14/03/2026
ইরানের দক্ষিণে পারস্য উপসাগরের বুকে ছোট্ট এক দ্বীপ। আয়তন মাত্র ২২ বর্গ কিলোমিটার। চারপাশে গভীর নীল জলরাশি। পুরো দ্বীপে রয়েছে কঠোর সামরিক পাহারা। ভেতরে তেলের বিশাল অবকাঠামো। আর মাটির নিচে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস। এই দ্বীপের নাম খার্গ।
আজ ইরানিদের কাছে এটি অনেকটাই ‘নিষিদ্ধ দ্বীপ’। কারণ এখানে প্রবেশাধিকার খুব সীমিত। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির কড়া নজরদারিতে দ্বীপটি প্রায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত। অনুমতি ছাড়া এখানে কেউ সহজে ঢুকতে পারে না। উঁচু বেড়া, ওয়াচ টাওয়ার আর কঠোর সামরিক উপস্থিতি খার্গকে এক রহস্যময় ভূখণ্ডে পরিণত করেছে।
কিন্তু এই কঠোরতার আড়ালেই রয়েছে আরেক বাস্তবতা। সেখানে একই সঙ্গে বেঁচে আছে প্রাচীন সভ্যতার পদচিহ্ন, বহু ধর্মের স্মৃতি, ঔপনিবেশিক লড়াইয়ের চিহ্ন, রাজনৈতিক নির্বাসনের অন্ধকার ইতিহাস এবং আধুনিক ইরানের জ্বালানি শক্তির প্রাণকেন্দ্র।
আজ ভোরে খার্গ দ্বীপ আবারও বিশ্বরাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তার দেশের বিমান বাহিনী ইরানের এই দ্বীপে অবস্থিত সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। সেই ঘোষণার পরই খার্গ দ্বীপ নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান উত্তেজনার আলোচনায় চলে আসে।
ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, তিনি শালীনতার খাতিরে দ্বীপটির তেল অবকাঠামো ধ্বংস করেননি। তবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা ব্যাহত হলে তিনি সেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন। এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে যায়, খার্গ কেবল একটি দ্বীপ নয়। এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং ভূরাজনীতির এক স্পর্শকাতর কেন্দ্র।
ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ খার্গ থেকে প্রক্রিয়াজাত ও পাঠানো হয়।
বছরে প্রায় ৯৫ কোটি ব্যারেল তেল এই দ্বীপের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে পৌঁছায়। চারপাশের গভীর নীল জলরাশি খার্গকে দিয়েছে বিশেষ প্রাকৃতিক সুবিধা। সেই কারণে বিশাল সুপারট্যাংকার সহজেই এখানে ভিড়তে পারে। এখান থেকে তেল যায় মূলত এশিয়ার বাজারে। এর মধ্যে চীন সবচেয়ে বড় আমদানিকারক।
ইরানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, খার্গের টার্মিনালগুলো দেশের জ্বালানি খাতের স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। আবুজার, ফোরুজান ও দোরুদ- এই তিনটি বড় অফশোর তেলক্ষেত্র থেকে অপরিশোধিত তেল সাগরতলের পাইপলাইন দিয়ে এখানে আসে। এরপর তা তীরবর্তী স্থাপনায় প্রক্রিয়াজাত হয়। তারপর সংরক্ষণ করা হয়, অথবা জাহাজে তুলে পাঠিয়ে দেওয়া হয় আন্তর্জাতিক বাজারে।
বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপের মুখে থেকেও ইরান খার্গের অবকাঠামো উন্নয়ন থামায়নি। ২০২৫ সালের মে মাসে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল কমোডিটি ইনসাইটস জানায়, ২৫ ও ২৬ নম্বর ট্যাংক পুনরায় চালু করার মাধ্যমে টার্মিনালের ধারণক্ষমতা আরও ২০ লাখ ব্যারেল বাড়ানো হয়েছে। প্রতিটি ট্যাংকে ১০ লাখ ব্যারেল তেল রাখা সম্ভব। একসময় এই টার্মিনালগুলোর সর্বোচ্চ লোডিং সক্ষমতা দিনে ৭০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছিল। বর্তমানে দেশটির দৈনিক রপ্তানি প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেলের মতো হলেও খার্গ এখনও ইরানের তেল প্রবাহের কেন্দ্রস্থল।
তবে খার্গের ইতিহাস শুধু তেলের নয়। সেই ইতিহাস আরও পুরনো।
এই দ্বীপে মানুষের বসতির প্রমাণ মিলেছে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষ দিক থেকে। এলামাইট, আকেমেনিড ও সাসানীয় যুগের নানা চিহ্ন আজও এখানে ছড়িয়ে আছে। অর্থাৎ খার্গ বহু সাম্রাজ্য, সংস্কৃতি এবং বিশ্বাসের নীরব সাক্ষী।
দ্বীপটির অন্যতম পবিত্র স্থান মীর মোহাম্মদ মাজার। ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগে এটি নির্মিত হয়। পাথর আর কাদা দিয়ে গড়া এর দুটি শঙ্কু আকৃতির গম্বুজ আজও অতীতের স্থাপত্যরুচির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
এর কাছেই রয়েছে মীর আরাম মাজার। সেখানে আছে ১২ মিটার দীর্ঘ একটি পাথর, যাতে ইসলামি লিপি খোদাই করা রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে দুটি প্রাচীন মশাল, যেগুলোর বয়স আকেমেনিড যুগ পর্যন্ত গড়াতে পারে বলে মনে করা হয়। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, এই স্থান মীর আরামের সঙ্গে যুক্ত, যিনি নবী হযরত নূহ (আ) এর বংশধর ছিলেন।
খার্গ দ্বীপের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। একটি প্রাচীন সমাধিক্ষেত্রে পাশাপাশি পাওয়া যায় জরথুস্ত্রীয় কবর, খ্রিষ্টান সমাধি এবং সাসানীয় যুগের কবরস্থান।
এখানে আরও আছে ১৭৪৭ সালের ডাচ দুর্গের ধ্বংসাবশেষ, ডাচ গার্ডেন, খার্গ অরচার্ড, পুরনো রেললাইন, ইসলামি কবরস্থান এবং আকেমেনিড যুগের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলালিপি। প্রবালপাথরে খোদাই করা এই লিপির মাপ ৮৫ বাই ১১৬ সেন্টিমিটার। একে এমন এক প্রাচীন প্রত্ননিদর্শন হিসেবে ধরা হয়, যেখানে স্পষ্টভাবে “পারস্য উপসাগর” নামটির উল্লেখ রয়েছে।
সমুদ্রপথে কৌশলগত অবস্থানের কারণে বহু যুগ ধরেই খার্গ ছিল লোভনীয় স্থান। কেউ কেউ ভুল করে এর নামকে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট প্রতিষ্ঠিত চারাক্স স্পাসিনোউ শহরের সঙ্গে যুক্ত করেন। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক নথি বলছে, এ দুইয়ের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। শতাব্দী ধরে স্থানীয় উচ্চারণ ও ইউরোপীয় মানচিত্রে দ্বীপটির নাম বদলেছে। কোথাও খার্গ, কোথাও খার্ক, কোথাও খারাজ, আবার কোথাও খারেজ নামে এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
দ্বীপের প্রাকৃতিক মিঠাপানির উৎস এবং অনুকূল ভৌগলিক অবস্থান একে একসময় গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংযোগস্থলে পরিণত করেছিল। কৃষিপণ্য ও খনিজ রপ্তানির ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব ছিল অনেক। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক যুগে প্রথমে পর্তুগিজরা খার্গসহ উপসাগরের আরও কিছু দ্বীপ দখল করে। পরে অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি ডাচরা এখানে প্রভাব বিস্তার করে।
১৭৫২ সালে ডাচ ব্যারন নিপহাউজেন বন্দর রিগের শাসক মীর নাসের আল-জাবির সঙ্গে একটি চুক্তি করেন। এর পরের বছর ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় একটি সুরক্ষিত দুর্গ নির্মাণ করে। কিন্তু সেই আধিপত্য বেশি দিন টেকেনি। কয়েক বছরের উত্তেজনার পর বন্দর রিগের গভর্নর মীর মুহান্না আক্রমণ চালিয়ে ১৭৬৬ সালের জানুয়ারিতে ডাচদের চূড়ান্তভাবে দ্বীপ থেকে বিতাড়িত করেন।
বিশ শতকে এসে খার্গের ইতিহাস আরও একবার অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। ১৯২৫ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ইরানের শাহ ছিলেন রেজা শাহ পাহলভি। তিনি খার্গকে রাজনৈতিক বন্দিদের জন্য নির্বাসনস্থল হিসেবে ব্যবহার করেন।
আধুনিক তেলযুগের শুরু হয় ১৯৫৮ সালের পর। খার্গকে তখন বিশাল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নতুন গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হয়। ১৯৬০ সালের আগস্টে সেখান থেকে প্রথম বড় চালান পাঠানো হয়। এরপর ১৯৬০-এর দশকে উপকূলের বাইরে নতুন নতুন তেলক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলে খার্গ দ্রুতই আবাদান বন্দরের গুরুত্বকে ছাড়িয়ে যায়। বিশাল ট্যাংকারগুলো আসতে শুরু করে এর গভীর জেটিতে।
১৯৮০-র দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় খার্গ দ্বীপ ভয়াবহ ও লাগাতার বোমা হামলার শিকার হয়। এর তেল স্থাপনা, অবকাঠামো, জীবনযাত্রা- সবকিছুই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্বীপটি যেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। পরে ইরানি কর্তৃপক্ষ ধীরে ধীরে সেটিকে আবার গড়ে তোলে।
আজও পারস্য উপসাগরের বুকে যখনই উত্তেজনা বাড়ে, খার্গের নাম সামনে চলে আসে। দ্বীপটি এখনও ব্যাপকভাবে সামরিকীকৃত।
একদিকে সুপারট্যাংকার নিঃশব্দে পারস্য উপসাগরের গভীর পানিতে ভেসে যায়। সঙ্গে করে নিয়ে যায় নিষেধাজ্ঞায় চাপে থাকা একটি দেশের অর্থনীতির প্রাণরস। অন্যদিকে প্রবালতটে দাঁড়িয়ে থাকে জরথুস্ত্রীয় আর খ্রিষ্টান কবরগুলো। এ যেন ঐতিহ্যবাহী অতীত আর ক্ষমতাধর বর্তমানের এক ভিন্নধর্মী পথচলা।