03/12/2025
একি আউলা-বাউলা কাণ্ড!
পঞ্চতাণ্ডব, দ্য কমন রান।
ভাষা! সে তো কেবল কিছু ধ্বনি আর চিহ্নের সমাহার নয়, সে হলো সভ্য সমাজের গোপন প্রহরী। আমাদের পণ্ডিতেরা যুগে যুগে ভাষাটিকে এমন এক সোনার খাঁচায় ভরেছেন, যেখানে শব্দের প্রতিটি নড়াচড়া কঠোর ব্যাকরণের শৃঙ্খল মেনে চলে। শব্দের সঠিক জন্ম ও বংশপরিচয় (ব্যঞ্জনবর্ণের উপরে চন্দ্রবিন্দু) নির্ণয় করাই তাদের মুখ্য কাজ।
অথচ, এই ব্যাকরণ যখন প্রান্তিক মানুষের উচ্চারণ শোনে, তখনই সে হাউমাউ করে ওঠে! তাদের চোখে, এই অমার্জিত শব্দগুলো যেন ভাষার সতীত্ব নষ্ট করে দিচ্ছে! তাঁরা ভুলে যান, ভাষার প্রাণ তার সংজ্ঞায় নয়, বরং তার ব্যভিচারে—অর্থাৎ সে কত সহজে আর কত মুক্তভাবে মানুষের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। আসুন, সেই ব্যাকরণবিদদের দিকেই তীর্যক দৃষ্টি ফেরানো যাক, যারা ভাষার খাঁচা এঁটে নিজেদের বর্গ ও অন্যের মর্গ রচনা করেন।
বাউলের ভাষা কোনো সাজানো বাগানের ফুল নয়; তা হলো বনের বুনো ফুল—স্বতঃস্ফূর্ত, স্বাধীন এবং বাঁধনহারা। জনসন বা প্রমথ চৌধুরীর মতো সাহিত্যিকেরা যে 'পলিশড' ভাষার মানদণ্ড তৈরি করেছেন, তা সমাজের উঁচু তলার মানুষদের জন্য, যেখানে সবকিছুর একটা নির্দিষ্ট 'আগামাথা' থাকা চাই। কিন্তু বাউলের বাণী সেই শৃঙ্খলার বাইরে, তা প্রান্তিক মানুষের হৃদয়ের গভীরের কথা। তথাকথিত 'ভদ্রলোক' সমাজে যা 'গোয়ামাথা' বা 'হোগামাথা' বলে কানে বাজে, বাউলদের কাছে সেটাই তাদের আধ্যাত্মিক সত্যের সরলতম প্রকাশ, যা কোনো লুকোচুরি জানে না, বোঝে না। এই ভাষাকে যারা অশ্লীল বলে, তাদের দায় ভাষার নয়, তাদের মনের; কারণ সেই মন কেবল নিয়মের কাঠিন্যেই শান্তি খুঁজে ফেরে। সেই বুদ্ধির বিনাশেই বাউলের ভাবের মুক্তি।
বাউলের 'ভাবের কথা' কোনো অভিধানের শব্দে ধরা পড়ে না; তা হলো আত্মার উপলব্ধি। তাদের গান কোনো ব্যাকরণ বা যুক্তির ধার ধারে না, তাই বাউলকে জেলে পুরে দেওয়াই হোক বা তাকে সম্মান জানানো হোক—তার উপলব্ধির ওপর কোনো ছাপ পড়ে না। বাউলরা জানে, তাদের সত্য প্রাতিষ্ঠানিক বিচার বা কারাগারের ঊর্ধ্বে। বাউলকে যদি বুঝতে হয়, তবে পুঁথিগত জ্ঞান আর সামাজিক রীতিনীতির বাঁধন ছিঁড়ে 'আউলাঝাউলা' হয়ে যেতে হবে।
'আউলাবাউলা' হওয়া মানেই হলো সেই মুক্ত চিন্তার জগতে প্রবেশ করা, যেখানে শিল্প আর ঐতিহ্য সবসময়ই ইনসাফ ও মুক্তির গান গেয়ে এসেছে। বাউল সেই আদিম ও খাঁটি মুক্তির পথ দেখায়, তাকে বিচার করতে যাওয়া এক প্রকার হাস্যকর বাড়াবাড়ি।
যে ব্যাকরণ কেবল একটি ব্যঞ্জনবর্ণের উপরে এক চন্দ্রবিন্দু বসানো বা না বসানো-র সূক্ষ্ম বিচারেই ভাষার মর্গ ও বর্গ রচনা করে, সেই ব্যাকরণকে বাউলরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। কারণ বাউলরা জানে, এই ভাষাগত শুদ্ধির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর ঔপনিবেশিকতা—যা কেবল শব্দকে মার্জিত করার অজুহাতে শ্রেণিবৈষম্যকেই স্থায়ী করে। যারা চন্দ্রবিন্দুটি সঠিকভাবে উচ্চারণ করে বা লিখতে পারল, তারা হলো 'বর্গ' বা সমাজে উচ্চকোটির অধিকারী; আর যারা ভাষার সেই 'পলিশড' মানদণ্ড ছুঁতে পারল না, তারা হলো 'মর্গ' বা মৃতপ্রায় গণ্য হওয়া প্রান্তিক জনতা। বাউলের ভাষা এই কৃত্রিম বিভাজনকে স্বীকার করে না; তাদের কাছে শব্দের সঠিক উচ্চারণ নয়, বরং ভাবের আন্তরিকতাই আসল, যা হৃদয় থেকে উৎসারিত হয়ে সহস্র শুদ্ধির শাসনকে বাতিল করে দেয়।
এই পুরো বিষয়টা আসলে এক সচেতন মজমা। এই শ্লেষ বাউলকে উদ্দেশ্য করে নয়, বরং সেই সমাজকে উদ্দেশ্য করে, যারা নিজেদের ভাষার শুদ্ধতা নিয়ে অহংকার করে অথচ জীবনের মূল সত্য থেকে বিচ্ছিন্ন। বাউলের ভাষা এই 'সুশীল' সমাজের কপটতা আর অন্তঃসারশূন্যতাকে টেনে বের করে আনে। তথাকথিত শালীনতা আর পরিশীলনের আড়ালে যে আধ্যাত্মিক শূন্যতা লুকিয়ে থাকে, বাউল তার দেহ-তত্ত্ব দিয়ে সেই শূন্যতাকে প্রকাশ্যে আনে। বাউলকে ভুল বোঝার মাধ্যমে সমাজ কেবল নিজেদের গোঁড়ামি আর কূপমণ্ডূকতাকেই প্রকাশ করে।
বাউলের এই সাহিত্যিক বিদ্রোহের শেকড় ইতিহাসের দারুণ গভীরে। তাদের জন্ম বাংলায় সহজিয়া বৌদ্ধ, নাথ যোগী এবং সুফি সাধকদের মিলনের স্রোতে। বাউলের "গোয়ামাথা"-র সোজাসাপটা উচ্চারণ কোনো আধুনিক অশ্লীলতা নয়; এটি বরং প্রাচীন নাথপন্থীদের এবং সুফিদের 'সির' (গুপ্ত রহস্য) বা 'মারিফত' (আধ্যাত্মিক জ্ঞান)-এর মতো এক স্পষ্ট ঘোষণা। সুফি সাধক মনসুর হাল্লাজ যেমন তার যুগে ধর্মীয় কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, বাউলও তার মুক্ত ভাষা দিয়ে একই কাজ করে। বাউলকে শাস্তি দেওয়া সেই ভুলেরই পুনরাবৃত্তি, যেখানে মুক্ত আত্মাকে সবসময়ই সংকীর্ণ জ্ঞান দিয়ে বেঁধে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
যারা বাউলের সরলতাকে অশ্লীলতার ফতোয়া দিয়ে 'আউলাঝাউলা কাণ্ড' ঘটায়, তারা আসলে কোরআনের নিগূঢ় শিক্ষা 'জাহের' (বাহ্যিক) ও 'বাতেন' (অভ্যন্তরীণ)-এর পার্থক্যটাই ধরতে পারে না। বাউল যখন তার "গোয়ামাথা" শব্দে জীবনের চরম সত্য প্রকাশ করে, তখন সে 'জাহের'-এর আবরণ ছিঁড়ে 'বাতেন'-এর দিকে ইশারা করে। এই বিচারক সেজে বসা মানুষগুলো হলো সেই লোক, যারা ইব্রাহিম (আঃ)-এর মূর্তিপূজা ভাঙা দেখেছিল, কিন্তু তার অন্তরের একত্ববাদী দর্শনটি ধরতে পারেনি। তাদের বুদ্ধি, যা কেবল বাইরের কাঠামোকে পূজা করে, তা আসলে কোরআনের সেই সতর্কবাণীকেই প্রমাণ করে—"তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তারা তা দিয়ে বোঝে না"।
এই তথাকথিত শুদ্ধিবাদীরা ভুলে যায় যে, পবিত্র কোরআন এমন প্রতীক ব্যবহার করেছে যা স্থূল অর্থে ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না, আর সুফি দর্শন সবসময় আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে আত্মার শুদ্ধিকরণকে বড় মনে করে। বাউলের 'আউলাঝাউলা' জীবনযাপন আসলে ইসলামের সুফি ধারার 'মালামাতিয়া' (তিরস্কারকারী) পন্থার অনুরূপ, যার উদ্দেশ্য লোকদেখানো ধার্মিকতা থেকে দূরে থাকা। বাউলের 'গোয়ামাথা'–'হোগামাথা' শব্দগুলোও একই ঢাল হিসেবে কাজ করে—যা তথাকথিত 'ভদ্রলোক' সমাজকে দূরে ঠেলে দেয়, যাতে বাউলরা নিরালায় তাদের 'ভাবের কথা' নিয়ে মগ্ন থাকতে পারে। এই 'আউলা-বাউলা কাণ্ড' প্রমাণ করে যে, সত্যের ভাষা সবসময়ই সহজ, কিন্তু তার উপলব্ধি কঠিন।
বাউলের এই 'আউলাবাউলা' বিদ্রোহ ড্রাইডেন, জনসন বা প্রমথ চৌধুরীর স্থির, গোছানো বুদ্ধির কাঠামোকে ভেঙে দিয়ে জীবনের মৌলিক সত্যের জয়গান করে। এই স্যাটায়ারের মাধ্যমে বাউল তার অস্তিত্বের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করে, যা কৃত্রিম সাহিত্যের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। বাউলকে বুঝতে না পারার ব্যর্থতা সেই বুদ্ধির, যা শুধুমাত্র পুঁথিগত জ্ঞানে আটকে থাকে; তাই, বাউলকে বোঝার জন্য নিজের ভেতরের 'আউলাবাউলা' সত্তাকে জাগিয়ে তোলা জরুরি। বাউলকে জেলে পুরে বা তাকে ভুল বুঝে সমাজের কোনো লাভ নেই, কারণ মুক্তির ধারণাটি কেবল আত্মার ভেতরের ব্যাপার, বাইরের কোনো বিচার নয়।
এই ভাষাগত ঔপনিবেশিকতার ভয় দেখিয়ে বাউলকে আর কোণঠাসা করা যায় না। মাটিতেই যার বসবাস, তাকে আর ভাষার শুদ্ধি বা সামাজিক মর্যাদার ভয় দেখিয়ে মাটিতে ফেলার ভয় দেখিয়ে লাভ আছে? বাউলেরা সেই মানুষ, যারা স্বেচ্ছায় সমাজের তৈরি করা মানদণ্ডের 'মর্গ'-এ স্থান নিয়েছে, যেখানে কোনো সামাজিক অহংকার, কৃত্রিম শালীনতা বা বিচারের ভার প্রবেশ করতে পারে না। তাদের জীবনের সত্য, তাদের 'গোয়ামাথা, হোগামাথা'-র মতো সোজাসাপটা উচ্চারণ সেই ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে। বাউলরা আগেই নিজেদের সমস্ত অহংকার, পোশাক আর প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে; তাই তাদের ভয় দেখানোর ক্ষমতা কোনো 'ঘষা-মাজা' বা 'পলিশড' ভাষার নেই।
দ্য কমন রানের 'আউলা-বাউলা কাণ্ড' হলো সেই স্যাটায়ার যা ঔপনিবেশিক ভাষার সাম্রাজ্যবাদী মসনদাসীনদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—তোমাদের চন্দ্রবিন্দুর বর্গ আমাদের ভাবের মর্গের কাছে মূল্যহীন।
এতো 'আউলা-বাউলা কাণ্ড' শেষে একটি কথাই প্রমাণিত হলো: যে সমাজ কেবল ব্যাকরণের চন্দ্রবিন্দু নিয়ে ফতোয়া দিতে ব্যস্ত, সে সমাজ আসলে জীবনের মূল সত্য থেকে বহুদূরে। ভাষার ঔপনিবেশিকতা দিয়ে বাউলকে বেঁধে রাখার চেষ্টা বৃথা। বাউলরা আগেই নিজেদের 'বর্গ' ও 'মর্গ'-এর ভয় কাটিয়ে উঠেছে, কারণ তারা জানে—মাটিতেই তাদের আশ্রয়, সেখানেই তাদের সত্য। বাউল তাই এক চিরন্তন বিদ্রোহী ফকির, যার কাছে ইনসাফ ও মুক্তির গান শব্দের শুদ্ধতা বা সামাজিক মর্যাদার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। আমাদের এই আলোচনা সেই সাধনীয় আত্মাদের প্রতি উৎসর্গকৃত, যাদের হৃদয়ের মুক্তি কোনো ব্যাকরণ বা বিচারের শৃঙ্খলে ধরা দেয় না।
(সমাপ্ত)