24/09/2026
উলুবনে_মুক্তো
পর্ব_৪+৫
সূচনা_জাফরিন
"সালমান খান ভক্ত !" মহীউদ্দীন খান সওদাগর চোখেমুখে চরম বিস্ময় আর বিরক্তি ফুটিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, "তুই কি পাগল হয়েছিস এজলাস?কোথাকার এক নায়ক বিয়ে করেনি বলে তোকেও চিরকুমার হয়ে ঘুরতে হবে? ওর মতো ব্যাংকে হাজার কোটি টাকা আছে তোর?"
এজলাস দেয়ালের চিত্রে চোখ রেখে নির্ভাবনায় কলার ঝাঁকাল। "টাকা দিয়ে কী করব আব্বাজান? স্বাধীনতায় কোনো আপস নেই। ভাইয়া তো আছে, তাকেই বিয়ে করিয়ে দিন।"
বৈঠকখানার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা সারহান এবার কাশির ভান করে নিজের উপস্থিতি জানান দিল। ঘরে ঢুকেই এজলাসের কাঁধে হাত রেখে গম্ভীর গলায় বলল, "আমার ঘাড়ে দায় না চাপিয়ে সোজা বল এজলাস,তুই কেন ভয় পাচ্ছিস? তুই না বলতি, তুই কাউকে পরোয়া করিস না? তাহলে একটা সাধারণ মেয়েকে নিজের অধীনে রাখতে তোর এতো ভয় কিসের?"
এজলাসের ধূসর চোখ দুটো মুহূর্তে বদলে গেল। সারহানের দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলল, "তুমি আমাকে উস্কানি দিচ্ছ সারহান ভাই? আমি কাকে ভয় পাব? ওই আমির হামজার মেয়েকে? যে একটা বন্ধ ঘরে আমার সামনে থরথর করে কাঁপছিল?"
কথাটা শুনেই মহীউদ্দীন সওদাগরের ঠোঁটের কোণে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। চতুর ব্যবসায়ী যেমন শিকারের দুর্বল জায়গায় আঘাত হানেন, তিনি ঠিক সেটাই করলেন। ধীর গলায় বললেন, "তাহলে বিয়েতে সমস্যা কোথায়? যে পরিবার আমাদের অপমান করেছিল, সেই পরিবারের মেয়েকে এই বাড়িতে এনে নিজের হাতের পুতুল বানিয়ে রাখার এতো বড় সুযোগ তুই হাতছাড়া করবি এজলাস? তুই না বলতি সওদাগর বংশের অপমান তুই করায়-গন্ডায় উসুল করবি?"
এজলাস এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মস্তিষ্কে দ্রুত কিছু হিসাব-নিকাশ খেলে গেল।পকেটে থাকা শুভ্র পাথরের পায়েল আর সেই অন্ধকার ঘরে জারিয়ার ভীতিসন্ত্রস্ত চেহারাটা যেন তার চোখের সামনে ভেসে উঠল।
'মেয়েটাকে বন্দি বানিয়ে নিজের ইশারায় নাচানোর সুযোগ?'-চিন্তাটা এজলাসের অহংকারে অদ্ভুত এক খোরাক জোগাল। সে শীতল হেসে বলল, "ঠিক আছে। তবে আমার একটা শর্ত আছে আব্বাজান। এই বিয়েতে কোনো জাঁকজমক হবে না। কাবিননামায় সই হবে আর মেয়ে সোজা এই বাড়িতে আসবে। কোনো উৎসবের নাটক আমি সহ্য করব না।"
মহীউদ্দীন সওদাগর সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নাড়লেন, "ঠিকাছে। তুই যা চাবি তা-ই হবে।"
তিনি চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে ছেলের দিকে আরেকবার তাকিয়ে কড়া গলায় বললেন, "আর শোন, বিয়ের আগেই চুল-দাড়ি ছাটিয়ে ভদ্র হয়ে নিস। না হয় প্রথম দিনেই জংলী ভাল্লুক ভেবে তোর নতুন বউ চিৎকার দিয়ে বাপের বাড়ি পালাবে!"
এজলাস নিজের রাশভারী চেহারার ঘন দাড়ি-গোঁফে হাত বুলিয়ে মুখ বাঁকাল, "আব্বা, এটা ট্রেন্ডি স্টাইল! ভাল্লুক হতে যাব কেন?"
"যেটা বললাম সেটাই করবি," মহীউদ্দিন সাহেব গাম্ভীর্য বজায় রেখে বললেন, "তোর বয়সের চেয়ে আমার অভিজ্ঞতার বয়স বেশি, বুঝলি?"
:
:
এদিকে সহপাঠীরা যখন পরীক্ষা শেষের আনন্দে মেতে উঠেছে, তখন জারিয়া নিঃশব্দে ঘরে বসে আছে মুখ গোমরা করে।
ড্রয়িংরুমে কয়েকটা মিষ্টির প্যাকেট রাখা। মুনিরা বেগম চোখ মুছে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন।
আমির হামজা মেয়েকে সামনে ডেকে এনে বসালেন। তার হাত দুটো চেপে ধরে কেঁদে ফেললেন একসময়ের এই শক্ত মনের মানুষটি। "আমাকে ক্ষমা করে দিস মা। তোর বাবা আজ হেরে গেছে। মহীউদ্দীন সওদাগর পরশু সন্ধ্যায় তোকে নিতে গাড়ি পাঠাবে। কোনো বড় অনুষ্ঠান হবে না, শুধু কাজী ডেকে আকদ করা হবে।"
জারিয়ার ভেতরের সমস্ত অনুভূতি যেন এক নিমেষে অবশ হয়ে গেল। সে কোনো কান্না করল না, কোনো চিৎকার করল না। শুধু শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, "বাবা, ওই লোকটা... মানে এজলাস, সেও কি এই বিয়েতে রাজি?"
আমির হামজা নিচু স্বরে বললেন, "হুম। উনারা তোকে তাদের ঘরের বউয়ের মর্যাদা দেওয়ার কথাই বলেছেন জারিয়া। কিন্তু তুই মনে রাখিস, তোর বাবা এখনো মরে যায়নি। কোনো অন্যায় হলে এক মুহূর্তও ওখানে থাকবি না।"
জারিয়া নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের চেহারাটার দিকে তাকাল। যে চোখ দুটোতে কাল পর্যন্ত অনেক স্বপ্ন ছিল, আজ সেখানে কেবল এক গভীর শূন্যতা।
সেই ধূসর চোখের লোকটা যখন তাকে ২৪ ঘণ্টা বন্ধ ঘরে আটকে রেখেছিল। তখন সে ভেবেছিল ওটা হয়তো কোনো ভুল বোঝাবুঝি,দেখতে কঠোর হলেও সে মানুষ ভালো, তাইতো ছেড়ে দিয়েছে জারিয়াকে কিন্তু এখন সে বুঝছে, ওটা ছিল একটা সুনির্দিষ্ট ফাঁদ! কিন্তু কেন? কেবল বড় বোনের ভাঙা বাগদানের শোধ নিতে তাকে এভাবে নিজের শিকার বানাল তারা?এ কেমন বিয়ে? যার সাথে বিয়ে হবে তাকেই তো দেখা হয়নি এখনো!
জারিয়া হাত জোর করে আয়নার দিকে তাকিয়ে কাঁদতে লাগলো আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল,'তুমি যদি কোনো শয়তান হও এজলাস, তবে আমি তোমাকে সহজে জিততে দেব না। আঘাত সহ্য করতে পারি, কিন্তু দাসী হয়ে বাঁধার শৃঙ্খল পরে মাথা নোয়াব না।'
আচমকাই যেন তার কিশোরী মন প্রতিবাদ করে উঠলো।অথচ যে মন আজ পর্যন্ত বাবা মায়ের অবাধ্যতা করেনি।
দুই দিন পর__
মণিকাঞ্চন ভিলার গাড়ি এসে দাঁড়াল আমির হামজার বাড়ির সামনে। কোনো সানাই বাজল না, কোনো আলোকসজ্জা হলো না।নিয়ম মতে বিয়ের কনের সাজে জারিয়া কাজী সাহেবের সামনে গিয়ে বসল।
কাবিননামায় সই করার সময় জারিয়ার হাত সামান্য কেঁপে উঠেছিল। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। তিনবার 'কবুল' বলার সাথে সাথে তার জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে গেল।
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামতেই জারিয়া পা রাখল মণিকাঞ্চন ভিলায়। বিশাল প্রাসাদতুল্য বাড়ি, কিন্তু প্রতিটি কোণে যেন থমথমে এক নীরবতা।
মোহসেনা বেগম ও দাদী আম্বিয়া বেগম তাকে সাদরে গ্রহণ করলেও সারহানের চোখে ছিল এক অপরাধবোধের ছাপ।বড় ভাই সামিন এবং তার স্ত্রী কেমন যেন বাঁকা নজরে দেখল জারিয়াকে,খুব একটা উদারতার প্রকাশ ঘটেনি তাদের আচরণে।
রাত বারোটা।
এজলাসের সুসজ্জিত বিশালাকার ঘরে খাটের ওপর চুপচাপ বসে ছিল জারিয়া। লাল বেনারসি আর গহনার ভারে তার শরীরটা ক্লান্ত হলেও মস্তিষ্ক ছিল অত্যন্ত সতর্ক।
হঠাৎ ঘরের দরজা খোলার শব্দ হলো।জুতোর শব্দ তুলে ঘরে প্রবেশ করল এজলাস। গায়ের কালো পাঞ্জাবির হাতা গোটানো, মুখে কোনো হাসি নেই।
সে ধীর পায়ে জারিয়ার দিকে এগিয়ে এল। খাটের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ঝুঁকে পড়ে জারিয়ার চিবুকটা তুলে ধরল।
জারিয়া তীব্র চোখে এজলাসের ধূসর চোখের দিকে তাকাল। এজলাসের ভ্রূ কিছুটা কুঁচকে গেল,মেয়েটির বিস্ফোরিত চোখ দেখে।
একটু ছুঁতেই জারিয়া যেন কারেন্টের শক খেল! ভীষণ ভয়ে কেঁপে উঠে মুখ ফুটে বলেই ফেলল, "আ-আপনি?! আপনি তো সেই গুন্ডা লোকটা! আপনি... আপনি এই ঘরে কেন এলেন?!"
এজলাস চোখ গোল গোল করে চরম অবাক হয়ে বলল, "গুন্ডা লোক মানে? কী যা তা বলছ!"
জারিয়া কাঁপা গলায় নিজের শাড়ির আঁচল পেঁচাতে পেঁচাতে বলল, "মানে আবার কী? আপনি আমাকে ছুঁলেন কেন? এখনই বের হন এখান থেকে, না হলে আমি কিন্তু চেঁচাব!"
হঠাৎ করেই এজলাসের মাথায় আব্বার সেই বিখ্যাত উক্তিটা বিজলীর মতো চমকে উঠল-‘না হয় জংলী ভাল্লুক ভেবে বউ পালাবে!’
'সর্বনাশ! আব্বা তো দেখি সেই খেলোয়াড়!' মনে মনে কথাটা ভেবে এজলাসের আর হাসির গমক আটকে রাখা দায় হলো। সে নিজের চাপদাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে মুখে একগাল মিষ্টি কিন্তু কৌতুকপূর্ণ হাসি ঝুলিয়ে বলল, "হুমম, তা ম্যাডাম... গুন্ডা তো চিনলেন, কিন্তু এই গুন্ডাই যে আপনার স্বামী আর বিয়ের খাতা সই করে এ ঘরে এসেছে, সেটা কি আবার নতুন করে বুঝিয়ে দিতে হবে?"
এজলাস পকেট থেকে সেই শুভ্র পাথরের পায়েলটা বের করে জারিয়ার কোলে ছুঁড়ে ফেলল। শীতল গলায় বলল, "স্বাগতম আমার নরকে জারিয়া পাখি, ওহ সরি আমার ঘরে।"
জারিয়া পায়েলটার দিকে তাকাল, তারপর এক মুহূর্ত না ভেবে পায়েলটা তুলে নিয়ে সোজাসুজি এজলাসের মুখের ওপর ছুঁড়ে মারল। পায়েলটা এজলাসের গাল ঘেঁষে মেঝেতে গিয়ে আছড়ে পড়ল।
জারিয়া খাট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সোজা এজলাসের চোখের দিকে চোখ রেখে বলল, "নরককে ভয় তারাই পায় যাদের হারানোর কিছু থাকে। আমার হারিয়ে যাওয়ার আর কিছু বাকি নেই এজলাস মেহমুদ । খেলায় চাল আপনি চেলেছেন ঠিকই, কিন্তু শেষটা কেমন হবে তা সময় নির্ধারণ করবে!"
এজলাসের গালে পায়েল লাগার জায়গায় লাল ছোপ পড়ে গেছে। সে হতভম্ব হয়ে কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এই সাধারণ মেয়েটার সাহস যে এতদূর গড়াবে, তা তার কল্পনারও বাইরে ছিল। তার ধূসর চোখে হিংস্রতার চরম শিখা জ্বলে উঠল।
চলবে...
জারিয়ার ছুড়ে মারা পায়েলের তীব্র আঘাত এজলাসের গালে তো বটেই, তার বিশাল অহংকারে গিয়েও সজোরে লাগল। কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধ থেকে গাল ঘেঁষে হাত বোলালো সে। গালে হালকা লাল দাগ ফুটে উঠেছে।চোখ দুটোতে যেন এক মুহূর্তেই হিংস্র আগ্নেয়গিরি জ্বলে উঠল।
জারিয়া সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, বুকটা দুরুদুরু কাঁপলেও মুখে ভয়ের লেশমাত্র নেই।
এজলাস ধীর পায়ে এক পা এগিয়ে জারিয়ার একদম কাছে এসে দাঁড়াল। তার মেজাজ এখন আসমানের চূড়ায়। কিন্তু নিজেকে সংযত করে অত্যন্ত শীতল কণ্ঠে বলল, "সাহস তো কম না! এই এজলাস মেহমুদকে মুখের ওপর জিনিস ছুড়ে মারলি? বাপের বাড়ি থেকে কি ভদ্রতার পাঠ শেখায়নি?"
জারিয়া এক চুলও পেছাল না। চিবুক উঁচিয়ে অত্যন্ত ঝাঁঝালো গলায় উত্তর দিল, "ভদ্রতা পাওয়ার যোগ্যতা সবাই রাখে না, চরিত্রহীন! বন্ধ ঘরে অচেনা মেয়েকে আটকে রাখা গুন্ডাদের থেকে ভদ্রতা আশা করাই পাপ। আর আপনার এই বেঈমান রঙের চোখ দেখে আমি একবিন্দুও ভয় পাই না, বুঝেছেন?"
"কী বললি তুই?" এজলাস এক মুহূর্তের জন্য যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। 'চরিত্রহীন'? 'বেঈমান রঙের চোখ'? মহীউদ্দীন খান সওদাগরের ছোট ছেলে, যাকে শহরের অর্ধেক লোক ভয়ে আর বাকি অর্ধেক সম্মানে সমীহ করে চলে, তাকে এক পুতুল মার্কা মেয়ে এইসব শব্দে ভূষিত করছে?
এজলাস বাঁকা হেসে চোখ দুটো ছোট ছোট করে বলল, "চোখের রঙ ধূসর বলে বেঈমান হয়ে গেল? আর এত রাতে এই ঘরে তোর সাথে একা আছি বলে আমি চরিত্রহীন? শোন ম্যাডাম, কাজী ডেকে কবুল পড়ে এই ঘরে আনিয়েছি তোকে। কোনো দয়া-দাক্ষিণ্য করতে আনিনি। তুই এখন আমার বিবাহিত স্ত্রী!"
"কাগজে-কলমে বিয়ে হলেই কেউ স্বামী হয়ে যায় না," জারিয়া শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল, "আপনার এই শয়তানি চাল আমি বুঝে গেছি। কিন্তু মনে রাখবেন, শৃঙ্খল পরাতে পারেন, কিন্তু দাসী বানাতে পারবেন না। এই বেঈমান রঙের চোখের গুন্ডার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই, কোনোদিন হবেও না!আর হ্যাঁ এই যে আমাকে" তুই" করে বলছেন এতেই বোঝা যাচ্ছে আপনি কতটা ভদ্রতার শিক্ষা পেয়েছেন। "
কথাটা শেষ করেই জারিয়া দ্রুত পায়ে গিয়ে খাটের একপাশের কোলবালিশটা তুলে নিল। তারপর একঝটকায় সেটা সোফার ওপর ছুড়ে মেরে বলল, "আপনার নরক আপনি সামলান। সোফায় গিয়ে ঘুমান!"
এজলাস হাঁ করে তাকিয়ে রইল। সে নিজের বিশালাকার ঘরে দাঁড়িয়ে নিজেরই নতুন বউয়ের কান্ড দেখছে। যে মেয়েটা কিছুদিন আগে অন্ধকার ঘরে আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছিল, সে আজ তাকে নিজের ঘরেই দিকনির্দেশনা দিচ্ছে!
এজলাস রাগে নিজের চুল টেনে ধরে হাসার চেষ্টা করল, "আমি সোফায় ঘুমাব? মাই ফুট! এই ঘর আমার, এই খাট আমার। তোর.. বলতে গিয়ে আবার সংশোধন করে বলল" অতই সমস্যা হলে আপনি মেঝেতে শুয়ে পড়ুন।"
"কখনোই না! লাল বেনারসি পড়ে আমি মেঝেতে শোব কেন?" জারিয়া সোজা গিয়ে খাটের এক কোণে নিজের কাঁথা-বালিশ গুছিয়ে পিঠ দিয়ে শুয়ে পড়ল। তারপর দেওয়ালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে রূঢ় গলায় বলল, "একদম আমার দিকে আসবেন না। এলে কিন্তু বাটি ছুড়ে মারব!"
তারপর জারিয়া বিড়বিড় করে পড়ল:
"ওয়াসবির আলা মা ইয়াকুলুনা ওয়াহজুরহুম হাজরান জামীলা।"
"এই যে কী বললে তুমি?"
বললাম:
"তারা যে মন্দ কথা বলে তাতে তুমি ধৈর্য ধারণ করো এবং সুন্দরভাবে তাদেরকে এড়িয়ে চলো।"
(সূরা আল-মুযযাম্মিল: ১০)
এজলাসের মেজাজ চড়ে আবার নেমে গেল। সে বিড়বিড় করে বলল, "আব্বা ঠিকই বলেছিল... জংলী ভাল্লুকের ঘরে আস্ত একটা বাঘিনী এনে তুলেছি! বাটি ছুড়ে মারবে,অপমান ও করবে... হুহ!"
নিজের চওড়া দাড়ি-গোঁফে হাত বুলাতে বুলাতে এজলাস সোফার দিকে পা বাড়াল। আজকের রাতে রাজকীয় খাটের অধিকার ছেড়ে তাকে এই ছোট সোফাতেই শরীর বাঁকিয়ে শুতে হচ্ছে, ভেবেই তার অহংকারে চোট লাগল। কিন্তু এই একগুঁয়ে মেয়েটার সাথে এখন মাঝরাতে মারা|মারি করার কোনো ইচ্ছা তার নেই।
সোফায় আধশোয়া হয়ে বালিশটা মাথার নিচে দিয়ে এজলাস অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, 'দাঁড়া জারিয়া পাখি, বাঘিনীগিরি বের করছি তোর! এই ঘরে তুই নিজ ইচ্ছায় এসেছিস, কিন্তু এখান থেকে বের হওয়ার রাস্তা আমার ইশারায় নির্ধারিত হবে।'
:
:
:
পরদিন সকাল।
মণিকাঞ্চন ভিলার রান্নাঘরে সকাল থেকেই বেশ হাঁকডাক। নতুন বউয়ের আজ প্রথম সকাল। মোহসেনা বেগম আর দাদী আম্বিয়া বেগম জারিয়াকে বেশ যত্ন করেই নাস্তার টেবিলে ডেকে বসালেন।
তবে পরিবেশটা খুব একটা হালকা ছিল না। বড় ভাই সামিন আর তার বউ মেহজাবীন বাঁকা নজরে জারিয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছিল। মেহজাবীন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, "তা জারিয়া, আমাদের ছোট সাহেবের সাথে প্রথম রাত কেমন কাটল? এজলাস তো আবার একটু কড়া মেজাজের, ভয় পাওনি তো?"
জারিয়া শান্ত হাতে পরোটা মুখে দিতে দিতে অত্যন্ত স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, "ভয় পাব কেন ভাবি? মেজাজ কড়া হতে পারে, কিন্তু মানুষ তো আর জংলী ভাল্লুক নয়! তবে হ্যাঁ, সোফায় শুয়ে ঘুমানোর অভ্যাস উনার মন্দ নয়।"
কথাটা শোনামাত্রই টেবিলে উপস্থিত সবাই থমকে গেল। মহীউদ্দীন সওদাগর চায়ের কাপ হাতে নিয়ে এজলাসের দিকে তাকালেন।
এজলাস ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল। পরনে ক্যাজুয়াল টি-শার্ট আর ট্রাউজার, চুলগুলো কিছুটা উষ্কখুষ্ক। জারিয়ার কথাটি তার কানে পৌঁছাতেই সে সিঁড়িতেই এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
মহীউদ্দীন সাহেব কৌতুকপূর্ণ চোখে ছোট ছেলের দিকে তাকিয়ে কেশে উঠলেন, "হুমম... তা এজলাস, বিয়ের প্রথম রাতেই সোফায় প্রমোশন পেয়ে গেলি? আব্বার কথা না শুনে চুল-দাড়ি কাটলি না, তার প্রতিফল পাচ্ছিস তো?"
সারহান টেবিলের একপাশে বসে জুস খাচ্ছিল, সে হুট করে হেসে ফেলে জুস গিলতে গিয়ে কাশতে লাগল। সামিনও নিজের হাসি চেপে গম্ভীর হওয়ার ভান করল।
এজলাসের ফর্সা মুখ লাল হয়ে উঠল। সে হনহন করে হেঁটে এসে নাস্তার টেবিলে জারিয়ার ঠিক মুখোমুখি চেয়ারটাতে বসল। চোখের মণি দুটোতে বিষ ছড়িয়ে জারিয়ার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "কেউ কেউ আবার বেশি কথা বলে নিজের বিপদ ডেকে আনে, আব্বাজান।"
জারিয়া মিষ্টি একটা হাঁসি দিয়ে বলল, "মিথ্যা বলা তো পাপ, তাই না আব্বাজান? যা সত্য তাই বললাম।"
মহীউদ্দীন সওদাগর মুচকি হেসে বললেন, "একদম ঠিক বলেছিস মা। সওদাগর বাড়িতে সত্যি কথা বলার লোকের বড় অভাব ছিল।"
এজলাস এবার এক কাপ কফি টান মেরে নিজের দিকে নিয়ে চুমুক দিল। মনে মনে সে জ্বলছে। এই মেয়েটা শুধু তার অহংকারে আঘাত করেনি, পুরো পরিবারের সামনে তাকে সোফায় শোয়া স্বামী বানিয়ে ছেড়েছে!
নাস্তা শেষে জারিয়া যখন নিজের ঘরে গিয়ে দাঁড়াল, ঠিক তখনই এজলাস ঘরে ঢুকে ঝড়ের বেগে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
জারিয়া চমকে পেছনে তাকাল। এজলাস ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে এল। তার মুখে সেই পরিচিত শীতল হাসি।
"অনেক তো নাটক হলো পাখি," এজলাস জারিয়াকে দেয়ালের সাথে একপ্রকার আটকে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বলল, "সবার সামনে আমার সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলার শোধ কীভাবে নিতে হয়, তা আমার ভালো করেই জানা আছে।"
জারিয়া বুক ফুলিয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "কী করবেন? মারবেন আমাকে? ওই বেঈমান রঙের চোখ দেখিয়ে আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করবেন না, গুন্ডা লোক কোথাকার!"
এজলাস হুট করেই জারিয়ার খুব কাছে ঝুঁকে এল। তাদের মধ্যে দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। জারিয়ার নিঃশ্বাস আটকে এল, তার হূদস্পন্দন হঠাৎ করেই তীব্র গতিতে চলতে লাগল।
এজলাস এক হাত দেওয়ালে রেখে অন্য হাতের আঙুল দিয়ে জারিয়ার কানের কাছে ঝুলন্ত চুলের একটি গোছা আলতো করে সরিয়ে দিল। তার শীতল ছোঁয়ায় জারিয়ার শরীরে এক অদ্ভুত বিদ্যুৎ খেলে গেল।
এজলাস অত্যন্ত মিষ্টি কিন্তু কৌতুকভরা গলায় বলল, "মারব কেন পাখি? শোধ নেওয়ার অনেক রোমান্টিক উপায়ও আছে। তুমি আমাকে 'চরিত্রহীন' বললে, অথচ আমি এখনও চরিত্রহীনের মতো কিছুই করলাম না! ব্যাপারটা কি একটু অন্যায় হয়ে যাচ্ছে না?"
জারিয়ার চোখ দুটো গোল গোল হয়ে গেল। এজলাসের এই আচমকা রূপ পরিবর্তন আর বাঁকা হাসি দেখে সে এবার সত্যিই কিছুটা ঘাবড়ে গেল।
"আ-আপনি দূরে সরুন!" জারিয়া এজলাসের বুকে হাত দিয়ে ঠেলার চেষ্টা করল, কিন্তু এজলাস যেন এক শক্ত পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
এজলাস নিচু হয়ে জারিয়ার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, "বাটি ছুড়ে মারার হুমকি দিয়েছিলে না? আজ রাতে কিন্তু কোনো সোফা খালি থাকবে না, পাখি। তৈরি থেকো!"
কথাটা বলেই এজলাস সোজা হয়ে দাঁড়াল। জারিয়ার রক্তিম আর ভীতিসন্ত্রস্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে সে এক বিজয়ের হাসি হাসল। তারপর পকেটে হাত দিয়ে শিস বাজাতে বাজাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
জারিয়া দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের ভেতরে যেন এক ভীষণ ঝড় বয়ে যাচ্ছে। লোকটা স্পষ্টতই তাকে উত্যক্ত করার নতুন পথ খুঁজে পেয়েছে!
জারিয়া আয়নার সামনে গিয়ে নিজের লাল হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকাল আর হাত মুঠো করে বিড়বিড় করে বলল, "চালবাজ বেঈমান! ভাবছ আমাকে এভাবে ভয় দেখিয়ে কাবু করবে? আমি জারিয়া, আপনার এই নকল প্রেম আর শয়তানি চালের জবাব গুনে গুনে ফেরত দেব!"
সাপ আর নেউলের লড়াই মাত্র শুরু হলো। মণিকাঞ্চন ভিলার এই বদ্ধ ঘরে কার অহংকার আগে ভাঙে, সেটাই এখন দেখার বিষয়!
চলবে...