25/05/2026
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে তার জীবনের খুঁটিনাটি নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন
আজ ২৫ মে (১১ই জ্যৈষ্ঠ)। ঠিক আজকের এই দিনেই কবি নজরুল ইসলামের জন্ম হয়েছিল। বাংলা সাহিত্যের এই মহান পুরুষ, যিনি একহাতে বাঁশরী আর অন্যহাতে রণতূর্য নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর সম্পূর্ণ জীবনী নিচে তুলে ধরা হলো।
# # প্রারম্ভিক জীবন (১৮৯৯–১৯১৭)
জন্ম: কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে এক দরিদ্র মুসলিম কাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
শৈশবের ধাক্কা: তাঁর বাবার নাম কাজী ফকির আহমদ এবং মা জাহেদা খাতুন। ১৯০৮ সালে পিতার অকাল মৃত্যুর পর মাত্র ৯ বছর বয়সে নজরুলকে সংসারের হাল ধরতে হয়। মক্তবের পাঠ শেষ করে তিনি সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন এবং মসজিদের মুয়াজ্জিন ও মাজারের খাদেমের কাজ নেন। শৈশবের এই চরম দারিদ্র্য ও কষ্টের কারণে তাঁর ডাকনাম রাখা হয়েছিল "দুখু মিয়া"।
লেটো দলের কবি: কিশোর বয়সে তিনি লোকনাট্য দল 'লেটো'-তে যোগ দেন। সেখানে গান ও নাটক রচনার মাধ্যমে তাঁর অসাধারণ কবিপ্রতিভার প্রথম প্রকাশ ঘটে।
রুটির দোকান থেকে ময়মনসিংহ: পরে তিনি কবিয়াল বাসুদেবের কবি দলে এবং আসানসোলের একটি রুটির দোকানে কাজ নেন। সেখানে তাঁর প্রতিভা দেখে আসানসোলের পুলিশ ইন্সপেক্টর কাজী রফিজউল্লাহ তাঁকে নিজের গ্রাম ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে ভর্তি করে দেন (১৯১৪)। পরবর্তীতে তিনি আবার চুরুলিয়ায় ফিরে রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুল থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন।
# # সৈনিক জীবন ও সাহিত্যে প্রবেশ (১৯১৭–১৯২০)
১৯১৭ সালের শেষদিকে, দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালীন নজরুল পড়ালেখা ছেড়ে ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। করাচি ব্যারাকে থাকার সময় তাঁর সাহিত্যিক জীবনের আসল ভিত্তি তৈরি হয়।
সৈনিক জীবনে বসেই তিনি ফারসি ভাষা ও সাহিত্য শেখেন এবং তাঁর প্রথম গল্প "বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী" (১৯১৯) ও প্রথম কবিতা "মুক্তি" প্রকাশ পায়।
# # ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব ও "বিদ্রোহী" কবি (১৯২০–১৯২২)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯২০ সালে পল্টন ভেঙে দিলে নজরুল কলকাতায় ফিরে আসেন। এখানে এসে তিনি পুরোপুরি সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় আত্মনিয়োগ করেন।
নবযুগ ও ধূমকেতু: শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের সম্পাদনায় প্রকাশিত 'নবযুগ' পত্রিকায় তিনি যোগ দেন। পরে নিজেই 'ধূমকেতু' নামক একটি বৈপ্লবিক পত্রিকা প্রকাশ করেন।
বিদ্রোহী কবিতা: ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে নজরুল তাঁর অমর কবিতা "বিদ্রোহী" রচনা করেন (যা ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি 'বিজলী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়)। এই একটি কবিতা বাংলা সাহিত্যে তাঁর স্থান চিরস্থায়ী করে দেয় এবং তিনি "বিদ্রোহী কবি" হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন।
# # ব্রিটিশদের কোপানল ও কারাবাস (১৯২২–১৯২৩)
নজরুলের কলম ছিল ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে এক ধারালো তলোয়ার। তাঁর 'ধূমকেতু' পত্রিকায় "আনন্দময়ীর আগমনে" কবিতা প্রকাশের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে রাজদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে।
রাজবন্দীর জবানবন্দী: আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি যে ঐতিহাসিক জবানবন্দী দিয়েছিলেন, তা বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য দলিল।
অনশন: হুগলি জেলে বন্দি থাকাকালীন কয়েদিদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে তিনি টানা ৩৯ দিন আমরণ অনশন করেছিলেন। পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন: "Give up hunger strike, our literature claims you."
# # প্রেম, বিয়ে ও পারিবারিক জীবন
১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল নজরুল প্রমীলা দেবীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এটি ছিল তৎকালীন সমাজে একটি অত্যন্ত সাহসী ও অসাম্প্রদায়িক পদক্ষেপ। নজরুল ও প্রমীলা দম্পতির চার সন্তান ছিল: কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ (বুলবুল), কাজী সব্যসাচী এবং কাজী অনিরুদ্ধ। এর মধ্যে প্রিয় পুত্র বুলবুলের অকাল মৃত্যু কবিকে গভীরভাবে শোকাচ্ছন্ন করেছিল।
# # গীতি-আলেখ্য ও আধ্যাত্মিক সাধনা (১৯২৬–১৯৪২)
বিদ্রোহের পাশাপাশি নজরুল ছিলেন প্রেমের ও আধ্যাত্মিকতার কবি। ১৯৩০-এর দশকে তিনি কলকাতার গ্রামোফোন কোম্পানি, এইচএমভি এবং অল ইন্ডিয়া রেডিওর সাথে যুক্ত হন। এই সময়ে তিনি প্রায় ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ গান রচনা ও সুর করেন, যা আজ "নজরুল গীতি" নামে পরিচিত।
তিনি একাধারে যেমন শ্যামাসংগীত ও কীর্তন লিখেছেন, তেমনি বাংলা ভাষায় ইসলামী গজল ও নাত রচনার অগ্রদূত ছিলেন। তাঁর এই বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি বাংলা সঙ্গীতকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
# # বাকরুদ্ধ হওয়া ও জীবনের ট্র্যাজেডি (১৯৪২–১৯৭৬)
১৯৪২ সালে নজরুল এক গুরুতর দুরারোগ্য ব্যাধিতে (পিকস ডিজিজ) আক্রান্ত হন। এর ফলে তিনি ধীরে ধীরে তাঁর বাকশক্তি ও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। দেশ-বিদেশে চিকিৎসা করিয়েও কবিকে আর সুস্থ করা সম্ভব হয়নি। জীবনের শেষ ৩৪ বছর তিনি সম্পূর্ণ নীরব ও পঙ্গু অবস্থায় কাটান।
# # বাংলাদেশে আগমন ও জাতীয় কবির স্বীকৃতি
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ১৯৭২ সালের ২৪ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে কবি নজরুলকে সপরিবারে স্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয় এবং তাঁকে "জাতীয় কবি" হিসেবে ঘোষণা করা করা হয়। ১৯৭৫ সালে তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয় এবং ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা "একুশে পদক" প্রদান করা হয়।
# # মহাপ্রয়াণ
১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট (১২ই ভাদ্র, ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) ঢাকার পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বিএসএমএমইউ) এই মহান কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁরই একটি বিখ্যাত গানের অনুরোধ অনুযায়ী:
"মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই..."
তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।