02/08/2026
আমির-এ মুয়াবিয়া রা ইরশাদ করেন,
وَاللَّهِ إِنِّي لَأَعْلَمُ أَنَّهُ خَيْرٌ مِنِّي وَأَفْضَلُ، وَأَحَقُّ بِالْأَمْرِ مِنِّي.
❝আল্লাহর শপথ! নিশ্চয়ই আমি জানি তিনি (মাওলা আলী রা) আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম এবং খিলাফতের অধিক হকদার।❞ (ক)
তাহলে সিফফিনের যুদ্ধের কারণ কী? এ-ব্যাপারে মুজাদ্দিদ-এ আলফে সানি ইমাম আহমেদ সেরহিন্দি রহ বর্ণনা করেন, ❝এই মতবিরোধ খেলাফতের পদের জন্য নয় বরং মাওলা আলীর খেলাফতের প্রাথমিক সময়ে হযরত উসমান রা'র কিসাসের দাবির বিবাদ।❞ (খ)
এমনকি স্বয়ং আমির-এ মুয়াবিয়া রা বলেন,
مَا قَاتَلْتُ عَلِيًّا إِلَّا فِي أَمْرِ عُثْمَانَ
❝হযরত আলি রা'র সাথে এ লড়াই কেবল উসমান রা'র রক্তপণ আদায়ের জন্যই হয়েছে।❞ (গ)
এ-বিষয়ে উম্মতের ইজমা প্রতিষ্ঠিত। উলামা-এ আহলে সুন্নাত এখানে ঐক্যমত। কিন্তু এত বড়ো লড়াই হলো, যুদ্ধ হলো, দুই পক্ষের মানুষ শহিদ হলো। দুই পক্ষেই অসংখ্য সাহাবি ও তাবেয়ি শহিদ হয়েছেন। তাদের ফায়সালা কী?
সিদ্ধান্ত স্বয়ং মাওলা-এ কায়েনাত দিচ্ছেন। মাওলা আলী মর্তুজা রা ঘোষণা দেন,
وَعَنْ يَزِيدَ بْنِ الْأَصَمِّ قَالَ: قَالَ عَلِيٌّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ : قَتْلَايَ وَقَتْلَى مُعَاوِيَةَ فِي الْجَنَّةِ
❝হযরত আলি রা ইরশাদ করেন, আমার ও মুয়াবিয়ার উভয়পক্ষের নিহত ব্যক্তিগণ জান্নাতি।❞ (ঘ) রাদ্বিআল্লাহু তাআলা আনহুম।
এ-হাদিসের সনদ নিয়ে ইমাম হাইসামি রহ বলেন, ❝এই হাদিসের রাবিগণ সিকাহ বা নির্ভরযোগ্য।❞ (ঙ)
আর এই ব্যাপারে নবিজি ﷺ এর ভবিষ্যতবাণী রয়েছে। নবিজি ﷺ ইরশাদ করেন,
لا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَقْتَتِلَ فِئَتَانِ عَظِيمَتَانِ، يَكُونُ بَيْنَهُمَا مَقْتَلَةٌ عَظِيمَةٌ دَعْوَتُهُمَا وَاحِدَةٌ
❝কিয়ামত ততক্ষণ সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ দু’টি মহান দল পরস্পরে যুদ্ধে লিপ্ত না-হবে। তাদের মাঝে ভয়ানক রক্তারক্তি হবে অথচ উভয় দলের দাবি হবে এক।❞ (চ)
উলামাগণ বলেন, বর্ণিত হাদিসে দুই মহান দল দ্বারা উদ্দেশ্য হলো হযরত আলি রা ও হযরত আমির-এ মুয়াবিয়া রা এর দল। (ছ)
সিফফিনের যুদ্ধ কেবল ভুল বুঝাবুঝির কারণে ও পরিস্থিতির প্রভাবে সংঘটিত হয়। তাই যুদ্ধে অংশ নেওয়া সাহাবা-এ রসুলের প্রতি কোনো প্রকার মন্দ ধারণা রাখা যাবে না। এটাই উম্মতের জন্য কল্যাণ এবং উলামা-এ আহলে সুন্নাতের সিদ্ধান্ত। কিন্তু একটি হাদিস— যা মুসলমানদের সংশয়ে ফেলে দেয়— হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রা এর শাহাদাতের ভবিষ্যতবাণীর হাদিসটি। নবিজি ﷺ ইরশাদ করেন,
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ لِعَمَّارٍ: تَقْتُلُكَ الْفِئَةُ الْبَاغِيَةُ
❝হযরত উম্মু সালামা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নিশ্চয় রসুলুল্লাহ (ﷺ) হযরত আম্মার (রা)-কে উদ্দেশ্য করে বলেন, তোমাকে একটি বাগি দল শহিদ করবে।❞ (জ)
'বাগি' শব্দতে এসেই অনেক মুসলমান ভাই থমকে যান। কারণ এই শব্দটিকে বিরুদ্ধবাদীরা বাজেভাবে উপস্থাপন করেছে। তাদের অপব্যাখ্যায় বাকিরা অজ্ঞতার দরুন সংশয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ সহিহ মুসলিমের বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থে যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম নবভি রহ বলেন,
قَالَ الْعُلَمَاءُ هَذَا الْحَدِيثُ حُجَّةٌ ظَاهِرَةً فِي أَنَّ عَلِيًّا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ كَانَ مُحِقًا مُّصِيبًا وَالطَّائِفَةُ الْأُخْرَى بُغَاةٌ لَكِنَّهُمْ مُجْتَهِدُوْنَ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِمْ
❝উলামায়ে কিরামগণ বলেন, এই হাদিসটি সুস্পষ্ট দলিল যে, নিঃসন্দেহে হযরত আলি রা হলেন হক ও সঠিক এবং অপর দলটি ছিল বাগি। কিন্তু তাঁরা সকলই ছিলেন মুজতাহিদ। ফলে তাঁদের কোন গুনাহ হয়নি।❞ (ঝ)
সুতরাং স্পষ্ট যে হাদিসে 'বাগি' কোনো নিন্দনীয় শব্দ নয়। বরং ইজতিহাদ অন্বেষণকারী হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। নিন্দনীয় হলে নিশ্চয়ই গুনাহ থেকে মুক্ত হতেন না।
হ্যাঁ এখানে বিরুদ্ধবাদীরা আরেকটা প্রশ্ন তুলবেন। ভিন্ন মতনে আম্মার রা এর হাদিসে আরো কিছু শব্দ দেখা যায়— يَدْعُوهُمْ إِلَى الجَنَّةِ، وَيَدْعُونَهُ إِلَى النَّارِ অর্থাৎ হযরত আম্মার তাদের জান্নাতের দিকে আহবান করবে আর তারা জাহান্নামের দিকে আহবান করবে।
এই অতিরিক্ত অংশটুকু মুসলিম শরিফের বর্ণনায় নেই কিন্তু বুখারি শরিফের একটি বর্ণনায় তা পাওয়া যায়। এ-ব্যাপারে আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি রহ ও আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি রহ এর সিদ্ধান্ত হলো— অতিরিক্ত অংশটি হাদিসের রাবি বর্ণনা করেননি বরং তা পরবর্তীতে সংযোজন করা হয়েছে। কেননা এই যুদ্ধে কেউ কাউকে জাহান্নামের দিকে আহবান করা সম্ভবই হবে না। কারণ উভয় পক্ষেই সাহাবি-এ রসুল ছিলেন। সুতরাং এই অতিরিক্ত অংশটি পরবর্তীতে যুক্ত করা হয়েছে।
পরিশেষে এটাই উলামা-এ হকের সিদ্ধান্ত হলো— সিফফিনের যুদ্ধে মাওলা আলি মর্তুজা হকের পথে ছিলেন। তবে শহিদ হওয়া উভয় পক্ষই জান্নাতি। কারোর প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করা হারাম হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সত্যের পথে অটুট রাখুন।
তথ্যসূত্র:
ক. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮/১৩৮ পৃ, ই.ফা.বা. পৃ: ২৪৮
খ. মাকতুবাত-এ ইমাম রব্বানি, মাকতুব নং ২৫১
গ. মুসান্নাফ-এ লি ইবনে আবি শায়বা, খণ্ড ৬, পৃ. ১৮৭, কিতাবুল ইমারা, হাদিস নং ৩০৫৫২
ঘ. ইমাম তাবরানি, আল-মুজামুল কাবির, পৃ. ১৯/৩০৭, হাদিস নং ৬৮৮
ঙ. ইমাম হাইসামি, মাজমাউয যাওয়ায়েদ, খণ্ড ৯, পৃ. ৩৫৭, বাবু মা জাআ মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান, হাদিস নং ১৫৯২৭
চ. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৭১২১; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৫৭
ছ. ইমাম নবভি, শরহে সহিহ মুসলিম, খণ্ড ১৮, পৃ. ১৩
জ. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৯১৬
ঝ. ইমাম নবভি, শরহে সহিহ মুসলিম, খণ্ড ১৮, পৃ. ৪০