29/05/2026
বাংলার এই অঞ্চলে এই যে আমরা কত সহজে গরু কুরবানি দিতে পারছি, ব্যাপারটা কিন্তু এতো সিম্পলি আসেনাই!
এই যেমন ধরেন, একসময় মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরে এক মুসলমান ব্যক্তি তাঁর সন্তানের জন্ম উপলক্ষে আকিকার আয়োজন করলেন, এই যেমন আমরা করি এখন। তো, আকিকার অংশ হিসেবে তিনি একটি গরু জবেহ করেন। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন এই অঞ্চলের শাসক রাজা বল্লাল সেন ক্ষুব্ধ হয়ে ঐ মুসলমান ব্যক্তিকে নির্যাতন করেন।
অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তিনি বিক্রমপুর ছেড়ে পবিত্র মক্কা শরীফে চলে যান। মক্কায় অবস্থানকালে তার সাথে দেখা হয় সুফি সাধক হযরত বাবা আদম (রহ.)-এর সঙ্গে। নির্যাতিত সেই ব্যক্তি তাঁর কষ্টের কথা, বিক্রমপুরের অবস্থা এবং ধর্মীয় অধিকার নিয়ে সংঘটিত ঘটনার কথা বাবা আদম (রহ.)-কে খুলে বলেন।
কথিত আছে, সব শুনে হযরত বাবা আদম (রহ.) বিক্রমপুরের উদ্দেশ্যে ৭ হাজার সৈন্য নিয়ে রওয়ানা দেন। বিক্রমপুরে পৌঁছে প্রথমে সেখানে বসতি স্থাপন করেন এবং মসজিদ নির্মাণ করেন।
এরপর একদিন বাবা আদম শহীদ (রহ.) কোরবানি/ফাতেহার আয়োজন করেন। জনশ্রুতি বলে, গরু জবেহের পর একটি পাখি মাংসের একটি টুকরো নিয়ে উড়ে যায় এবং তা রাজা বল্লাল সেনের রাজদরবারের উঠোনে গিয়ে পড়ে। রাজদরবারে গরুর মাংস দেখে রাজা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং এর উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানতে পারেন, বিক্রমপুরে এক মুসলমান সাধক তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে অবস্থান করছেন।
সেখান থেকেই শুরু হয় সংঘাত।
রাজা বল্লাল সেন যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন, এবং যুদ্ধে পরাজয় হলে তাঁর সব রাণী যেন চিতায় আত্মহুতি দেয় সেটার ঘোষণা দেন। এজন্য বেশকিছু কবুতর নিয়ে যান যুদ্ধের ময়দানে। সৈন্যদের বলা হয় আমরা যদি যুদ্ধে পরাজয় বরণ করি এরকম পরিস্থিতি হয় তাহলে কবুতরগুলো যেন ছেড়ে দেওয়া হয়। কবুতরগুলো রাজ দরবারে পৌঁছে গেলে রাণীরা সবাই মিলে যেন আত্মাহুতি দেয় তার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। কবুতর ফিরে আসা হল পরাজয়ের চিহ্ন। চিতায় আগুন জ্বালিয়ে রাখা হয়। অন্যদিকে বাবা আদম (রহ.) ও তাঁর সঙ্গীরা ঈমান, ইবাদত ও ধর্মীয় অধিকারের পক্ষে অবিচল থাকেন। যুদ্ধ শুরু হলে একে একে বাবা আদম (রহ.)-এর সঙ্গীরা শাহাদাত বরণ করেন। যুদ্ধক্ষেত্র রক্তাক্ত হয়ে ওঠে, কিন্তু জনশ্রুতি অনুযায়ী বাবা আদম (রহ.)-কে সাধারণ অস্ত্র দিয়ে শহীদ করা যাচ্ছিল না।
যুদ্ধ করতে করতে বাবা আদমের সৈন্যরা একে একে শাহাদাত বরণ করেন৷ রাজা বল্লালের সৈন্যরা একে একে মারা যাচ্ছেন৷ তবে বাবা আদমকে কোনভাবেই শহীদ করা যাচ্ছে না৷ এরকম অবস্থায় বল্লালের এক সৈন্য পরিস্থিতি না বুঝে কবুতরগুলোর বাঁধন খুলে দিলে কবুতরগুলো রাজ দরবারে পৌঁছালে বল্লাল বাহিনী পরাজয় বরণ করেছে মনে করে রাজদরবারের রাণীরা চিতায় গিয়ে আত্মহুতি দেন৷
কথিত আছে, এক পর্যায়ে বাবা আদম (রহ.) নিজেই বলেন, তোমাদের তরবারি দিয়ে আমাকে হত্যা করা সম্ভব নয়। আমি শাহাদাত চাই। এরপর তিনি নিজের তরবারি রাজা বল্লাল সেনের হাতে তুলে দেন। সেই তরবারির আঘাতেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন এবং কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করেন।
এরপর, বল্লাল বাবা আদম শহীদের বাহিনীকে পরাজিত করে রাজ দরবারে ফিরে গিয়ে দেখে রাজদরবারের রাণীরা সবাই চিতায় আত্মহুতি দিয়েছেন৷ এই অবস্থায়, রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ে বল্লালও অবশেষে আগুনে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করে।
তাই আমাদের এই অঞ্চলে কোরবানি শুধু একটি ইবাদত নয়, এর সাথে এই বাংলার মুসলিম মানুষের অধিকারের আদায় আর সংগ্রামের কাহিনি গাঁথা আছে।
আল্লাহ হযরত বাবা আদম শহীদ (রহ.)-এর কোরবানি, আত্মত্যাগ এবং আমাদের সকলের কোরবানি কবুল করুন।
আমিন।
📍 বাবা আদম শহীদ মসজিদ, বিক্রমপুর
#কুরবানি #বাবাআদমশহীদ #বিক্রমপুর #মুন্সীগঞ্জ #বাংলারঐতিহ্য #প্রাচীনমসজিদ #ঐতিহাসিকস্থান