29/07/2026
যদি প্রতিটি তরুণ মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ পেত—তবে কি একটি দেশ আরও নিরাপদ, আরও সক্ষম হয়ে উঠত?
ভারতের প্রশিক্ষিত ও প্রত্যক্ষ মদদে পরিচালিত জামাত ইসলামের জঙ্গিদের মোকাবেলায় এটা কি সুন্দর সমাধান হতে পারে না?
কল্পনা করুন, একটি বড় ভূমিকম্পের পর শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বিদ্যুৎ নেই, হাসপাতালগুলো অতিরিক্ত চাপের মুখে, সড়কে বিশৃঙ্খলা, হাজারো মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা। এমন সংকটের প্রথম কয়েক ঘণ্টায় কারা এগিয়ে আসবে?
অনেক দেশের কাছে এর উত্তর শুধু সেনাবাহিনী নয়। বরং এমন এক নাগরিক সমাজ, যেখানে তরুণদের একটি অংশ আগে থেকেই শিখেছে কীভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হয়, কীভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে হয়, কীভাবে আতঙ্কের মধ্যেও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হয় এবং কীভাবে জাতীয় জরুরি অবস্থায় রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াতে হয়।
তাই প্রশ্নটি কেবল সামরিক নয়। এটি রাষ্ট্রের স্থিতিস্থাপকতা, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
যুদ্ধের জন্য নয়, প্রস্তুতির জন্য
২১শ শতাব্দীতে নিরাপত্তার সংজ্ঞা বদলে গেছে। একটি দেশের জন্য হুমকি কেবল সীমান্ত সংঘাত নয়; সাইবার আক্রমণ, মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জ্বালানি সংকট এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর হামলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অনেক রাষ্ট্র এখন এমন নাগরিক গড়ে তুলতে চায়, যারা শুধু অস্ত্র ব্যবহারই নয়, বরং জরুরি পরিস্থিতিতে সমাজকে সচল রাখতে পারে।
এই কারণেই অনেক দেশের সামরিক বা জাতীয় সেবা কর্মসূচিতে অস্ত্রচর্চার পাশাপাশি প্রাথমিক চিকিৎসা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব, যোগাযোগ, অগ্নিনির্বাপন, সাইবার নিরাপত্তা এবং দলগত কাজের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সিঙ্গাপুর: একটি ছোট দেশের বড় প্রস্তুতি
স্বাধীনতার পর সীমিত জনসংখ্যা ও নিরাপত্তা-চ্যালেঞ্জের মুখে সিঙ্গাপুর জাতীয় সেবা (National Service) চালু করে। অধিকাংশ সক্ষম পুরুষ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সামরিক বা সংশ্লিষ্ট সেবায় অংশগ্রহণ করেন এবং পরে রিজার্ভ ব্যবস্থার অংশ থাকেন।
নীতিনির্ধারকদের মতে, এর উদ্দেশ্য শুধু প্রতিরক্ষা নয়; বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমির তরুণদের একত্রে কাজ শেখানো, জাতীয় পরিচয় শক্তিশালী করা এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি করাও এর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
সুইজারল্যান্ড: নাগরিক ও প্রতিরক্ষার সমন্বয়
সুইজারল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে একটি মিলিশিয়া-ভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনুসরণ করে আসছে। অনেক নাগরিক মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর পুনঃপ্রশিক্ষণে অংশ নেন। এর ফলে পূর্ণকালীন বাহিনীর পাশাপাশি একটি বৃহৎ প্রশিক্ষিত রিজার্ভ বাহিনী গড়ে ওঠে, যা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সক্রিয় করা সম্ভব।
দক্ষিণ কোরিয়া: নিরাপত্তা বাস্তবতা থেকে জাতীয় সংস্কৃতিতে
যদি এমন কোনো দেশের উদাহরণ খোঁজা হয়, যেখানে যুবসমাজের সামরিক প্রশিক্ষণ শুধু প্রতিরক্ষা নীতি নয়, বরং জাতীয় জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তবে দক্ষিণ কোরিয়া অন্যতম।
১৯৫৩ সালে কোরীয় যুদ্ধ যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে থেমেছিল, কিন্তু আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি হয়নি। ফলে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে নিরাপত্তা উত্তেজনা দীর্ঘদিন ধরে দেশটির প্রতিরক্ষা নীতিকে প্রভাবিত করে আসছে।
এই প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ সক্ষম পুরুষ নাগরিক বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা পালন করেন। সাধারণত স্বাস্থ্য মূল্যায়নের পর তারা সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী বা বিমানবাহিনীতে নির্দিষ্ট সময় কাজ করেন। সক্রিয় সেবা শেষে তারা রিজার্ভ ব্যবস্থার অংশ থাকেন, যাতে জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সংগঠিত হওয়া যায়।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—অনেকেই এই সময়কে কেবল সামরিক জীবন হিসেবে নয়, বরং আত্মনিয়ন্ত্রণ, সময়নিষ্ঠা, দলগত নেতৃত্ব, শারীরিক সক্ষমতা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বাস্তব শিক্ষা হিসেবে দেখেন। যদিও এই ব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে—বিশেষ করে শিক্ষা ও কর্মজীবনে বিলম্ব, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এর ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশটিতে নিয়মিত আলোচনা হয়।
প্রশিক্ষণ মানেই কি যুদ্ধ?
এখানেই মূল প্রশ্ন।
সামরিক প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য কি মানুষকে যুদ্ধপ্রবণ করে তোলা, নাকি সংকটের সময় দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা?
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আধুনিক প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নাগরিক প্রস্তুতি। একজন প্রশিক্ষিত তরুণ শুধু সীমান্তে নয়, ভূমিকম্প, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড বা বড় দুর্ঘটনার সময়ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। প্রাথমিক চিকিৎসা, উদ্ধারকাজ, যোগাযোগ সমন্বয় এবং নেতৃত্ব—এসব দক্ষতা যুদ্ধের বাইরেও প্রতিদিনের জীবনে মূল্যবান।
বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা?
বাংলাদেশ প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে সাইবার নিরাপত্তাও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এমন বাস্তবতায় কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবী ভিত্তিতে একটি জাতীয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বিবেচনা করা যেতে পারে, যেখানে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে—
- প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি চিকিৎসা সহায়তা
- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও উদ্ধার অভিযান
- অগ্নিনির্বাপন
- সাইবার নিরাপত্তার মৌলিক ধারণা
- যোগাযোগ ও নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ
- নাগরিক প্রতিরক্ষা ও সংকট ব্যবস্থাপনা
- শারীরিক সক্ষমতা ও দলগত অনুশীলন
এ ধরনের কর্মসূচির উদ্দেশ্য হবে দক্ষ, আত্মনির্ভর, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করা—শুধু সৈনিক নয়।
ভারসাম্যের প্রশ্ন
অবশ্য এমন কর্মসূচি সফল করতে হলে মানবাধিকার, আইনের শাসন, পেশাদার প্রশিক্ষণ এবং নাগরিক স্বাধীনতার প্রতি পূর্ণ সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রশিক্ষণই যেন বিভাজন, বৈষম্য বা অপ্রয়োজনীয় সামরিকীকরণের মাধ্যম না হয়।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কেবল শক্তিশালী অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে সেই সমাজের ওপর, যেখানে মানুষ সংকটের সময় একে অপরকে সাহায্য করতে জানে এবং দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত থাকে।
ভবিষ্যতের প্রশ্ন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন, সাইবার যুদ্ধ এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির যুগে যুদ্ধের ধরন বদলে যাচ্ছে। কিন্তু একটি বিষয় বদলায়নি—যে রাষ্ট্রের নাগরিকরা প্রস্তুত, সংগঠিত এবং দায়িত্বশীল, সেই রাষ্ট্র সংকটের সময় তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল থাকে।
হয়তো ভবিষ্যতের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শুধু আধুনিক অস্ত্র নয়; বরং এমন একটি প্রজন্ম, যারা প্রয়োজনে জীবন রক্ষা করতে পারে, দুর্যোগে নেতৃত্ব দিতে পারে, প্রযুক্তিগত হুমকি মোকাবিলা করতে পারে এবং দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে।
প্রশ্নটি তাই শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের নয়।
প্রশ্নটি হলো—একটি জাতি কি তার তরুণদের এমনভাবে গড়ে তুলছে, যাতে তারা শান্তির সময় উন্নয়নের অংশীদার এবং সংকটের সময় জাতির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শক্তিতে পরিণত হতে পারে?