27/11/2025
যে দিন থেকে আমরা তথ্য মুখস্থ রাখা বন্ধ করেছি, সেই দিন থেকেই কেউ না কেউ আমাদের ভবিষ্যৎ মুখস্থ করা শুরু করেছে।
জ্ঞানের বাহক থেকে জ্ঞানের ভিখারি—মানব মস্তিষ্কের পতনের নীরব বিবর্তন
মানুষের সভ্যতায় এক সময় জ্ঞান ছিল প্রাণের মতো—মাথায় ধরে রাখার জন্য মানুষ লড়াই করত। বংশ পরম্পরায় মুখে মুখে যে শিক্ষা চলত, তা ভুলে যাওয়া মানেই ছিল ইতিহাসের মৃত্যু। মানুষ সেই জ্ঞানকে স্মৃতিতে বাঁধতে চাইত, মনে ধারণ করতে চাইত, কারণ হারিয়ে গেলে ফেরানোর উপায় ছিল না।
স্মৃতির শক্তি তখন ছিল অস্ত্র, দায়িত্ব, আর সম্মানের পরিচয়।
কিন্তু সময় বদলাল। বই জন্ম নিল—এক বিস্ময়, আবার এক বিপদও।
জ্ঞান আর মাথায় রাখার দরকার হলো না; মানুষ অভ্যস্ত হলো নতুন এক শর্টকাটে:
“আমার মনে রাখার দরকার নেই—বই রাখবে।”
মানুষ ধীরে ধীরে নিজের মস্তিষ্ক থেকে দায়িত্ব সরিয়ে দিল কাগজের পাতার উপর।
এই পরিবর্তন প্রথমে ক্ষুদ্র ছিল, কিন্তু আচমকা এক সত্য ধরা দিল—যে মানবসভ্যতা একসময় স্মৃতির উপর দাঁড়িয়ে ছিল, তারা এখন স্মৃতি থেকে পালিয়ে বেড়ায়।
ভয়াবহ দিক হলো: মানুষ নিজের সক্ষমতাকে ভুলে গেল, আর অন্য কিছুর উপর নির্ভরতার শক্ত অভ্যাস তৈরি করল।
এরপর আরেকটি শক্তির আগমন—AI—এই নির্ভরতার কড়াইতে যেন আরও আগুন ঢেলে দিল।
এখন মানুষ শুধু বই নয়, নিজের মস্তিষ্ককেও কাজ থেকে অব্যাহতি দিতে চায়।
কিছু মনে রাখার দরকার নেই, কিছু ভাবার প্রয়োজন নেই—AI তো আছে।
একটি প্রশ্ন করলেই উত্তর পাওয়া যায়, বিশ্লেষণ পাওয়া যায়, ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। মনে হয় যেন জ্ঞানের অফিসিয়াল ঠিকানা এখন নিজের মস্তিষ্ক নয়, বরং বাইরের এক যন্ত্র।
এখানেই বিপদের বীজ।
কারণ আমরা ভুলে যাই—নির্ভরতা যত বাড়ে, নিয়ন্ত্রণ তত কমে।
আমরা আজ এমন এক জ্ঞান-পরিবেশ তৈরি করেছি যেখানে
“তথ্য আমার নয়, যন্ত্রের। স্মৃতি আমার নয়, সিস্টেমের।”
আর এই সিস্টেম—AI, ইন্টারনেট, সার্ভার—যে চিরদিন আপনার পাশে থাকবে, এর কোনও গ্যারান্টি নেই।
একটি নীতি পরিবর্তন, একটি বোতাম টিপে দেওয়া, অথবা একটি অদৃশ্য সাইবার আঘাত—এতটুকুই যথেষ্ট।
বিশ্বের বহু শক্তির কাছে প্রযুক্তি বন্ধ করা কোনো মহাকাব্যিক ঘটনা নয়; বরং একটি সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত।
আরও ভয়ংকর সত্য হলো—আমরা এমন এক দেশে বাস করি যেখানে ডিজিটাল জীবনের শ্বাসনালী হলো কয়েকটি সাবমেরিন ক্যাবল।
ভাবুন, সাগরের নিচের সেই দুইটি নালী যদি একদিন নীরব হয়ে যায়?
ইন্টারনেট থেমে গেলে শুধু AI নয়—আমরা থেমে যাব।
আমাদের মস্তিষ্ক এতটাই অবসরপ্রিয় হয়ে গেছে যে তখন হয়তো আমরা প্রশ্নই করতে পারব না—এখন কী? কীভাবে? কোথায়?
মানব মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে এক প্রকার 'ডিজিটাল অনাথ' হয়ে যাচ্ছে—তথ্যহীন, স্মৃতিহীন, দক্ষতাহীন।
এমন এক দেহ, যার মনে কিছু নেই, যার ভরসা সবটাই অন্যের হাতে।
আর এই অবস্থাই তৈরি করে আসল বিপদ।
যখন মানুষ মস্তিষ্ককে কাজ করাতে ভুলে যায়, তখন তারা সহজে বশীভূত হয়।
একটি রুটি-কলা ধরিয়ে দিলেই দৌড়ে সেই হাতের পেছনে চলতে শুরু করবে—মানুষ না বুঝেই।
কে সেই হাত? মানুষ? নাকি মানবের মুখোশধারী অন্ধকার শক্তি?
আগে তারা প্রকাশ্যে আসতে ভয় পেত—মানুষ চিনে ফেলবে, প্রতিরোধ করবে বলে।
কিন্তু যখন মানুষের চিন্তাশক্তিই শুকিয়ে যায়, তখন শয়তানদের আর ছদ্মবেশ লাগে না।
একটা বাটনের দয়ায় বাঁচা মানুষ প্রতিরোধ করবে কীভাবে?
এই বিপর্যয় কেউ আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়নি; আমরা নিজেরাই নিজের মস্তিষ্ককে ছুটিতে পাঠিয়েছি, এবং নিজেদের অস্তিত্ব অন্যের হাতে তুলে দিয়েছি।
অতএব প্রশ্নটা স্পষ্ট—
আমরা কি জ্ঞানের মালিক, নাকি জ্ঞানের ভিখারি হয়ে যাচ্ছি?
মানুষের মস্তিষ্কের শক্তি কমছে না—কমাতে বাধ্য করা হচ্ছে।
আর আমরা যদি এখনো না জাগি, খুব শীঘ্রই “ডিজিটাল পাগল” হওয়াটা ভবিষ্যতের কল্পকাহিনি নয়, বরং বাস্তবতার ঠান্ডা সত্য হবে।