04/09/2026
ইব্রাহিম পাশার সেই ঐতিহাসিক মসজিদটি আজ এক আজানহীন, নীরব জাদুঘর।
সুলতান সুলেইমান যখন ইব্রাহিম পাশাকে উজিরে আজমের পাশাপাশি রুমেলিয়া প্রদেশের গভর্নরের দায়িত্ব দেন, তখন রুমেলিয়ার অন্তর্ভুক্ত বুলগেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চল ছিল এতটাই দুর্গম যে এ অঞ্চলকে দেলিওরমান বলা হতো, যার অর্থ “পাগলাটে জঙ্গল”।
তাই ১৫৩৩ সালে এই অঞ্চলের হাজারগ্রাদ এলাকায়
(বর্তমান রজগ্রাদ) ইসলামি সভ্যতার বিস্তার ও উসমানীয় আধিপত্য সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে ইব্রাহিম পাশা নিজের নামে একটি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন এবং এর জন্য একটি ওয়াকফ তহবিল গঠন করেন
কিন্তু ১৫৩৬ সালে ইব্রাহিম পাশার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর নির্মাণকাজ কিছুটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তবুও সেখানকার মুসলিম সম্প্রদায় মসজিদটিতে নিয়মিত নামাজ আদায় শুরু করেন।
তবে ১৬০০ সালে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে মসজিদটি ধসে পড়ে। পরবর্তীতে ১৬১৬ সালে তৎকালীন উজির মাহমুদ পাশা মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করেন এবং “ইব্রাহিম পাশা জামে মসজিদ” নামটি অপরিবর্তিত রাখেন।
উনিশ শতকের প্রথম দিকে রুশ ও উসমানীয়দের মধ্যে একাধিকবার সামরিক সংঘর্ষ সংঘটিত হওয়ায় মসজিদটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তা সত্ত্বেও মসজিদটিতে নামাজ আদায় চলমান ছিল।
১৯০৮ সালে বুলগেরিয়া স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর ১৯৭০-এর দশক থেকে তৎকালীন স্বৈরশাসক তোদোর ঝিবকভের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট সরকার ইব্রাহিম পাশা মসজিদসহ অসংখ্য মসজিদ ও মাদ্রাসায় নামাজসহ অন্যান্য ধর্মীয় কার্যক্রম বন্ধ করে সেগুলোকে জাদুঘরে পরিণত করে।
ইব্রাহিম পাশা মসজিদটি কয়েক বছর জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, ১৯৮৩ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের অজুহাতে মসজিদটি তালাবদ্ধ করে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি ভুতুড়ে জাদুঘরের মতো ফেলে রাখা হয়।
২০১১ সালে তুরস্ক ও বুলগেরিয়ার মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক পারস্পরিক সাংস্কৃতিক বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তিতে উল্লেখ ছিল, তুরস্ক সরকার প্রথমে ইস্তানবুলে অবস্থিত “আয়রন চার্চ” নামে পরিচিত একটি জরাজীর্ণ বুলগেরীয় গির্জা পুনর্নির্মাণ করে সেখানে পুনরায় উপাসনার সুযোগ করে দেবে।
বিনিময়ে, বুলগেরিয়া সরকার ইব্রাহিম পাশা মসজিদসহ বুলগেরিয়ায় অবস্থিত আরও কয়েকটি পরিত্যক্ত মসজিদ পুনর্নির্মাণ করে নামাজ আদায়ের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে।
চুক্তি অনুযায়ী, তুরস্ক সরকার প্রায় ৪০ লাখ মার্কিন ডলার অর্থায়নের মাধ্যমে ইস্তানবুলের জরাজীর্ণ “আয়রন চার্চ” পুনর্নির্মাণ করে এবং ২০১৮ সালে সেটিকে পুনরায় উপাসনার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে, ২০২০ সালে বুলগেরিয়া সরকার প্রায় ১৩ লাখ মার্কিন ডলার অর্থায়নের মাধ্যমে ৪০ বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ইব্রাহিম পাশা মসজিদের পুনর্নির্মাণকাজ শুরু করে।
তবে সংস্কারকাজ শুরুর সময় বুলগেরিয়ার সংস্কৃতিমন্ত্রী এক মন্তব্যে জানান, এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির ভবিষ্যৎ শুধুমাত্র একটি “জাদুঘর” হিসেবে নির্ধারিত।
তখন বুলগেরিয়ার মুসলিম প্রতিনিধিরা সংস্কৃতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং এটিকে চুক্তির শর্ত ভঙ্গের আশঙ্কা হিসেবে তুলে ধরেন।
২০২৫ সালে মসজিদটির সংস্কারকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর বুলগেরিয়ার সাধারণ মানুষ ও পর্যটকেরা ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি পরিদর্শনের দাবি জানান। তাই বুলগেরিয়ান সরকার প্রতি মাসের শেষ শুক্রবার দর্শনার্থীদের জন্য মসজিদটি “ওপেন ডে” হিসেবে উন্মুক্ত করে দেয়।
তবে নানা আইনি জটিলতার অজুহাতে এখনো মসজিদটিতে কোনো ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
শুধু ইব্রাহিম পাশা মসজিদই নয়—পৃথিবীর বুকে এমন আরও বহু মসজিদ রয়েছে, যেখান থেকে একসময় নিয়মিত আজানের ধ্বনি ভেসে আসত, যেখানে মুসলিমরা নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন। অথচ আজ সেই মসজিদগুলোর মধ্যে অনেক মসজিদই আজানহীন জাদুঘরে পরিণত হয়ে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
🖊️