Masud Rana Nehal

Masud Rana Nehal Dhaka
(47)

22/08/2026

লোকলজ্জা
পর্ব ০৪
শাহেদ খান

​বাবার সম্মতি পাওয়ার পর আমি আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করলাম না। এতদিন যে মানুষটা শুধু আদেশ দিতে অভ্যস্ত ছিল, সে আজ শিক্ষানবিশের মতো আমার সামনে বসে রইল। বাবার ভেতরের সেই কড়া প্রফেসরের ভাবটা এক নিমেষে উধাও হয়ে গেছে। সেখানে জায়গা করে নিয়েছে একজন স্ত্রীর জন্য ভুগতে থাকা পঁয়তাল্লিশ বছরের পুরুষ, যে নিজের স্ত্রীকে নতুন করে ফিরে পেতে চায়।

​আমি ড্রয়িংরুমের সোফায় গিয়ে বসলাম। বাবাকে ইশারা করে পাশে বসতে বললাম। বাবা ধীর পায়ে এসে বসল।
​"শোনো বাবা," আমি গম্ভীর গলায় বললাম, "মা এতদিন শুধু একটা জিনিসেরই অভাব বোধ করেছে—তোমার মুখ থেকে দুটো ভালো কথা। শাড়ি-গয়না তো তুমি আগেও দিতে, কিন্তু কখনো তার পেছনের আবেগটা ছিল না। এখন তোমাকে ফোন দিয়ে মায়ের সাথে কথা বলতে হবে।"
​বাবা আঁতকে উঠে বলল, "এখনই ফোন করব? সে যদি ফোন কেটে দেয়? বা যদি রিসিভ না করে?"

​"কেটে দিলে দিক, তাহলেও তো চেষ্টাটা হলো। তুমি নিজের ফোনটা বের করো।"
​বাবা পকেট থেকে ফোনটা বের করল। হাতটা হালকা কাঁপছিল। আমি ডায়াল প্যাড খুলে মায়ের নম্বরটা তুলে বাবার হাতে দিলাম।
​"ফোনটা কানে দিয়ে তুমি একদম সাধারণ কথা বলবে। কোনো ঝগ*ড়া না, কোনো যুক্তি দাঁড় করানো না। শুধু জিজ্ঞেস করবে সে কেমন আছে। আর একটা কথা—কলেজের কথা টেনে আনবে।"

​"কলেজের কথা কেন?" বাবা একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

​"বলবে যে কলেজে ক্লাসে পড়াতে গেলে নাকি ইদানীং বইয়ের পাতার বদলে তোমার মুখ ভেসে ওঠে," আমি হেসে বললাম।

​বাবা চোখ দুটো বড় বড় করে আমার দিকে তাকাল। "তুই আমাকে দিয়ে এসব কী বলাচ্ছিস শাহেদ! এই বয়সে এসে এমন ডায়লগ বলা সাজে?"

​"তুমি কি মাকে ফেরত চাও, নাকি আবার সেই লোকলজ্জার দোহাই দিয়ে একা একা বসে থাকবে?"
​বাবার মুখটা আবার নিচু হয়ে গেল। ফোনটা কানে চেপে ধরল। লাউডস্পিকার অন করা ছিল না, কিন্তু রিং হওয়ার শব্দ আমি পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছিলাম। তিনবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে মা ফোন রিসিভ করল। তবে কোনো কথা বলল না। একদম নিস্তব্ধ।
​বাবা গলার ভেতরের থুতু গিলে একটু কেশে নিল।

"রুকসানা... শুনছো?"
​ওপাশ থেকে মামার বাড়ির হালকা গুঞ্জন শোনা গেল, কিন্তু মায়ের কোনো জবাব নেই।
​বাবা একটু শক্ত হয়ে বসে কাঁপাকাঁপা গলায় বলতে শুরু করল, " কে কেমন আছো? খেয়েছো কি? শরীরটা ভালো আছে তো?"

​ওপাশে নীরবতা অব্যাহত রইল। মা হয়তো বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে এই মানুষটা সত্যি তাকে এসব কথা জিজ্ঞেস করছে।
​বাবা একটু বিরতি দিল। আমার দিকে তাকাল, আমি হাত দিয়ে ইশারা করলাম আসল কথাটা বলতে। বাবা একটা গভীর শ্বাস নিয়ে বলতে লাগল, "আসলে... আজ কলেজে ক্লাসে দাঁড়িয়েছিলাম। টেবিলের ওপর বই খোলা ছিল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার কী জানো? বইয়ের পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে আমি ক্লাসে কিছুই বলতে পারলাম না। সারাক্ষণ বইয়ের মধ্যে শুধু তোমার মুখটাই ভেসে উঠছিল। এতগুলো বছর তোমাকে কোনোদিন বুঝে উঠিনি রুকসানা..."

​কথাটা শেষ করেই বাবা এক সেকেন্ড না দাঁড়িয়ে ফোনের লাল বোতামটা চেপে কল কেটে দিল! বাবার কপালে পুরো ঘাম জমে গেছে। লোকটা বুক হাঁপাতে হাঁপাতে চশমাটা আবার খুলে ফেলল।

​আমি হেসে ফেললাম। "কলটা কেটে দিলে কেন? মা কী বলে শোনোইনি তো!"
​"না না, আর নেওয়া যাচ্ছিল না," বাবা ঘেমে নিয়ে একাকার হয়ে বলল। "বুকটা ধকধক করছিল। জীবনের প্রথমবার এমন কথা বললাম।"
​আমি বুঝতে পারলাম, প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে এটুকুই যথেষ্ট। মা যে ওপাশে কতটা অবাক হয়েছে, তা অনুমান করতে আমার কষ্ট হলো না। ১৮ বছর ধরে যে লোকটা একটা মিষ্টি কথা বলেনি, তার মুখ থেকে এমন বাক্য শুনে মা নিশ্চয়ই হতবাক হয়ে বসে আছে।

​পরদিন সকালে আমি নতুন একটা পরিকল্পনা করলাম। মাকে শুধু ফোনে মিষ্টি কথা বললেই হবে না, কাজের মাধ্যমেও দেখাতে হবে যে বাবা সত্যি বদলাচ্ছে। আমি বাবার ল্যাপটপটা নিয়ে ড্রয়িংরুমে আসলাম।
​"বাবা, মায়ের সবচেয়ে পছন্দের রঙ কোনটা বলতো?"
​বাবা একটু ভেবে বলল, "সবুজ রঙ ও বেশি পছন্দ করে মনে হয়। আর ওই জামদানি টাইপের শাড়িগুলো বেশি পড়ে।"
​আমি অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকালাম। "তার মানে তুমি জানতে মা কী পছন্দ করে?"

​বাবা অপরা*ধীর মতো মাথা নিচু করে বলল, "জানতাম রে শাহেদ। কিন্তু কখনো বলা হয়নি বা নিজ থেকে কিনে দেওয়া হয়নি। দোকানে গেলে নরমাল যা চোখে পড়ত, তাই কিনে আনতাম।"

​"তাহলে আজ সেই ভুল শুধরাতে হবে।" আমি অনলাইন শপিংয়ের একটা ভালো ওয়েবসাইট খুললাম। সেখানে বেশ কিছু সুন্দর আসল ঢাকার জামদানি শাড়ির কালেকশন ছিল। বাবার সামনে ধরে বললাম, "এখান থেকে মায়ের জন্য একদম গাঢ় সবুজ রঙের সুন্দর একটা জামদানি শাড়ি পছন্দ করো।"

​বাবা চশমাটা নাকের ওপর একটু নামিয়ে বেশ মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। চার-পাঁচটা শাড়ি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখার পর একটা খুব সুন্দর কাজের শাড়ির ওপর গিয়ে আঙুল রাখল।
​"এইটা ভালো লাগছে শাহেদ। আঁচলের কাজটা তোর মায়ের পছন্দের মতো।"

​আমি অনলাইনে শাড়িটার অর্ডার কনফার্ম করলাম। ডেলিভারি অ্যাড্রেস দিলাম মামার বাড়ির ঠিকানা। আর মেসেজের জায়গায় লিখে দিলাম—"১৮ বছর ধরে লোকলজ্জার ভ''য়ে যা বলতে পারিনি, আজ এই শাড়ির সাথে পাঠালাম। সময় দিলে কি একবার আমার এই ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার সুযোগ দেবে?"

​অর্ডার সম্পন্ন হওয়ার পর বাবা আমার দিকে তাকিয়ে একরকম ইতস্তত করে বলল, "তোর মামার বাড়ির এলাকার লোকজন কিন্তু বেশ কড়া। কুরিয়ারের লোক যখন পার্সেল নিয়ে যাবে, সবাই তো দেখবে। তোর মামা-মামীরা আবার কী মনে করবে?"
​আমি বাবার দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বললাম, "বাবা! আবার লোকলজ্জা?"
​বাবার মুখটা মুহূর্তেই বদলে গেল। একটু থেমে বাবা নিজের ভুল বুঝতে পারল। তারপর একটা মৃদু হাসি দিয়ে বলল, "না, একদম না। লোকে যা বলার বলুক। আমি আমার স্ত্রীকে শাড়ি পাঠিয়েছি, এতে কারো কাছে কৈফিয়ত দেওয়ার কিছু নেই।"

​কথাটা শুনে আমার ভেতরেও একটা প্রশান্তি এল। মানুষটা পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। এতদিন যে দেয়ালটা বাবা নিজের চারপাশে তুলে রেখেছিল, সেটা ইট বাই ইট ভাঙছে।
​দুই দিন পর বিকেলবেলা। আমরা দুইজন ঘরে বসে আছি। এমন সময় আমার ফোনে মায়ের নম্বর থেকে কল এল। আমি স্পিকার অন করে ফোনটা রিসিভ করলাম।
​"হ্যাঁ মা বলো," আমি স্বাভাবিক গলায় বললাম।
​ওপাশ থেকে মায়ের গলা ভেসে এল। কিন্তু গলাটা যেন কেমন ভারাক্রান্ত, আবার তার মধ্যে এক অদ্ভুত অনুভূতি মেশানো।
​"শাহেদ... তোর বাবা এই শাড়িটা পাঠিয়েছে?"
​আমি বাবার দিকে তাকালাম। বাবা আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল, চোখ দিয়ে আকুতি ঝরছে।
​আমি বললাম, "হ্যাঁ মা, বাবা নিজের পছন্দ করে অনলাইন থেকে অর্ডার দিয়ে পাঠিয়েছে। সাথে কোনো মেসেজ আছে?"

​মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব নিচু গলায় বলল, "তোর বাবা এসব নাটক কেন করছে বলতো? এই বয়সে এসে আবার এসব কিসের ভ*ণ্ডামি?"

​মায়ের কথায় রা''গ ছিল, কিন্তু সেই রা''গের গভীরতার পেছনে একটা চমকে যাওয়ার ছাপও ছিল। মা নিশ্চয়ই চিঠিটা পড়েছে।

​আমি বাবাকে চোখের ইশারায় কথা বলতে বললাম। বাবা এবার আর পেছাল না। ফোনটা নিজের হাতে নিয়ে সোজা কানে দিল।

​"রুকসানা," বাবা খুব স্থির কিন্তু মার্জিত গলায় বলল। "এটা নাটক না। ১৮ বছর ধরে তোমাকে যে অপ*মান আর অবহেলা দিয়ে এসেছি, সেটার সামনে এই শাড়িটা কিছুই না। কিন্তু আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, তুমি যদি আর কোনোদিন ফিরে নাও আসো, তবুও আমি আর সেই পুরোনো খালেক হব না। এলাকার লোক কী বলল, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। তুমি শুধু শাড়িটা পরে একবার তোমার এই খামখেয়ালী স্বামীকে ক্ষমা করার কথা ভেবো।"

​কথাটা শেষ করে বাবা আর ফোন কাটল না। শান্ত হয়ে মায়ের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। ওপাশে মায়ের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। বহু বছর পর মা হয়তো আবার সেই মানুষটাকে আবিষ্কার করছিল, যাকে সে একসময় নিজের প্রেমিক হিসেবে পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল।

​চলবে...?

খুব তারাতাড়ি ৫ম পর্ব পোস্ট করা হবে ধন্যবাদ।

22/08/2026

আমার বউ তার প্রেমিকের সাথে ভেগে যাওয়ার পরে ফোনটা এলো!

ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আমি হেসে ফেললাম! কষ্ট নাকি নিজের কপালকে বিদ্রুপ করে হাসলাম নাকি অনেক অপেক্ষার পরে এই ফোনকলটি পেয়ে সত্যিই আনন্দিত হলাম বুঝতে পারছি না।

ইনকামিং কলের অপর প্রান্তে আমার প্রাক্তন!

ফোনটা কানে নিয়ে বললাম,

—- 'খবরটা পেয়ে গেছ? এত তাড়াতাড়ি? এত তাড়াতাড়ি এত দূর চলে গেছে?'

ওই প্রান্ত চুপচাপ থাকল কয়েক মূহুর্ত। তারপর স্বভাবগত ধীর কন্ঠে বলল,

—- 'কী হয়েছে, সাজ্জাদ? কী খবর?'

এতক্ষণ কী করব, কাকে বলব, কাকে জানাব, কীভাবে কীভাবে কী হবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। হুড়মুড় করে ভেঙে পড়লাম,

—- 'দিশা, আমার বউ চলে গেছে!'

—- 'কে চলে গেছে?'

—- 'সাথী চলে গেছে! আমার বউ চলে গেছে।'

—- 'কবে? আর কোথায় চলে গেছে?'

আমি এবার একটু স্থির হলাম। প্রাক্তন হলেও, ওই মানুষটা, দিশা, আমার সমস্ত শক্তির জায়গা ছিল এক সময়। আব্বা মরে গেল, সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র আমি তখন, পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে ভেবে অকুল পাথারে পড়েছিলাম। দিশা তখন প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনটির কার্যকরী কমিটির ছাত্র কল্যান সম্পাদক পদবিধারী। শুধু নামে নয়, কাজেও সে ছিল তাই! আমি যখন আমার সমস্যার কথা বললাম, সোনালি ফ্রেমের চশমাটা খুলে আয়তচোখে গভীর তাকিয়ে বলেছিল,, —- 'ওঠ!'

আমি অসহায় তাকিয়েছিলাম শুধু।

ওই উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিল,

—- 'দরীদ্র তহবিল থেকে যা ব্যবস্থা করে দিতে পারব তা দিয়ে মাস দুই ঠেক দিতে পারবি বড়োজোর। তারপর? চল তোর পার্মানেন্ট ব্যবস্থা করি?’

সেইদিন দুটো টিউশন হলো আমার, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ছেড়ে সস্তার মেসবাড়িতে ঠিকানা হলো, কোন চিপার কোন হোটেলে দুবেলা খেয়ে আসলে পকেটের সাস্থ্যের খুব একটা তারতম্য হয় না, কোন ভাইয়ের কাছে লাগাতার ধর্না দিতে থাকলে বিরক্ত হয়ে বই আর নোট ছুঁড়ে দেন, ওইদিন সমস্ত পাঠ পেয়ে গিয়েছিলাম আমি দিশার কাছে।

অনেকের কাছে, অনেক সমস্যার সমাধানে দিশা, ওর নামের মতোই পথের দিশা!

সেই পথনির্দেশনা পেতেই আমি আকুল হলাম,

—- 'আমার সাথে গত সন্ধ্যায়ও কথা হয়েছে। আমি বললাম, খবরদার সাথী ঘর ছাড়বা না। আমি আসতেছি। আমি আজ সকালে পৌঁছে শুনি, সে গতকালও এখানে ছিল না। তিন দিন হলো সে বাড়িতে নাই। আমার ছেলেটাকেও নিয়ে গেছে। আমার আয়াত! বাপপাগল ছেলে, ওর মা বকলেই ও আমাকে ফোন করে। বলে, আব্বু চলে আসো? আজ তিন দিন, আমার ছেলেটা কেমন করে আছে?’

— 'আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে খোঁজ নিয়েছিস? বন্ধু-বান্ধব?'

—- 'সব জায়গায় খোঁজ করেছি। ঘরে ওর একটা ছবি বা ভোটার আইডি, কোনো কাগজ কিছু রেখে যায়নি!'

—- 'দেখ, আমার মনে হয়, বাচ্চা নিয়ে গেছে যখন, কোনো বন্ধু বা কাজিন এইরকম কারো বাসায় গিয়েছে। তোর সাথে ঝগড়া হয়েছে বললি না, এইজন্যই লুকিয়ে আছে।'

—- 'না, দিশা না। ঘটনা সেরকম নয়!'

—- 'দেখ, তোর বউকে তো আমি চিনি না। ইন জেনারেল বলছি, বাচ্চাকে নিয়ে যেই মা বের হয়, সে আর যাই হোক এরকম খারাপ হতে পারে না!'

—- 'ওরে দিশা রে, সবাই তোমার মতো আদর্শবাদী নয়। আমি খোঁজ নিয়ে শিওর হয়েই বলছি। বাচ্চার সাথে ভিডিও কলে কথা বলি বলে এন্ড্রয়েড সেট কিনে দিয়েছিলাম। সাথী সারাদিন ওই মোবাইলে লুডু খেলে। তা খেলুক। খারাপ কিছু তো করে না, ভেবে আমিও ডাটা কিনে কিনে দিতাম। ওই লুডু খেলতে পার্টনার লাগে। সেই পার্টনার হচ্ছে এই ছেলে। অনলাইনে লুডু খেলতে খেলতে প্রেম! অনেক আগে নম্বর সেইভ করেছিল আমার শালীর নম্বরে। সেই নম্বরে একটা ছেলের হোয়াটসঅ্যাপ খোলা। হোয়াটসঅ্যাপ আইডিতে গিয়ে দেখি, ডিপিতে আমার বউ আর সেই ছেলের ছবি। একসাথে। রিকশায়। সাথীর মাথায় ফুলের ক্রাউন। মানে, এই যে ফেব্রুয়ারিতে ভালোবাসা দিবস গেল না, ওইদিন ওই ছেলের সাথে বেরিয়েছিল? আমাকে বলেছিল, মাথা ব্যথা, শুয়ে থাকবে। আমি যেন ফোন না দিই!'

— 'কী বলিস!'

—- 'এখন কী করব আমার মাথায় আসছে না রে...'

—- 'আগে খুঁজে তো বের কর? তোর বাচ্চাটা আছে সাথে।'

— 'কীভাবে কী করব আমার মাথায় আসছে না রে...'

— 'আন্টিকে কী বলেছিস?'

—- 'ওই সাথীর জন্যই মায়ের সাথে আমার সম্পর্ক নেই আজ চার বছর। ওর অনেক বদনাম ছিল। আমার সাথে বিয়ে হওয়ার আগে একবার পালিয়েছিল এলাকার এক ছেলের সাথে। তারপর আমার সাথে প্রেম হয়। ওকে প্রেমের বিয়ে করেছি বলেই মা আমাকে ত্যাজ্য করেছে!'

– ‘কী বলিস? তুই যে বলেছিলি আমার চলাফেরা ছেলেদের মতো বলে আন্টির পছন্দ নয় আমাকে। তাই মায়ের পছন্দে সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিস। তাহলে তোর প্রেমের বিয়ে হলো কখন?'

প্রেম-প্রতারণা
পর্ব_০১
আফসানা আশা

চলবে...

22/08/2026

আপার আঁচল
পর্ব ০৭
শাহেদ খান

​অত্যা*চারের মাত্রা দিন দিন এতই বেড়ে যাচ্ছিল যে ঘরে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। স্কুলের খাতা-কলম কেনার টাকা তো দূরের কথা, দু-বেলা দু-মুঠো ভাত পাওয়াও ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একদিন সকাল সকাল নতুন মা তার প*ঙ্গু ছেলেকে নিয়ে পাশের পাড়ায় কার এক বাড়িতে গেল। আব্বাও সকাল সকাল কাজের উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেছে। খালি বাড়ি পেয়ে আপা আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, "চল শাহেদ, আজ ফুফুর বাড়ি যাব।"

​নতুন মাকে বলে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না, বললে হয়তো আমাদের পা বাড়াতেই দিত না। আমরা কাঁচা পথ ধরে প্রায় তিন মাইল হেঁটে বড় ফুফুর বাড়ি পৌঁছালাম। উঠানে ফুফুকে দেখেই আপা আর ধরে রাখতে পারল না, দৌড়ে গিয়ে ফুফুকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে লাগল। আমি ফুফুর আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে চোখের পানি মুছছিলাম।
​ফুফুও আমাদের বুকে চেপে ধরে চোখ ভাসাল। কতক্ষণ পর কান্নার তোড় একটু কমলে ফুফু আমাদের ঘরে নিয়ে বসাল, আচল দিয়ে মুখ মুছিয়ে ভাত সামনে দিল। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছিল, আমরা দু-ভাইবোন গপগপ করে খেতে লাগলাম।

​খাওয়া শেষে আপা ফুফুর হাত দুটো নিজের দুই হাতের মুঠোয় চেপে ধরল। আপার মুখটা তখন বড্ড কাতর দেখাচ্ছিল।
​আপা বলল, "ফুফু, আমারে একটা কাজ খুঁজে দাও না। শহরের বা গ্রামের কোনো ভালো বাড়িতে চাকরের কাজ হলেও আমি করব। আব্বা তো শাহেদের পড়ালেখার জন্য একটা পয়সাও দেয় না। ইস্কুলের মাস্টার মশাই খাতার জন্য রোজ তাগাদা দেয়।"

​ফুফু আপার এই শুকিয়ে যাওয়া ছোট শরীরটার দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠল। আপার মাথায় হাত বুলিয়ে ব্যাকুল গলায় বলল, "মা রে, তুই এই ছোট শরীর নিয়ে কীভাবে কাজ করবি? এতটুকু বয়সে তোকে লোকের দুয়ারে কাজ করতে পাঠালে আমার ম*রা মায়ের আ**ত্মা যে শান্তি পাবে না রে।"

​আপা চোখ দুটো শক্ত করে বলল, "আমি পারব ফুফু। শাহেদের জন্য আমার পারতেই হবে। ও না পড়লে আমাদের এই আঁধার কোনোদিন কাটবে না। আমি খেটে ম*রব, তাও শাহেদকে আমি পড়ালেখা করাব।"

​ফুফু আপাকে বুকের সাথে চেপে ধরে নীরব হয়ে গেল। বিকেলের রোদ পড়ে এলে ফুফু আমাদের বিদায় দিল।
​সন্ধ্যায় যখন আমরা বাড়ি ফিরলাম, তখন উঠানে কুপির আলো জ্বলছে। নতুন মা বারান্দায় বসে ছিল, আর আব্বা তামাক খাচ্ছিল। আমাদের উঠানে ঢুকতে দেখে আব্বার মুখের চেহারায় এক চিলতে স্বস্তির ছাপ ফুটল বটে, কিন্তু সেই স্বস্তি উবে গেল নতুন মায়ের চোখ রাঙানিতে।
​নতুন মা তেড়ে এসে মুখে বিশ্রী গা*লিগা*লাজ শুরু করল, "হয়েছে! নবাবের বেটি আর বেটা সারাদিন পর ফিরলেন! কোথায় ছিল এতক্ষণ? কার বাড়ি গিয়ে মুখ লুকিয়ে বসেছিলি? ঘরে কাজকাম ফেলে রেখে কোন চুলোয় যাওয়া হয়েছিল?"

​আব্বা তামা*কের নোলকটা একপাশে রেখে একটু রা*গী সুরেই শুধাল, "কই গিয়েছিলি তোরা সারাদিন? না বলে-কয়ে এভাবে না খেয়েবাড়ি থেকে বের হওয়া কিসের জন্য?"

​আপা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলল, "ফুফুর বাড়ি গেছিলাম।"
​'ফুফুর বাড়ি' শব্দটা শুনতেই নতুন মা ফোঁ*স করে উঠল, "শোনো কথা! ওনারা ফুফুর বাড়ি গিয়ে আমার নামে কুতসা গাইতে গিয়েছিলেন! তগো ফুফু তো তোদের মাথায় আরো বাতাস দিচ্ছে। আবার যদি ওই ভিটেয় পা দিয়েছিস, তবে তোদের ঠ্যাং ভে*ঙে আমি ঘরে বসিয়ে রাখব!"

​আপা কোনো জবাব দিল না। চুপচাপ আমার হাত ধরে চালার ঘরে চলে এলো।
​এই ঘটনার দুই দিন পর সকালে হঠাৎ ফুফু আমাদের বাড়িতে এলো। ফুফু উঠানে পা দিয়ে আব্বা আর নতুন মায়ের দিকে ফিরেও তাকাল না, কোনো কথা বলল না। সোজা আমাদের ঘরের পেছনের চালার ঘরে চলে এলো।

​ফুফু আপার হাতটা ধরে টেনে কোণে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, "মা রে, তোর জন্য একটা কাজের ব্যবস্থা করেছি। আমার জামাইয়ের গ্রামের পাশেই এক মস্ত বড় ধনী পরিবার থাকে। তারা বেশিরভাগ সময় ঢাকায় থাকে। গ্রামের বাড়িতে এসেছিল, কাল-পরশু ঢাকায় ফিরে যাবে। তারা তোদের দুজনকে ঢাকায় নিয়ে যেতে রাজী হয়েছে।"
​কথাটা শুনে আপার চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য বড় বড় হয়ে উঠল। ফুফু বলতে লাগল, "তাদের বাড়িতে তোকে রান্নাবান্না আর খুচরো কাজকাম করতে হবে। কাজের বিনিময়ে তারা তোদের দুজনের পেটের ভাত দেবে, পরনের জামাকাপড় দেবে আর শাহেদকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে পড়ালেখার সব খরচ জোগাবে।"

​ফুফুর কথা শেষ হতে না হতেই আপার মলিন মুখে এক অদ্ভুত বিজয়ের আলো ফুটে উঠল। আপা ফুফুকে জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল, "সত্যি বলছ ফুফু? শাহেদ তাইলে শহরের স্কুলে পড়ব?"

​ফুফু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আপার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, "হ রে মা , তাই তো বলল তারা। কিন্তু শাহেদের এই পড়ার জন্য তোকে কোনো বেতন দেবে না। তোকে বিনা বেতনে দিনরাত খেটে যেতে হবে। তুই পারবি তো রেণু?"

​আপার চোখের কোণে পানি এসে জমেছিল, কিন্তু তা আনন্দের। আপা ফুফুর হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে বলল, "টাকা দিয়ে আমি কী করব ফুফু? শাহেদ পড়ালেখা করতে পারলেই আমার সব পাওয়া হয়ে যাবে। আমি দিনকে রাত বানিয়ে কাজ করব, তাও ওকে আমি শহরের স্কুলে পড়াব।"

​আমি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আপার কথাগুলো শুনছিলাম। আপা শুধু আমার ভবিষ্যতের জন্য নিজের জীবনটা এক ধনী পরিবারের হাতে তুলে দিতে এক পায়ে রাজী হয়ে গেল। ঘরের বাইরে থেকে তখনো নতুন মায়ের খিস্তি-খেউড় আর তার ছেলের গোঙানির আওয়াজ আসছিল, কিন্তু ঘরের ভেতরে আমার আপার উড়নার আঁচলে পেঁচানো ছিল এক বুক স্বপ্ন আর এক নতুন আলোর দিশা।

​চলবে...?

খুব শীঘ্রই ৮ম পর্ব পোস্ট করা হবে।

22/08/2026

নায়েবান_বঁধু
পর্ব_২৬
ইযারা_হক

সময়টা তখন পরের দিন। একদম ভোর ভোর হয়েছে এমন একটা টাইম। চৌধুরী বাড়ির সবার অবস্থা এখন আরও নাজেহাল। সারা রাত খুঁজেও তারা আরশিয়ার কোনো খুঁজ পায়নি। কর্তাগন পুলিশের উপর নানা রকম ভাবে হম্বিতম্বি করছে। পুলিশ এখনো আরশিয়ার কোনো খোঁজ পাচ্ছে না কেনো? পরে অহন সবাইকে সামলেছে। তবে কিছুক্ষণ আগে তাদের এই বিষয়েও টনক নড়েছে যে শুধু আরশিয়াকে না, বরং গতকাল রাত থেকে অয়নকেও পাওয়া যাচ্ছে না।

অহন সেটা জানতে পেরেই অয়নকে অনেকবার কল দিয়েছিল, কিন্তু তার মোবাইল সুইচ অফ দেখাচ্ছিলো। এরপর অয়ন বাড়ির বাকি সবাইকে শান্ত করতে মিথ্যে বলেছে যে,

‘অয়ন আছে এক জায়গায়’

তাই শুনে চৌধুরীর বাড়ির সবাই আপাতত অয়নকে নিয়ে কম চিন্তা করছে। কিন্তু আরশিয়াকে নিয়ে তারা খুব ব্যতিব্যস্ত হয়ে আছে। আরশিয়ার মা রিনা বেগম আরও দুইবার জ্ঞান হারিয়েছেন। আরশিয়ার বাবা ইমরান চৌধুরীর অবস্থাও ভালো না।

অহন এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছে। আর কয়েকদিন পরেই অরির এইচএসি পরীক্ষা। এইতো মাসেকখানেক! কিন্তু পরীক্ষা হওয়া সত্ত্বেও সে এখান থেকে যেতে পারছে না। তার শ্বশুরবাড়িতে এত বড় একটা ঝামেলা চলছে, সে যাবে কিভাবে?

সে তো আর মনুষ্যত্বহীন নয়।

*

সময়টা তখন ঠিক ভোর ছয়টা। চৌধুরী বাড়ির তিন কর্তা মাত্রই বাসা থেকে বের হয়ে গেছে ফের আরশিয়াকে খোঁজার জন্য। অরি আর কাজের মেয়ে মিনু তারা এক সাইডে দাঁড়িয়ে আছে। আপাতত অরি গিন্নির মতো মিনুকে বোঝাচ্ছে আজকের মেনু কি হবে! চিন্তায় এমন না খেয়ে থাকলে তো হবে না! গতকাল দুপুর থেকেই কারও ঠিকমতো খাওয়া হয় নি। খাদিজা বেগম সোফার এক কর্নারে বসে আছেন। অপর পাশে বসে আছে তাদের দাদিমা জাহানারা বেগম। অহন আর নাহিদ মাত্রই আরশিয়াকে খোঁজার জন্য বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এমন সময় চৌধুরী বাড়ির দরজা ভেদ করে অয়ন এবং আরশিয়া দুজনেই প্রবেশ করলো। দুজনের পায়ে কেমন থমথমে ভাব। অয়নের মুখটা গম্ভীর হয়ে আছে। অপর দিকে আরশিয়ার অবস্থা আরও বিরাট। যেন ওর দেহ আছে কিন্তু প্রাণ নেই, এমন একটা মুখাবয়ব। ওদের দুজনকে সবার প্রথম দেখলো মিনু।

দেখা মাত্রই চোখ বড় বড় করে বিরাট এক চিৎকার দিয়ে বলল,

'ওই তো দেহো, অয়ন ভাই আর আরশিয়া আপা একলগে আইছে। তোমরা কে কোনহানে আছো, দেহো, তাড়াতাড়ি।'

মিনুর এমন চিৎকারে ড্রয়িং রুমে থাকা সবার দৃষ্টিই গেল অয়ন এবং আরশিয়ার দিকে। যারা দরজায় এসে মাত্রই দাঁড়িয়েছে। তাদের দেখা মাত্রই চৌধুরী বাড়ির সবাই হুড়মুড়িয়ে তাদের কাছে এগিয়ে আসলো। রিতা বেগম এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে ফেললেন। জাহানারা বেগমও আরশিয়ার হাতে এবং মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ছটফটে গলায় শুধালেন,

'কোথায় ছিলি তুই? কই গেছিলি? তোর মায়ের কী অবস্থা হইছে তুই জানোস? পরান যায়-যায় অবস্থা।'

জাহানারা বেগমের সাথে খাদিজা বেগমও তাল মিলিয়ে বললেন,

'কোথায় ছিলি তুই মা? জানিস না তোকে আমরা কত ভালোবাসি? তোর বাপ চাচার অবস্থা তো একেবারে নাজেহাল হয়ে গিয়েছিল তোকে খুঁজে না পেয়ে। এতক্ষণ কোথায় ছিলি?’

তাদের এত জিজ্ঞাসার পরিবর্তেও আরশিয়া কোনো কথা বললো না। কেবল একবার মুকের মতো মাথা তুলে তাকালো সবার দিকে। অপরদিকে অয়ন আরশিয়াকে এখনো এক সাইড থেকে ধরে আছে।

প্রায় মিনিট পাঁচেক পর রিতা মেয়েকে ছেড়ে দিলেন। এরপর মাথা তুলে মেয়ের সারা মুখে আদর ও স্নেহের চুমু খেলেন। এরপর কাঁদতে কাঁদতে এক প্রকার ফুঁপিয়ে শুধালেন,

'কোথায় ছিলি তুই মা? মায়ের সাথে রাগ করেছিস? আর বকবো না তোকে। কোথায় গিয়েছিলি?'

আরশিয়া এবারেও কোনো প্রতুত্তর করলো না। প্রানহীন চোখে তাকালো। তার ভেতরে যে কি চলছে। সে কাউকে বোঝাতে পারবে না। পরপর এতগুলো শক যেন সে নিতে পারছে না। নিতে না পারাটাই স্বাভাবিক।

এদিকে এতক্ষনে সুযোগ পেয়ে অহন এগিয়ে আসলো। প্রথমেই অয়নের কাছে এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখলো। অহনকে দেখা মাত্রই যেন অয়নের সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেলো। সে হুট করে অহনকে জড়িয়ে ধরলো। কিন্তু কোনো কথা বললো না। অহনও পাল্টা জড়িয়ে ধরলো, সেও কোনো কথা বললো না। বুঝলো তার ছোট ভাইয়ের মন এখন কোনো কিছু নিয়ে অস্বস্তিতে আছে। অয়নের এই স্বভাব তার জানাই আছে। তাই তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করলো। মিনিট দুয়েক পর তাকে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। এরপর কাটকাটে গম্ভীর গলায় আরশিয়া এবং অয়নের উদ্দেশ্যে বললো,

‘তোমরা নিজেদের রুমে যায়। ফ্রেশ হয়ে এসো। এ নিয়ে পরে কথা হবে।’

এরপর একটু থেমে বাড়ির সবার দিকে তাকিয়ে বললো,

‘আর কেউ তোমরা ওদের বিরক্ত করো না। ওরা ফিরে এসেছে এটাই বড়ো কথা। বাকিসব আলোচনা পরে হবে। আমি বাবা, ও চাচ্চুদের কল দিয়ে খবর জানিয়ে দিচ্ছি। ওরা ফিরুক আগে'

অহনের কথার বিপরীতে কেউ দ্বিরুক্তি করলো না। সবাই মাথা নাড়লো। রিতা বেগম মেয়েকে নিয়ে রুমের দিকে গেলেন। খাদবজা বেগমও জাহানারা বেগমকে নিয়ে ওনার রুমের দিকে গেলেন। অয়ন আরও আগেই নিজ রুমে চলে গিয়েছে। এমনভাবে একে একে বাড়ির সবাই যার যার কাজে চলে গেলো। অহন যেহেতু বলেছে পরে আলোচনা করবে তাহলে সেটাই ভালো। শুধু অরি একদিকে দাঁড়িয়ে আছে। মূলত সবকিছু দেখেও সে কিছু বুঝতে পারে নি। বোঝার কথাও না, যতক্ষণ না আরশিয়া আর অয়ন সব খোলাসা করছে ততক্ষণ কিছুই বোঝা যাবে না।

‘এই যে ম্যাম? আপনি আমার রুমে আসুন।’

হুট করেই অহনের কন্ঠে অরির ধ্যান ভাঙলো। সে মাথা তুলে অহনের দিকে তাকালো। এরপর ভ্রু কুচকে শুধালো,

‘কেনো?’

অহন ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললো। সে খুব ক্লান্ত। তার মানসিক শারীরিক দুইভাবেই প্রেসার গিয়েছে। এখন আর শরীরটা একদম সায় দিচ্ছে না। তাই খানিকটা হেয়ালি করেই বললো,

‘স্বামী সেবার জন্য। আপনার স্বামী খুব টায়ার্ড! একটু রেস্ট চাচ্ছে। আসবেন?’

অরি এক ঠোট কামড়ে ধরলো। এরপর এদিক সেদিক তাকিয়ে মিনমিন করে বললো,

‘আসছি'

‘দ্রুত’ - বলেই অহন আর দাঁড়ালো না। গটগট করে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেলো। পিছু পিছু অরিও গেলো। আপাতত স্বামী সেবা করা যাক। সে নিজেও বুঝেছে অহন অনেক ক্লান্ত। তাই বিপরীতে কোনো কথা বলে নি। শান্ত স্বরে সায় জানিয়েছে।

*

বেলা তখন সকাল দশটার কাঁটায়। অহন অরির কোলে মাথা গুঁজে দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। মূলত তখন অরি রুমে আসতেই অহন তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে তাকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে তার কোলে মাথা গুঁজে দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে আদেশ দিয়েছিল,

'আমি ঘুমাবো। মাথায় হাত বুলিয়ে দাও। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমার ঘুম ভাঙে, ততক্ষণ এক পাও নড়বে না।'

অরি বাধ্য মেয়ের মতোই অহনের আদেশ মেনে নিয়েছিল। এরপর অহনের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে কখন যে নিজেও ঘুমিয়ে গিয়েছিল, তা জানতেই পারলো না। এখন জানালা ভেদ করে আসা সূর্যের তীক্ষ্ণ রশ্মিতে তার ঘুম ভেঙে গিয়েছে। ভেঙে গিয়েছে বললে ভুল হবে, হালকা হয়ে গিয়েছে।

অরি ঘুম ঘুম চোখে মাথা নাড়লো। এরপর পিটপিট করে চোখ খুললো। সর্বপ্রথম কয়েক মিনিট সময় নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে নিল। এরপর নড়াচড়া করতে যাবে, তখনই নিজের কোলে ভারী কিছু অনুভব করলো। নিচের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল অহনের মাথা তার কোলের মধ্যে রয়েছে। অহনের ঘুম এখনো ভাঙেনি।

অরি কিছুক্ষণ সময় নিয়ে অহনের দিকে তাকিয়ে থাকলো। এরপর আড়মোড়া ভেঙে অহনের মুখের ওপর ঝুঁকে আসলো। অহন খুব শান্তভাবে ঘুমাচ্ছে। দেখতে একদম নিষ্পাপ লাগছে। জেগে থাকলে তো একদম বাঘের মতো গম্ভীর হয়ে থাকে মুখটা পেঁচার গম্ভীর করে রাখে সবসময়। যেন মুখের মধ্যে কেউ জোর করে তিতকরলা গুঁজে দিয়েছে, অনেকটা এমন ভাব! অরি নিজের মাথাটা ঝুঁকিয়ে অহনের মুখের সামনে নিয়ে আসলো। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস অহনের মুখের উপর পড়ছে। অহনের কোনো নড়চড় নেই। হয়তো গভীর ঘুমে নিমগ্ন।

অরি কিছুক্ষণ এক নাগারে অহনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। অহনের মুখ, নাক, গাল, চোখ, ঠোঁট সবকিছু একদম তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করলো। এরপর হুট করেই এক হাত তুলে অহনের এক গালের চাপদাড়িতে রাখলো। হালকা করে হাত বুলিয়ে দিলো। কেমন সুড়সুড়ি লাগছে।

অরির বেশ মজা লাগছে। এরপর অপর হাতটাও অহনের আরেক গালে দিয়ে দিলো। তার হাতে সুড়সুড়ি অনুভব হচ্ছে। অরি এবার শব্দ করে হেসে ফেললো। কিন্তু এই শব্দেই অহনের ঘুম ভেঙে গেলো। অহনের ঘুম ভাঙতে দেখে অরি হকচকিয়ে নিজের হাত সরাতে চাইলো। কিন্তু অহন দিলো না। খপ করে অরির দুই হাতটা নিজের হাতের মধ্যে পুড়ে নিলো। এরপর ঘুম ঘুম গভীর হাস্কি স্বরে শুধালো,

'কি ব্যাপার ম্যাম? চুপচাপ বসে আমার সৌন্দর্য উপভোগ করা হচ্ছে?'

অরির যেন লজ্জায় মাথা কাটা যায়। সে লজ্জায় মাথাটা নিচের দিকে দিয়ে রাখলো। এরপর মিনমিন করে বললো,

'স.. সরি।'

অহন একটু শব্দহীন হাসলো। এরপর একদস হুট করেই অরিকে নিজের নিচে শুইয়ে দিলো। মিনিটের মধ্যে সে অরির উপরে উঠে গিয়ে নিজের মুখটা অরির কাঁধে গুঁজে দিলো। সেখানে আলতো করে ঠোট ছুঁয়ে শুধালো,

'সরি কেন? আমি তো আপনারই প্রপার্টি। সমস্যা নেই তো। আমার তো ভালোই লাগছিলো।'

অরি চোখ বড় বড় করে দেখালো। অনুভূতিতে তার শরীরের পশম দাড়িয়ে গিয়েছে। তবে সেসব প্রকাশ না করে বরং বিস্ময়ের স্বরে অহনকে শুধালো,

'তার মানে আপনি ঘুমোননি? ভান কর়ছিলেন?'

অহন একটু দুষ্টু এসে বললো,

'না ঘুমিয়ে ঘুমানোর ভান করে যদি বউয়ের এমন সেবা পাওয়া যায়, তাহলে এমন ভান করা তো সমস্যার কিছু না।’

অহনের কথায় অরি লজ্জা পেয়ে নিজের মুখটা অহনের প্রশস্ত বুকে গুঁজে দিলো। অহন একটু হেসে উঠলো। এরপর মুখটা অরির কপালের কাছে নামিয়ে সেখানে আলতো করে দুটো চুমু খেয়ে বললো,

'উঠুন ম্যাম। ভেতরের আমিটাকে জাগিয়ে দেবেন না। আপাতত সঠিক সময় না। নিচে যেতে হবে।'

অহনের কথায় অরি এবার মাথা তুলে তাকালো। এরপর অহনের কথা মতো সেখান থেকে মুখ সরালো। অহন নিজেও অরির উপর থেকে উঠে পড়লো। এরপর ওয়াশরুমে যেতে বললো,

'বসুন। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।'

অরি বসলো। প্রায় মিনিট পাঁচেক সময় নিয়ে অহন ফ্রেশ হয়ে আসলো। এরপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তোয়ালে দিয়ে নিজের মাথাটা মুছতে মুছতে অরির দিকে তাকিয়ে শুধালো,

'চলে যাবে আজ-ই?'

অহনের প্রশ্নে অরি একটু হেসে মাথা দোলালো। প্রতুত্তর করলো,

'হুম, আজকেই চলে যাবো'

অহন যে সন্তুষ্ট হলো না, তা তার মুখ দেখেই বুঝা গেলো।

'আরেকদিন থেকে যাও'

অরি একটু দুষ্টুমির স্বরে শুধালো,

'কেনো থাকলে কি দিবেন?'

অহন সিরিয়াসভাবে ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলো,

'কি চাও তুমি?'

অরি খানিকটা ভেবে এবারও দুষ্টুমির স্বরে বললো,

'আমি তো চাই সমুদ্র দেখতে। নিয়ে যাবেন নাকি?'

অহন এগিয়ে আসলো। এরপর একটু ঝুঁকে এসে বললো,

'আরে সেখানে নিয়ে গেলে আমি কি পাবো?'

'কি চান?'

'যদি বলি তোমাকে?'

চলমান……….

22/08/2026

গতকাল রাতে আম্মা দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন আমার স্কুল টিচারকে, যে আমাকে নানার বাড়ি থাকতে বাসায় এসেও প্রাইভেট পড়াতো। এই কথাটি আজকে খালা আমাকে ফোনে জানালো। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিলাম, "বাবা যদি ফিরে আসে?"
​খালা তখন বললো, "তোর বাবা আর ফিরে আসবে না শাহেদ। লোকটা ১০ বছর ধরে নিখোঁজ। হয়তো মা**রা গেছে।"
​আমি তার কথা থামিয়ে দিয়ে বললাম, "ভালো থেকো, রাখলাম।"
​ওমনি খালা তাড়াতাড়ি বললো, "শাহেদ, শাহেদ! বাবা, আগেই ফোন রেখে দিস না। তোকে যে জন্য ফোন দিয়েছি সে কথা এখনো বলা হয়নি।"

​"কি কথা খালা? তাড়াতাড়ি বলো।"

​খালা তখন আমতা আমতা করে বললো, "তোর আম্মাকে একটা ফোন দিস। তোকে ফোন দেওয়ার সাহস পাচ্ছে না তোর আম্মা।"
​"আমি কোনো ফোন দিতে পারবো না, আমার সময় নেই। ভালো থেকো।"— বলে ফোনটা কে''টে দিলাম।
​কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে ফোনটা যখন খাটটার ওপর ছুঁড়ে ফেললাম, তখন বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি খালি লাগছিল। মেসের এই ছোট ঘরটায় দুপুরের এই সময়টায় ভীষণ গরম পড়ে। মাথার ওপর পুরোনো ফ্যানটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে ঘুরে চলেছে, কিন্তু ঘরের বাতাস একটুও ঠান্ডা হচ্ছে না। আমি খাটের একপাশে এসে চুপচাপ বসে রইলাম। হাতদুটো কাঁপছিল কিছুটা।
​আমার যখন ৫ বছর, তখন বাবা প্রবাসে যায়। দেশ ছাড়ার আগের দিন রাতের কথা আমার আজও আবছা মনে আছে। বাবা ঘরের মেঝেতে বসে প্যাক করা ব্যাগের ওপর হাত রেখে আম্মাকে আর আমাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদছিল। বাবাকে কাঁদতে দেখে আম্মাও হাউমাউ করে কেঁ*দে উঠেছিল, আর আমি কিছু না বুঝেই ওদের জড়িয়ে ধরে কান্না জুড়ে দিয়েছিলাম।

বাবার গায়ের একটা বিশেষ গ''ন্ধ ছিল—আতর আর ঘোমের মেশানো একটা গ''ন্ধ। সেই গ''ন্ধটা আজও আমার নাকে লেগে আছে।

​বাবা বিদেশে যাওয়ার পর প্রথম এক মাস নিয়মিত ফোন করতো। তারপর হঠাৎ করেই একদিন সেই ফোন আসা বন্ধ হয়ে গেল। বাবা আর ফোন দেয় না। নানার বাড়ি দাদার বাড়ির মানুষজন কতভাবে চেষ্টা করলো, বাবার সাথে যারা একই ঘরে থাকতো সেই রুমমেটদের সাথেও যোগাযোগ করা হলো। কিন্তু তারাও কিছু বলতে পারলো না। তারা শুধু জানালো, একদিন সকালে বাবা কাজে বের হয়েছিল, তারপর আর কাজ থেকেও ফেরেনি, ঘরেও আসেনি।

​বাবার এই আচমকা হাওয়া হয়ে যাওয়াটা আম্মাকে পুরোপুরি ভে''ঙে ফেলেছিল। দিনরাত শুধু কেঁদে কেঁদে আম্মার চোখের কোল কালো হয়ে গিয়েছিল। উপায় না দেখে নানা এসে আমাদের দুইজনকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে গেলেন।

​তারপর দেখতে দেখতে দশটা বছর পার হয়ে গেল। এই ১০ বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে। আমি নানার বাড়িতে বড় হয়েছি, ওখানকার স্কুলেই পড়াশোনা করেছি। এবার এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর হোস্টেলে উঠেছি। আসলে নানার বাড়ির আশ্রয়ে আর কত দিন থাকা যায়? নিজের একটা আলাদা জগত দরকার ছিল। কিন্তু আজ খালার মুখ থেকে এই খবরটা শোনার পর মনে হচ্ছে, জীবনের পুরোনো ভিত্তিটাই যেন এক ঝটকায় উপড়ে গেল।

​যে মানুষটা আমাকে টানা ৫ বছর অংক পড়ালো, যাকে আমি 'স্যার' বলে ডেকে এসেছি, সে এখন আমার মায়ের স্বামী—কথাটা ভাবতেই মাথার রগগুলো যেন লাফিয়ে উঠছে। ওই স্যার যখন নানার বাড়িতে আমাকে পড়াতে আসতেন, তখন মাঝে মাঝেই আম্মার সাথে টুকটাক কথা বলতেন। আম্মা তার জন্য চা-নাস্তা নিয়ে আসতো। আমি কোনোদিন বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পারিনি যে তাদের মধ্যে এমন কিছু তৈরি হতে পারে। কিংবা হয়তো তারা দুজনেই একা ছিলেন বলেই এমনটা ঘটেছে। কিন্তু আমার কাছে তো বাবা মানে এখনো সেই লোকটা, যিনি চলে যাওয়ার সময় আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন।

​ফোনের স্ক্রিনটা আবার জ্বলে উঠলো। আম্মার নম্বর ভেসে উঠছে। আমি স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে রইলাম, কিন্তু রিসিভ করার ইচ্ছা হলো না। কলটা কেটে গিয়ে আবার বাজতে শুরু করলো।

​মেসের বারান্দায় দিয়ে কেউ একজন হেঁটে গেল, তার জুতোর শব্দ কানে আসতেই আমি চোখ বন্ধ করলাম। চোখ দুটো কেন যেন ভীষণ জ্বা*লা করছে। আম্মা ফোনটা কেন করছে? আমাকে সান্ত্বনা দিতে? নাকি নিজের অপরা*ধবোধ হালকা করতে? যে মানুষটা দশ বছর ধরে স্বামীর পথ চেয়ে বসে ছিল, সে কি এত সহজে অতীতকে মুছে ফেলতে পারলো?

​খাট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাইরে নিচের গলিতে দুটো ছোট ছেলে ফুটবল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে। ওদের হাসির শব্দ ভেসে আসছে। ঠিক এই বয়সে আমার জীবনটাও এমন স্বাভাবিক হতে পারতো। বাবার নিখোঁজ হওয়া আর আজকের এই নতুন সত্যিটা—দুটোর মাঝে দাঁড়িয়ে আমি নিজেকে খুব একা বোধ করছি।

​মোবাইলটা টেবিলের ওপর বাজতেই থাকলো। আমি ফোনটার দিকে এক পা বাড়ালাম, তারপর আবার থেমে গেলাম। এই মুহূর্তে আম্মার গলার আওয়াজ শুনলে আমি কী বলবো? তাকে কি হাসি মুখে বলবো খুব ভালো কাজ করছো আম্মা, নাকি রা*গ দেখাবো? নাকি জিজ্ঞেস করবো, "তুমি কি বাবার জন্য আর কিছুদিন অপেক্ষা করতে পারতে না?"

​কোনো প্রশ্নেরই তো সহজ উত্তর নেই। আমি ধীরপায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। ঘরে আর একা একা থাকা সম্ভব হচ্ছে না। অন্তত বাইরের ভিড়ে মিশে গেলে হয়তো ভেতরের এই তোলপাড় খানিকটা কমবে। কিন্তু ঘর থেকে বের হওয়ার আগেই পকেট থেকে পার্সটা বের করতে গিয়ে হাতে লাগলো একটা পুরোনো কাগজ। পার্সের চেইন খুলতেই বেরিয়ে এলো বাবার সেই একমাত্র ছবিটা—যা বিদেশে যাওয়ার আগে তোলা হয়েছিল।
​ছবিতে বাবা হাসছে, পাশে ছোটবেলার আমি। ছবিটার দিকে তাকিয়ে আমি মনে মনে শুধু একটা কথাই ভাবলাম—বাবা, তুমি সত্যিই কোথায় হারিয়ে গেলে?

চলবে...?

পরিস্থিতির শিকার
পর্ব ০১
শাহেদ খান

22/08/2026

লোকলজ্জা
পর্ব ০৩
শাহেদ খান

​মা এক কাপড়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। যাওয়ার সময় একবারও পিছন ফিরে তাকায়নি। ড্রয়িংরুমে বসে থাকা বাবার সহকর্মীরা একে একে উঠ দাঁড়িয়ে আস্তে করে বিদায় নিলেন। কারো মুখেই কোনো কথা ছিল না। পরিস্থিতিটা এমন এক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকল যে, সান্ত্বনা দেওয়ার মতো উপযুক্ত ভাষা কারো জানা ছিল না।
​ঘরটা মুহূর্তেই একদম খালি হয়ে গেল। তিন রুমের এই মাঝারি সাইজের বাসাটাতে মা যখন ছিল, তখন হয়তো অনেক কথা হতো না, কিন্তু একটা জীবন্ত মানুষের উপস্থিতি টের পাওয়া যেত। আজ মা পা বাড়াতেই যেন চারপাশের দেওয়ালগুলো হাঁ করে গিলে খেতে আসল।

​বাবা সোফায় জড়সড় হয়ে বসে রইল। চশমাটা খুলে হাতের তালুতে নিয়ে কতক্ষণ যে ঘষে ঘষে মুছল, তার কোনো হিসাব নেই। যেই লোকলজ্জাকে আড়াল করতে গিয়ে বাবা সারাজীবন নিজের ভেতরের আবেগগুলোকে চেপে রেখেছিল, আজ সেই লোকলজ্জাই যেন বাবাকে জীবন্ত দা*ফন করে দিয়ে গেল। কলেজের সহকর্মীরা চলে যাওয়ার পর বাবার চোখ দুটো কেমন কাঁচের মতো স্থির হয়ে রইল।

​রাত নামল। ডাইনিং টেবিলে কোনো লাইট জ্বলল না। রান্নাঘর থেকে হাঁড়ি-পাতিল নাড়াচাড়ার কোনো শব্দ এল না। আমি ঘরে বসে দেখছিলাম, বাবা ধীর পায়ে রান্নাঘরে গেল। কালকের বাজার করা মাছের থলেটা সেখান থেকেই দুর্গ*ন্ধ ছড়াচ্ছিল। বাবা নিজে হাতে থলেটা তুলে ডাস্টবিনে ফেলল। তারপর সিঙ্কের পাশে দাঁড়িয়ে কয়েকটা শুকনো থালাবাসন এপাশ-ওপাশ করল। কোনোদিন যে মানুষটা এক গ্লাস পানিও নিজের হাতে ঢেলে খায়নি, সে আজ রান্নাঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দিকবিদিক হারিয়ে ফেলছিল।
​পরদিন সকালের দৃশ্যটা আরো করুণ। বাবা কলেজে গেল না। জীবনের প্রথমবার বাবাকে দেখলাম কোনো শারীরিক অসুস্থতা ছাড়াই বিছানায় চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। টেবিলের ওপর ইস্ত্রি না করা কলেজের জামাটা তেমনই পড়ে রইল। মা প্রতিদিন সকালে যে সুগন্ধি সাবানের গন্ধ আর ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ নিয়ে ঘরে ঢুকত, সেই অভ্যস্ত সকালটা আজ পুরোপুরি অনুপস্থিত।
​দুপুরের দিকে চাচাদের ফোন আসতে শুরু করল। গ্রামের চায়ের দোকানে নাকি অলরেডি রটে গেছে, খালেকের বউ তাকে ছেড়ে চলে গেছে। এলাকার যেই লোকগুলোর ভ*য়ে বাবা সারাজীবন শিউরে উঠত, আজ তারাই ফোনে বাবার সাথে সমবেদনা জানানোর নামে কৌতুক করছিল। বাবা ফোনটা বেশিক্ষণ কানে ধরে রাখতে পারল না। একপর্যায়ে মোবাইলটা বন্ধ করে টেবিলে রেখে দিল।
​আমি খেয়াল করলাম, বাবা গ্রামের মানুষের এই আলোচনার চেয়েও বেশি ভেঙে পড়েছে অন্য এক কারণে। সেটা হলো মায়ের অনুপস্থিতি। সারাজীবন মা যে নিঃশব্দ সেবাটা দিয়ে এসেছে—খেতে বসার আগে পানির গ্লাস এগিয়ে রাখা, গোসলের পর তোয়ালেটা হাতে তুলে দেওয়া, এই অভ্যাসগুলো এখন বাবাকে প্রতি মুহূর্তে কামড়াতে শুরু করেছে। বাবা আসলে বুঝতেই পারেনি, শাসন করার আড়ালে সে মায়ের সেবার ওপর কতটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।

​তিন দিন কে*টে গেল। ঘরটা ধীরে ধীরে নোংরা হতে শুরু করল। ধুলোর আস্তরণ জমল সোফার ওপর। মা থাকা অবস্থায় যা কোনোদিন দেখা যায়নি। বাবা রাতে ঘুমায় না, শুধু ড্রয়িংরুম থেকে শোবার ঘর পর্যন্ত হেঁটে বেড়ায়। যে মানুষটা কোনোদিন স্ত্রীর সাথে নরম গলায় কথা বলেনি, সে আজ মায়ের ফেলে যাওয়া একটা সাধারণ সুতির শাড়ির আঁচল হাত দিয়ে ধরে অনেকক্ষণ বসে থাকে।
​আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না। বাবার এই অসহায় রূপটা দেখে মনের ভেতরের রাগটা কোথাও যেন একটু নরম হয়ে এল। লোকটা ভুল করেছে, কিন্তু ভুলের মাশুল দিতে গিয়ে এখন একেবারে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে।

​চতুর্থ দিন বিকেলে বাবা যখন বারান্দার গ্রিল ধরে বাইরে তাকিয়ে ছিল, আমি পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
"বাবা, এভাবে আর কত দিন চলবে?"
​বাবা হুট করে ফিরে তাকাল। তার চোখের নিচে কালি জমেছে, গালের দাড়িগুলো না কামানোর কারণে বেশ বড় হয়ে গেছে। শিক্ষক মানুষটার চেহারায় সেই কড়া ভাবটা আর বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট নেই।

​"তুই তোর মায়ের সাথে কথা বলেছিস শাহেদ?" বাবা খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল।
​"বলেছি। মা মামার বাড়িতেই আছে। খুব শান্তিতে আছে বাবা," আমি সরাসরি বললাম। "আইনি কাগজ তৈরি হচ্ছে। মা এবার সত্যি আর ফিরবে না।"

​কথাটা শুনে বাবার মুখের রঙ এক মুহূর্তে বদলে গেল। গ্রিলটা আরো শক্ত করে চেপে ধরে বলল, "আমি কি সত্যি তাকে এত কষ্ট দিয়েছি? আমি তো কোনো অভাব দিইনি রে শাহেদ..."
​"তুমি অভাব দাওনি, কিন্তু মানুষ হিসেবে তাকে কোনোদিন ভালোবাসোনি," আমি বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম। "এলাকার চারটে মূর্খ লোক কী বলবে, সেই ভয়ে তুমি নিজের বউকে ১৮ বছর একটা ব*ন্দী জীবন দিয়েছ। তুমি পাড়াপ্রতিবেশি লোকের জন্য তুমি মায়ের প্রেমিক হয়ে উঠতে পারো নি বাবা। আর আজ সেই লোকগুলোই তোমাকে নিয়ে হেসে কূল পাচ্ছে, আর তুমি ঘরে একা বসে কান্নাকাটি করছো।"

​বাবা মাথা নিচু করে ফেলল। কোনো প্রতিবাদ করল না।
​আমি বাবার কাঁধে হাত রাখলাম। "বাবা, মাকে যদি সত্যি ফিরিয়ে আনতে চাও, তবে ওই সরকারি কলেজের প্রফেসরের মুখোশটা খুলে ফেলতে হবে। সমাজের লোকলজ্জার ভ*য় ঝেড়ে ফেলতে হবে। তোমাকে আবার সেই ২৪ বছরের যুবকের মতো ভাবতে হবে, যে একটা নতুন মেয়েকে ভালোবাসার জন্য লড়াই করতে পারে। মাকে ইমপ্রেস করতে হবে। নতুন করে তার মন জয় করতে হবে।"
​বাবা চশমার ওপর দিয়ে আমার দিকে কেমন করে জানি তাকাল। চোখ দুটো কিছুটা বড় বড় হয়ে গেল। যেন এই বয়সে এসে এমন কথা শুনবে, সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি। একজন বাবা তার সন্তানের মুখ থেকে নিজের বউকে ইমপ্রেস করার কথা শুনছে—এটা বাবার কাছে অদ্ভুত ঠেকছিল।

​কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর বাবার মুখের সেই অবিশ্বাসের ভাবটা কেটে গেল। চোখের চশমাটা ঠিক করে নিয়ে বাবা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মুখের চেহারায় কোনো অহংকার ছিল না, ছিল না কোনো কৃত্রিম গাম্ভীর্য। স্পষ্ট বোঝা গেল, আমার এই প্রস্তাবে লোকটা ভেতরে ভেতরে পুরোপুরি রাজি হয়ে গেছে।
​বাবা শুকনো গলায় বলল, "কিন্তু কীভাবে? সে তো আমার চেহারাও দেখতে চায় না..."
​আমি হালকা হাসলাম। "সেই পথ আমি দেখাচ্ছি। কিন্তু তার আগে তোমাকে শপথ করতে হবে, এলাকার লোক কী বলল না বলল, তা নিয়ে আর কোনোদিন ভাববে না।"
​বাবা ধীর গতিতে মাথা নাড়ল। ১৮ বছর ধরে জমে থাকা অহংকারের বরফটা অবশেষে গলতে শুরু করল।

​চলবে...?

খুব শীঘ্রই চতুর্থ পর্ব পোস্ট করা হবে

Address

Cumilla

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Masud Rana Nehal posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Masud Rana Nehal:

Shortcuts

Share