26/08/2026
শিশু থেকে বৃদ্ধ, জশনে জুলুসে লাখো মানুষের ঢল
*পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী আজদ, চট্টগ্রামে ৫৫তম জশনে জুলুস
শিশু থেকে বৃদ্ধ, নানা বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামের রাজপথ। বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে লাখো মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৫৫তম জশনে জুলুস।সকাল থেকেই নগরের বিভিন্ন সড়কে ছিল মানুষের ঢল। শিশুদের চোখে উৎসাহ, তরুণদের কণ্ঠে স্লোগান আর বয়স্কদের মুখে দরুদ ও মোনাজাত। বয়সের ব্যবধান ভুলে একই কাতারে দাঁড়িয়ে জুলুসে অংশ নিয়েছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।কেউ বাবার হাত ধরে, কেউ দাদার সঙ্গে, আবার কেউ বন্ধু-স্বজনদের নিয়ে। কারও হাতে জুলুসের পতাকা, কারও কণ্ঠে দরুদ ও নাত।
সকাল পৌনে ১০টার দিকে পাকিস্তানের দরবারে সিরিকোটের সাজ্জাদানশীন পীর আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ (ম.জি.আ.) বিশেষ গাড়িতে খানকাহর সামনে আসার পর শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী জশনে জুলুস। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন সাহেবজাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ কাসেম শাহ (ম.জি.আ.) ও শাহজাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ আকিব আহমেদ শাহ (ম.জি.আ.)।জুলুস শুরুর আগে হুজুর কেবলা সাংবাদিকদের ব্রিফিং দেন। পরে দোয়া ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে জুলুসের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।
জুলুসের পথে দেখা যায় ভিন্ন এক দৃশ্য। সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ, ভবনের ছাদ ও ফুটপাতেও অপেক্ষায় ছিলেন অনেকে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে ছিল বাড়তি উৎসাহ। বাবা-মায়ের হাত ধরে কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তারা জুলুস দেখতে ও এতে অংশ নিতে আসে।বয়স্করাও পিছিয়ে ছিলেন না। কেউ ধীরে ধীরে হেঁটেছেন, কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় জুলুসে শামিল হয়েছেন। তাঁদের অনেকের হাতে ছিল তসবিহ। কণ্ঠে ছিল দরুদ, হামদ ও নাতের সুর।জুলুসের বহর এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। হুজুর কেবলা হাত নেড়ে ভক্তদের শুভেচ্ছা জানান। বিভিন্ন সময় তিনি মোনাজাত করলে সড়কজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ‘আমিন আমিন’ ধ্বনি।
জুলুসকে ঘিরে নগরজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ। গুরুত্বপূর্ণ মোড়, সড়কদ্বীপ ও সড়ক বিভাজক সাজানো হয়েছে তোরণ, আনজুমানের পতাকা, ফেস্টুন ও ব্যানারে। মুরাদপুর থেকে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদরাসা পর্যন্ত বসেছে ভাসমান মেলাও।মেলায় আতর, টুপি, তসবিহ, মেসওয়াক, পাজামা, পাঞ্জাবি, জুলুসের পতাকা থেকে শুরু করে খাবার ও বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্য বিক্রি হচ্ছে। জুলুসে অংশ নেওয়া মানুষের জন্য বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে পানি, শরবত ও খেজুর বিতরণ করা হচ্ছে।
আনজুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এবারের জুলুসে দেশ-বিদেশের আশেকে রাসূলরা অংশ নিয়েছেন। আনজুমান পরিচালিত তিন শতাধিক মাদরাসার সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সিলসিলার ভাই এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও এতে যোগ দিয়েছেন।
ষোলশহরের জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদরাসা থেকে শুরু হওয়া জুলুসটি মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট, জিইসি, ওয়াসা, লালখান বাজার হয়ে টাইগারপাস পর্যন্ত । এরপর একই পথে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদরাসা মাঠে ফিরে আসে।
লাখো মানুষের এই সমাগমে সবচেয়ে চোখে পড়ছে প্রজন্মের মিলন। একই আয়োজনে পাশাপাশি হাঁটছেন শিশু, তরুণ, মধ্যবয়সী ও প্রবীণরা। কারও কাছে এটি পরিবারের সঙ্গে অংশ নেওয়ার স্মৃতি, কারও কাছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অংশ, আবার কারও কাছে প্রিয় আলেমকে একনজর দেখার সুযোগ।
জুলুসের শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি প্রায় ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করছেন। জুলুস চলাকালে লালখান বাজার-মুরাদপুর ফ্লাইওভার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
*পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী, চট্টগ্রামে ৫৫তম জশনে জুলুস
গতকাল বুধবার (২৬ আগস্ট) পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের স্মরণে মুসলিম উম্মাহর কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি পালিত হচ্ছে।
৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে মা আমিনার কোল আলো করে জন্মগ্রহণ করেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। ৬৩ বছর বয়সে একই দিনে তিনি মদিনায় পৃথিবীতে বিদায় নেন। দিনটি মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী হিসেবে পরিচিত।মহানবীর জন্মের আগে আরব সমাজে অরাজকতা, হানাহানি, মূর্তিপূজা ও নানা অনাচার বিরাজ করছিল। ইতিহাসে এ সময়কে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মানবজাতিকে সেই অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনতে মহান আল্লাহ তাকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি। দিনটি পালনে সরকার ও বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি নিয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ওয়াজ মাহফিল, সেমিনার, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।জাতীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর বাণীতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহনশীলতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, বর্তমান যুদ্ধ, সংঘাত, হিংসা, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতায় বিপর্যস্ত বিশ্বে মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহনশীলতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার আদর্শ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তার আদর্শ অনুসরণ করে হিংসা, বিদ্বেষ, বিভেদ ও অন্যায় পরিহার করে শান্তি, সম্প্রীতি, সাম্য ও মানবিকতার ভিত্তিতে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহমর্মিতা, ক্ষমা ও মানবিকতার আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, মহানবীর আদর্শ অনুসরণ করে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে চট্টগ্রামে গতকাল অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী ৫৫তম জশনে জুলুস। সকাল ৮টায় নগরের ষোলশহরের আলমগীর খানকা-এ কাদেরিয়া সৈয়্যদিয়া থেকে জুলুসটি শুরু হয।
আনজুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এ জুলুসের নেতৃত্ব সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ।