27/12/2025
অস্তমিত সূর্য থেকে ভোরের আলো: এক বিস্মৃত মহাবীর হাবিলদার রজব আলী খান
বাংলার আকাশে স্বাধীনতার সূর্য যখন অস্তমিত হয়েছিল ১৭৫৭-এর পলাশীর প্রান্তরে, সেই অন্ধকার ঘোচাতে একশ বছর পর বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন চট্টগ্রামের এক দামাল ছেলে। ইতিহাসের ধুলোবালি আজ হয়তো তাঁর নাম কিছুটা ঝাপসা করে দিয়েছে, কিন্তু ১৮৫৭ সালের সেই ১৮ই নভেম্বর চট্টগ্রামের পাহাড়তলী প্যারেড গ্রাউন্ডের মাটি আজও তাঁর বীরত্বের সাক্ষ্য দেয়। তিনি আর কেউ নন—বিদ্রোহী বীর হাবিলদার রজব আলী খান।
ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত পরহেজগার আর শান্ত স্বভাবের এই মানুষটির ভেতরে যে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এমন তীব্র আগুন ছিল, তা হয়তো সেদিন ব্রিটিশ ক্যাপ্টেনের কল্পনাতেও ছিল না। ৩৪ নম্বর নেটিভ বেঙ্গল পদাতিক বাহিনীর এই সাহসী সিপাহি যখন হুঙ্কার ছাড়লেন, তখন কেঁপে উঠেছিল বন্দরনগরীর ব্রিটিশ ভিত।
সেই ঐতিহাসিক রাতে রজব আলীর নেতৃত্বে প্রায় চারশ বিদ্রোহী সিপাহি আছড়ে পড়েছিলেন ব্রিটিশদের অস্ত্রাগার আর কোষাগারের ওপর। ব্রিটিশ বেনিয়ারা এতটাই আতঙ্কিত হয়েছিল যে, জান বাঁচাতে তারা লোকালয় ছেড়ে বঙ্গোপসাগরের মাঝখানে জাহাজে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। টানা ৩০ ঘণ্টা এই চট্টগ্রাম ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন! আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের প্রাঙ্গণে সেই লড়াইয়ে শহীদ হওয়া বীরদের রক্ত আজও মিশে আছে আমাদের অস্তিত্বে।
রজব আলীর স্বপ্ন ছিল বিশাল—ঢাকার বিপ্লবীদের সাথে মিলে পুরো দেশ থেকে ব্রিটিশদের তাড়ানো। কিন্তু নিয়তি আর বিশ্বাসঘাতকতা ছিল তাঁর পথের কাঁটা। দুর্গম পাহাড়, গভীর জঙ্গল আর ত্রিপুরার রাজার অসহযোগিতা সত্ত্বেও এক বুক সাহস নিয়ে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন। যখন রসদ ফুরিয়ে আসছিল, যখন সাথীরা একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিলেন, তখনও রজব আলী মাথা নত করেননি।
ঢাকার লালবাগ কেল্লায় যখন বিপ্লবীদের রক্তে হোলি খেলা হচ্ছিল, আন্টাঘর ময়দানের গাছে যখন ঝোলানো হচ্ছিল দেশপ্রেমিকদের লাশ—রজব আলী তখন গহীন অরণ্যে লড়াই করছেন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। ইতিহাসের এক করুণ ট্র্যাজেডি এই যে, যে মানুষটি একটি জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তাঁর শেষ পরিণতি কোথায় হয়েছিল, তা আজও অজানা। চট্টগ্রামের এই সূর্যসন্তান কোনো এক পাহাড়ের নিভৃতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন, কোনো চিহ্ন না রেখে।
আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে বুক ভরে শ্বাস নিচ্ছি, কিন্তু বীর রজব আলী খানেরা রয়ে গেছেন ইতিহাসের আড়ালে। কবির ভাষায়—
“মুক্তির মন্দির সোপান তলে
কত প্রাণ হল বলিদান
লেখা আছে অশ্রু জলে।”
রজব আলী খান কোনো সাধারণ সৈনিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন আমাদের আত্মপরিচয়ের শেকড়। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের যদি আমরা চিনতে ভুল করি, তবে আগামীর পথ চলা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। এই বীর সেনানীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
তথ্যসূত্র:
চট্টগ্রামে সিপাহি বিদ্রোহ — পূর্ণেন্দু দস্তিদার।
চট্টগ্রামের ইতিহাস — আবদুল হক চৌধুরী।