22/08/2026
লোকলজ্জা
পর্ব ০৪
শাহেদ খান
বাবার সম্মতি পাওয়ার পর আমি আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করলাম না। এতদিন যে মানুষটা শুধু আদেশ দিতে অভ্যস্ত ছিল, সে আজ শিক্ষানবিশের মতো আমার সামনে বসে রইল। বাবার ভেতরের সেই কড়া প্রফেসরের ভাবটা এক নিমেষে উধাও হয়ে গেছে। সেখানে জায়গা করে নিয়েছে একজন স্ত্রীর জন্য ভুগতে থাকা পঁয়তাল্লিশ বছরের পুরুষ, যে নিজের স্ত্রীকে নতুন করে ফিরে পেতে চায়।
আমি ড্রয়িংরুমের সোফায় গিয়ে বসলাম। বাবাকে ইশারা করে পাশে বসতে বললাম। বাবা ধীর পায়ে এসে বসল।
"শোনো বাবা," আমি গম্ভীর গলায় বললাম, "মা এতদিন শুধু একটা জিনিসেরই অভাব বোধ করেছে—তোমার মুখ থেকে দুটো ভালো কথা। শাড়ি-গয়না তো তুমি আগেও দিতে, কিন্তু কখনো তার পেছনের আবেগটা ছিল না। এখন তোমাকে ফোন দিয়ে মায়ের সাথে কথা বলতে হবে।"
বাবা আঁতকে উঠে বলল, "এখনই ফোন করব? সে যদি ফোন কেটে দেয়? বা যদি রিসিভ না করে?"
"কেটে দিলে দিক, তাহলেও তো চেষ্টাটা হলো। তুমি নিজের ফোনটা বের করো।"
বাবা পকেট থেকে ফোনটা বের করল। হাতটা হালকা কাঁপছিল। আমি ডায়াল প্যাড খুলে মায়ের নম্বরটা তুলে বাবার হাতে দিলাম।
"ফোনটা কানে দিয়ে তুমি একদম সাধারণ কথা বলবে। কোনো ঝগ*ড়া না, কোনো যুক্তি দাঁড় করানো না। শুধু জিজ্ঞেস করবে সে কেমন আছে। আর একটা কথা—কলেজের কথা টেনে আনবে।"
"কলেজের কথা কেন?" বাবা একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
"বলবে যে কলেজে ক্লাসে পড়াতে গেলে নাকি ইদানীং বইয়ের পাতার বদলে তোমার মুখ ভেসে ওঠে," আমি হেসে বললাম।
বাবা চোখ দুটো বড় বড় করে আমার দিকে তাকাল। "তুই আমাকে দিয়ে এসব কী বলাচ্ছিস শাহেদ! এই বয়সে এসে এমন ডায়লগ বলা সাজে?"
"তুমি কি মাকে ফেরত চাও, নাকি আবার সেই লোকলজ্জার দোহাই দিয়ে একা একা বসে থাকবে?"
বাবার মুখটা আবার নিচু হয়ে গেল। ফোনটা কানে চেপে ধরল। লাউডস্পিকার অন করা ছিল না, কিন্তু রিং হওয়ার শব্দ আমি পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছিলাম। তিনবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে মা ফোন রিসিভ করল। তবে কোনো কথা বলল না। একদম নিস্তব্ধ।
বাবা গলার ভেতরের থুতু গিলে একটু কেশে নিল।
"রুকসানা... শুনছো?"
ওপাশ থেকে মামার বাড়ির হালকা গুঞ্জন শোনা গেল, কিন্তু মায়ের কোনো জবাব নেই।
বাবা একটু শক্ত হয়ে বসে কাঁপাকাঁপা গলায় বলতে শুরু করল, " কে কেমন আছো? খেয়েছো কি? শরীরটা ভালো আছে তো?"
ওপাশে নীরবতা অব্যাহত রইল। মা হয়তো বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে এই মানুষটা সত্যি তাকে এসব কথা জিজ্ঞেস করছে।
বাবা একটু বিরতি দিল। আমার দিকে তাকাল, আমি হাত দিয়ে ইশারা করলাম আসল কথাটা বলতে। বাবা একটা গভীর শ্বাস নিয়ে বলতে লাগল, "আসলে... আজ কলেজে ক্লাসে দাঁড়িয়েছিলাম। টেবিলের ওপর বই খোলা ছিল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার কী জানো? বইয়ের পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে আমি ক্লাসে কিছুই বলতে পারলাম না। সারাক্ষণ বইয়ের মধ্যে শুধু তোমার মুখটাই ভেসে উঠছিল। এতগুলো বছর তোমাকে কোনোদিন বুঝে উঠিনি রুকসানা..."
কথাটা শেষ করেই বাবা এক সেকেন্ড না দাঁড়িয়ে ফোনের লাল বোতামটা চেপে কল কেটে দিল! বাবার কপালে পুরো ঘাম জমে গেছে। লোকটা বুক হাঁপাতে হাঁপাতে চশমাটা আবার খুলে ফেলল।
আমি হেসে ফেললাম। "কলটা কেটে দিলে কেন? মা কী বলে শোনোইনি তো!"
"না না, আর নেওয়া যাচ্ছিল না," বাবা ঘেমে নিয়ে একাকার হয়ে বলল। "বুকটা ধকধক করছিল। জীবনের প্রথমবার এমন কথা বললাম।"
আমি বুঝতে পারলাম, প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে এটুকুই যথেষ্ট। মা যে ওপাশে কতটা অবাক হয়েছে, তা অনুমান করতে আমার কষ্ট হলো না। ১৮ বছর ধরে যে লোকটা একটা মিষ্টি কথা বলেনি, তার মুখ থেকে এমন বাক্য শুনে মা নিশ্চয়ই হতবাক হয়ে বসে আছে।
পরদিন সকালে আমি নতুন একটা পরিকল্পনা করলাম। মাকে শুধু ফোনে মিষ্টি কথা বললেই হবে না, কাজের মাধ্যমেও দেখাতে হবে যে বাবা সত্যি বদলাচ্ছে। আমি বাবার ল্যাপটপটা নিয়ে ড্রয়িংরুমে আসলাম।
"বাবা, মায়ের সবচেয়ে পছন্দের রঙ কোনটা বলতো?"
বাবা একটু ভেবে বলল, "সবুজ রঙ ও বেশি পছন্দ করে মনে হয়। আর ওই জামদানি টাইপের শাড়িগুলো বেশি পড়ে।"
আমি অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকালাম। "তার মানে তুমি জানতে মা কী পছন্দ করে?"
বাবা অপরা*ধীর মতো মাথা নিচু করে বলল, "জানতাম রে শাহেদ। কিন্তু কখনো বলা হয়নি বা নিজ থেকে কিনে দেওয়া হয়নি। দোকানে গেলে নরমাল যা চোখে পড়ত, তাই কিনে আনতাম।"
"তাহলে আজ সেই ভুল শুধরাতে হবে।" আমি অনলাইন শপিংয়ের একটা ভালো ওয়েবসাইট খুললাম। সেখানে বেশ কিছু সুন্দর আসল ঢাকার জামদানি শাড়ির কালেকশন ছিল। বাবার সামনে ধরে বললাম, "এখান থেকে মায়ের জন্য একদম গাঢ় সবুজ রঙের সুন্দর একটা জামদানি শাড়ি পছন্দ করো।"
বাবা চশমাটা নাকের ওপর একটু নামিয়ে বেশ মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। চার-পাঁচটা শাড়ি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখার পর একটা খুব সুন্দর কাজের শাড়ির ওপর গিয়ে আঙুল রাখল।
"এইটা ভালো লাগছে শাহেদ। আঁচলের কাজটা তোর মায়ের পছন্দের মতো।"
আমি অনলাইনে শাড়িটার অর্ডার কনফার্ম করলাম। ডেলিভারি অ্যাড্রেস দিলাম মামার বাড়ির ঠিকানা। আর মেসেজের জায়গায় লিখে দিলাম—"১৮ বছর ধরে লোকলজ্জার ভ''য়ে যা বলতে পারিনি, আজ এই শাড়ির সাথে পাঠালাম। সময় দিলে কি একবার আমার এই ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার সুযোগ দেবে?"
অর্ডার সম্পন্ন হওয়ার পর বাবা আমার দিকে তাকিয়ে একরকম ইতস্তত করে বলল, "তোর মামার বাড়ির এলাকার লোকজন কিন্তু বেশ কড়া। কুরিয়ারের লোক যখন পার্সেল নিয়ে যাবে, সবাই তো দেখবে। তোর মামা-মামীরা আবার কী মনে করবে?"
আমি বাবার দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বললাম, "বাবা! আবার লোকলজ্জা?"
বাবার মুখটা মুহূর্তেই বদলে গেল। একটু থেমে বাবা নিজের ভুল বুঝতে পারল। তারপর একটা মৃদু হাসি দিয়ে বলল, "না, একদম না। লোকে যা বলার বলুক। আমি আমার স্ত্রীকে শাড়ি পাঠিয়েছি, এতে কারো কাছে কৈফিয়ত দেওয়ার কিছু নেই।"
কথাটা শুনে আমার ভেতরেও একটা প্রশান্তি এল। মানুষটা পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। এতদিন যে দেয়ালটা বাবা নিজের চারপাশে তুলে রেখেছিল, সেটা ইট বাই ইট ভাঙছে।
দুই দিন পর বিকেলবেলা। আমরা দুইজন ঘরে বসে আছি। এমন সময় আমার ফোনে মায়ের নম্বর থেকে কল এল। আমি স্পিকার অন করে ফোনটা রিসিভ করলাম।
"হ্যাঁ মা বলো," আমি স্বাভাবিক গলায় বললাম।
ওপাশ থেকে মায়ের গলা ভেসে এল। কিন্তু গলাটা যেন কেমন ভারাক্রান্ত, আবার তার মধ্যে এক অদ্ভুত অনুভূতি মেশানো।
"শাহেদ... তোর বাবা এই শাড়িটা পাঠিয়েছে?"
আমি বাবার দিকে তাকালাম। বাবা আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল, চোখ দিয়ে আকুতি ঝরছে।
আমি বললাম, "হ্যাঁ মা, বাবা নিজের পছন্দ করে অনলাইন থেকে অর্ডার দিয়ে পাঠিয়েছে। সাথে কোনো মেসেজ আছে?"
মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব নিচু গলায় বলল, "তোর বাবা এসব নাটক কেন করছে বলতো? এই বয়সে এসে আবার এসব কিসের ভ*ণ্ডামি?"
মায়ের কথায় রা''গ ছিল, কিন্তু সেই রা''গের গভীরতার পেছনে একটা চমকে যাওয়ার ছাপও ছিল। মা নিশ্চয়ই চিঠিটা পড়েছে।
আমি বাবাকে চোখের ইশারায় কথা বলতে বললাম। বাবা এবার আর পেছাল না। ফোনটা নিজের হাতে নিয়ে সোজা কানে দিল।
"রুকসানা," বাবা খুব স্থির কিন্তু মার্জিত গলায় বলল। "এটা নাটক না। ১৮ বছর ধরে তোমাকে যে অপ*মান আর অবহেলা দিয়ে এসেছি, সেটার সামনে এই শাড়িটা কিছুই না। কিন্তু আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, তুমি যদি আর কোনোদিন ফিরে নাও আসো, তবুও আমি আর সেই পুরোনো খালেক হব না। এলাকার লোক কী বলল, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। তুমি শুধু শাড়িটা পরে একবার তোমার এই খামখেয়ালী স্বামীকে ক্ষমা করার কথা ভেবো।"
কথাটা শেষ করে বাবা আর ফোন কাটল না। শান্ত হয়ে মায়ের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। ওপাশে মায়ের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। বহু বছর পর মা হয়তো আবার সেই মানুষটাকে আবিষ্কার করছিল, যাকে সে একসময় নিজের প্রেমিক হিসেবে পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল।
চলবে...?
খুব তারাতাড়ি ৫ম পর্ব পোস্ট করা হবে ধন্যবাদ।