SD ABAID

SD ABAID Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from SD ABAID, Digital creator, Comilla.

31/01/2024

তোর_শহরে_ভালোবাসা💜
পর্ব-১০

🍂🍂
পাখির কিচিরমিচির শব্দে সামুর ঘুম ভেঙে যায়।চোখ মেলে নিজেকে অপরিচিত জায়গায় আবিস্কার করে।পরক্ষনেই ওর মনে পড়ে ও তো আদির সাথে এসেছে।আদিকে খোজতে ঘাড় কাত করতেই দেখে আদি বেডের কর্ণারে পাশ ফিরে শুয়ে আছে।গতকাল রাতে যেভাবে শুয়েছিলো।সামু আদিকে দেখে মুচকি হাসি দেয়।নিজের গায়ে চাদর জড়ানো দেখে।

রাতে বৃষ্টি পড়েছে ওয়েদার কিছুটা ঠান্ডা ছিলো।তাই হয়তো আদি ওর গায়ে চাদর দিয়ে দিয়েছে।কিন্তু আদির গায়ে কিছুই নেই।এই গন্ডারের কি শীত লাগেনা।
সামান্তার ঘুম আসছেনা।ঘড়িতে ৭টা ২১বাজে।উঠে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।উঠার জন্য পা টান দিতেই অবাক।

--ছিঃ ছিঃ সামু তুই আদির পায়ের উপর পা তুলে ঘুমিয়েছিস?মাথা তো ঠিক জায়গায় আছে কিন্তু পা কিভাবে ওখানে গেলো?আদি যদি জানতে পারে আমাকে পচাতে ছাড়বেনা।

সামান্তা আস্তে-ধীরে পা সরিয়ে অতি সাবধানে বেড থেকে নেমে গেলো।তারপর গায়ের চাদর আদির গায়ে দিয়ে ওর দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো।চুলগুলো এলোমেলো ভাবে চোখের উপর ছড়িয়ে রয়েছে।একদম কিউটের ডিব্বা।

--ইসস,,আমার বাব্বিটা কি সুন্দর!!একদম বাচ্চাদের মতো কিউট।মাই ডেয়ার কিউট হাসব্যান্ড তুমি যতই কিউট হওনা কেন,,এত তাড়াতাড়ি তোমাকে ধরা দিচ্ছিনা।

সামান্তা ফ্রেশ হয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাড়ালো।যতদূর দেখা যাচ্ছে গাছপালা কোনো বাড়িঘর নেই।কোথায় আছে কিছুই বুঝতে পারছেনা।সামান্তা নিচে গিয়ে পুরো বাড়ি চক্কর দিলো।পুরো বাড়ি ঘুরে যেটা বুঝতে পারলো আদি প্রায়ই এবাড়িতে আসে।তবে একা নয়।টেবিলের উপর এলোমেলো গ্লাস আর ড্রিংক ওয়াইনের বোতল বোতল দেখেই বুঝতে পারছে।
কিচেনে গেলো।যদি খাওয়ার জন্য কিছু পাওয়া যায়।খুব ক্ষুদা পেয়েছে।কাল রাতে একটু কোক খেয়েছে।পুরো কিচেন তন্নতন্ন করেও কিছু পেলোনা।কয়েকটা কফির প্যাকেট ছাড়া।সামান্তা তাড়াতাড়ি কফি বানিয়ে নিলো।

কফির মগ নিয়ে গ্লাসের পাশে গিয়ে দাড়ালো।কফিতে চুমুক দিচ্ছে আর বাইরেটা দেখছে।সামনেই গার্ডেন।গার্ডেনে অসংখ্য ফুল ফুটে আছে।পাখিরা কিচিরমিচির করছে,রোদেরা আলোছায়ার খেলা করছে।সামুর মনে হচ্ছে ও ওর গ্রামে আছে।কতদিন এমন পাখির কিচিরমিচির শব্দ শুনতে পায়নি।কফি খাওয়া শেষ এখন কি করবে একা একা?
আদি ঘুমাচ্ছে।ওকে ডাকবে?ওকে ডেকে ঝামেলা বাড়ানোর দরকার নেই।এটা সেটা বলে বিরক্ত করবে।তারচেয়ে ঘুমাক একা একাই বসে থাকা ভালো।

হটাৎ আদির ঘুম ভেঙে যায়।ঘুম ভেঙে নিজের গায়ে চাদর জড়ানো দেখে যেটা রাতে সামুকে দিয়েছিলো।আদি পাশ ফিরে সামুকে খোজে কিন্তু বিছানা ফাকা।আদি লাফ দিয়ে উঠে পড়ে।ওয়াশরুম চেক করে কিন্তু সামু নেই।তাই দৌড়ে নিচে যায় সেখানেই সামুকে দেখতে না পেয়ে জোরে জোরে ডাকে।

--সামু,,সামু!!হয়ার আর ইউ?

সামু আদির চিতকার শুনে মনে মনে বলে,
উঠতে ষাড়।আমাকে এখানে আটকে রেখে এভাবে চিতকার করার মানে কি?
সামান্তা সাড়াশব্দ না দিয়ে ওভাবেই বসে রইলো।আদি খোজতে খোজতে সামুকে পায়।দেখে সামু ভাবলেশহীন ভাবে বসে আছে।সামুকে দেখে ওর রাগ উঠে যায়।

--এই মেয়ে কখন থেকে ডাকছি আর তুমি এখানে বসে আছো?

--কেন ডাকছেন?

--কেন ডাকছি মানে?ঘুম থেকে উঠে দেখি তুমি নেই।

--আর তাই আপনি ভাবলেন আমি পালিয়ে গেছি??হাও ফানি।আপনি আমাকে এখানে আটকে রেখেছেন আমি কিভাবে পালাবো?

--তুমি যে মেয়ে তোমাকে আটকে রাখা যায় নাকি?বিশ্বাস নেই।
যাইহোক কখন উঠেছো?আমাকে ডাকো নি কেন?

--১ঘন্টা,আপনাকে ডাকবো কেন?আপনি যতক্ষণ ঘুমাবেন ততক্ষণ আমার শান্তি।আপনি আমাকে প্রচুর জ্বালাতন করেন।

আদি সামান্তার কাছে গিয়ে বললো,কি জ্বালাতন করেছি?
আদি সামান্তার দিকে আগাচ্ছে।সামান্তা ভয় পেয়ে তোতলিয়ে বললো,,
--আআমা,,র খুউব ক্ষুধা পেয়েছে।খাবারের অভাবে কিছুক্ষণ পর মারা পরবো।প্লিজ কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করুন।

আদি দূরে সরে গেলো।ঠিকই তো গতকাল ওকে কোচিং থেকে তুলে নিয়ে এসেছি।রাতে একটু কোক খেয়েছে।তাতে কি হয়,,নিশ্চয়ই অনেক ক্ষুধা পেয়েছে।আমিও না,,তাড়াহুড়ায় খাবার এ আনি নি।

--কিছুক্ষন পর ই খাবার চলে আসবে।তুমি আরেকটু কষ্ট করো।আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।
আদি ফ্রেশ হতে চলে গেলো।সামুর পেটে ইদুর দৌড়াচ্ছে।

আদি ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে সামু পেটে হাত দিয়ে বসে আছে।আদি ওর পাশে গিয়ে বসে বললো,,
আমি ফোন করেছি।১০মিনিটের মধ্যেই চলে আসবে।আরেকটু কষ্ট করো।আই এম রিয়েলি সরি।আসলে তাড়াহুড়ায় এমন,,

সামান্তা শুকনো হাসি দিয়ে বললো,
আমার তেমন ক্ষুধা পায়নি।

আদি জানে ও মিথ্যে বলছে।সময় কাটানোর জন্য বললো,
ঘুম কেমন হলো?
--ভালো।

আদি বাকা হেসে বললো, তা তো হবেই।আমার পায়ের উপর পা তুলে আয়েশ করে ঘুমিয়েছো।

সামু তো অবাক।
--আমি ইচ্ছে করে করিনি।

--বুঝেছি,বুঝেছি,,আমার মতো কিউট ছেলে দেখে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারোনি।

সামি ভ্রু কুচকে বললো, কিহ!!কিউট আর আপনি?আপনি একটা জিরাফ।

--জিরাফ!!

--জ্বী হা,জিরাফ!!ছয় ফুট হাইটের জিরাফ।

আদি ইনোসেন্ট মুখ করে বললো, আমার মতো কিউট, হ্যান্ডসাম ছেলেকে তোমার জিরাফ বলতে একটুও বাধলো না।এত বড় অবিচার!!

সামু আদির ফেস দেখে হেসে দিলো।তারপর কিচেনে গিয়ে ৫মিনিট পর আদির জন্য কফি নিয়ে ফিরলো।
আদিকে কফি দিয়ে বললো,আপনি এখানে প্রায়ই আসেন তাই না,,,(কিছুটা থেমে) কফি খেতে??

আদি কফিতে চুমুক দিতে গিয়ে থেমে গেলো।সামান্তা যে ওকে কি মিন কতেছে সেটা ও ভালোই বুঝতে পারছে।কফির নাম নিয়ে যে খুচা মেরেছে সেটাও বুঝতে পারলো।
আদি কিছুনা বলে কফিতে চুমুক দিলো তারপর বললো,
তোমাকে মিথ্যে বলবোনা,আমি এখানে প্রায়ইশ আসি বন্ধুদের নিয়ে।আড্ডা দেই,একসাথে বসে ড্রিংক করি।তুমি জানো আমি ছেলেটা তেমন ভালো না।কি যেনো বলেছিলে লাফাঙ্গা,,হুম ওটাই।তবে এসবের মধ্যে একটা কথা হলো আমার মেয়ে দোষ নেই।আর সবচেয়ে বড় সত্যি হলো তোমার প্রতি আমার যে ফিলিংস সেটা মোহ,মায়া কোনোটাই নয়।তাহলে এতদিনে কেটে যেত।বিয়ের ৫মাস রানিং।৩মাস যাবত আমি তোমাকে ফিল করি।এর আগে কখনো কোনো মেয়ের প্রতি এমন ফিলিংস হয়নি।অনেক মেয়ের সাথে ফ্লার্ট করেছি,পিছে ঘুরিয়েছি,
ডেটিংএ গিয়েছি।বাট কেউই বেশিদিন টিকে নি।কাউকে ছুতে ইচ্ছে করেনি,পেতে ইচ্ছে করেনি,কেউ আমাকে এতটা টানেনি তুমি যতটা টানছো।তোমাকে আমি সারাজীবনের জন্য চাই।তুমি চাও আর না চাও তোমাকে,,,

কলিং বেল বেজে উঠলো।আদির কথায় ব্যাঘাত ঘটলো।সামান্তা মনোযোগ দিয়ে আদির কথা শুনছিলো ওর ও মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটলো।আদি হালকা হাসি দিয়ে দরজা খোলতে চলে গেলো।
সামান্তা ভাবছে,
এই ছেলেটা এত সুন্দর করে হাসে কেন?এই হাসিই তো আমাকে দূর্বল করে দিবে।এই হাসিতে যে আমি ফিদা হয়ে যাই সে কি জানে??হয়তো জানে না।

দু'জন ছেলে এসে টেবিলের উপর বড়বড় ৪টা প্যাকেট রাখলো।ছেলেগুলোকে বিদায় দিয়ে আদি প্যাকেটগুলো খোলে টেবিলে খাবার রাখছে।
--সামু চলে এসো।তোমার খাবার রেডি।
সামান্তা টেবিলের সামনে গিয়ে চোখ বড়বড় করে চেয়ে আছে।
--আপনার এখানে কদিন থাকার ইরাদা আছে বলুন তো?
--দুপুরেই আমরা বেরিয়ে যাবো।বিকেলের মধ্যে বাসায় পৌছে যাবো।
--তাহলে এত খাবার কেন?
--সব তোমার জন্য।যেটা ইচ্ছে খাও।
--দেখুন এটা সত্যি যে আমার অনেক ক্ষুধা পেয়েছে তার মানে এই নয় আমি রাক্ষস।আপনি আমাকে এইভাবে অপমান করছেন?
--আরে বোকা মেয়ে আমি তো তোমার ফুড চয়েজ জানিনা তাই অনেক আইটেম অর্ডার কিরেছি।নেও খেয়ে নেও।

সামান্তা একটা চিকেন ফ্রাই,স্যান্ডউইচ আর এক গ্লাস জুস খেয়ে বললো আমার হয়ে গেছে।
আদি তা দেখে বলে,,ব্যাস!!এই তোমার ক্ষুধা?
তাই তো এমন স্লিম বডি।তোমরা মেয়েরা এভাবেই স্লিম থাকো তাইনা।না খেয়ে খেয়েই এমন হও।
আমাকে দেখো,আমাকে দেখে খাওয়া শিখো।খেয়েদেয়ে গলুমলু হলে আমার প্রব্লেম নেই।নিশ্চিন্তে খেতে পারো।

--কোনো দরকার নেই,,আপনি রাক্ষসের মতো খেয়ে মুটো হন আর পাথরের মতো শক্ত শরীর বানান।

আদি সামুকে ক্ষেপানোর জন্য বললো,
--তোমার শরীর যে এত নরম সেটা কালকে বুঝেছি।কি যে সফট ইচ্ছে করছিলো খেয়ে ফেলি,,,উফফ।

সামান্তা চোখ বড়বড় করে দুহাতের আংগুল খিচে রাগ ঝেড়ে চোখমুখ খিচে বেরিয়ে গেলো।আদি দরজার লক খোলেছে তাই বাইরে বেরিয়ে গেলো।আদি ওর পিছু পিছু হাটা ধরলো।বলা তো যায়না যদি চলে যায়।

সামান্তা বাগানে দাঁড়িয়ে ফুল দেখছে।আদি দূর থেকে দাঁড়িয়ে সামুকে দেখছে।সামান্তার গালের উপর রোদ পড়ে চকচক করছে।সামান্তাকে মোহিত লাগছে।পাশেই একটা পুকুর।পুকুর পাড় শান বাধানো।সামান্তা সিড়িতে বসে পানিতে পা ডুবিয়ে দিলো।গ্রামের কথা মনে পড়ছে।মনে হচ্ছে গ্রামেই আছে।পানিতে পা ডুবিয়ে বাচ্চাদের মতো খেলছে।
আদি ওর পাশে গিয়ে পা ডুবিয়ে বসে পড়লো।
সামু একবার সেদিকে চেয়ে নিজের খেলায় মন দিলো।

তারপর আদিকে উদ্দেশ্য করে বললো,
জায়গাটা অনেক সুন্দর।আমার অনেক পছন্দ হয়েছে।

--তুমি আরো থাকতে চাও?

--থাকতে ইচ্ছে করছে কিন্তু থাকা যাবেনা,,আমার ভার্সিটি আছে।অন্য সময় আসবো।
আবার কিন্তু আসবো হু,,(বাচ্চাদের মতো বায়না করে)

--কার সাথে আসবে?

--কেন আপনার সাথে।

--আমার সাথে কেন আসবে?
আদির কথায় সামান্তা থমকে গেলো।
,(তুই আমার জামাই তাই আসবো,এটা আবার বলা লাগে)
--ঠিক আছে আসবোনা,,আপনি না নিয়ে আসলে কি করার?
আদি সামান্তার আরেকটু কাছে গিয়ে ঘেঁষে বসলো।তারপর বললো,
--আমি তো আসতেই চাই,তুমিই তো চাওনা।আচ্ছা আমাকে কি তুমি করে বলা যায়না?
--উহু।
--কেন?
--জানিনা।
--কেন জানোনা?এখনি তুমি করে বলবে।বলো।
--না,,বলবোনা।
--তাহলে পানিতে ফেলে দিবো।
--ফেলে দিন।
আদি সামান্তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো।ওর ধারণা গ্রামের মেয়ে সাতার জানে।সামান্তা ভাবতেও পারেনি আদি এমন একটা কাজ করতে পারবে।ওর ইচ্ছে করছে আদির মন্ডু ফাটিয়ে দিতে।হটাৎ দুষ্টু বুদ্ধি খেললো মাথায়।ও ডুবে যাওয়ার ভান করছে।আর চিতকার করছে আমি সাতার জানি না।
আদি ওর চিতকারে ভয় পেয়ে গেলো।নিজের চুল নিজের ছিড়তে ইচ্ছে করছে।কেন ফেললো ওকে।আদি পানিতে লাফ দিয়ে সামান্তার কাছে যেতেই সামান্তা ডুব দিয়ে কিনারায় চলে এলো।
আদি তো হতবাক।সামান্তা হেসে কুটিকুটি।আদি রাগে ফেটে যাচ্ছে।
আদি ওর সামনে গিয়ে দাড়ালো।আদিকে দেখে সামান্তার হাসি উবে গেলো।চোখ মুখ শক্ত করে ওর সামনে দাড়িয়ে আছে।

--তুমি মজা করছো হা?আমার ভয়ে জান যায় আর তুমি মজা করো?কি করে পারো?আমাকে কি তোমার মানুষ মনে হয়না?তুমি জানো আমি কি পরিমাণ ভয় পেয়েছিলাম??

সামান্তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেলো।
--সরি,,আমি বুঝতে পারিনি,,,।

--তুমি বুঝবেওনা।কখনোই বুঝবেনা।

আদি পুকুর থেকে উঠে গেলো।
সামান্তা উঠে আদির সাথে যাচ্ছে।আলমারি থেকে জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে যেতে নিবে তখনই আদিও ওয়াশরুমে ঢুকতে যাচ্ছে তখনই দুজনে ধাক্কা।আদি ওর দিকে চেয়ে আছে।ভিজা জামাকাপড় গায়ে লেপ্টে আছে।ভিজা চুলগুলো গালে,গলায় লেপ্টে আছে।

--সরুন।আমি আগে যাবো।তারপর আপনি।

আদির ঘোর ভাংলো।বাকা হেসে বললো,
--চলো একসাথে যাই,,,।চেঞ্জের সাথে রোমান্স ও হয়ে যাবে।

সামান্তা আদিকে ধাক্কা মেরে ওয়াশরুমে গিয়ে দরজা লক করে দিলো।আদি হেসে অন্য রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলো।

দুপুরে খেয়েদেয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো।আদি আর সামু পাশাপাশি সিটে বসে যাচ্ছে।সামু বারবার আদির দিকে তাকাচ্ছে আর গতদিনের কথা ভাবছে।

--দেখো আমি জানি আমি অনেক কিউট।তাই বলে এভাবে চেয়ে থাকবে,,আমার কিন্তু লজ্জা লাগছে।
সামান্তা হকচকিয়ে গেলো।আমতা আমতা করে বলল,
--আমি আপনাকে কেন দেখতে যাবো??
--আমাকে আবারো আপনি করে বলছো?দাড়াও তোমাকে একটা শিক্ষা দেওয়া দরকার,,।
আদি সামুকে টেনে মুখের কাছে নিয়ে এলো।
সামু ভয় পেয়ে বললো,
--কি করছেন?এটা রাস্তা,ড্রাইভ করছেন,,এক্সিডেন্ট হয়ে যাবে।
--যা খুশি হোক,দুনিয়া জ্বলেপুড়ে যাক,,আমাকে তুমি করে বলো নয়তো এইভাবেই ড্রাইভ করবো।
গাড়ি কিভাবে ব্রেক করছে।আর আদিও ওর মুখের দিকে আরো আগাচ্ছে।কেমন উষ্ণ নিশ্বাস পড়ছে।
সামান্তা ভয় পেয়ে বললো,বলবো বলবো।
--আগে বলো।
--তুতু,,,মি।
--সুইট করে বলো।
--তুমি।
--এইতো গুড গার্ল।
আদি ওকে ছেড়ে দিয়েই গাড়িটা ব্রেক কশে অন্য গাড়ির সাথে ধাক্কা খেতে যাবে তখনই আদি ব্রেক ধরে গাড়িটা সরিয়ে নেয়।
সামান্তা ভয়ে চোখ বন্ধ করে আছে।কিছুক্ষণ পর চোখ খোলে আদির দিকে কটমট করে চেয়ে বললো,
পাগলামির একটা লিমিট থাকা উচিত।কি করতে যাচ্ছিলেন?নিজেও মরতেন আমাকেও মারতেন।সোজা হয়ে গাড়ি চালান।আর একটা কথা বললে আপনার খবর আছে।

--আচ্ছা আচ্ছা সরি।(এ মেয়ে আমাকে কোনোদিনও তুমি বলবেনা)

আদি গাড়ি চালাচ্ছে সামান্তা বাইরেটা দেখছে।গ্রামের মতো নিরিবিলি রাস্তা।গ্লাস খোলে দিলো। বাতাস বইছে।সামান্তার চুলগুলো উড়ছে।তখনই আচমকা সামনে থেকে একটা গাড়ি এসে ধাক্কা দিলো।আদি সামান্তার সামনে নিজের বামহাত রেখে গাড়ি সাইডে নেওয়ার চেষ্টা করছে।সামান্তা চিতকার করে উঠে।গাড়িটা একটা গাছের সাথে লেগে থেমে যায়।সামান্তার মাথা আদির হাতের উপর।সামান্তা চোখ খোলে মাথা তুলে আদির দিকে তাকালো।আদি স্টিয়ারিংয়ে মাথা নিচু করা অবস্থায়।সামান্তা আদিকে এভাবে দেখে ভয় পেয়ে গেলো।অজানা ভয়ে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।এক হাতে আদির হাত চেপে ধরে অন্য হাত মাথায় রেখে বলল,
--আদি,,,,,!!

আদি চোখ মুখ কুচকে মাথা তুলে সামুর দিকে তাকালো সামুর চোখে পানি।মেয়েটা ভয় পেয়েছে খুব।
--তুমি ঠিক আছো?
--আরে আমি ঠিক আছি।আপনি ঠিক আছেন কিনা বলুন।
--হ্যা,,
সামু আদির কপালে রক্ত দেখতে পেলো।রক্ত দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়লো।রেগে গিয়ে বললো,
--আপনার কপালে রক্ত।কপালে কেটে গেছে।আপনাকে আমি বারবার বলছি মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালান।মনোযোগ দিন।ফাইজলামি বন্ধ করুন।কিন্তু আপনি তো আমার কোনো কথাই শুনছেন না।

আদি কপালে হাত দিয়ে সামনে এনে দেখে রক্ত।সামুকে বলে,,
--ট্রাস্ট মি,,এবার আমার কোনো দোষ নেই।আমি ঠিক ভাবেই চালাচ্ছিলাম।ওই গাড়িটাই মনে হচ্ছে নেশা করে চালাচ্ছে।
সামান্তার মেজাজ সপ্ত আসমানে।গাড়ি থেকে নেমে সামনে থামনো গাড়ির কাছে গেলো।একটা ছেলে বসে আছে সেও হয়তো সামান্য আহত হয়েছে।দেখে মনে হচ্ছে হুশে নেই।

--ওই বের হ।তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে বের হ।
ছেলেটা ভ্রু কুচকে সামুর দিকে তাকালো।
--কে রে?বের হবো কেন?
--তোর জম।
সামু গাড়ির দরজা খোলে ছেলেটার কলার ধরে বের করে আনে।ছেলেটা নেশাগ্রস্ত থাকায় সুবিধা হয়েছে।
--ওই গাড়ি চালাস না প্লেন?রাস্তা কি তোর দাদার যে মদ খেয়ে টাল হয়ে গাড়ি চালাবি আর অন্যের গাড়ি উড়িয়ে দিবি?
--ছাড় বলছি।
--শালা,,,সরি না বলে ছাড়তে বলিস?দাড়া।
সামু ওকে ছেড়ে দিয়ে কিছু খোজতে লাগলো। গাছের একটা ডাল পেয়ে গেলো।সেটা তুলে ছেলেটাকে মারতে লাগলো।
--তোর জন্য আমার বরের কপাল কেটেছে৷ কতগুলো রক্ত বের হয়েছে।তোর ও ততখানি রক্ত বের করেই শান্ত হবো।তার আগে নয়।

ছেলেটা ছটফট করছে।
--মারছেন কেন?আমি ইচ্ছে করে করিনি।

আদি গাড়িতে বসে সামুর কান্ড দেখে কপালে হাত।এ কি মেয়েরে বাবা।একে না থামালে মার্ডার করে দিবে।আমার সংসার করার স্বপ্ন শেষ।আদি তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে সামুর সামনে গেলো।
ছেলেটা বলছে,
আপু সরি,,মাফ করে দিন।আর এমন হবেনা।
--কিসের সরি??তোকে আজ আমি খুন করবো।মদ খাবি,,টাল হয়ে গাড়ি চালিয়ে মানুষ মারবি?চিনিস আমাকে?আমি সামান্তা সেহনুজ চৌধুরী।আজকের পর আমার নামটা আজীবন মনে রাখবি।
--জ্বী আপু কোনো দিন ভুলবোনা।আজীবন মনে রাখবো।
সামান্তা ঘেমে নেয়ে গেছে।কিন্তু থামছেনা।আদি ওকে টেনে নিয়ে এলো।সামান্তা আদির থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে।
--ছাড়ুন,,ওকে আজ আমি মেরেই ফেলবো।এইসব লোকের জন্য আজাইরা ফুর্তির জন্য কত এক্সিডেন্ট হয়।কত মানুষ মারা যায়।যদি আজ আপনার কিছু হয়ে যেতো।

আদি সামান্তাকে জোর করে বুকের মধ্যে চেপে ধরলো।সামান্তা তখনো জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে।
--আমি ঠিক আছি,,কিছু হয়নি আমার।
সামান্তা আদিকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরলো।ওর মনে হচ্ছিলো ও আদিকে হারিয়ে ফেলছিলো।সামান্তা শান্ত হলে ওকে গাড়িতে নিয়ে বসায়।আদি লুকিং গ্লাসে নিজের কপাল দেখে।রক্ত কপাল বেয়ে পড়ছে।আদি টিস্যু নিয়ে মুছতে গেলে,,
সামু ধমক দিয়ে বললো,
--আর ইউ ম্যাড?টিস্যু দিয়ে ক্ষতস্থান মুছবেন?টিস্যু কাটা জায়গায় আটকে থাকবে,,ইনফেকশন হতে পারে।মাথা এদিকে আনুন।

সামান্তার ওড়না টিস্যু কাপড়ের।তাই কামিজের কোনা দিয়ে ওর কপাল মুছে দিলো।আদির খুব ব্যথা লাগছে কিন্তু প্রকাশ করছেনা।কারণ এই ব্যথা তার কাছে মধুময় লাগছে।তার প্রেয়সী মলম লাগিয়ে দিয়েছে অলরেডি।

--গাড়ি স্টার্ট দিন।আর সাবধানে চালাবেন।

আদি মৃদু হেসে গাড়ি স্টার্ট দুলো।সামান্তা মুখে যাই বলুক না কেন ও যে আদিকে ভালোবাসে সেটা বুঝাই যাচ্ছে।

সামান্তা চুপ হয়ে গেছে।আদিও কিছু বলছেনা শুধু অনুভব করছে।একটা ফার্মেসী দেখে আদিকে বললো,
--স্টপ দ্যা কার।
আদি গাড়ি থামিয়ে সামুর মুখের দিকে চেয়ে বললো, কি হয়েছে?
--নামুন,,বলছি।
আদি সামুর কথামতো নেমে গেলো।সামান্তার পিছে পিছে গেলো।সামান্তা একটা ফার্মেসীতে গিয়ে একটা ছেলেকে বললো,
ভাইয়া,,ওনাকে একটু ব্যান্ডেজ করে দিন তো।
আদি বললো বাসায় গিয়ে করে নিলেই তো হতো।
--চুপ করুন।
আদি চুপচাপ ব্যান্ডেজ করে নিলো।

--তুমি আমার এতো কেয়ার করো জানতাম না তো?
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিতে।
--এখন এতো কথা না বলে গাড়ি চালান।
কিছুক্ষণ পর বললো, তুমি তো খুব ডেঞ্জারাস।আগে সন্ত্রাসী ছিলে নাকি?

--মি.মাথামোটা ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন আমি আমার কলেজের গার্লস লিডার ছিলাম।কত ছেলেকে ধরে পিটিয়েছই জানেন।সব কটা আমাকে ভয় পেতো।যারা মেয়েদের বিরক্ত করতো তাদের বেধে পেটাতাম।অনেক ছেলেকে বিভিন্ন শাস্তি দিয়েছি।

--যেমন??

--শীতের সকালে কলেজে বিশাল পুকুরে ১০টা ডুব দেইয়েছি।কাউকে এ পাড় থেকে ওপারে সাতার কেটে যেতে বলেছি।কাউকে পুরো কিলেজের ওয়াল দিয়ে হাটিয়েছি ইত্যাদি ইত্যাদি। কত্ত মজার ছিলো দিনগুলো।

--আমার তো এখন থেকে সাবধানে থাকতে হবে।কবে আমার হাত-পা ভেঙে দেও।আল্লাহ নোস।
তবে যাই বলো থ্যাংকস গড!!ভাগ্যিস আজকে এক্সিডেন্ট হয়েছিলো নয়তো জানতেই পারতাম না আমার বউ আমাকে এত্ত ভালোবাসে।

--কিসের ভালোবাসা? কোনো ভালোবাসা ণয়।

--তুমি যাই বলো না কেন,,ইউ লাভস মি,,একদিন স্বীকার করবে।

আদি আর সামু বাড়িতে ঢুকতেই নিশি দোড়ে এসে বললো,
--সামু কেমন সারপ্রাইজ দিলাম?

--অনেক সুন্দর।এত সুন্দর যে আমার জান যায় যায় অবস্থা।

আদির মা এসে বললো,
--মানে?

--মানে,,আমি কোচিং শেষে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছি তখন কেউ এসে মুখে রুমাল দিয়ে কিডন্যাপ করে নিয়ে যায় নিজেকে বন্ধ ঘরে আবিষ্কার করি।তারপর ওনাকে দেখি।আমাকে লক করে রেখে দেয়।

আদি ইশারায় বারবার না করছে কিন্তু সামু গরগর করে সব বলে দিচ্ছে।আদির মা এবার আদির দিকে চোখ পাকিয়ে চাইতেই আদি কপাল থেকে চুল সরিয়ে বললো,
এই দেখ এই কারণে ও আমার মাথা ফাটিয়ে ফেলেছে।
--না মা মিথ্যা বলছে।এটা তো গাড়িতে এক্সিডেন্ট হয়েছে।
--কি বলছিস কিভাবে?
সামান্তা সব খোলে বললো।আদির মা আদিকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।


নিশি আর আদি বসে বসে গল্প করছে তখনই সামু ভার্সিটি থেকে ফিরছে।ওর মুখটা দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা হয়েছে।
নিশি সামুকে বললো,
সামু আজ রাতে আমরা পার্টিতে যাচ্ছি।তুই, ভাইয়া আর আমি।
সামু আদির দিকে চেয়ে মুখ ভার করে বললো, আমি যাবোনা আপু,,ভালো লাগছেনা।
সামান্তা ফ্রেশ হয়ে বের হতেই আদি ওকে চেপে ধরলো।সামান্তা আদিকে এভাবে দেখে ভয় পেয়ে যায়।
--কেন যাবেনা?আমি যাবো তাই? আমার সঙ্গে যেতে প্রব্লেম?
সামান্তা ঠান্ডা গলায় বলল,দেখুন আপনার যা ভাবার ভাবুন কিন্তু আজকে আমি ওই পার্টিতে যাবোনা।

--কেন ওই পার্টিতে কি প্রব্লেম?

--আমার ভালো লাগছে না আমি যাবোনা।আপনার যেতে হয় যান।
সামান্তা রুম থেকে বের হয়ে গেলো।

আদি মনে মনে বলছে,
এভাবে এভয়েড করছো?তোমাকে আগে খাচায় পুরি তারপর দেখবে আদি কি জিনিস,,,

সামু ভার্সিটি থেকে ফিরার সময়,
গেইট থেকে বের হয়েই দেখে রাজ দাঁড়িয়ে আছে।
--আপনি?আপনাকে না ভার্সিটি আসতে মানা করেছি?
--দুদিন যাবত তোমার খবর পাইনি তোমার ফোন অফ।তাই খোজ নিতে বাধ্য হয়েই এসেছি।
--আমি বেচে আছি।মরিনি।
--ফোন অফ কেন?
--প্রথমত বাসায় ছিলাম না।আর দ্বিতীয়ত আমাকে আর ফোন দিয়ে পাবেন না।
--মানে?
--মানে ওইদিন ই বলেছি আদি আপনার ফোন দেওয়া পছন্দ করে না।তাই সিম ভেঙে ফেলেছে।প্লিজ আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবেন না।
--তুমিও সেটাই চাও?
--অবশ্যই কেন নয়?আমি বিবাহিত।আমাকে আমার হাসব্যান্ড শ্বশুর বাড়ির কথা মতো ই চলতে হবে।
সরি,মাফ করবেন।আমি আপনার সাথে ফ্রেন্ডশিপ রাখতে চাইনা।বায়।
সামু কথাটা বলেই চলে আসছিলো। রাজ পিছনে থেকে বললো,
--তুমি না চাইলেও আমি আসবো,তোমার খোজ নিবো।
সামু রেগে গেলো।
--মানে কি,,জোর জবরদস্তি নাকি?
--হ্যা তাই।
--তাহলে শুনে রাখুন,,এসব করলে ঝামেলায় পরে যাবেন।আদি ইস ক্রেজি এবাউট মি,,ও যদি জানে তবে খারাপ হয়ে যাবে।
রাজ চোখ মুখ শক্ত করে বললো, তো জানাও,,,কে নিষেধ করেছে?আদি যদি ক্রেজি হয় তবে আমিও ক্রেজি।যা হওয়ার হবে আই ডোন্ট কেয়ার।
সামু কিছু না বলে গাড়িতে উঠে বসে।
সামুর আদির কথাগুলো ভালো লাগেনি।তাই ওর থেকে দুরে থাকাই ভালো।আদি জানলেও ঝামেলা করবে তাই না জানানোই বেটার।

চলবে,,

31/01/2024

#প্রিয়_রাগান্বিতা🩷
#লেখিকা: #তানজিল_মীম🩷
পর্ব-২৪
________________
রৌদ্রময় সকাল! ফজরের নামাজ সেরে পুনরায় আরেকবার ঘুমিয়ে ছিল রাগান্বিতা। ইমতিয়াজ ফজরের সময় বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আর এসেছিল কি না জানে না রাগান্বিতা। হঠাৎই কিছু একটা ভেবে নড়েচড়ে উঠলো রাগান্বিতা। আশেপাশের কোথাও ইমতিয়াজকে না দেখে খানিকটা চিন্তিত হয়েই পালঙ্ক ছেড়ে নামলো সে। সিঁড়ি বেয়ে নামতেই দেখা মিললো দাদিমার সাথে। তাকে দেখেই দাদিমা মিষ্টি হেঁসে বললেন,
“তুমি উডছো রাগান্বিতা।”
“হুম বাবা কোথায় দাদিমা?”
“তোর আব্বা তো হকাল হকালই হাডে গেছে বাজার করনের লাইগ্যা।”
“ওহ আচ্ছা আর দাদাভাই?”
“ওয় তো চাষাবাদে গেছে জমির ফসল দেহার লাইগ্যা।”

দাদিমার কথা শুনে রাগান্বিতা অবাক স্বরে এদিক সেদিক তাকিয়ে বললো,
“দাদাভাই চাষাবাদ করে কবে থেকে?”
“মেলাদিন(বেশিদিন) হয় নাই হুনছি এহন থেইকা গ্রামেই থাকবো তোর আব্বায় আর শহরে যাইতে দিতে চায় না।”
“ওহ।”
“হয় তুমি এখন যাও চোহে মুহে পানি দিয়াও আমি খাওন বাড়তাছি।”
“ঠিক আছে।”

দাদিমা রন্ধনশালার দিকে এগিয়ে গেলেন আর রাগান্বিতা আশেপাশে তাকিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে উঠানের কলপাড়ের দিকে আসলো। এই ইমতিয়াজটা সকাল সকাল গেল কই! রাগান্বিতার মনটা বড় অস্থির লাগছে। রাগান্বিতা দিনে দিনে হারে হারে টের পাচ্ছে প্রেম বড্ড ভয়ংকর জিনিস। মানুষটাকে এক পলক না দেখলেই কেমন অস্থির অস্থির লাগে। রাগান্বিতা কলের গোঁড়ায় এসে দাঁড়াতেই আচমকাই এক বাঁশির সুর কানে ভেসে আসলো। রাগান্বিতা ধড়ফড়িয়ে উঠলো এ তো সেই মানুষটারই বাঁশির সুর। রাগান্বিতা যেন ঠাহর করতে পারলো ইমতিয়াজ কোথায় আছে রাগান্বিতা আর দেরি করলো না কলগোড়া ছেড়েই ছুট লাগালো বাহিরে।

ইমতিয়াজের সঙ্গে রাগান্বিতার প্রথম দেখা হওয়া প্রথম দিনের সেই জায়গা আর সেই বিশাল গাছটার নিচে বসে আজও বাঁশি বাজাচ্ছে ইমতিয়াজ। রাগান্বিতা দূর থেকেই নিজের পায়ের গতি কমিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসতে ছিল ইমতিয়াজের দিকে। সেদিনকার সেই দিনটা আর আজকের দিনটার মধ্যে কত তফাৎ! রাগান্বিতা ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে আনমনা বসলো ইমতিয়াজের পাশ দিয়ে। ইমতিয়াজ তখনও নিজ মনে বাঁশি বাজাতে ছিল। কি মুগ্ধনীয় শব্দ তার রাগান্বিতা চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে লাগলো তা। হঠাৎই বাঁশি বাজানো থামিয়ে দিয়ে সামনের দিকে তাকিয়েই বললো ইমতিয়াজ,
“কারো অনুমতি ছাড়া তার পাশে বসে বাঁশির সুর শোনা কিন্তু ঘোর অন্যায় জমিদার কন্যা।”

রাগান্বিতা যেন ধড়ফড়িয়ে উঠলো এক মুহূর্তের জন্য হলেও চরমভাবে অবাক হয়েছে সে। রাগান্বিতা নিজেকে দমালো। বললো,
“বাঁশির সুর কানে আসাটা অন্যায় নয়।”
“ঘরে বসে শুনলে অন্যায় নেই ছুটে এসে শুনলে ঘোর অন্যায়।”

রাগান্বিতা কি বলবে বুঝতে পারছে না। পরমুহুর্তে কি ভেবে জবাব দিলো,
“যে বাঁশি বাজাচ্ছিল তার ওপর আমার অধিকার আছে।”

ঝটপট প্রশ্ন ইমতিয়াজের,
“কিসের অধিকার?”
“সে আমার একজন নিজস্ব মানুষ। আর নিজস্ব মানুষের ওপর কিসের অধিকার থাকতে পারে তা নিশ্চয়ই আপনায় বুঝিয়ে বলতে হবে না।”

ইমতিয়াজ হেঁসে ফেলে মেয়েটা কিভাবে বলে দিল “সে তার নিজস্ব মানুষ’'! ইমতিয়াজ শীতল সুরে বললো,
“তুমি এত সুন্দর করে কথা বলো না রাগান্বিতা, আমি যদি প্রেমে পড়ে যাই আমার তো ভয় লাগে।”

রাগান্বিতা শব্দ করে হাসে আয়েশ করে ইমতিয়াজের পাশে বসে বলে,
“বউকে ভালোবাসতে ভয় কিসের?”
“তুমি বুঝবে না।”
“বুঝিয়ে বললে কে বুঝবে না শুনি!”

অভিমানী স্বরে শুধালো রাগান্বিতা। ইমতিয়াজ রাগান্বিতার নাকের ডগায় হাল্কা স্পর্শ করে বললো,
“সবাই বুঝবে কিন্তু তুমি বুঝবে না।”

রাগান্বিতার রাগ হলো সে রাগ নিয়ে মুখ ভাড় করে বসে রইলো। আর ইমতিয়াজ তার কান্ডে হাসলো। শীতল সুরে বিড়বিড়িয়ে বললো,
“তুমি কি বিশ্বাস করবে বউ, খুন না করেও আজ আমি খুনি হয়েছি।
ভালোবাসবো না ভেবেও ভালোবাসতে শুরু করেছি!”

রাগান্বিতা ইমতিয়াজের দিকে কেমন এক চাহনী নিয়ে তাকালো। ভ্রু-জোড়া কুঁচকে বললো,
“কিছু কি বললেন আপনি?”

ইমতিয়াজ উদাসীন সুরে আবার শুধালো,
“আমি তোমায় অনেক কিছু বলি বউ, কিন্তু তুমি শুনো না। আমি আঘাতপ্রাপ্ত মানুষ বউ, তুমি আমার প্রতি এত অনুরাগী হও না।”
“ভালোবাসতে বারণ করছেন আমায়?”
“এত বড় সাধ্য আমার কই!"
“তবে নিজে ভালোবাসতে চাইছেন না কেন?”
“আমি ভালোবাসতে শুরু করলে তুমি সইতে পারবে না।”
“কেন পারবো না?”

ইমতিয়াজ জবাব দেয় না। উল্টো বলে,
“তুমি কি জানো বউ, আমি তোমার চোখে আমার মরণ দেখি!'

স্তব্ধ হয়ে গেলো রাগান্বিতা। চোখদুটো আচমকাই কেমন একটা করে উঠলো বুকটা থমকে উঠলো মুহূর্তেই। রাগান্বিতা তার ভেজা ভেজা আঁখি নিয়ে বলে,
“আপনি এভাবে কথা কেন বলেন, আমার যে খারাপ লাগে।”

ইমতিয়াজ বুকে জড়িয়ে ধরে রাগান্বিতাকে। মিষ্টি হেঁসে বলে,
“তুমি এভাবে কেঁদো না, আমি ব্যাথা পাই!”

রাগান্বিতা আর কিছু বলতে পারলো না চুপ হয়ে গেল ওখানেই। এই মানুষটা এমন কেন। অভিমানের ক্রোধে ভাসলো রাগান্বিতা! আর ইমতিয়াজ ভিতরে ভিতরে কি যে ভাবলো বোঝা গেল না।'
____________________________

“রামু! দ্রুত দরজা খোলো, তুমি এভাবে কাহিনির অর্ধেক বলে বাথরুমে যেতে পারো না। আমি কাল শেষ রাতে কখন ঘুমিয়ে গেলাম, তুমি ডাকবে না আমায়! রামু কি হলো! বের হও বলছি!”

লাগাতার রামুর বাথরুমের দরজা ধাক্কাচ্ছে আর কথাগুলো বলছে ইলিয়াস। তার মাথা ভন ভন করছে এই গল্পের শেষটা জানার জন্য মনটা অস্থিরতায় ধেয়ে আসছে তার। কালরাতে কাহিনি শুনতে শুনতে কখন যে চোখ দুটো বুজিয়ে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গিয়েছিল ইলিয়াস সেটা বুঝতে পারে নি। সকালে ঘুম ভাঙতেই রামুর বউকে ডেকে জানতে পারে রামু বাথরুমে গেছে। তাই তো ছুটে আসলো এখানে। ইলিয়াস আবারও দরজা ধাক্কালো। জোরে আওয়াজ করে বললো,
“তুমি কি বাহিরে আসবে রামু নাকি আমি দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকবো।”

এবার রামু পারুক কেঁদে ভাসিয়ে দিক। এই কোন পাগলকে সে রাগান্বিতার কাহিনি বলতে বসেছিল। তাকে শান্তি মতো বাথরুমও করতে দিবে না নাকি। রামু আরো দশমিনিটের মতো সময় নিয়ে বের হলো। একরাশ আক্রোশ নিয়ে বললো,
“আমারে কি আমনে শান্তি মতো একটু ইয়ে করবাও সময় দিবেন না ডাক্তার বাবু!'
“তোমার ইয়ে টিয়ে বাদ দেও আগে কাহিনি বলো। তোমার কাহিনির চক্করে আমার রাতে ঘুম হয়নি জানো তুমি। সকালেও তো ধড়ফড়িয়ে উঠলাম পুরো।”
“আমার কি দোষ আমনেই তো ঘুমাইয়া গেছিলেন।”

ইলিয়াস কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
“ঠিক আছে ওসব বাদ দেও। এবার যদি পুরো কাহিনি না বলে কোথাও গিয়েছো তো ইনজেকশন দিয়ে আমিও তোমায় রাগান্বিতার মতো পাগল বানিয়ে দিবো।”

রামু অবাক হয়ে গেল ডাক্তার ইলিয়াসের কথা শুনে এগুলান কোনো ডাক্তারে কয়! রামু শুকনো ঢোক গিলে বললো,
“এমনে কেউ কয়?”
“তুমি বড্ড বকছো দ্রুত বলো, ইমতিয়াজ গেল কই! রাগান্বিতা কিভাবে পাগল হয়ে গেল! ওর বাবাও বা মারা গেলেন কি করে! তার থেকেও বড় কথা রাগান্বিতাকে চিঠিগুলো দিতো কে, ইমতিয়াজ নাকি অন্যকেউ! আর দাদিমার রাগান্বিতা শাপলার অলংকারের সাজ দেখে ভয় পাবার কারণটাও এখনও বলো নি তুমি! তার থেকেও বড় প্রশ্ন ইমতিয়াজ যদি কুহুকেই ভালোবাসতো তাহলে রাগান্বিতাকে বিয়ে করলো কেন?”

রামু বেশি না ভেবেই জবাব দিলো,
“কেন আবার মাহাদকে খুঁইজ্জা পাওন যাচ্ছিল না বইলা।”

চমকে আবার প্রশ্ন করলো ইলিয়াস,
“আরো একটা প্রশ্ন মাহাদকে মারলো কে? ইমতিয়াজ! যাতে রাগান্বিতাকে বিয়ে করতে পারে।"
“না। একখান কথা কি জানেন ডাক্তার বাবু এই মাহাদরে যে মারছিল হেও বাইচ্চা নাই আর!”

ইলিয়াসের মাথা ঘুরে উঠলো কথা শুনে। এত রহস্য কেন। ইলিয়াস তাড়া দিল। চেঁচিয়ে বললো,
“কাহিনি কও রামু!"

রামু ভয় পেয়ে গেল। দ্রুত হাত মুখ ধুয়ে তার ঘরের সামনের জায়গাটা দেখিয়ে বললো,
“আমনে ওইখানে যাইয়া বহেন আমি এক্ষুণি আইতাছি পুরা কাহিনি শেষ কইরাই এবার দম ফালামু আমি।”

ইলিয়াস নিজেকে শান্ত করলো। আর দেরি না করে চলে গেল রামুদের ঘরের দুয়ারের সামনে। বসলো পিড়িতে।'

রামুদের ঘর থেকে রাগান্বিতাদের সেই তালুকদার ভিলাটা দেখা যায় বছর পাচেক আগেই রামু এখানে ঘর বানিয়েছিল চাইলে জমিদার বাড়িতে থাকতে পারতো কিন্তু অজানা কোন ভয়ের কারণে থাকতে পারলো না। পরিত্যাক্ত হয়ে পড়ে আছে তালুকদার ভিলাটি। তালুকদার ভিলার সামনেই ছোট্ট কুঁড়েঘরে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে রাগান্বিতাকে। এটাও পাঁচবছর আগেরই তৈরি। রাগান্বিতাকে সবাই ছেড়ে ছুঁড়ে গেলেও রামু পারে নি যেতে। রাগান্বিতার জন্যই রামু তার নিজ গ্রাম ত্যাগ করে এখানেই বউ নিয়ে থাকছে। তবে একেবারে কাছে নয় একটু দূরে। ধুলোতে জর্জরিত নিজ বাড়িটাকে জানালা দিয়ে চেয়ে দেখলো রাগান্বিতা। চোখের নিচে কালো দাগ, এলেমেলো চুল, ময়লাযুক্ত ছিঁড়ে যাওয়া পোশাক আর পায়ে শিকল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি। দৃষ্টি তার ওই বাড়িটার দিকে। রাগান্বিতা এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে বাড়িটার পানে। রাগান্বিতার কাজই ওই বাড়িটার দিকে কোনো কারণ ছাড়াই ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা। রাগান্বিতা বিড় বিড় করে বললো,
“তুমি কবে ফিরবে ইমতিয়াজ! আমি যে আজও তোমার অপেক্ষায় বসে। কতদিন হয়ে গেল তোমার মুখের সেই বউ বউ ডাকখানা আমি শুনি না।”

চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো রাগান্বিতার! তবে উত্তর আর মিললো না।
____________________________
১৯৮১ সালে! বড় সেই বিশাল গাছটায় এখনো পাশাপাশি বসে রাগান্বিতা আর ইমতিয়াজ। রাগান্বিতা এখনো মন খারাপ করে ইমতিয়াজের বুকে মাথা দিয়ে বসে আছে। ইমতিয়াজ নড়েচড়ে উঠলো। বললো,
“আর কত মন খারাপ করবে বউ, আমি তো তোমার পাশেই বসে!’

রাগান্বিতা ইমতিয়াজের বুক থেকে মাথাটা ওঠালো। বললো,
“আপনি একটা বদমাশ লোক!”

ইমতিয়াজ হেঁসে জবাব দেয়,
“জানি তো!”

আক্রোশে ফেটে বলে রাগান্বিতা,
“না জানেন না।”

আবারও হাসে ইমতিয়াজ। বলে,
“ঠিক আছে। এবার ওঠো জলদি সকাল থেকে কিছু খেয়েছো দেখে তো মনে হচ্ছে না। চলো দ্রুত কিছু খেয়ে নিবে,

উঠে দাঁড়ালো রাগান্বিতা আর ইমতিয়াজ। দুজনই চললো তালুকদার ভিলার উদ্দেশ্যে। ইমতিয়াজ যেতে যেতে বললো আবার,
“কথায় কথায় শুধু এভাবে রাগ দেখালে কিন্তু হবে না বউ। মাঝে মাঝে ভালোও বাসতে হবে।”
“মাঝে মাঝে কেন, আমি তো আপনায় রোজই ভালোবাসি।”

ইমতিয়াজ মিষ্টি একটা হাসি দিলো, রাগান্বিতার গাল টিপে বললো,
“তুমি একটা পাগল বউ,

কপাল কুঁচকে জবাব দিলো রাগান্বিতা,
“আপনি করেছেন, আমার কোনো দোষ নেই।”

ইমতিয়াজ চুপ হয়ে গেল। সে বুঝেছে আজ রাগান্বিতা বেশ ক্ষেপেছে তার একটা কথাও মাটিতে ফেলতে দিবে না। তার আগেই উত্তর হাজির!'

#চলবে.....

[ভুল-ক্রটি ক্ষমার সাপেক্ষ। আর গল্প কেমন লাগলো অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবে। সবাইকেই ধৈর্য্য ধরতে হবে না হলে উপায় নেই। পুরোটা গুছিয়ে আনতে আমার সময় লাগবে।]

♥️
Contact us for
Joya's Craftopia

31/01/2024

#প্রিয়_রাগান্বিতা🩷
#লেখিকা: #তানজিল_মীম🩷
পর্ব-২৫
________________
কড়া রোদ্দুরে আচ্ছন্ন চারপাশ। ইমতিয়াজ বাড়ি নেই মোকলেসের সাথে দেখা করতে গেছে। রন্ধনশালায় রান্না করছে রাগান্বিতা আর দাদিমা। রাগান্বিতার মাথায় কিছু প্রশ্ন ঘুরছে সে চাইছে দাদিমাকে বলতে। সে কুহুর বিষয় নিয়েই কিছু বলবে কিন্তু দাদিমা আধও কিছু বলবে কি না জানে না রাগান্বিতা৷ দাদিমার সেদিনকার তার সাজ দেখে তার ওপর রেগে যাওয়া আর ভয় পাওয়ার বিষয়টা এখনো প্রায়সই মাথায় ঘোরে। রাগান্বিতার মনে হচ্ছে আজ দাদিমাকে জিজ্ঞেস করলে সে নিশ্চয়ই কিছু বলবে। অনেক ভেবে রাগান্বিতা সিদ্ধান্ত নিলো প্রশ্নটি সে করবেই। রাগান্বিতা প্রশ্নটি করবে এরই মাঝে দাদিমা বলে উঠলেন,
“জানো রাগান্বিতা তুমি যাওনের পর একখান ঘটনা ঘটছে।”

রাগান্বিতা নিজের প্রশ্নটি ধামাচাপা দিল। নরম কণ্ঠে বললো,
“কি ঘটনা?”
“মাহাদরে কেডা জানি মাইরা ফেলছে। তুমি যাওনের দিনই রাত্তির বেলা মুজিবর গো বাড়ির পিছনের ডোবায় মাহাদের লাশখানা ভাইসয়া উঠছিল। কি যে মায়া লাগজিল রাগান্বিতা তুমারে বুঝবার পারমু না। কে যে করলো! কে জানে!

রাগান্বিতা স্তব্ধ স্বরে বললো,
“পুলিশ আসে নি।”
“আইছিল মাহাদ নাকি হাতার(সাঁতার) জানতো না হের লাইগ্যা বেশি আগায় নায়।”
“কিন্তু মুজিবর চাচাদের ডোবায় তো পানি কম থাকে পড়লে মরে যাওয়ার কথা তো নয়।”
“ওইদিন নাকি বেশি আছিল।”

রাগান্বিতা চুপ রইলো তার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে! মাহাদ নিখোঁজ হওয়ার পর তার সাথে ইমতিয়াজের বিয়ে হওয়াতে তার খুব আনন্দ হয়েছিল। কিন্তু মাহাদের মৃত্যু সে ভাবে নি। রাগান্বিতা নিশ্চুপে 'আমি একটু আসছি' বলে বাড়ি থেকে বের হলো। একটু হাঁটতেই দেখা মিললো ইমতিয়াজের তার দিকেই এগিয়ে আসছে। ইমতিয়াজ রাগান্বিতার সামনে দাঁড়াতেই রাগান্বিতা থমথমে গলায় বললো,
“জানেন মাহাদ আর নেই কে যেন মেরে ফেলেছে।”

ইমতিয়াজ থতমত খেয়ে গেল। বিস্মিত কণ্ঠে বললো,
“কে মারলো?”

রাগান্বিতা জবাব দেয় না তার মনে হচ্ছে তার জন্যই মাহাদকে কেউ মেরে দিয়েছে। রাগান্বিতা ছলছল দৃষ্টি নিয়ে ইমতিয়াজের দিকে তাকিয়ে বললো,
“আমার জন্যই মারা গেছে মাহাদ।”

ইমতিয়াজ আশেপাশে তাকালো। না কেউ নেই। সে রাগান্বিতার হাত ধরলো। নিশ্চুপ স্বরে বললো,
“এসব তুমি কি বলছো?”

হঠাৎই কেঁদে উঠলো রাগান্বিতা। ইমতিয়াজ চমকে উঠলো রাগান্বিতাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো,
“আমার সাথে চলো।”
“আমি মাহাদের খুনি।”

রাগান্বিতার মুখ চেপে ধরলো ইমতিয়াজ। বললো,
“হুস,চুপ! একটাও কথা না।'

রাগান্বিতা চুপ হয়ে গেল তার মাথা ভনভন করছে বার বার নিজেকেই মাহাদের খুনি মনে হচ্ছে। তাকে যদি মাহাদ বিয়ে করতে না আসতো তাহলে হয়তো মাহাদ আজ বেঁচে থাকতো। তার জন্য মাহাদের জীবনটা এভাবে নষ্ট হয়ে গেল। ভাবলেই বুক চিঁড়ে কান্না আসছে রাগান্বিতার।'

নদীর ঘাটে ঢেউ চলছে প্রবল। ইমতিয়াজ রাগান্বিতাকে নিয়ে নদীর ঘাটে এসেছে। আশপাশে জনশূন্যহীন কেউ নেই। দূরদূরান্তে শুধু ট্রলার আর নৌকা যাওয়া দেখা যায়। নদীর ঘাটের ডানদিকটায় মাটির একটা সরু রাস্তা যায়। দুই পাশে সারি সারি তালগাছ। যার একপাশে নদী আর অন্যপাশে মাঠ। মাঠের ওপার মুন্না মিয়াদের বাড়ি। নদীর দিকের তালগাছের সারির আগে রয়েছে এক বিশাল বড় রেন্টিগাছ। সেই রেন্টি গাছের নিচে পাশাপাশি বসে আছে রাগান্বিতা আর ইমতিয়াজ। রাগান্বিতা এখনো ফোঁপাচ্ছে। ইমতিয়াজ এবার বিরক্ত নিয়ে ধমক দিলো। বললো,
“এভাবে কাঁদতে থাকলে মানুষ তো ভাববে আমি তোমায় মেরেছি। তারপর লোকে নারী নির্যাতনে আমাকে জেলে দিক।”

রাগান্বিতা তাও নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ হলো। আরও কতক্ষণ ফোপালো। ধীরে ধীরে পরিবেশ হলো শান্ত। কারো মুখে কোনো কথা নেই। ইমতিয়াজ এবার পরিস্থিতি বুঝে নরম কণ্ঠে প্রশ্ন করলো,“এবার বলো কি হয়েছে?”

রাগান্বিতা নির্জীব। চুপচাপ। মুখে কোনো কথা নেই। ইমতিয়াজ আবার প্রশ্ন করলো,“তুমি কি কিছু বলবে?”

রাগান্বিতা এবার মুখ খুললো। বললো,“আমার কাছে প্রায়সই কারো লেখা চিঠি আসে সে নিজেকে নিষ্ঠুর বলে দাবি। বিয়ের আগে আমি অনেকগুলো চিঠি পেয়েছি। চিঠির জন্যই সেদিন গ্রামের সব শিক্ষিত ছেলেদের ডাকি তাদের হাতের লেখা দেখি আপনাকেও তো ডাকা হয়েছিল।”

ইমতিয়াজ শুনলো,কিছু ভাবলো। বললো,
“তারপর।”
“কিন্তু কারো সাথে ওই চিঠির হাতের লেখা মিলে নি।”

ইমতিয়াজের মাঝে তেমন কোনো হেলদোল দেখা গেল না। সে স্বাভাবিকভাবেই জিজ্ঞেস করলো,
“এতে মাহাদের খুনের কি সম্পর্ক?”
“আপনি বুঝতে পারছেন না আমার মনে হচ্ছে ওই চিঠি দাতাই মাহাদকে মেরেছে।”
“নাও হতে পারে।”

রাগান্বিতা নিজেকে ধাতস্থ করলো। চোখের পানিটুকু মুছে বললো,
“মানে?”
“মানেটা খুব সোজা হতেই পারে অন্যকেউ মেরেছে।”
“আপনি বুঝছেন না চিঠির লেখাগুলো খুব ধারালো ছিল।”
“আমার মনে হয় না চিঠিদাতা এমন কিছু করবে।”
“আপনি এতটা নিশ্চিত কি করে হচ্ছেন?”
“আমি নিশ্চিত নই মনে হলো তাই বললাম।”

রাগান্বিতা কিছু বলে না সে ভেবেছিল চিঠির কথাগুলো ইমতিয়াজকে বললে ইমতিয়াজ তাকে কটু কথা শোনাবে কিন্তু ইমতিয়াজ এমন কিছুই করলো না। কিন্তু কেন? রাগান্বিতার ভাবনাটা বুঝি ইমতিয়াজ বুঝলো। সে বললো,
“আমি সেদিনই আঁচ করতে পেরেছিলাম কেউ তোমার নামে প্রেমপত্র দিচ্ছে। আর তুমি তাকে খুজচ্ছো। এ বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। তুমি সুন্দরী, তোমাকে হাজার ছেলে চাইবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এখন তুমি বিবাহিত। আমার মনে হয় না তোমার নামে আর কোনো চিঠি আসবে আর যদি আসে আমায় বলবে আমি এর ব্যবস্থা নিবো।”

রাগান্বিতা নিখুঁত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ইমতিয়াজের মুখের দিকে। বিয়ের পর আর একটাই চিঠি এসেছিল রাগান্বিতার কাছে রাগান্বিতা কথাটি চেপে গেল কিন্তু ভাবলো পরে আর কোনো চিঠি আসলে সে চেপে যাবে না চিঠি সমেত দেখাবে। রাগান্বিতা আশেপাশে তাকালো। না কেউ নেই, সে আচমকাই ইমতিয়াজের গালে চুমু খেল। মিষ্টি হেঁসে বললো, “আপনি পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ স্বামী।”

ইমতিয়াজ আকস্মিক কান্ডে কিছুটা চমকে উঠলো। নিজেকে ধাতস্থ করলো, তবে কিছু বললো না। মেয়েটাকে যত দেখে তত অবাক হয় ইমতিয়াজ,“মেয়েটা তাকে এত ভালোবাসে কেন?”

কিছু সময় যেতেই মোকলেসের হাক শোনা গেল নদীর পাড়ে রঙিন নৌকা নিয়ে ঘুরছে। মোকলেস এগিয়ে আসলো ইমতিয়াজকে দেখে বললো,
“ভাই আমনে এহানে কি করেন?” রাগান্বিতা আপাও দি আছে।”

ইমতিয়াজ, রাগান্বিতা একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করলো মোকলেসকে কি বলবে উত্তর খুঁজে পায় না। ইমতিয়াজ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
“তোর জন্যই বসে ছিলাম।”

মোকলেস অবাক হলো। বললো,
“আমার জন্যে,
“হ তোর নৌকায় চড়বো।”

মোকলেস কথা বাড়ালো না নৌকাটাকে ইমতিয়াজদের অনেকটা কাছে নিয়ে এসে বললো,
“হাচা(সত্যি) উডবেন ভাই। এহন তো ঠাডা পড়া রোদ্দুর।”
“তাতে কি নদীতে হাওয়া নেই।”
“তা একটু আছে,
“তাইলে আবার কি চল। রাগান্বিতা উঠো!'

রাগান্বিতা বিনা বাক্যে উঠে দাঁড়ালো। ইমতিয়াজের হাত ধরেই সে নৌকায় চড়ে বসলো। দুজন একসাথে অনেকটা সময় পার করলো। মোকলেস নৌকা চালাতে চালাতে শাপলার বিলে চলে আসলো। তবে আজ শাপলা নেই। কিছু লতা ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না। ইমতিয়াজ বললো,
“আজ শাপলা থাকলে তোমায় আবার সাজাতাম বউ?”

রাগান্বিতার মুখটা খানিকটা কালো হয়ে গেল। সে খুশি হতে চেয়েও খুশি হতে পারলো না। ইমতিয়াজ প্রশ্ন করলো,“কি হলো?”

রাগান্বিতা মাথা নিচু করে জবাব দিলো,
“দাদিমা শাপলাফুল দিয়ে সাজতে বারণ করেছেন।”

ইমতিয়াজ খানিকটা ভড়কালো। প্রশ্ন ছুড়লো আবার,
“কেন?”
“জানি না। আপনি সেদিন যখন শাপলা দিয়ে সাজিয়েছিলেন দাদিমা তা দেখেন। খুব অদ্ভুত আচরণ করেন! কি নিয়ে যেন ভয় পেয়েছিলেন খুব। সাথে আমায় বারণ করেছেন আমি যেন আর শাপলা দিয়ে না সাজি।”

ইমতিয়াজ কিছু বললো কি যেন ভাবলো রাগান্বিতা প্রশ্ন করলো,“কি ভাবছেন।”

ইমতিয়াজ তাকালো নদীর দিকে শুঁকনো মুখে জবাব দিলো,
“ফুলের সাথে কিসের ভয়?”
“পোকামাকড়ের কথা বলেছিলেন।”

ইমতিয়াজ আর ভাবলো না এতটুকু বললো শুধু,“ওহ আচ্ছা।”
----
রাতের খাবার সেরে দাদিমার কক্ষে ঢুকলো রাগান্বিতা। দাদিমা তখন পালঙ্কের চাদর ঠিক করছিলেন। রাগান্বিতার উপস্থিতি টের পেতেই দাদিমা প্রশ্ন করলেন,
“কিছু কইবা রাগান্বিতা?”

রাগান্বিতা এগিয়ে আসলো। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জোরালো কণ্ঠে প্রশ্ন করলো,“আমি সব জানতে চাই দাদিমা।”

দাদিমা হতভম্ব হয়ে গেলেন। কাঁপা কাঁপা স্বরে বললেন,
“কি জানবার চাও?”
“এই যে তুমি সেদিন আমার শাপলার সাজ দেখে কেন ঘাবড়ে গিয়েছিলে?”

দাদিমা থমকে হাসলেন। বললেন,
“হেদিনই(সেদিনই) তো কই ছিলাম শাপলা ফুলে পোকামাকড় থাহে।”
“তুমি মিথ্যে বলো না। আমি কিন্তু সবটা জেনেই ছাড়বো। আমার মন বলছে তুমি কুহু আপার বিষয়েও কিছু জানো।”

এবার যেন আরো ঘাবড়ে গেলেন দাদিমা। কি বলবেন বুঝতে পারছেন না। রাগান্বিতা ক্ষিপ্ত মেজাজ। সে আজ জেনেই ছাড়বে। রাগান্বিতা দাদিমার দিকে তাকিয়ে বললো,
“আমায় সব বলো।”

দাদিমা শাড়ির আঁচল চেপে কাঁদলেন। রাগান্বিতার বুকটা হঠাৎই কেঁপে উঠলো। সে দাদিমাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
“তুমি কাঁদছো কেন দাদিমা?”

দাদিমা চুপ রইলেন। রাগান্বিতা দাদিমাকে নিয়ে জানালার পাশে বসলো। জানালার কপাট খুলতেই ঘুটঘুটে অন্ধকার পরিবেশটা নজরে আসলো প্রথম। তারপর আকাশের চাঁদখানা দেখা গেল। রাগান্বিতা কিছু বললো না দাদিমা অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললো,
“কুহুরে কেউ মারে নাই রাগান্বিতা। কুহু তোর আব্বার মুখে চুনকালি মাখাইয়া মইরা গেছে। নিজেই নিজের পাপ ধুইতে বিষ খাইছে।”

রাগান্বিতার চোখ থমথমে, গলায় কণ্ঠস্বর গেল থেমে। আপা বাবার মুখে চুনকালি দিয়েছে। রাগান্বিতা থমথমে গলাতেই বললো,
“আপা কি করছিল?”

মুখে আঁচল চেপে বললো দাদিমা,
“কুহু পোয়াতি আছিল।”

থমকে গেল রাগান্বিতা। পায়ের মাটিটা বুঝি সরে যাচ্ছিল এক মুহূর্তের জন্য। কান দিয়ে যেন ধোঁয়া বের হলো। সে স্তব্ধ! তার আপা বিয়ের আগে, না না! রাগান্বিতার বিশ্বাস হলো না তার আপা কলঙ্কিত নয়! কিছুতেই এটা হতে পারে না। দাদিমা মিথ্যে বলছে। তার আপা পবিত্র ছিল। মৃত বলে কি যা খুশি তাই শুনে নিয়ে বিশ্বাস করে নিবে রাগান্বিতা!

#চলবে....
[ভুল-ত্রুটি ক্ষমার সাপেক্ষ!]

♥️
Contact us for
Joya's Craftopia

Address

Comilla
3500–3583

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when SD ABAID posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share