23/11/2025
মুফতি হাজী শরীয়তুল্লাহ (রাহিঃ) এর মক্কার শিক্ষাজীবন ও সালাফি প্রভাব —
প্রেক্ষাপটঃ মুফতি হাজী শরীয়তুল্লাহ (রাহিঃ) (জন্মঃ আনুমানিক ১৭৮১ খ্রী. শরীয়তপুর) তরুণ বয়সে কলকাতায় কিছুদিন কাজ করে উপার্জিত অর্থে ১৮০৭ খ্রীষ্টাব্দে হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কায় পাড়ি জমান। তিনি সেখানে প্রায় ১৮ বছর অবস্থান করেন (১৮০৭–১৮২৫ খ্রী.) — এই সময়কাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওই সময় আরব উপদ্বীপে শুরু হয় তাওহীদের পুনর্জাগরণ আন্দোলন, যার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মুজাদ্দিদ শায়েখ মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব (রাহিঃ) এর উত্তরসূরিগণ।
হিজাযে (আরব উপদ্বীপ) ইসলামি শিক্ষা অর্জন —
১৮শ শতকের শেষ থেকে ১৯শ শতকের শুরু পর্যন্ত হিজাযে ইসলামি সংস্কার আন্দোলনের প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। মুজাদ্দিদ শায়েখ মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব (রাহিঃ) (মৃত্যু ১৭৯২ খ্রী.) এর তাওহীদ আন্দোলন তখন পবিত্র মক্কা ও মদিনার শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে।
“মক্কায় অবস্থানকালে হাজী শরীয়তুল্লাহ তৎকালীন ‘ওহাবি’ চিন্তাধারার (অর্থাৎ তাওহীদভিত্তিক সংস্কার আন্দোলনের) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেন, যা তখন হিজায অঞ্চলে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছিল”।
(Dr. J.N. Sarkar, History of Bengal, Vol. II, p. 238).
“তিনি মক্কায় অবস্থানকালে ওহাবি আলেমদের (তাওহীদমুখী সংস্কারকদের) সংস্কার-উদ্দীপনা আত্মস্থ করেন এবং বঙ্গে ফিরে আসেন এই সংকল্প নিয়ে যে, ইসলামে সংযোজিত বিকৃতি ও বিদআতসমূহকে দূর করে একে পরিশুদ্ধ করবেন”।
[Abul Kasem, The Faraizi Movement in Bengal (1979), p. 14].
“নজদী সংস্কারকদের [অর্থাৎ শায়েখ মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব (রাহিঃ) এর অনুসারীদের] প্রভাব হাজী শরীয়তুল্লাহর চিন্তাধারায় যে বিদ্যমান ছিল — তা অস্বীকার করা যায় না”।
[Dr. Abdul Karim, Social History of the Muslims in Bengal (1973), p. 123].
“তাঁর সংস্কারধারা ছিল আরবের সংস্কারকদের মতো — তিনি তাওহীদের ওপর জোর দেন, ওলিপূজা ও বিদআত পরিত্যাগে আহ্বান জানান, এবং কোরআন ও সুন্নাহয় ফিরে যাওয়ার ডাক দেন”।
[Syed Mahmudul Hasan, Islamic Reformers in Bengal (1988)].
তাওহীদ ভিত্তিক সংস্কার আন্দোলনে প্রত্যাবর্তন —
মক্কা থেকে ফিরে এসে (১৮২৫ খ্রী.) তিনি সরাসরি ঘোষণা দেন যেঃ “ফরজ পালন করো, বিদআত বর্জন করো”। এ থেকেই “ফারায়েজি আন্দোলন” (Faraizi Movement) নামটি আসে — কারণ তাঁর দাওয়াহর মূল বিষয় ছিল ফরজ (আল্লাহর নির্ধারিত বিধান) প্রতিষ্ঠা ও শিরক/বিদআতের পরিত্যাগ। তিনি মসজিদে, হাটে, গ্রামের মজলিসে মানুষকে আহ্বান দিতেনঃ “আল্লাহর এবাদত করো, কবরে নয়; দোয়া করো আল্লাহর কাছে, পীরের কাছে নয়”।
তাঁর কথায় সালাফি প্রভাব —
তাঁর রচিত ও প্রচারিত বক্তব্যে যে বিষয়গুলো লক্ষ্য করা যায়ঃ আল্লাহর একত্বের ব্যাখ্যা তিন ভাগে (রুবুবিয়্যা, উলুহিয়্যা, আসমা ওয়াস সিফাত) — ঠিক যেমন শায়খুল ইসলাম তাকীউদ্দিন ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) ও মুজাদ্দিদ শায়েখ মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব (রাহিঃ) ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, “আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা, কবরে সেজদা দেওয়া, বা ওলিদের নামে মান্নত করা — এগুলো ইসলামবিরোধী” (সূত্রঃ “ফরায়েজ-ই-শরীয়ত”, “তাওহীদ আন্দোলনের ইতিহাস”, মওলানা আব্দুল হাই)। “বিদআত” শব্দটি তিনি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন, যা সেই সময়ের সুফি আলেমরা খুব একটা করতেন না। সমাজ সংস্কারের মূল মাধ্যম হিসেবে “ফরজ” ও “তাওহীদ” কে একত্রিত করেছেন, যা সালাফি দাওয়াহর বৈশিষ্ট্য।
মুফতি হাজী শরীয়তুল্লাহ (রাহিঃ) মক্কায় অবস্থানকালে তাওহীদ আন্দোলনের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হোন এবং তিনি বঙ্গে ফিরে এসে শিরক ও বিদআতবিরোধী, কিতাব-সুন্নাহনিষ্ঠ দাওয়াহ চালু করেন — যা মূলত “সালাফি তাওহীদ আন্দোলনেরই স্থানীয় রূপ”।