24/06/2026
সফরনামা — পর্ব ১
আমার দুই দিনের সংক্ষিপ্ত রূহানি সফর
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
আলহামদুলিল্লাহ। মহান আল্লাহ তাআলার অসীম অনুগ্রহে একটি সংক্ষিপ্ত, অথচ হৃদয়ের গভীরে অম্লান হয়ে থাকার মতো দুই দিনের রূহানি সফরে অংশগ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করেছি। এই সফর ছিল শুধু স্থান পরিবর্তনের নয়; বরং অনুভূতির, স্মৃতির, ভালোবাসার এবং আত্মার এক নীরব যাত্রা। সেই সফরের কিছু মুহূর্ত, কিছু আবেগ আর কিছু উপলব্ধিকে শব্দের মালায় গেঁথে রাখার ক্ষুদ্র প্রয়াসই এই সফরনামা। আল্লাহ তাআলা এটিকে কবুল করুন এবং এর মাধ্যমে কল্যাণ দান করুন। আমীন।
দিনটি ছিল রবিবার।
ভোরের আকাশ তখনও রাতের আঁধারকে পুরোপুরি বিদায় জানায়নি। দু-একটি তারা যেন বিদায়ের শেষ আলোটুকু নিয়ে আকাশের বুকে স্থির হয়ে ছিল। চারপাশে এমন এক নীরবতা, যেন পুরো পৃথিবী তার রবের স্মরণে নিমগ্ন।
ঠিক তখনই ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি বাতাস চিরে আমার কানে এসে পৌঁছাল।
আমি শয্যা ত্যাগ করলাম।
ঘরের বাইরে পা রাখতেই ভোরের শীতল বাতাস আমাকে আলতো করে স্পর্শ করল। মনে হলো, প্রকৃতি যেন আজ অন্যরকম সাজে সেজেছে। শিশিরভেজা ঘাস, কুয়াশায় ঢাকা পথ আর নির্মল আকাশ—সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, মহান রব আজকের দিনটিকে আমার জন্য বিশেষ করে রেখেছেন।
কারণ, আজকের ফজর ছিল আর দশটি দিনের মতো নয়।
আজ আমি শুধু মসজিদের দিকে যাচ্ছিলাম না; হৃদয় ছুটে যাচ্ছিল বহুদিনের লালিত এক আকাঙ্ক্ষার দিকে। আমার প্রাণের দুটি স্থান—প্রিয় মেখল মাদ্রাসা এবং হাটহাজারী—আজ আমাকে ডাকছিল। মনে হচ্ছিল, বহুদিনের বিচ্ছেদের পর কোনো আপনজনের সঙ্গে দেখা হতে চলেছে।
ফজরের নামাজ, তিলাওয়াত এবং দৈনন্দিন মামুলাত শেষ করে যখন বাড়িতে ফিরলাম, তখন দিনের শুরু হলেও আমার কাছে সময় যেন থেমে গেছে।
ঘড়ির কাঁটা যেন আর এগোতে চাইছিল না।
সন্ধ্যা ছয়টার অপেক্ষা আমার কাছে কয়েক ঘণ্টা নয়, যেন কয়েক যুগ।
প্রতিটি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, "আর কতক্ষণ?"
অবশেষে অপেক্ষার অবসান হলো।
গোধূলির আলো ধীরে ধীরে পৃথিবীকে বিদায় জানাচ্ছে। আমি মায়ের কাছে গেলাম। তাঁর কপালে হাত রেখে দোয়া চাইলাম। সেই দোয়ার উষ্ণতা যেন পুরো সফরের পাথেয় হয়ে গেল।
তারপর স্ত্রী ও সন্তানদের দিকে শেষবারের মতো তাকালাম। তাদের নীরব চোখের ভাষায় ছিল ভালোবাসা, দোয়া আর ফিরে আসার প্রত্যাশা।
বুকভরা আনন্দ আর অদ্ভুত এক আবেগ নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম।
আজ চট্টগ্রামের পথে উড়ে বেড়ানো ধুলোও আমার কাছে ধুলো ছিল না; প্রতিটি ধূলিকণা যেন প্রিয়জনের কাছে পৌঁছে যাওয়ার সংবাদ বহন করছিল।
আলহামদুলিল্লাহ।
সময়মতো আমাদের গাড়ি ছেড়ে দিল।
চালক সাহেব ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার মানুষ। পুরো সফরে মাগরিব থেকে ফজর পর্যন্ত প্রতিটি ওয়াক্তের নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করার সুযোগ পেয়েছি। দীর্ঘ পথের ক্লান্তির মাঝেও এই সৌভাগ্য সফরটিকে অন্য এক প্রশান্তিতে ভরে দিয়েছিল।
রাত ধীরে ধীরে ভোরে গড়াল।
ঘড়িতে তখন সকাল ৬টা ৩৫ মিনিট।
গাড়ি থামল ভাটিয়ারিতে।
সেখান থেকে সিএনজিতে হাটহাজারীর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।
এরপর শুরু হলো এক অন্যরকম পথচলা।
ভাটিয়ারি থেকে হাটহাজারীর পাহাড়ি পথ যেন আল্লাহর কুদরতের এক জীবন্ত তাফসির।
দুই পাশে আকাশছোঁয়া পাহাড়। তাদের বুকে সবুজের চাদর। ভোরের আবছা আলোয় পাহাড়গুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল, তারা যুগ যুগ ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে একটাই কথা বলছে—
"সুবহানাল্লাহ!"
সিএনজি যত সামনে এগোচ্ছিল, আমি ততই হারিয়ে যাচ্ছিলাম প্রকৃতির সেই নীরব ইবাদতে।
মনে হচ্ছিল, এই পাহাড়, এই গাছ, এই বাতাস—সবকিছুই তাদের নিজস্ব ভাষায় মহান রবের তাসবীহ পাঠ করছে।
শীতল বাতাস জানালার ফাঁক দিয়ে এসে মুখে লাগছিল, আর হৃদয়ের ভেতরে এক অদ্ভুত প্রশান্তির ঢেউ তুলছিল।
প্রতিটি বাঁক যেন আমাকে আরও কাছে নিয়ে যাচ্ছিল আমার বহুদিনের প্রতীক্ষিত গন্তব্যের।
---
প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর পৌঁছালাম হাটহাজারী বাসস্ট্যান্ডে।
নামতেই চারদিক থেকে রিকশাওয়ালাদের ডাক ভেসে এলো।
"হুজুর, রিকশা লাগবে?"
আমি শুধু মুচকি হেসে মাথা নাড়লাম।
আজ আমি হাঁটতে চাই।
কারণ, ভালোবাসার পথে হাঁটার ক্লান্তি বলে কিছু নেই।
দেড় কিলোমিটারের সেই পথ আমার কাছে কোনো দূরত্ব ছিল না; বরং প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল হৃদয়ের এক একটি ধুকপুকানি।
মনে হচ্ছিল, আমি কোনো মাদ্রাসার দিকে যাচ্ছি না; আমি ছুটে চলেছি এমন এক দরজার দিকে, যেখানে আমার জীবনের অসংখ্য স্মৃতি, অসংখ্য দোয়া এবং অসংখ্য অশ্রু আজও অপেক্ষা করে আছে।
যখন মানুষের ভালোবাসা আল্লাহর জন্য হয়, তখন পথের কষ্ট আনন্দে রূপ নেয়।
আজ সেই আনন্দই আমার সফরের সবচেয়ে বড় সঙ্গী ছিল।
হাঁটতে হাঁটতে কখন যে প্রিয় হাটহাজারী মাদ্রাসার প্রধান ফটকের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি, নিজেই টের পাইনি। মনে হচ্ছিল, পা দুটো আমাকে নয়, ভালোবাসাই টেনে নিয়ে এসেছে।
ফটকের সামনে দাঁড়িয়েই চোখে পড়ল একটি পরিচিত মুখ। আমারই প্রিয় ছাত্র—আমির হামজা। ছোট্ট যে ছেলেটিকে একদিন নিজের হাতে হিফজ সম্পন্ন করিয়ে উচ্চতর দ্বীনি শিক্ষার জন্য মেখলে পাঠিয়েছিলাম, আজ সে মিশকাত জামাতের ছাত্র। সময় যে কত দ্রুত মানুষকে বড় করে দেয়, তাকে দেখে যেন নতুন করে উপলব্ধি করলাম। সে এগিয়ে এসে এমন আন্তরিকতায় আমাকে গ্রহণ করল, যেন বহুদিন পর আপন কেউ ফিরে এসেছে।
মাদ্রাসার আঙিনায় পা রাখতেই হৃদয়ের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এলো। চারদিকে পরিচিত পরিবেশ, পরিচিত বাতাস, পরিচিত সেই নীরবতা—সবকিছুই যেন বহুদিনের বিচ্ছেদের পর আমাকে বুকে টেনে নিচ্ছিল।
কিন্তু দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিও তখন শরীরে স্পষ্ট।
মনে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব—এখনই কি প্রিয় হযরতের মাকবারায় ছুটে যাব, নাকি একটু বিশ্রাম নিয়ে নিজেকে সতেজ করব?
শেষ পর্যন্ত শরীরের হক আদায় করাকেই প্রাধান্য দিলাম। তিনতলার মেহমানখানায় গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু বিশ্রাম আর হলো কোথায়! একের পর এক বার্তা, খোঁজখবর আর প্রিয়জনদের ভালোবাসা—চোখ বন্ধ করার সুযোগই দিল না। কখন যে সকাল পেরিয়ে বেলা বাড়ল, বুঝতেই পারলাম না।
এরই মধ্যে আরেকটি ভালোবাসার গল্প নীরবে রচিত হচ্ছিল।
আমার প্রিয় দ্বীনি ভাই, মাওলানা নাসির উদ্দিন সাহেব, চট্টগ্রামের দূর প্রান্ত থেকে শুধু আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য চলে এসেছেন। আমি তাঁকে জোহরের পর আসতে বলেছিলাম। কিন্তু ভালোবাসা কি কখনো সময়ের হিসাব মানে?
আমি যেন বিশ্রামে ব্যাঘাত না পাই—এই ভেবে তিনি সকাল সাড়ে এগারোটা থেকেই মেহমানখানার দরজার বাইরে নীরবে বসে ছিলেন। একবারও দরজায় কড়া নাড়েননি। এই নীরব অপেক্ষার মূল্য শব্দে প্রকাশ করা যায় না। কিছু ভালোবাসা উচ্চারণ করা যায়, আবার কিছু ভালোবাসা শুধু অনুভব করা যায়।
দুপুর গড়িয়ে যখন ঘড়িতে ১টা ১৫ মিনিট, তখন ঘুম ভাঙল। দ্রুত অযু করে সোজা রওনা হলাম মাদানী মসজিদের দিকে।
কারণ, আমার হৃদয়ের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা তখনও পূর্ণ হয়নি।
মাদানী মসজিদের পশ্চিম পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন আমার প্রাণপ্রিয় পীর ও মুর্শিদ। তাঁর রওজার দিকে যত এগোচ্ছিলাম, ততই হৃদস্পন্দন যেন বদলে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, বহুদিন পর এমন একজনের সামনে দাঁড়াতে যাচ্ছি, যাঁর কাছে আমার হৃদয়ের প্রতিটি ভাষা পরিচিত, অথচ আজ তিনি নীরব।
রওজার সামনে দাঁড়িয়ে সময় যেন থেমে গেল।
পৃথিবীর সব শব্দ কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। শুধু হৃদয় কথা বলছিল।
পাশেই শায়িত আরেক মহান ব্যক্তিত্ব। দুই মহাপুরুষের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে আমি কিছুক্ষণ নীরবে মোরাকাবায় ডুবে থাকার চেষ্টা করলাম। সেই নীরবতার গভীরে এমন এক প্রশান্তি ছিল, যা ভাষার সীমা অতিক্রম করে যায়।
ঠিক তখনই মনে পড়ল—মাওলানা নাসির উদ্দিন সাহেব আমার অপেক্ষায় আছেন।
একজন মুহিব্বিনকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করানো শোভা পায় না।
সংক্ষিপ্ত দোয়া করে বিদায় নিলাম। নিজের, পরিবারের, উস্তাদদের, শুভাকাঙ্ক্ষীদের এবং সমগ্র উম্মাহর জন্য আল্লাহর দরবারে হাত তুললাম। অন্তরটা যেন হালকা হয়ে গেল।
মাদ্রাসার মূল ফটকে এসে দাঁড়ালাম।
আমি রাস্তার এক পাশে, তিনি অন্য পাশে।
আজকের আগে আমরা কখনো সামনাসামনি দেখা করিনি। অথচ মনে হচ্ছিল, বহু বছরের পরিচয়। ফোনে শুধু বললাম, "আমি এসে গেছি।"
তিনি তাকালেন। আমিও তাকালাম।
চোখের ভাষা কখনো কখনো হাজার শব্দের চেয়েও বেশি কথা বলে।
কাছে এসে আমরা একে অপরকে আলিঙ্গন করলাম। সেই আলিঙ্গনে ছিল না কোনো আনুষ্ঠানিকতা; ছিল ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, দোয়া আর দীর্ঘদিনের রূহানি সম্পর্কের নীরব প্রকাশ।
এরপর আমার প্রিয় ছাত্র আমির হামজাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা তিনজন খাবারের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।
হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, সফরের আসল অধ্যায় যেন এখনো শুরুই হয়নি।
কারণ, সামনে অপেক্ষা করছে সেই ভূমি—যেখানে আমার ছাত্রজীবনের প্রথম স্বপ্ন বোনা হয়েছিল। যেখানে প্রথমবার ইলমের আলো হৃদয়কে আলোকিত করেছিল। যেখানে উস্তাদদের স্নেহ, বন্ধুদের হাসি আর তারুণ্যের অসংখ্য স্মৃতি আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায়।
বহু বছর পর যখন আবার সেই প্রিয় মেখলের মাটিতে পা রাখলাম, তখন হৃদয়ের ভেতর কী ঝড় উঠেছিল? সেই পুরোনো কক্ষ, সেই মসজিদ, সেই পথ, আর সেই স্মৃতিগুলো আমাকে কীভাবে স্বাগত জানিয়েছিল?
পরবর্তী পর্ব
মেখল—আমার শিক্ষা জীবনের প্রথম বিদ্যাপীঠ: ফিরে পাওয়া এক টুকরো জীবন
আমি অধমের সাথে আছে মাওলানা নাসির উদ্দিন সাহেব এবং আমার ছাত্র নবীন আলেম হাফেজ মাওলানা আমির হামজা
ক্রমশ...
#সফরনামা #রূহানিসফর #স্মৃতিচারণ #হাটহাজারী #মেখল #মাদরাসালাইফ #ভালোলাগারপথ #আত্মারশান্তি #স্মৃতিরসফরে #জীবনবোধ