14/10/2025
আজকের বিষয় কেন মানুষ লক্ষ্মীপূজায় ঘরের দরজার উপরে শলাকার কদম ফুল টাঙ্গায়।
গত ৬/৭ অক্টোবর ছিল শ্রীশ্রী লক্ষ্মীপূজা। লক্ষ্মীপূজার আগের দিন পূজার জন্য ফুল কিনতে গিয়ে দেখলাম কিছু দোকানে শলাকার কদম ফুল বিক্রি করছে। দেখে মনের ভিতরে প্রশ্ন জাগলো এই ফুল কি কাজে ব্যবহৃত হয়। সেই প্রশ্নই আমাকে এর সঠিক ব্যাখ্যা খুজতে আপ্লুত করল। তাই বিভিন্ন জনের জেনে এবং নিজেও বিভিন্ন গ্রন্থ পড়ে তথ্য খুজে বের করলাম কিছু তথ্য। সেই তথ্য নিয়েই আজকে আপনাদের কাছে তুলে ধরছি কেন মানুষ ঘরের দরজায় শলাকার কদম ফুল ঝুলিয়ে রাখে। আশা করি এই লেখাটি পড়ে আপনাদেরও ভাল লাগবে। তাহলে শুরু করি।
লক্ষ্মী পূজায় ঘরের দরজায় শলাকার কদম ফুল টাঙানো একটি প্রাচীন আচার, যার শাস্ত্রীয় ভিত্তি ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য দুই-ই গভীর।
১. শলাকার কদম ফুলের প্রতীক ও গুণ
কদম ফুল (Neolamarckia cadamba) শাস্ত্রে “বৃজরাজ-প্রিয়”অর্থাৎ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অত্যন্ত প্রিয় ফুল হিসেবে বর্ণিত। স্কন্দপুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণব গ্রন্থে কদম বৃক্ষকে বলা হয়েছে: "কদম্ববৃক্ষঃ শ্রীকৃষ্ণলীলাভূমিঃ।" অর্থাৎ কদম বৃক্ষ সেই স্থান ও মাধ্যম, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ লীলা প্রকাশ করেন। অতএব কদম ফুল টাঙানো মানে শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীলক্ষ্মীর একত্র আহ্বান। লক্ষ্মী হলেন বিষ্ণুর শক্তি — আর কদম ফুল কৃষ্ণভক্তির প্রতীক। এই দুটি শক্তির মিলনই গৃহে শ্রী, ঐশ্বর্য ও শান্তির সূচনা।
২. “শলা” বা শলাকার তাৎপর্য
“শলা” শব্দটি সংস্কৃতে অর্থ— দণ্ড, অস্থি, বা সাপোর্ট। যখন ফুলটি শলায় গেঁথে দরজায় টাঙানো হয়, তখন তার দণ্ডাকার রূপ ধর্মদণ্ড বা স্থিতির প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। এটি নির্দেশ করে— “আমার গৃহ যেন ধর্ম, শ্রী, ও কৃষ্ণভক্তির উপর স্থিত হয়।” অর্থাৎ, শলাকার কদম ফুল টাঙানো মানে —শ্রীলক্ষ্মীর আগমনের দ্বারকে ধর্মের দণ্ডে প্রতিষ্ঠিত করা।
৩. দরজায় টাঙানোর উদ্দেশ্য (মার্গদ্বার শুদ্ধি)
শাস্ত্র মতে, “যত্র লক্ষ্মীঃ প্রবিশেত্, তত্র শুদ্ধদ্বারকর্ম ভবেত্।”(বৃহন্নারদীয় পুরাণ) লক্ষ্মীদেবী সেই গৃহে প্রবেশ করেন, যেখানে দ্বার বা প্রবেশপথ শুদ্ধ, পবিত্র ও সুগন্ধিত ফুলে সজ্জিত। অতএব, দরজায় কদম ফুল (যা শ্রীকৃষ্ণপ্রিয় ও শুদ্ধ সুবাসযুক্ত) টাঙিয়ে বলা হয়— “হে লক্ষ্মী, হে বিষ্ণুপত্নী! এই গৃহে শ্রী ও শান্তি সহ আগমন কর।”
৪. গৌড়ীয় বৈষ্ণব দৃষ্টিতে
গৌড়ীয় বৈষ্ণবধারায় লক্ষ্মীকে কৃষ্ণভক্তি-সংগত রূপে দেখা হয়। কদম ফুল হল কৃষ্ণের প্রেমলীলার চিহ্ন, আর লক্ষ্মী সেই প্রেমভক্তির করুণারূপা। তাই কদম ফুলের শলাকা টাঙানো মানে—“ভক্তির দ্বার খুলে লক্ষ্মীপ্রবেশের আহ্বান।”এটি একপ্রকার ভক্তিসূচক সংযোগ (yogic symbol)—যেখানে গৃহের প্রবেশদ্বার ভক্তি, শ্রী ও শান্তির কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
৫. লোকাচার ও শাস্ত্র মিলন
বাঙালি লোকাচারে দেখা যায়: লক্ষ্মীপূজার আগের দিন গৃহ পরিষ্কার করে, দরজার দুপাশে কদম, শেফালি বা তুলসীপাতা ফুল টাঙানো হয়। এটি শাস্ত্রীয়ভাবে অনুমোদিত— যেমন গৃহপ্রবেশ, লক্ষ্মীপূজা, ও অন্নপূর্ণা পূজায় “দ্বারসজ্জা” (দ্বারশোভন) শাস্ত্রবিধান। “দ্বারমলঙ্কারঃ পবিত্রার্থং।” (গৃহ্যসূত্র)
সারসংক্ষেপ
দিক তাৎপর্য
কদম ফুল শ্রীকৃষ্ণপ্রিয়, ভক্তি ও আনন্দের প্রতীক
শলা (দণ্ড) ধর্ম ও স্থিতির প্রতীক
দরজায় টাঙানো শ্রীলক্ষ্মীর পবিত্র প্রবেশের আহ্বান
গৌড়ীয় ভাবার্থ কৃষ্ণভক্তি ও লক্ষ্মীশক্তির মিলন
লক্ষ্মীপূজার সময় ঘরের দরজায় শলাকার কদম ফুল টাঙানো মানে —
গৃহদ্বারকে শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীলক্ষ্মীর শক্তিতে পবিত্র করা, ধর্ম ও ভক্তির দণ্ডে স্থাপন করা, এবং শ্রী, শান্তি, সমৃদ্ধির স্থায়ী আগমন নিশ্চিত করা।
দরজায় শলাকার কদম ফুল টাঙানোর শাস্ত্রীয় পদ্ধতি
পূজার দিন বা পূজার আগের সন্ধ্যায়—গৃহের মূল প্রবেশদ্বার পরিষ্কার করুন। দরজার দু’পাশে গঙ্গাজল বা পবিত্র জল ছিটিয়ে শুদ্ধি করুন। এরপর দুটি কদম ফুল (যদি না পাওয়া যায় তবে শেফালি বা পদ্মপাতা যুক্ত ফুল বিকল্প হতে পারে) শলায় (ছোট বাঁশ বা কাঠের দণ্ডে) গেঁথে নিন।
সংকল্প
ওঁ বিষ্ণুপ্রিয়া লক্ষ্মীদেবী প্রসন্না ভব। মম গৃহদ্বারে শ্রীপ্রবেশার্থং কদম্বপুষ্পশলিকা স্থাপয়ামি।
অনুবাদ: হে বিষ্ণুপ্রিয়া লক্ষ্মীদেবী! তুমি যেন এই গৃহে প্রবেশ করো, এই কদম ফুলের শলিকা দ্বারা আমি তোমার আগমনের পথ পবিত্র করছি।
গৃহ্যসূত্র অনুসারে “দ্বারমলঙ্কার” কালে বলা হয় বিনিয়োগ মন্ত্র।
ওঁ প্রজাপতিঃ বিষ্ণুরিষিঃ। অনুষ্টুপ্ ছন্দঃ। লক্ষ্মীঃ দেবতা। গৃহদ্বারশোভনকর্মণি বিনিয়োগঃ।
মূল মন্ত্র (ফুল টাঙানোর সময় উচ্চারণযোগ্য)
ওঁ শুভং করোতি লক্ষ্মীঃ শ্রীমদ্বিষ্ণুপত্নী।গৃহে মম প্রবিশ প্রিয়ে। কদম্বপুষ্পগন্ধেন দ্বারং শোভাবিনির্মিতম্। অত্র তিষ্ঠ, মাং পা, মম গৃহে শ্রীর্ভব॥
অর্থ: হে শ্রীলক্ষ্মী, শ্রীবিষ্ণুপত্নী! তুমি আমার গৃহে প্রবেশ করো, কদম ফুলের গন্ধে এই দ্বার শোভিত হলো তুমি এখানে অবস্থান করো, আমায় রক্ষা করো, আমার গৃহে শ্রী ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত করো।
অভিমন্ত্রিত স্পর্শ (ডান ও বাম দিকের জন্য)
ডান দিক (পুরুষ দিক): ওঁ শ্রীবিষ্ণোর্নমঃ, দক্ষিণদ্বারে ধর্মস্থাপনম্।
বাম দিক (স্ত্রী দিক): ওঁ শ্রীলক্ষ্ম্যৈ নমঃ, বামদ্বারে শ্রীয়ঃ স্থাপনম্।
এভাবে দুই দিকেই কদম ফুলের শলিকা টাঙানো হয়।
আভ্যন্তর মন্ত্র (দরজার ভেতরে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ)
ওঁ লক্ষ্মীর্গৃহে গৃহিণী মম, গৃহদ্বারে শ্রীঃ প্রতিষ্ঠিতা। গৃহ্যতাং মম পূজা, কদম্বপুষ্পেন সংযুতা॥ অর্থ: হে দেবী লক্ষ্মী, তুমি এই গৃহের গৃহিণী হও, এই দ্বারে তোমার শ্রী প্রতিষ্ঠিত হোক, আমার পূজা তুমি গ্রহণ করো — এই কদমফুলের সঙ্গে।
শেষে প্রণাম ও প্রার্থনা
ওঁ শ্রীং লক্ষ্ম্যৈ নমঃ। ওঁ নমো নারায়ণায়। ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ॥ এরপর দরজায় ধূপ-দীপ প্রদীপিত করে একবার প্রণাম করুন।
গৌড়ীয় ভাবার্থ
কদম ফুল: শ্রীকৃষ্ণলীলার প্রতীক।
লক্ষ্মী: কৃষ্ণের অভিন্নশক্তি — ভক্তি ও ঐশ্বর্যের মিশ্ররূপা।
দরজা: গৃহ ও হৃদয়ের দ্বার, যেখানে ভক্তি ও শ্রী প্রবেশ করে।
তাই এই আচার অর্থাৎ “দ্বারসজ্জা কদম্বপুষ্পেন” হচ্ছে ভক্তি-শ্রী-ধর্মের সংযোগ স্থাপন।
অতএব “যে গৃহে কদম ফুলের সুবাসে লক্ষ্মী আহ্বান করা হয়, সে গৃহে ভক্তি, শান্তি ও ঐশ্বর্য চিরস্থায়ী হয়।”
হরেকৃষ্ণ।