05/05/2026
কি ভয়ানক প্রতিবাদ ও প্রতিশোধ, সিনেমাও হার মানবে,একটু পড়ুন
তেহরান। ২০০৪ সাল। এক পড়ন্ত বিকেল। বাস স্টপে দাঁড়িয়ে ছিলেন ২৭ বছরের সুন্দরী তরুণী আমেনেহ বেহরামী। ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রী, চোখে অনেক স্বপ্ন। কিন্তু তিনি জানতেন না, তার সেই স্বপ্ন আর মাত্র কয়েক সেকেন্ডের অতিথি। ভিড়ের মধ্যে তার দিকে এগিয়ে আসছিল একটি পরিচিত ছায়া। মাজিদ মোভাহেদি। তার ইউনিভার্সিটি ক্লাসমেট। যে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল, আর আমেনেহ ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। মাজিদের হাতে ছিল একটি লাল রঙের প্লাস্টিকের বোতল। ভেতরে টলটল করছে তরল মৃত্যু— সালফিউরিক এসিড।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাজিদ সেই বোতলের পুরোটা ছুঁড়ে মারে আমেনেহর মুখে। মুহূর্তের মধ্যে নরক নেমে এল পৃথিবীতে। আমেনেহর মনে হলো তার চামড়ার ওপর কেউ গলন্ত লাভা ঢেলে দিয়েছে। তার আর্তনাদে কেঁপে উঠল তেহরানের আকাশ। চামড়া গলে খসে পড়ছে, চোখের মণি পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল তার দৃষ্টি। সেই শেষবার তিনি পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন। এরপর শুধুই অন্ধকার।
হাসপাতালের বিছানায় যখন জ্ঞান ফিরল, জীবনটা তখন ধ্বংসস্তূপ। স্পেনের বার্সেলোনায় পাঠানো হলো তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য। একের পর এক সার্জারি। ১৯ বার অস্ত্রোপচার করেও তার দৃষ্টি ফেরানো গেল না। মুখটা হয়ে গেল বিভীষিকাময়। কিন্তু আমেনেহ কাঁদলেন না। তিনি আয়নায় নিজের সেই বিকৃত মুখ স্পর্শ করে শপথ নিলেন— বিচার চাই। এবং সেই বিচার হতে হবে চোখের বদলে চোখ।
শুরু হলো এক দীর্ঘ আইনি লড়াই। ইরানের ইসলামিক দণ্ডবিধিতে 'কিসাস' বা তালিওন আইনের বিধান আছে। অর্থাৎ 'চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত'। আমেনেহ আদালতে দাবি করলেন, মাজিদ তার জীবন অন্ধকার করে দিয়েছে, তিনিও মাজিদের জীবনে অন্ধকার নামিয়ে আনতে চান। তিনি আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা জেল চান না, তিনি চান মাজিদের দুই চোখ এসিড দিয়ে অন্ধ করে দিতে।
সারা বিশ্ব তখন এই মামলার দিকে তাকিয়ে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রতিবাদ করছে, কিন্তু ইরানের আদালত আমেনেহর দাবির পক্ষেই রায় দিল। ২০১১ সাল। দীর্ঘ সাত বছর পর সেই মুহূর্তটি এল। তেহরানের বিচারিক হাসপাতাল। অপারেশন থিয়েটারে প্রস্তুত ডাক্তাররা। মাজিদ মোভাহেদিকে নিয়ে আসা হলো। তাকে হাঁটু গেড়ে বসানো হলো। তার হাত-পা বাঁধা। ভয়ে সে থরথর করে কাঁপছে, কাঁদছে, প্রাণভিক্ষা চাইছে।
আমেনেহর হাতে তুলে দেওয়া হলো এসিডের ড্রপার। ডাক্তার বললেন, "তুমি কি প্রস্তুত?" আমেনেহ এগিয়ে গেলেন। সাত বছর ধরে তিনি এই মুহূর্তটির স্বপ্ন দেখেছেন। তার বুকের ভেতর প্রতিশোধের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। তিনি মাজিদের সামনে দাঁড়ালেন। ড্রপারটা মাজিদের চোখের ওপর ধরলেন। আর মাত্র এক ফোঁটা, তারপরই মাজিদের পৃথিবীও হয়ে যাবে অন্ধকার। ঘরের মধ্যে পিনপতন নীরবতা। সবাই শ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে।
এক... দুই... তিন...
হঠাৎ আমেনেহ হাত নামিয়ে নিলেন। হাসপাতালের নিস্তব্ধতা ভেঙে তার শান্ত গলা শোনা গেল— "আমি মাফ করলাম।"
সবাই স্তম্ভিত। মাজিদ বিশ্বাস করতে পারছে না। সে আমেনেহর পায়ে লুটিয়ে পড়ল। আমেনেহ বললেন, "ওকে অন্ধ করলে কি আমি আমার চোখ ফিরে পাব? আমার মুখ কি আর আগের মতো সুন্দর হবে? প্রতিশোধ নিলে আমি শান্তি পেতাম ঠিকই, কিন্তু ক্ষমা করলে আমি মুক্তি পাব। আমি চাই না আমার মতো ওকেও অন্ধকারের যন্ত্রণা ভোগ করতে হোক।"
সেদিন আমেনেহ প্রমাণ করেছিলেন, শরীরের জোরের চেয়ে মনের জোর অনেক বেশি। তিনি মাজিদকে অন্ধত্ব থেকে মুক্তি দিলেন, কিন্তু তাকে আইনি শাস্তি থেকে রেহাই দিলেন না। মাজিদের ১১ বছরের জেল হলো। আর আমেনেহ? তিনি ফিরে গেলেন নতুন জীবনে। তিনি তার আত্মজীবনী লিখলেন— 'অগ উম অগ' (চোখের বদলে চোখ)। সেখানে তিনি লিখলেন, "প্রতিশোধ নেওয়া সহজ, কিন্তু ক্ষমা করা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ। আমি কঠিন পথটাই বেছে নিয়েছি।"
মাজিদ ২০১৫ সালে জেল থেকে ছাড়া পায়। কিন্তু আমেনেহ আজ বিশ্বজুড়ে এক আইকন। তিনি স্পেনে নতুন জীবন শুরু করেছেন। তার মুখ হয়তো এসিডে পুড়ে গেছে, কিন্তু তার আত্মা আজও উজ্জ্বল। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে হয়, কিন্তু দিনশেষে মানুষ হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো আমাদের মানবিকতা।
এসিড আমেনেহর মুখ পোড়াতে পেরেছে, দৃষ্টি কেড়ে নিতে পেরেছে, কিন্তু তার মেরুদণ্ড গলাতে পারেনি। অন্ধকারের অতল গহ্বরে দাঁড়িয়েও তিনি জ্বেলেছেন ক্ষমার আলো। ইরানের সেই হাসপাতালে সেদিন এসিডের ফোঁটা পড়েনি, পড়েছিল মানবতার অশ্রু।
স্যালুট আমেনেহ বেহরামী। আপনি সত্যিকারের হার না মানা যোদ্ধা।
Source & Disclaimer:
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া (Ameneh Bahrami), দ্য গার্ডিয়ান এবং বিবিসি-র আর্কাইভ রিপোর্টস (২০১১)। আমেনেহর লেখা বই 'Eye for an Eye' (জার্মান: Auge um Auge)।