেট, জুয়া কিংবা অন্যান্য নেশার দিকেও চলে যায়।
আরেকটি বড় বিষয় হলো—অনেকেই কলেজ শেষ করার আগেই বিয়ে করে ফেলে। ফলে তারা খুব অল্প বয়সেই সংসারের দায়িত্বে জড়িয়ে পড়ে।
ধর্মীয় গুরুর মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক তরুণ-তরুণীর জীবনে এই ঘটনাগুলো ঘটে থাকে। যার ফলে তারা যে সম্ভাবনা ও মেধা নিয়ে শুরু করেছিল, সেই সম্ভাবনাকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে না।
এরপর তিনি আরেকটি উদাহরণ দিলেন।
তিনি বললেন—বাঙালি ছেলে-মেয়েদের জীবন অনেকটা বিড়ালের বাচ্চার মতো দিয়ে শুরু হয়। বিড়ালের বাচ্চারা জন্মের পর দেখতে তেমন সুন্দর লাগে না, অনেকেই তাদের ধরতেও চায় না।
তেমনি অনেক বাঙালি শিশু ছোটবেলায় খুব মেধাবী বা উজ্জ্বল মনে হয় না। স্কুলে অনেকেই কোনোরকমে ক্লাস পার করে। অনেকে ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসে থাকে।
কিন্তু তাদের জীবনের বাস্তবতা ভিন্ন।
অনেক বাঙালি ছেলে-মেয়ে ছোটবেলা থেকেই পরিবারের দায়িত্বে জড়িয়ে পড়ে। কেউ টিউশনি করে, কেউ দোকানে কাজ করে, কেউ অন্য কোনো পেশায় যুক্ত হয়।
এর ফলে তাদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই দায়িত্ববোধ এবং সংগ্রামের মানসিকতা তৈরি হয়।
যখন তারা কলেজে ওঠে, তখন তারা বুঝতে পারে পড়াশোনার গুরুত্ব কতটা। তখন তারা মন দিয়ে পড়াশোনা শুরু করে।
প্রেম, নেশা বা অন্যদিকে সময় নষ্ট না করে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার দিকে মন দেয়।
এর ফলও আমরা দেখতে পাই।
অনেক বাঙালি ছাত্র-ছাত্রী ইন্টারমিডিয়েটে ভালো ফলাফল করে। কেউ জিপিএ-৫ পায়, কেউ জিপিএ-৪ পায়। এরপর তারা ভালো মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ার সুযোগ পায়।
অন্যদিকে সেই সময় অনেক পাহাড়ি তরুণ সংসার জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
সকাল হলে কেউ ভাতের টিফিন নিয়ে কাজে বের হয়, কেউ জীবিকার জন্য বিভিন্ন কাজে ছুটে বেড়ায়।
তখন প্রশ্ন আসে—এই অবস্থার জন্য দায়ী কে?
ধর্মীয় গুরুর মতে, এর একটি বড় কারণ হলো আমাদের নিজেদের অবহেলা।
যদি প্রথম শ্রেণি থেকে কলেজ পর্যন্ত যে মেধা পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা যায়, সেটাকে সঠিকভাবে ধরে রাখা যেত—তাহলে প্রতি বছর তিন পার্বত্য জেলা থেকে অনেক বেশি সংখ্যক ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস ক্যাডার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী বের হয়ে আসত।
ধরা যাক, প্রত্যেক জেলা থেকে বছরে অন্তত ৫০ জন করে ডাক্তার, ৫০ জন করে ইঞ্জিনিয়ার এবং ৫০ জন করে বিসিএস কর্মকর্তা বের হওয়ার কথা ছিল।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও প্রত্যেক জেলা থেকে অন্তত ১০০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার মতো মেধা আমাদের আছে।
কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি সেই সংখ্যাটা খুবই কম। অনেক সময় হয়তো একজন বা দুজন।
এই বাস্তবতা আমাদের ভাবিয়ে তোলে।
শেষে সেই ধর্মীয় গুরু বলেছিলেন—পাহাড়ি ছেলে-মেয়েরা ছোটবেলায় অনেক সম্ভাবনাময় হয়, কিন্তু বড় হয়ে অনেক সময় সেই সম্ভাবনাকে ধরে রাখতে পারে না। আর বাঙালি ছেলে-মেয়েরা ছোটবেলায় হয়তো তেমন উজ্জ্বল নয়, কিন্তু বড় হয়ে কঠোর পরিশ্রম ও সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে।
এই কথাগুলোর ভেতরে কোনো বিদ্বেষ নেই। বরং এটি একটি আত্মসমালোচনা।
আমাদের উচিত নিজেদের ভুলগুলো বোঝা, শিক্ষা নেওয়া এবং নতুন প্রজন্মকে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করা।
কারণ শিক্ষা, শৃঙ্খলা এবং পরিশ্রমই পারে একটি সমাজকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে নিতে।
বিঃদ্রঃ আমার লেখায় কারোর মনে আঘাত বা ভুল হলে ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখবেন। কারন কথা গুলো নিজ কানে শুনা অভিজ্ঞতা আমার। সেই সময়ে যদি আমি ফোন ব্যবহার করতাম তাহলে ভিডিও রেকর্ড করে আপনাদেরকে দেখাইতাম কত সুন্দর আলোচনা যা বাস্তবিক।
কিন্তু দুঃখের বিষয় আমি ফোন ব্যবহার করি কলেজে শেষের দিকে ২০১৯ সালে।
💐 ধন্যবাদ সবাইকে কষ্ট করে পড়ার জন্য , ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করে দিবেন৷ আর ভুল হলে কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানাবেন 🙏🙏🙏
---
লেখায়
এডমিন ✅
Valentina Tripura
Voice Of Valentina
আদিবাসী তরুণ কলাম লেখক
আদিবাসী জীবন সংগ্রামের কথা
আদিবাসী সংস্কৃতি ও জীবন বৈচিত্র্য