04/09/2026
কুমিল্লায় শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা
শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ও ‘জয় শ্রীকৃষ্ণ’ ধ্বনিতে মুখর নগরী
তাপস চন্দ্র সরকার :
“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত...” — পবিত্র শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই অমর বাণীকে সামনে রেখে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে কুমিল্লায় পালিত হয়েছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী মহোৎসব।
এ উপলক্ষে শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) শ্রীশ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উদযাপন কমিটি, কুমিল্লার উদ্যোগে দিনব্যাপী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সকাল সাড়ে ৮টায় নগরীর রাণীর বাজার রোডস্থ শ্রীশ্রী রাসস্থলী ও রামঠাকুর আশ্রমের প্রধান ফটকের সামনে থেকে বের হয় বর্ণাঢ্য জন্মাষ্টমী শোভাযাত্রা।
বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতীক, ব্যানার-ফেস্টুন, কীর্তন, ধর্মীয় সংগীত ও ভক্তিমূলক পরিবেশনায় শোভাযাত্রাটি নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি এবং ভক্তদের ‘জয় শ্রীকৃষ্ণ’, ‘হরে কৃষ্ণ’সহ বিভিন্ন জয়ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে নগরী।
শোভাযাত্রায় নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশু-কিশোর ও তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। কৃষ্ণ-রাধার সাজে সজ্জিত শিশুদের অংশগ্রহণ ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা শোভাযাত্রায় যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে নগরবাসীকেও শোভাযাত্রা উপভোগ করতে দেখা যায়।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট কুমিল্লা মহানগর শাখার আহ্বায়ক ও শ্রীশ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উদযাপন কমিটি কুমিল্লার আহ্বায়ক শ্রী শ্যামল কৃষ্ণ সাহার সভাপতিত্বে শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হাজী আমিন-উর রশিদ ইয়াছিন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও দর্শন সত্য, ন্যায়, মানবতা, কর্তব্যবোধ ও শান্তির পথে চলার শিক্ষা দেয়। অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার যে চেতনা শ্রীকৃষ্ণের জীবনাদর্শে রয়েছে, তা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে ধারণ করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’—এই চেতনা ধারণ করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও সুদৃঢ় করতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসূফ মোল্লা টিপু এবং জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিজ রোজী আকতার।
শোভাযাত্রায় আরও অংশ নেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি চন্দন কুমার রায়, সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ তাপস কুমার বকসী, আইসিটি সম্পাদক অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার, মহানগর শাখার আহ্বায়ক কমল চন্দ খোকন, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নারায়ণ চন্দ্র সরকার, মহানগর শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি অচিন্ত্য দাশ টিটু, সাধারণ সম্পাদক পিংকু চন্দ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আশীষ দাসসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
এছাড়া ইসকন কুমিল্লা জগন্নাথপুরের মন্দির কমিটির সভাপতি সুদর্শন জগন্নাথ দাস ব্রহ্মচারী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মৃত্যুঞ্জয় যুধিষ্ঠি দাস ব্রহ্মচারী, মহেশাঙ্গণ শ্রীশ্রী লোকনাথ স্মৃতি তর্পণ সংঘের সাধারণ সম্পাদক হারাধন ভৌমিক, বিভিন্ন মন্দির ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শোভাযাত্রায় অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও দর্শনের শিক্ষা শুধু ধর্মীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; সত্য, ন্যায়, মানবতা, কর্তব্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এই শিক্ষা সর্বজনীন। বর্তমান সময়ে হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভাজন পরিহার করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
শ্রীশ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উদযাপন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক সঞ্জিত দেবনাথ স্বাগত বক্তব্য দেন। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক সুব্রত চৌধুরী তপু। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কমিটির সদস্য সচিব দিলীপ কুমার নাগ কানাই।
দিনব্যাপী আয়োজনে ধর্মীয় সংগীত, কীর্তন, কৃষ্ণের বাল্যলীলা ও রাধা-কৃষ্ণের প্রতীকী উপস্থাপনাসহ নানা আয়োজন ছিল। ভক্তদের নৃত্য, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে পুরো আয়োজন হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।
আয়োজক ও ভক্তরা বলেন, জন্মাষ্টমীর মূল শিক্ষা হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়। শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ ধারণ করে সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও মানবিকতার চর্চা আরও বাড়ানোর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তারা।
শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, কীর্তনের সুর আর ‘জয় শ্রীকৃষ্ণ’ ধ্বনিতে এদিন মুখর হয়ে ওঠে কুমিল্লা নগরী।
#কুমিল্লার_ডাক #সাম্প্রদায়িক_সম্প্রীতি