31/08/2026
একটি দেশকে ধ্বংস করতে অনেক মানুষ লাগে না।
প্রতিবেদক : আলমগীর আলম।
দুর্নীতি, অর্থপাচার, প্রতারণা ও অব্যবস্থাপনার শিকার সাধারণ মানুষ
একটি দেশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার জন্য সব মানুষকে খারাপ হতে হয় না। কখনো কখনো অল্পসংখ্যক ক্ষমতাবান, অসাধু ও স্বার্থান্বেষী মানুষের দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ড একটি দেশের অর্থনীতি, প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের জীবনকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
জাল নোট তার একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একজন বা একটি চক্র যখন জাল টাকা তৈরি ও বাজারে ছড়িয়ে দেয়, তখন শুধু একজন মানুষ প্রতারিত হন না—ব্যাংক, ব্যবসায়ী, গ্রাহক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে এর মোকাবিলায় অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকও জাল নোট প্রতিরোধে নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য যাচাই, বড় লেনদেনে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার এবং সন্দেহজনক নোট সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর পরামর্শ দিয়েছে।
কিন্তু একটি দেশের প্রকৃত ক্ষতি শুধু জাল নোটে সীমাবদ্ধ নয়। আরও ভয়াবহ হচ্ছে দুর্নীতি, ব্যাংকের অর্থ লুট, ঋণখেলাপি, অর্থপাচার, প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়, কর ফাঁকি, ঘুষ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার।
১. দুর্নীতি সাধারণ মানুষের টাকা কমিয়ে দেয়
সরকারের অর্থ মূলত জনগণের কর ও অন্যান্য রাজস্ব থেকে আসে। সেই অর্থ যদি রাস্তা, হাসপাতাল, শিক্ষা, পানি, বিদ্যুৎ কিংবা কর্মসংস্থানে যথাযথভাবে ব্যয় না হয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে অপচয় বা আত্মসাৎ হয়, তাহলে ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হয়।
একটি প্রকল্পের প্রকৃত খরচ যদি ১০০ টাকা হয় কিন্তু দুর্নীতি ও অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে ২০০ টাকা লাগে, তাহলে অতিরিক্ত ১০০ টাকা কোথা থেকে আসে? শেষ পর্যন্ত জনগণের কর, ঋণ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ থেকেই আসে।
২. ব্যাংকের অর্থ লুট হলে ক্ষতি শুধু ব্যাংকের নয়
ব্যাংকে জনগণের আমানতের অর্থ থাকে। দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়া বা সংশ্লিষ্ট পক্ষকে অতিরিক্ত ঋণ দেওয়ার ফলে ব্যাংক দুর্বল হলে সাধারণ আমানতকারীও ঝুঁকিতে পড়েন।
IMF-এর ২০২৬ সালের বাংলাদেশ বিষয়ক প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতে দুর্বল মালিকানা কাঠামো, অতিরিক্ত related-party lending এবং দুর্বল তদারকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে জুন ২০২৫ শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩৪ শতাংশে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ ব্যাংকের দুর্নীতি বা অনিয়ম শুধু ব্যাংকার ও ঋণগ্রহীতার বিষয় নয়—এর প্রভাব পড়ে কোটি কোটি সাধারণ মানুষের ওপর।
৩. অর্থপাচার দেশের ভবিষ্যৎকে দুর্বল করে
একজন ব্যক্তি অবৈধভাবে অর্জিত টাকা বিদেশে নিয়ে গেলে তার প্রভাব শুধু একটি পরিবারের সম্পদে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেই অর্থ দেশের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন থেকে বেরিয়ে যায়।
২০২৫ সালের একটি BIBM গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের প্রায় ৭৫ শতাংশ trade-based money laundering-এর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে গবেষণায় উঠে এসেছে; মিথ্যা আমদানি-রপ্তানি ঘোষণা ছিল এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪-২৫ বার্ষিক প্রতিবেদনেও অবৈধ সম্পদ পুনরুদ্ধার ও বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
৪. কর ফাঁকি দিলে সৎ মানুষ বেশি চাপ বহন করে
এক শ্রেণির মানুষ যদি কর ফাঁকি দেয়, রাষ্ট্রের রাজস্ব কমে যায়। তখন সরকারকে হয় উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হয়, নয়তো অন্যদের ওপর করের চাপ বাড়াতে হয়।
ফলে যে ব্যক্তি নিয়মিত কর দেন, তিনিও পরোক্ষভাবে অসাধু করদাতার বোঝা বহন করেন।
৫. ঘুষ একটি অদৃশ্য কর
একজন সাধারণ নাগরিক যখন সরকারি সেবা পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য হন, তখন তার প্রকৃত আয় কমে যায়।
একজন শ্রমিক বা নিম্নআয়ের মানুষ যদি মাসে কয়েকবার বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা খরচ করেন, তাহলে তার পরিবারের খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের জন্য হাতে থাকা অর্থ কমে যায়।
এভাবে দুর্নীতি দরিদ্র মানুষের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি চাপ সৃষ্টি করে।
৬. মিথ্যা তথ্য ও প্রতারণাও অর্থনীতির ক্ষতি করে
জাল নোটের মতোই বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করে। মানুষ যখন অন্য মানুষ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারায়, তখন লেনদেনের খরচ বাড়ে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হয়।
এ কারণেই একটি দেশের জন্য বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান ও আইনের শাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৭. অপরাধের চক্র বড় হলে রাষ্ট্রের খরচও বাড়ে
অবৈধ অর্থের প্রবাহ শনাক্ত করতে ব্যাংককে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নিতে হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তদন্ত করতে হয়, আদালতে মামলা চলে এবং সম্পদ উদ্ধারে দীর্ঘ প্রক্রিয়া প্রয়োজন হয়।
বাংলাদেশে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে BFIU ৩০,১৯৯টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের রিপোর্ট পেয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭৪ শতাংশ বেশি। এর একটি কারণ হিসেবে উন্নত নজরদারি ও enforcement-ও উল্লেখ করা হয়েছে—তাই এই সংখ্যাকে সরাসরি “অপরাধ ৭৪ শতাংশ বেড়েছে” বলা ঠিক হবে না।
৮. সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত কে?
সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ।
কারণ—
- দুর্নীতির টাকা জনগণের সম্পদ থেকে আসে;
- অর্থপাচার দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমায়;
- ব্যাংকের অনিয়ম আমানতকারী ও অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলে;
- কর ফাঁকি রাষ্ট্রের রাজস্ব কমায়;
- ঘুষ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায়;
- প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয় রাষ্ট্রের ঋণ ও ভবিষ্যৎ দায় বাড়ায়;
- দুর্বল প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ নষ্ট করে।
IMF-ও বলেছে, বাংলাদেশের গত দুই দশকের অর্থনৈতিক অগ্রগতি দারিদ্র্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও দুর্বল governance ও প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা প্রবৃদ্ধির সুফল অসমভাবে বণ্টিত করেছে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে গুরুতরভাবে দুর্বল করেছে।
তাহলে সমাধান কী?
দেশকে এগিয়ে নিতে শুধু নতুন আইন করলেই হবে না। আইন বাস্তবায়ন করতে হবে।
১. দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্বাধীন ও কার্যকর তদন্ত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
২. বড় সরকারি প্রকল্পের ব্যয় ও অগ্রগতি জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে।
৩. ব্যাংকের ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব বন্ধ করতে হবে।
৪. বড় ঋণখেলাপিদের বিষয়ে দ্রুত ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. অর্থপাচার শনাক্ত ও বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
৬. কর ফাঁকি বন্ধ করে করব্যবস্থাকে সহজ ও ন্যায়সঙ্গত করতে হবে।
৭. সরকারি সেবায় ঘুষ কমাতে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা বাড়াতে হবে।
৮. জাল নোট ও আর্থিক প্রতারণা প্রতিরোধে জনগণকে নিয়মিত সচেতন করতে হবে।
৯. সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের হিসাব যাচাই ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রকাশের ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।
১০. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—অপরাধী যে-ই হোক, তার পরিচয় বা ক্ষমতা না দেখে আইনের আওতায় আনতে হবে।
উপসংহার
একটি দেশকে ধ্বংস করার জন্য লাখ লাখ মানুষকে অপরাধী হতে হয় না। কয়েকজনের দুর্নীতি, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিনের নীরবতা মিলেই একটি দেশের অর্থনীতি ও মানুষের ভবিষ্যৎকে দুর্বল করে দিতে পারে।
তবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার—এ কথা বলা ঠিক হবে না। বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে দারিদ্র্য কমানো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনমানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। এখন প্রয়োজন সেই অগ্রগতিকে সুরক্ষিত করার জন্য সুশাসন, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা।
দেশের সম্পদ কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এটি জনগণের সম্পদ। তাই জনগণের সম্পদের অপচয়, লুট, পাচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে।
কারণ একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সোনা-ডলার নয়—তার মানুষ, তাদের শ্রম, তাদের আস্থা এবং তাদের ভবিষ্যৎ।