30/08/2026
বহু বছর ধরে এন্ডোমেট্রিওসিসকে কেবলই একটি প্রজননতন্ত্র বা জরায়ু-সম্পর্কিত জটিলতা হিসেবে দেখা হতো। লোকলজ্জা আর সামাজিক ট্যাবু বা সংকোচের কারণে বাংলাদেশের অসংখ্য নারী এই তীব্র শারীরিক কষ্ট বছরের পর বছর মুখ বুজে সহ্য করে আসছেন। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা প্রচলিত এই ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এন্ডোমেট্রিওসিস আসলে কোনো সুনির্দিষ্ট অঙ্গের রোগ নয়, বরং এটি এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, যার প্রভাব পুরো শরীরেই পড়তে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এন্ডোমেট্রিওসিসের কারণে শরীরে যে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন তৈরি হয়, তার প্রভাব ফুসফুস, অন্ত্র এমনকি চোখ ও মস্তিষ্ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কী এই এন্ডোমেট্রিওসিস?
সাধারণত নারীদের জরায়ুর ভেতরের দেয়ালের আস্তরণকে বলা হয় এন্ডোমেট্রিয়াম, যা প্রতি মাসে ঋতুচক্র বা মাসিকের সময় রক্তের সাথে শরীর থেকে বের হয়ে যায়। কিন্তু এন্ডোমেট্রিওসিস রোগে আক্রান্ত নারীদের ক্ষেত্রে এই এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যু বা কোষগুলো জরায়ুর বাইরে ডিম্বনালি, ডিম্বাশয়, মূত্রথলি কিংবা তলপেটের অন্যান্য অংশে ছড়াতে ও বাড়তে শুরু করে। ফলে মাসিকের সময় জরায়ুর ভেতরের মতো বাইরের এই টিস্যুগুলো থেকেও রক্তক্ষরণ ও তীব্র প্রদাহের সৃষ্টি হয়। শরীর থেকে এই রক্ত বের হওয়ার কোনো পথ না থাকায় তা ভেতরেই জমে চকলেট সিস্ট এবং আশপাশের অঙ্গের মধ্যে অস্বাভাবিক জোড়া লাগা বা এডহেসন তৈরি করে।
শরীরে এর প্রভাব
বিজ্ঞানীরা এখন নিশ্চিত করছেন যে, এন্ডোমেট্রিওসিসের ক্ষত বা লেশন গুলো থেকে অতিরিক্ত ইস্ট্রোজেন হরমোন এবং এক ধরনের রাসায়নিক উপাদান নিঃসৃত হয়। এটি পুরো শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেমকে এলোমেলো করে দেয়।গবেষণায় দেখা গেছে, এন্ডোমেট্রিওসিসের কারণে সৃষ্ট এই শারীরিক প্রদাহের সাথে মাইগ্রেন (দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা), হাঁপানি এবং মারাত্মক পরিপাকতন্ত্রের জটিলতার (যেমন: কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া ও পেটে গ্যাস হওয়া) সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, এটি রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং এর কারণে নারীরা তীব্র ক্লান্তি বা ক্রনিক ফ্যাটিগ ও মানসিক অবসাদে ভোগেন।
রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব ও অবহেলা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একজন নারীর শরীরে এন্ডোমেট্রিওসিসের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর থেকে রোগটি চূড়ান্তভাবে নির্ণয় হতে প্রায় ৪ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। বাংলাদেশে এই বিলম্বের হার আরও বেশি। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো, আমাদের সমাজে কিশোরী বা তরুণীদের মাসিকের তীব্র কষ্ট বা তলপেটের ব্যথাকে অনেকেই ‘স্বাভাবিক’ বা মেয়েলি সমস্যা বলে উড়িয়ে দেন। ফলে সঠিক সময়ে রোগ ধরা পড়ে না, যা পরবর্তীতে বন্ধ্যাত্ব বা সন্তান ধারণে অক্ষমতার মতো বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করে।
পরিবর্তনের ডাক
চিকিৎসা বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কারগুলো এখন বিশেষজ্ঞদের এন্ডোমেট্রিওসিসের চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এতদিন ধরে কেবল ব্যথা কমানোর ওষুধ, হরমোন থেরাপি কিংবা ল্যাপারোস্কোপিক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জরায়ুর আশপাশের সিস্ট ফেলে দেওয়াকেই এর প্রধান চিকিৎসা মনে করা হতো।কিন্তু যেহেতু এটি পুরো শরীরের একটি প্রদাহজনিত ব্যাধি, তাই শুধু স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা একা এর পূর্ণাঙ্গ সমাধান করতে পারবেন না। এখন থেকে এন্ডোমেট্রিওসিস নিয়ন্ত্রণে মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি বা সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যেখানে ব্যথানাশক ও হরমোন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিক রাখা এবং খাদ্য তালিকায় প্রদাহরোধী পরিবর্তন আনা জরুরি।
এন্ডোমেট্রিওসিসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একমাত্র পথ নীরবতা ভেঙে সচেতন হওয়া। মাসিকের তীব্র ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ কিংবা মলমূত্র ত্যাগের কষ্ট লুকানোর
কোনো বিষয় নয়; বরং পরিবারের সচেতনতা আর সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শই পারে একটি জীবনকে সুন্দর ও সুরক্ষিত রাখতে।