01/08/2026
এক বড় ভাইয়ের করুণ দীর্ঘ নিঃশ্বাস
---------------------------------
অভিজিৎ বড়ুয়া অভি
----------------------
সিপিং সংক্রান্ত একটা কাজে আমার স্টাফরা বুঝচ্ছে না। অফিসে বসে ভাবছি। একজনের কথা মনে পড়লো। ফোন করে আগ্রাবাদ অফিসে আসতে বললাম।
ভদ্রলোক ১টার নাগাদ এলো। সমস্যার বিষয়টি আমার কর্মচারীদের বুঝিয়ে দিলো। দেখলাম খুবই উস্কখুস্ক, সার্ট ময়লা। এলোমেলো চুল। ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত।
কাজের মাঝে সিগারেট এগিয়ে দিলাম। ভদ্রলোক সিগারেট জ্বালিয়ে খুব দীর্ঘ এক টান দিলেন।
আমি হেসে বললাম, "এতো দীর্ঘ নিঃশ্বাস কেন ভাই" ।
খুবই শূন্য দৃষ্টিতে তাকালো। বললাম, "দুপুরের খাওয়া হয়েছে। "
ভদ্রলোক চুপ করে থাকলো। বুঝলাম। বললাম, "চলেন খেতে। আপনি আমার উপকার করলেন একবেলা দাওয়াত আপনা পাওনা হয়েছে।"
আগ্রবাদ বাঙ্গালীয়ানা হোটেল আমার খুবই প্রিয়। অনেক প্রকার ভর্তা পাওয়া যায়। বিভিন্ন ভর্তা, ডাল, সব্জি, মাংস আনালাম।
ভদ্রলোক খুবই আন্তরিক ভাবে জিজ্ঞেস করলো, এতো খাবার কেন। বললাম, "খান। আমিতো তেমন খাইনা। খাওয়াতে আপত্তি কোথায়।"
ভদ্রলোক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। আমি বললাম, "ভাই আপনার এই ঘন ঘন দীর্ঘ নিঃশ্বাস আমার খুবই অপছন্দের। এর কারণ কি?"
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভদ্রলোক বললেন, " আপনিতো জানেন আমার স্ত্রী মারা গেছে। এরপর থেকে ছোট ভাইয়ের সাথে থাকি। কিন্ত সংসার খরচ কম দি, বেশী খাই ইত্যাদির নানা অভিযোগ। শশুড়বাড়ির থেকে আম পাঠিয়েছিল, একদিন পেয়েছি, আর চোখে দেখিনি। বিভিন্ন প্রকার মাছ কিনেছি, একদিন এক পিস পেয়েছি। মা জীবিত থাকতে, মাছের মাথা আমাকে তুলে দিতেন। তা আর এখন ঝুটে না।"
আমি হাসলাম। বললাম, "খুবই ভাল গল্প, আমার নতুন উপন্যাসে যোগ করবো। এক অপদার্থ এর জীবন কাহিনী।"
ভদ্রলোক আমার মুখের দিকে তাকালো, বললো, "এই ছোট ভাইয়ের বিয়ে কথা চলছে, মা এসে বললো। আমার ছোট চাকরী। কেউ জানতে চাইলো না টাকা কিভাবে জোগান হবে। ধার করে দিলাম। এরপর তার জীবনে সমস্যার শেষ নেই। টাকা দাও টাকা দাও। কত কষ্ট করে টাকা তাকে দিয়েছি। আর এখন আমি তার বোঝা।"
আমি উচ্চস্বরে হাসলাম। পাশের মানুষ জন তাকালো। সংযত হয়ে বললাম, "আসলেই আপনি খুবই বড় অপদার্থ।'
ভদ্রলোক আবার বললো, 'ছোট বোনের বিয়ে। আমার কাছে টাকা নেই। কেউকি তা শুনবে। জমানো সব টাকা তুলে দিলাম। জামাই বিদায়, জাপানি সুট লাগবে। অফিসে কত বিনয় কাকুতি করে সেই টাকা জোগান দিলাম। ভাবলাম বৃদ্ধ বয়সে এরা আমাকে আশ্রয় দেবে।আর সেই বোন এখন বলে, আমার জন্য নাকি তার শশুড়বাড়িতে সন্মান নষ্ট হয়।"
আমি হাসলাম। বললাম, " সন্তান, ভাইবোন দুই ধরণের হয়। কেউ হয় দ্বায়িত্ব বোধ ও ভালোবাসার। আর কেউ হয় জানোয়ার শ্রেণীর। আপনার ভাইবোন জানোয়ার শ্রেণীর। এখন আপনি প্রকৃত ভাইবোনে আর জানোয়ার এর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারেন নি। তাই আপনি বড় অপদার্থ। বর্তমান এই ভোগের মিথ্যাচারের দুনিয়ায় সৎ উদার ভালোবাসার কোন মূল্য নেই। কোন ধর্ম নেই। বিচার নেই। এই জানোয়ার ভাইবোনের সঙ্গী হয় আত্মীয়সজন। এই এক শেয়াল ডাক দেয় হুক্কা হুয়া, বাকী শেয়াল বলে কেয়া হুয়া।"
আমি আরো বললাম, "আপনি যেহেতু অপদার্থ অকর্মণ্য বোকা, নিজের ভাল বুঝেন না, তাই আপনার উপর যা হয়েছে, তা আপনার কর্মফল। উচিত ছিল নিজের স্বার্থ দেখা। জানোয়ারদের জন্য সর্বস্ব দিয়ে নিঃস্ব হয়ে এখন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলছেন।"
বললাম, "এই ঠিকানা আর ফোন নং এ ফোন করবেন।ওরা আমার স্টাফ। ওরা মেস করে থাকে। আপনিও ওদের সাথেই থাকেন। ছোট ভাই আর ভাইয়ের বউ এর কাছে অপমানিত আর অসন্মান পাওয়ার চেয়ে ভাল।"
খাওয়ার পর গাড়িতে উঠে বসলাম। ভদ্রলোক গাড়ি দেখে বললো, "আপনার গাড়ি খুবই বড়।'
আমি হেসে বললাম, 'আমি স্বার্থ বুঝি। এই ভোগবাদীতার সমাজ, পরিবার, সন্তান, ভাইবোন, আত্মীয় রূপি জানোয়াদের ভালো বুঝি। তাই নিজের চিন্তা আগে করি। সবাই অভিযোগ আমি স্বার্থ বুঝি। আপনার মতন অকর্মণ্য অপদার্থ হবার চেয়ে নিজের ভাল নিজে বুঝা উত্তম। "
এখন কোন ধর্ম নেই। ঈশ্বরের কোন বিচার নেই। অধর্ম এখন ধর্ম। বদমাইশ লম্পট মদখোর দুর্বৃত্ত ঘুষখোর এখন চারিদিকে। সন্তান ভাইবোন আত্মীয় ব্যবসার অংশীদার এখন প্রতারক। এরাই পরিবার সমাজ সংগঠনের রাষ্ট্রের নায়ক।
এখন সুখে সম্পদশালী হয়ে ভাল থাকতে হলে বদমাইশ বা দুর্বৃত্ত বা ঘুষখোর দুর্নীতিবাজ হতে হবে।