14/08/2026
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য বিদায়ী উপাচার্য (ভাইস চ্যান্সেলর) প্রফেসর ড. নিয়াজ আহমদ খান বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন ভাবনার এক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। একজন আন্তর্জাতিক মানের গবেষক এবং সফল শিক্ষাবিদ হিসেবে তাঁর কাজ বাংলাদেশের নীতি-নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
শিক্ষা, গবেষণা, পরিবেশ ও সামাজিক কল্যাণে তাঁর অবদানের একটি বহুমাত্রিক ও গভীর বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিকায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব
🔸উপাচার্য হিসেবে সুশাসন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত পরিবেশ ও একাডেমিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কাজ করেছেন।
🔸আন্তর্জাতিক মানদণ্ড: তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বাজেট বৃদ্ধি, লাইব্রেরির আধুনিকায়ন এবং বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে যৌথ গবেষণা কর্মসূচি (Joint Research) বাড়াতে ভূমিকা রেখেছেন।
🔸শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস: সেশন জট কমানো এবং হলের সিট বাণিজ্য বন্ধের মতো সাহসী প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।
২. পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তনের অগ্রদূত
🔸পরিবেশ নীতি-নির্ধারণ: ড. নিয়াজ আহমদ খান কেবল তাত্ত্বিক শিক্ষক নন; বাংলাদেশের বন ব্যবস্থাপনা, উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জাতীয় নীতি তৈরিতে তিনি সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন।
🔸আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো যে ক্ষতির মুখে পড়ছে, তা তিনি বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপি (UNDP) ও আইইউসিএন (IUCN)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থায় অত্যন্ত জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছেন।
🔸কমিউনিটি-ভিত্তিক বন ব্যবস্থাপনা: স্থানীয় মানুষদের সম্পৃক্ত করে কীভাবে বন রক্ষা করা যায় (Community-based Forest Management), সেই বিষয়ে তাঁর করা মডেল ও গবেষণা দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
৩. গ্রামীণ উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও স্থানীয় সরকার সংস্কার
🔸তৃণমূলের উন্নয়ন: তাঁর গবেষণার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। প্রথাগত অর্থশাস্ত্রের বাইরে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে পরিবেশ রক্ষা করেই দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব।
🔸স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন: ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের মতো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাগুলোকে শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করার জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন।
🔸সামাজিক কল্যাণ ও এনজিও সেক্টর: বাংলাদেশে কর্মরত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় উন্নয়ন সংস্থার (NGO) উপদেষ্টা হিসেবে তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নে সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন।
৪. আদর্শ শিক্ষক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক গড়ার কারিগর
🔸ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের বিকাশ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ' (উন্নয়ন অধ্যয়ন) বিভাগকে আজকের এই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসার পেছনে তাঁর অবদান অনন্য।
🔸মানুষ গড়ার মেন্টর: তাঁর সরাসরি তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছে শত শত সিভিল সার্ভেন্ট (বিসিএস কর্মকর্তা), গবেষক, এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, যারা আজ দেশপ্রেমের সাথে দেশ গঠনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
🔸জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন: অত্যন্ত অমায়িক, বিনয়ী এবং প্রজ্ঞাবান এই শিক্ষক তরুণ প্রজন্মকে সবসময় সস্তা আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে যুক্তিনির্ভর এবং নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হতে অনুপ্রাণিত করেন।
ড. নিয়াজ আহমদ খান একাধারে একজন শীর্ষ শিক্ষাবিদ (Academician), পরিবেশ বিজ্ঞানী এবং নীতি-নির্ধারক (Policy Maker)। শিক্ষা, সামাজিক কল্যাণ ও পরিবেশ রক্ষায় তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা এবং অসামান্য অবদান বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের গবেষকদের জন্য একটি মাইলফলক।