20/08/2024
অ্যাক্টিভ লিসেনিং বা মন দিয়ে কথা শোনা কেন জরুরি
আমরা সবাই চাই, অন্যরা যেন আমাদের কথা শোনে, বোঝে এবং গ্রহণ করে। কর্মসূত্রে আমাদের অনেকের সাথে যোগাযোগ করতে হয়। যেখানে এই মনোযোগ কাজে আসে। কেননা মনোযোগ না থাকলে, আপনি হয়ত তার প্রস্তাব বা আইডিয়া ঠিকমত বুঝতে পারবেন না, এতে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
আবার, বন্ধুর বা কাছের কারো সাথে বাকবিতণ্ডার সময় আপনি যদি তার কষ্ট বা সমস্যার কথা মন দিয়ে না শোনেন, কেবলই সঠিক অবস্থানে থাকার জন্য নিজের কথা বলে যান, তাহলে সম্পর্ক আরও খারাপ হতে পারে। এরকম সময়গুলিতেই অন্যের কথা শোনার দারুণ পদ্ধতি হল "অ্যাক্টিভ লিসেনিং" বা "মন দিয়ে শোনা"।
# ইতিহাস
১৯৫৭ সালে দুই মার্কিন মনোবিজ্ঞানী কার্ল রজার্স আর রিচার্ড ফারসন এই ব্যাপারটা নিয়ে অনেক গবেষণা করেন। "Active Listening" শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে তারা প্রথম এই ধারণাটি তুলে ধরেন। তাদের মতে, অ্যাক্টিভ লিসেনিং হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে শ্রোতা (Listener) সক্রিয়ভাবে বক্তার (Speaker) কথা শোনে এবং বোঝে।
এরপর ধারণাটি ব্যবসা এবং ব্যবস্থাপনায় জনপ্রিয় হতে শুরু করে। নেতৃত্ব এবং ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে থাকে, যেখানে লিডার এবং ম্যানেজাররা তাদের টিম মেম্বারদের সাথে যোগাযোগ উন্নত করতে এবং সমস্যা সমাধান করতে এটি ব্যবহার করে।
বর্তমানে অ্যাক্টিভ লিসেনিং একটি মৌলিক যোগাযোগ দক্ষতা হিসাবে বিবেচিত হয়। এবং ব্যক্তিগত, পেশাগত এবং সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হয়।
# অ্যাক্টিভ লিসেনিং কী?
"মন দিয়ে শোনা" মানে শুধু শুনে যাওয়া না। এখানে শ্রোতাকে বক্তার কথা, অনুভূতি ও আসল বক্তব্য বুঝতে হয়। আর তারপর নিজের মতামত না চাপিয়ে বক্তার কথা আরও ভালভাবে বোঝার জন্য প্রশ্ন করা বা নিজের বোধগম্যতা জানানো হয়।
শুনতে সোজা মনে হলেও, বাস্তবে এটা একটা কঠিন দক্ষতা। যারা কথা বলতে ও শুনতে দক্ষ, তারাও অনেক সময় এটা ঠিকঠাক রাখতে পারেন না।
যেমন, আপনার সন্তান স্কুলে যাওয়ার সময় আপনাকে যদি বলে তার স্কুলে যেতে ভাল লাগে না তাহলে শুধু "আচ্ছা" "আচ্ছা" “এটা কোনো সমস্যা না” বলে মাথা নাড়লেই হবে না। বরং তার কথা মন দিয়ে শুনুন, তার অনুভূতি বুঝুন, আর প্রয়োজনে প্রশ্ন করুন, "তোমার কি স্কুলে কোনো সমস্যা হচ্ছে?”
# মন দিয়ে শোনার ৭টি দারুণ কৌশল
"আপনি আমার কথা ভুল বুঝেছেন," "আপনি ভুল সিদ্ধান্তে চলে গেছেন," "এটা আমি আশা করিনি" ধরনের বাক্যগুলি কি আপনি ব্যবহার করেন? বা রাগান্বিত হয়ে মিটিং থেকে বেরিয়ে যাওয়া বা ফোন কল কেটে দেওয়া—এসব কি শুনতে পরিচিত লাগছে?
এক গবেষণায় দেখা গেছে, সেলসম্যানরা মন দিয়ে কথা শোনার কৌশল ব্যবহার করে ১২০% বেশি সেল করতে পেরেছে!
শুধু বিক্রি নয়, যেকোনো ক্ষেত্রেই এই ৭টি কৌশল কাজে লাগিয়ে আপনি অনেক কিছু শিখতে পারবেন, অন্যের সাথে বিশ্বাস ও সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবেন, ভুল বোঝাবুঝি কমাতে পারবেন, এমনকি ক্যারিয়ারেও এগিয়ে যেতে পারবেন।
১. মনোযোগ দিয়ে উপস্থিত থাকুন
আজকাল আমরা প্রায় সবসময়ই ফোন আর সোশাল মিডিয়ায় ব্যস্ত থাকি। নোটিফিকেশন, কল আর ইমেইলের শেষ নেই। তাই, মন দিয়ে শোনার প্রয়োজনীয়তা এখন আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।
অনলাইন মিটিং চলার সময় একটু কাজ সেরে নেওয়ার অভ্যাস প্রায় সবারই আছে। কিন্তু চেষ্টা করুন যতটা সম্ভব পুরো মনোযোগ দিয়ে কথোপকথনে অংশ নিতে। মিটিংয়ে ফোন সাইলেন্ট করে রাখুন, ইমেইল চেক থেকে বিরত থাকুন, এবং চেষ্টা করুন বক্তার দিকে তাকিয়ে কথা শুনতে।
যদি মনোযোগ না দেন, অন্যরা সহজেই এটা বুঝতে পারবে। আর তারা মনে করবে আপনি কথা শুনছেন না, তাদের গুরুত্ব দিচ্ছেন না। শুধু তাই না, পুরো মনোযোগ না দিলে হয়ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিস করবেন। শুধু শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকলেই চলবে না, মনটাও সেখানে থাকতে হবে।
২. অন্যের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ লক্ষ্য করুন
দেহভঙ্গি, হাতের নড়াচড়া, চোখের যোগাযোগ, এমনকি কথা বলার সুর এবং গতি, এসব কিছুই বক্তার আসল বক্তব্য বুঝতে সাহায্য করে। কেউ যদি কথা বলার সময় চোখ এড়িয়ে যায়, তাহলে হয়ত সে লজ্জা পাচ্ছে বা সত্যিটা বলছে না। আবার, কেউ যদি হাত নাড়তে নাড়তে কথা বলে, তাহলে হয়ত সে উত্তেজিত।
এসব লক্ষ্য করুন, বক্তার কথার "আড়ালের" অর্থ বুঝতে ব্যবহার করুন। অনেক সময়, শরীরের ভাষা বা বডি ল্যাঙ্গুয়েজই বলে দেয় একজন আসলে কী বলতে চাইছে।
সাথে নিজের বডি ল্যাঙ্গুয়েজের দিকেও খেয়াল রাখুন। চোখের যোগাযোগ রাখুন, এমনভাবে উপস্থিত থাকুন যেন মনে হয় আপনি আগ্রহী এবং মনোযোগী।
৩. “Open ended” প্রশ্ন করুন
Open ended প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে বক্তাকে আরও ব্যাখ্যা করতে উৎসাহিত করুন।
"হ্যাঁ" বা "না" জবাবের জন্য ক্লোজ বা বন্ধ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবেন না, বরং খোলা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে গভীরে যান, এমন উত্তর আশা করুন, যা আপনি আগে ভাবেননি।
যেমন, "আপনার মতে, এই প্রজেক্টের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী হতে পারে?" অথবা "আপনি যদি আমাদের দলের লিডার হতেন, তাহলে কী কী চেঞ্জ আনতে চাইতেন?" এ ধরনের প্রশ্ন জিজ্ঞেস করুন।
৪. শোনার আগে ভাবুন, উত্তর দেওয়ার আগে বুঝুন
আপনি হয়ত অনেকবার এমন করেছেন—কেউ কথা বলছে, আপনি ইতোমধ্যেই মাথায় একটা প্ল্যান করে ফেলেছেন!
বস যখন আপনার কাজের প্রশংসা করছেন, আপনি হয়ত ভাবছেন এরপর বেতন বাড়ানোর কথা বলবেন। কিন্তু আসলে বস হয়ত আপনাকে অন্য একটা কঠিন কাজের দায়িত্ব দিতে চাইছেন!
তার বাক্য শেষ করার আগেই আপনি উত্তর দিতে প্রস্তুত, অথবা কথোপকথন অন্যদিকে নিয়ে যেতে চাইছেন। এটা অন্য ব্যক্তিকে বলে যে আপনি শুধু নিজের কথাই বলতে চান।
যখন কারো সাথে কথা বলবেন বা মিটিং করবেন, অপেক্ষা করুন, নিজের চিন্তাটা স্থগিত রাখুন এবং সত্যিকার অর্থে অন্য ব্যক্তির কথা শুনুন। তারা কী বলতে চাইছে, সেটা বোঝার চেষ্টা করুন। তারপর সেই অনুযায়ী উত্তর দিন।
৫. সমালোচনা বা বিচার করবেন না
উত্তর দেওয়ার আগে ভাল করে বুঝুন। কথা বলার সময় বক্তাকে বিচার করার প্রবণতাটা এড়িয়ে চলুন। অনেক সময় আমরা অজান্তেই বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা কথার মাধ্যমে এটা করে ফেলি।
সহকর্মী তার ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বললে, "আরে এ আর এমন কী, আমি তো এর চেয়েও বড় সমস্যা সামলেছি" —এমন কথা বলা অনুচিত।
যেমন, "কেন?" দিয়ে প্রশ্ন শুরু করা, বা ভুরু উঁচু করা অন্য ব্যক্তির কাছে সমালোচনা মনে হতে পারে। এতে তারা হয়ত আর সব কথা বলতে চাইবেন না, তারা মনে করতে পারেন, আপনি তাদের সমর্থন করছেন না।
৬. অন্যের অনুভূতির প্রতিফলন ঘটান
যদি বক্তা দ্রুত বা উৎসাহী স্বরে কথা বলেন, তাহলে তাদের কণ্ঠের স্বরের সাথে তাল মিলিয়ে একই উৎসাহ প্রতিফলিত করার চেষ্টা করুন। এটি দুঃখ, হতাশা, গর্ব, সন্তুষ্টি ইত্যাদি অন্যান্য আবেগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
কেউ যদি তার প্রজেক্টের সফলতার কথা উচ্ছ্বাস নিয়ে বলেন, তাহলে আপনিও তার সাথে উচ্ছ্বাস শেয়ার করতে পারেন, "বাহ, দারুণ খবর তো! অনেক অনেক শুভকামনা!"
৭. বক্তার কথা নিজের ভাষায় বলুন, অনুভূতি প্রকাশ করুন, স্পষ্ট প্রশ্ন করুন
বক্তার মূল বক্তব্য নিজের ভাষায় বলুন, যাতে বোঝা যায় তাদের কথা ঠিকঠাক বুঝেছেন। যেমন, "তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন..." অথবা "যদি আমি ঠিক বুঝে থাকি, তাহলে..."।
ক্লায়েন্ট যদি বলে, "আমি চাই ওয়েবসাইটটা আরও আকর্ষণীয় হোক", তাহলে বলতে পারেন, "আপনি চাচ্ছেন ওয়েবসাইটের ডিজাইন আরও আধুনিক ও ইউজার-ফ্রেন্ডলি হোক, তাই তো?"
তাদের অনুভূতির প্রতিফলন ঘটান, যেমন, "এটা শুনে মনে হচ্ছে আপনি এ ব্যাপারে হতাশ হয়েছেন" অথবা "আপনি এই ব্যাপারে বেশ এক্সাইটেড বলে মনে হচ্ছে।"
সবকিছু ঠিকঠাক বুঝেছেন কিনা এ ব্যাপারে নিশ্চিত না হলে প্রশ্ন করুন। যেমন, "আপনি কি একটু ব্যাখ্যা করতে পারবেন...?" বা "আপনি কি এর দ্বারা বোঝাতে চেয়েছেন...?"
বন্ধু বা কাছের কেউ যদি যদি বলে, "আজকে মনটা ভাল নেই", আপনি জিজ্ঞাসা করতে পারেন, "কোনো বিশেষ কারণ আছে, নাকি শুধু মুড অফ?"
অন্যদের সাথে মিটিংয়ের সময়, কোনো কথা ভুল বুঝে থাকলে পরিষ্কার করে জিজ্ঞেস করুন। পরে, একটা ইমেইল পাঠিয়ে মূল আলোচনার বিষয়গুলি আর সিদ্ধান্তগুলি লিখে দিন। এতে করে কেউ ভুল কিছু বুঝবে না, আর সম্পর্কও ভাল থাকবে।
আমরা চাই, সবার সাথে ভাল সম্পর্ক থাকুক, ক্যারিয়ারে সফল হই, ব্যবসায় ভাল পার্টনারশিপ করি এবং সুন্দর পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবন যাপন করি। মন দিয়ে শোনা এই সব উদ্দেশ্যকেই বাস্তব রূপ দিতে সাহায্য করতে পারে। তাই আজ থেকেই নিজেকে চ্যালেঞ্জ করুন, কথোপকথন বা মিটিংয়ে এই কৌশলগুলির একটা হলেও ব্যবহার করবেন।