20/07/2026
অদৃশ্য মানুষ
সকাল সাতটা বাজতে দশ মিনিট বাকি। রহিম চাচা ঠিক ঠিক এই সময়টায় ঘুম থেকে ওঠেন। পঁয়ষট্টি বছরের শরীরটা এখন নানা অজুহাতে ব্যথা করে, কিন্তু অভ্যাসের কাছে হার মেনে তিনি লেপ সরিয়ে বসেন। ছোট্ট ঘরটা—আয়তনে বড়জোর দশ ফুট বাই আট। সিকিউরিটি গার্ডের রুম বলতে এটাই। তবু পরিপাটি করে গোছানো। এক কোণে তোষক-বালিশ, আরেক কোণে টিনের ট্রাংক, দেয়ালে একমাত্র জানালাটা—যা দিয়ে বাইরের পৃথিবী দেখা যায়।
জানালাটা তার সবচেয়ে প্রিয়। এই জানলা দিয়ে তিনি দেখেন ভোরের আলো ফোটে, পাখিরা উড়ে যায়, রাস্তার ঝাড়ুদার এসে ঝাড়ু দেয়। এই জানলা দিয়েই তিনি দেখেন ফ্ল্যাটের মানুষগুলোকে—কেউ অফিসে যাচ্ছে, কেউ স্কুলে, কেউ বাজারে। সবাই যায়। সবাই ব্যস্ত। কেউ থামে না। কেউ একবার ফিরেও তাকায় না।
রহিম চাচা উঠে প্রথমে অজু করেন। তারপর ফজরের নামাজ পড়েন। নামাজ শেষে তোষকের ওপর বসে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। এই সময়টা তার মন খারাপ করে। বউ মারা গেছেন দশ বছর। ছেলে থাকে ঢাকায়—কিন্তু সে যেন অনেক দূরের মানুষ। বছর ঘুরলেও একবার আসে না। আসলেও থাকে আধঘণ্টা, টাকা নিয়ে চলে যায়। "বাবা, এই মাসে আর পারলাম না"—এই এক কথা। রহিম চাচা বকেন না। জানেন, ছেলের সংসার, অভাব আছে। কিন্তু তবু মনটা কেমন করে। ছেলেটা যখন ছোট ছিল, কত আদর করতেন। এখন সেই ছেলেটাই যেন আরেক গ্রহের মানুষ।
নামাজের পর তিনি বারান্দার মতো ছোট্ট জায়গাটায় গিয়ে দাঁড়ান। এখান থেকে পুরো ফ্ল্যাটবাড়িটা দেখা যায়—সাত তলা। পঁয়ত্রিশটা ফ্ল্যাট। উনার দায়িত্ব এই ফ্ল্যাটবাড়িটার নিরাপত্তা দেখা। কিন্তু তিনি জানেন, নিরাপত্তার চেয়েও তিনি আসলে একটা ঘড়ি—যে ঘড়ি দেখে মানুষ সময় মাপে, কিন্তু ঘড়িটার নিজের কোনো সময় নেই।
---
লাবণ্য ঘুম থেকে ওঠে অ্যালার্মের শব্দে। সকাল আটটা। সে তার ছোট্ট ফ্ল্যাটটায় একা থাকে—চাকরি করে, স্বাধীন জীবন। চোখ মেলেই ফোন হাতে নেয়। হোয়াটসঅ্যাপ, ইন্সটাগ্রাম, অফিসের ইমেইল—একের পর এক স্ক্রল করতে থাকে। সময় নেই তার। অফিস যেতে হবে নটা নাগাদ।
টেবিলের ওপর গতকালকের কাপটা পড়ে আছে। সিঙ্কে জমা প্লেটগুলো ধোয়া হয়নি। বিছানার চাদর এলোমেলো। কিন্তু লাবণ্যের এসবে মন নেই। সে দৌড়ে বাথরুমে যায়, তাড়াতাড়ি রেডি হয়, একটা রুটি মুখে পুরে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দরজা খোলে।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই চোখ পড়ে গেটের পাশে রহিম চাচার ঘরটার দিকে। রহিম চাচা বসে আছেন। লাবণ্যকে দেখে একটু হাসলেন। বললেন, "আসসালামুআলাইকুম, মা। ভালো আছেন?"
লাবণ্য থামে না। হাঁটতে হাঁটতেই বলে, "ওয়ালাইকুম আসসালাম, চাচা। ভালো আছি।"
উত্তর শোনার অপেক্ষা করে না সে। পায়ের গতি আরো বাড়ে। অফিসের গাড়ি ধরতে হবে।
রহিম চাচা কিছুক্ষণ তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারপর আস্তে করে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। এই ফ্ল্যাটে পঁয়ত্রিশটা পরিবার। সবাইকে তিনি চেনেন। কার সন্তান কেমন, কার অভাব কেমন, কার সংসারে সুখ কেমন—সব জানেন। কিন্তু কেউ তাকে চেনে না। কেউ কখনো জিজ্ঞেস করে না—"চাচা, আপনি কেমন আছেন?"
---
দুপুরে ফ্ল্যাট ফাঁকা হয়ে যায়। স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত সবাই যার যার কাজে বেরিয়ে পড়ে। তখন রহিম চাচা একা হয়ে যান। তখন তার একমাত্র সঙ্গী হয় ফটকের পাশে লাগানো শিউলি গাছটা। গাছটা নিজে লাগিয়েছিলেন বছর পাঁচেক আগে। এখন বড় হয়েছে, ফুল দেয়। রহিম চাচা প্রতিদিন দুপুরে ঝরে পড়া ফুল কুড়োন। কুড়োতে কুড়োতে তার মনে পড়ে গ্রামের বাড়ির কথা—সেখানে তার বউ শিউলি ফুল দিয়ে মালা গাঁথত। এখন সেই গ্রামের বাড়ি নেই, বউ নেই, ছেলে কাছে নেই। শুধু এই ফ্ল্যাটের পঁয়ত্রিশটা সংসার আছে—যেখানে তিনি সবার, অথচ তার কেউ নেই।
তার একটা খাতা আছে। পুরোনো, মলাট ছেঁড়া, দোকানের সাধারণ খাতা। সেই খাতায় তিনি হিসেব রাখেন। কোন ফ্ল্যাটে কে থাকে, কার বাচ্চা কবে জন্মেছে, কে কবে অসুস্থ হয়েছিল, কার বউ কবে বাপের বাড়ি গেছে—এসব। এই অদ্ভুত হিসেব রাখার কারণ একটাই—তার মনে থাকে না এখন। বয়স হয়েছে, স্মৃতি দুর্বল। তাই লিখে রাখেন।
কিন্তু এই খাতার আরেকটা কারণ আছে—যেটা তিনি কাউকে বলেন না। এই মানুষগুলোর কথা লিখতে লিখতে তিনি যেন তাদের কাছাকাছি থাকতে পারেন। তারা তাকে চেনে না, কিন্তু তিনি তাদের চেনেন। এই চেনাটাই এখন তার একমাত্র সম্বল।
আজ দুপুরে খাতা খুলে লিখলেন—
"আজ ১৪ই মার্চ। লাবণ্য মা অফিসে গেছেন সাড়ে আটটায়। বড় তাড়া ছিল। মুখে হাসি নেই। মনে হয় মন খারাপ। দোয়া করি, আল্লাহ মায়ের সব কষ্ট দূর করে দিন।"
এই লেখাটা কেউ পড়বে না। কিন্তু রহিম চাচার মনটা হালকা হয়। যেন কারো কাছে নিজের দিনটার কথা বলতে পারলেন।
---
বিকেলে ফ্ল্যাটে আবার কোলাহল ফেরে। বাচ্চারা খেলতে নামে, মহিলারা ছাদে কাপড় দিতে যান, কেউ বা পাড়ার দোকানে বাজার করতে যান। রহিম চাচা সবার দিকে তাকিয়ে থাকেন। কেউ এলে হাসেন, দোয়া দেন।
চার তলার রাবেয়া বেগম এসে বললেন, "চাচা, একটু পানি দেবেন? লিফট খারাপ, ওঠার শক্তি নাই।"
রহিম চাচা তাড়াতাড়ি পানি এনে দিলেন। রাবেয়া বেগম পানি খেয়ে বললেন, "আপনার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া চাইব, চাচা।"
এইটুকুই। তারপর তিনি চলে গেলেন উপরে। রহিম চাচা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার খাতা খুললেন। লিখলেন—
"রাবেয়া বেগম এসেছিলেন। লিফট খারাপ, কষ্ট হচ্ছে। দোয়া করি, আল্লাহ যেন সমস্যার সমাধান করে দেন।"
তারপর খাতা বন্ধ করে বাইরে তাকিয়ে থাকলেন। সন্ধ্যা নামছে। শিউলি গাছটা ছায়া ফেলছে উঠোনে।
---
রাত নটায় লাবণ্য ফিরল। আজ অফিসে খুব কঠিন দিন গেছে। বসের কাছে বকা খেয়েছে, ক্লায়েন্টের সাথে ঝামেলা হয়েছে, শরীরটাও কেমন যেন খারাপ লাগছে। সে দরজার পাশ দিয়ে ঢোকার সময় রহিম চাচার দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। হাসিটা মুখে এল না।
রহিম চাচা দেখলেন। কিছু বললেন না। শুধু আস্তে করে বললেন, "আল্লাহ মায়ের ভালো করুন।"
লাবণ্য শুনতে পেল না।
রাতে খাওয়া-দাওয়া সেরে লাবণ্য বিছানায় শুয়ে পড়ল। ফোনে স্ক্রল করতে করতে তার মনে পড়ল—আজ কি রহিম চাচাকে একটুও কথা বলেছে? না। উত্তরটাও ঠিক করে দেয়নি। এই লোকটা সারাদিন এখানে বসে থাকে। কত বয়স হবে? কার সাথে থাকে? কিছুই জানে না সে।
কিন্তু এই ভাবনাটা মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল। ফোনের স্ক্রিনে আরেকটা ভিডিও ভেসে উঠল। সে আবার স্ক্রল করতে লাগল।
---
জানুয়ারির এক শীতের রাতে ফ্ল্যাটের মেইন গেটে তালা লাগিয়ে রহিম চাচা নিজের ঘরে ফিরলেন। আজ খুব ঠান্ডা। কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন, তবু ঘুম আসছে না। বুকে কেমন যেন চিনচিন করে। ওষুধ আছে, কিন্তু নেওয়ার ইচ্ছে করছে না। এখন মনে হয় কেউ যদি একটু পাশে বসত—ছেলেটা, নাতিটা...
কিন্তু কেউ আসবে না। তিনি জানেন।
হঠাৎ দরজায় শব্দ হলো। "চাচা?"
রহিম চাচা চমকে উঠলেন। লাবণ্য দাঁড়িয়ে।
"চাচা, ঘুমান নাই?"
"না মা। কী মনে করে এত রাতে?"
লাবণ্য একটু ইতস্তত করে বলল, "আমার ফোনটা অফিসে ফেলে এসেছি। আরেকটা ফোন থেকে ট্র্যাক করছি, দেখাচ্ছে এই বিল্ডিংয়েই আছে। আপনি কি কাউকে ঢুকতে দেখেছেন?"
রহিম চাচা ভাবলেন। "না মা, কেউ ঢোকে নাই। আপনি নিশ্চিত অফিসে ফেলছেন?"
লাবণ্যর মুখটা শুকিয়ে গেল। "হ্যাঁ, তা-ই মনে হচ্ছে। কিন্তু এত রাতে..."
"কাল সকালে গিয়ে আনলেই হবে। আল্লাহ ভরসা। কিছু হবে না। আপনি এখন যান, ঘুমান। ঠান্ডা লাগবে।"
লাবণ্য চলে গেল। রহিম চাচা দরজাটা বন্ধ করে আবার শুতে গেলেন। কিন্তু ঘুম এল না। তার মনে হতে লাগল, এত রাতে একটা মেয়ে একা বেরিয়েছে—কী বিপদই না হতে পারত! এই মানুষগুলো নিজেদের এত ব্যস্ত রাখে যে জীবনের ছোট ছোট বিপদগুলোও দেখতে পায় না। অথচ তিনি বসে বসে দেখেন সব। কিন্তু তাকে কেউ দেখে না।
পরদিন সকালে লাবণ্য অফিসে গিয়ে ফোন পেয়ে গেল। ফিরে এসে রহিম চাচাকে বলল, "পেয়েছি, চাচা।"
রহিম চাচা হাসলেন। "আলহামদুলিল্লাহ।"
লাবণ্য আবার হাঁটা দিল।
"মা, একটু শুনবেন?"
লাবণ্য থামল। অবাক হয়ে তাকাল। এই প্রথম রহিম চাচা তাকে থামতে বললেন।
"কাল রাতে ঠান্ডা খুব ছিল। আপনি একা বেরিয়েছিলেন। পরে আমার খুব চিন্তা হইছিল। এখন থেকে এত রাতে একা বাইর হবেন না। দরকার হইলে আমারে ডাক দিয়েন। আমি যামু।"
লাবণ্য কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। এত দিন এই মানুষটাকে সে দেখেও দেখেনি। রহিম চাচার চোখের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো—এই চোখে কত কথা! কত একাকিত্ব! কত অপেক্ষা!
সে বলল, "ঠিক আছে, চাচা। ধন্যবাদ।"
তারপর হেঁটে চলে গেল। কিন্তু এবার আর আগের মতো নয়। এবার তার মনে একটা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিল—এই মানুষটা কে? কেন সারাদিন এখানে বসে থাকে? তার নিজের কেউ নেই?
প্রথমবারের মতো সে একটু থমকে দাঁড়াল। পেছনে ফিরে তাকাল। রহিম চাচা তখন শিউলি গাছটার দিকে তাকিয়ে আছেন। তার চোখেমুখে একটা অদ্ভুত শূন্যতা—যেন তিনি কোথাও নেই। শরীর এখানে, মন বহুদূরে।
লাবণ্যর বুকটা কেমন করে উঠল। সে ঠিক করল, কাল থেকে রহিম চাচার সাথে একটু কথা বলবে। ভালো করে কথা বলবে।
কিন্তু কাল আসে না। কাল কখনো আসে না।
---
ফেব্রুয়ারি মাসের এক সকাল। ফ্ল্যাটে কোলাহল। আজ রহিম চাচার জানালাটা খোলেনি। সকাল আটটা বেজে গেছে, অথচ তিনি বের হননি। ফটকের তালা এখনো খোলা হয়নি। ফ্ল্যাটের লোকজন ভিড় জমিয়েছে রহিম চাচার ঘরের সামনে।
কেউ বলল, "চাচা, দরজা খোলেন!"
কোনো সাড়া নেই।
শেষমেশ সাত তলার করিম সাহেব দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকলেন। ভেতরে রহিম চাচা তোষকের ওপর শুয়ে আছেন। শরীর ঠান্ডা। হাতে পুরোনো খাতাটা। তিনি আর নেই।
খবর ছড়িয়ে পড়ল ফ্ল্যাটে। সবাই এল। কেউ কাঁদছে, কেউ চুপ। কিন্তু বেশিরভাগের চোখ শুকনো। কারণ রহিম চাচা তাদের কেউ ছিলেন না। তিনি ছিলেন শুধুই দারোয়ান—একজন অদৃশ্য মানুষ, যাকে দেখেও কেউ দেখেনি।
লাবণ্য এসে দাঁড়িয়েছে ভিড়ের মধ্যে। তার চোখ ভিজে উঠেছে। কেন কাঁদছে, সে নিজেও জানে না। এই মানুষটাকে সে চিনত না, জানে না তার জীবন, তার গল্প। তবু কেন জানি কান্না পাচ্ছে।
করিম সাহেব রহিম চাচার হাত থেকে খাতাটা তুলে নিলেন। সবার সামনে খুললেন। এক পাতা, দুই পাতা—সব পাতায় শুধু ফ্ল্যাটের মানুষদের কথা। কে কবে অসুস্থ ছিল, কার বাচ্চা কবে পরীক্ষা দিয়েছে, কে কবে চাকরি হারিয়েছিল, কে কবে বিয়ে করেছে।
সবশেষ পাতাটা খোলা ছিল। তাতে লেখা—
"আজ ২রা ফেব্রুয়ারি। শরীরটা ভালো লাগছে না। বুকের ব্যথাটা বাড়ছে। ছেলেটাকে ফোন করতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু ওর সংসার আছে, টেনশন দিতে চাই না। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, ফ্ল্যাটের সবাই ভালো থাকুক। কেউ যেন অসুস্থ না হয়। আর হ্যাঁ, লাবণ্য মা'র মনটা আজ খারাপ ছিল—কাল সকালে যেন হাসিমুখে অফিসে যেতে পারে, এই দোয়া করি।"
লাবণ্যর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটা তার জন্য দোয়া করতেন! তাকে দেখতেন, তার ভালো-মন্দ বুঝতেন! অথচ সে কখনো একদিনও দাঁড়িয়ে কথা বলেনি।
করিম সাহেব বললেন, "রহিম চাচার ছেলেকে খবর দিতে হবে। কেউ নম্বর জানেন?"
সবাই চুপ। কেউ জানে না। এই পঁয়ত্রিশটা ফ্ল্যাটের কেউ কখনো রহিম চাচার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আগ্রহ দেখায়নি। তিনি কখনো বলেননি, কেউ কখনো জিজ্ঞেসও করেনি।
শেষমেশ তার পুরোনো ফোন থেকে ছেলের নম্বর পাওয়া গেল। ফোন করা হলো। ছেলে এল। কাঁদল। কিন্তু লাবণ্যর মনে হলো, এই কান্নায় প্রকৃত দুঃখ নেই। এই কান্না শুধু কর্তব্যের।
শেষকৃত্য শেষে ছেলে চলে গেল। ফ্ল্যাট আবার আগের মতো হয়ে গেল। শুধু ফটকের পাশের ঘরটা খালি পড়ে রইল। কিছুদিন পর আরেকজন দারোয়ান এল—নতুন মানুষ, নতুন মুখ। পুরোনো মানুষটা ভুলে গেল সবাই।
কিন্তু লাবণ্য ভুলতে পারল না।
---
রহিম চাচার সেই খাতাটা লাবণ্য নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। মলাট ছেঁড়া, পাতা হলদে হয়ে যাওয়া খাতাটা এখন তার শোবার টেবিলে থাকে। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে সে একবার করে পড়ে। পড়তে পড়তে তার মনে হয়, এই লেখাগুলো শুধু কিছু কথার সমষ্টি নয়—একটা মানুষের ভালোবাসার ইতিহাস। একজন অদৃশ্য মানুষের নিঃশব্দ ভালোবাসা।
একদিন রাতে সে খাতাটার শেষ পাতায় নিজের হাতে লিখল—
"রহিম চাচা, আমি দুঃখিত। আপনি আমাদের দেখেছেন, কিন্তু আমরা কখনো আপনাকে দেখিনি। আপনি আমাদের মানুষ ভেবেছিলেন, কিন্তু আমরা আপনাকে শুধু দারোয়ান ভেবেছি। এই সমাজ বড্ড নিষ্ঠুর—আমরা সেই সব মানুষকে ভুলে যাই, যারা আমাদের পাশে থাকে। যারা আমাদের জন্য দোয়া করে। যারা আমাদের দেখে, কিন্তু আমরা যাদের দেখি না।"
লিখে খাতাটা বন্ধ করল। চোখ বন্ধ করে ভাবল, এই শহরে কত রহিম চাচা আছেন—দারোয়ান, গাড়িচালক, ঝাড়ুদার, রিকশাওয়ালা। সবাই অদৃশ্য। সবাই সবার, অথচ কারো না। তারা রোজ আমাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়, কিন্তু আমরা কখনো তাদের দিকে তাকাই না।
পরদিন সকালে লাবণ্য অফিসে যাওয়ার সময় নতুন দারোয়ানকে দেখল। থামল।
"আসসালামুআলাইকুম। আপনার নাম?"
নতুন দারোয়ান অবাক হয়ে তাকাল। ফ্ল্যাটের কেউ তাকে নাম জিজ্ঞেস করেনি।
"ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমার নাম আব্দুল্লাহ।"
"চাচা, আপনি কেমন আছেন?"
আব্দুল্লাহ চাচা আরো অবাক হলেন। হাসলেন। বললেন, "ভালো আছি, মা। আল্লাহর রহমতে।"
লাবণ্য হাসল। বলল, "আমার নাম লাবণ্য। আমি সাত তলায় থাকি। কোনো কিছু দরকার হলে আমাকে বলবেন। আর হ্যাঁ, সকালে নাশতা খেয়েছেন?"
আব্দুল্লাহ চাচা নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। এত দিন এই শহরে আছেন, কেউ তাকে এমন করে কথা বলেনি। তিনি কিছু বলার আগেই লাবণ্য এগিয়ে গেল।
কিন্তু এবার আর আগের মতো নয়। এবার সে পেছনে ফিরে তাকাল। আরেকবার। তারপর হাসল।
আব্দুল্লাহ চাচাও হাসলেন। তার বুকের ভেতর একটু উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। তিনি জানতেন না যে এই মেয়েটির এমন আচরণের পেছনে একজন রহিম চাচা আছেন—একজন অদৃশ্য মানুষ, যার মৃত্যু একটা মেয়েকে চোখ খুলে দিয়েছে।
---
সেদিন বিকেলে লাবণ্য অফিস থেকে ফিরে শিউলি গাছটার দিকে তাকিয়ে দেখল, আব্দুল্লাহ চাচা ফুল কুড়োচ্ছেন। সে কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
"ফুল ভালোবাসেন, চাচা?"
আব্দুল্লাহ চাচা হাসলেন। "ভালোবাসি, মা। এই গাছটা রহিম চাচা লাগিয়েছিলেন। শুনেছি। উনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন।"
"আপনি জানেন?"
"জানি। উনি চলে যাওয়ার পর সবাই ভুলে গেছে, কিন্তু গাছটা মনে রেখেছে। রোজ ফুল ফোটে। যেন উনি ফুলের ভেতর দিয়েও বলতে চাচ্ছেন—আমি আছি।"
লাবণ্যর চোখে জল আসে। সে ফুলগুলো হাতে নেয়। বলে, "চাচা, এই ফুলগুলো দিয়েছিলেন বলেই তো আজ আমি দেখতে শিখেছি। উনি অদৃশ্য ছিলেন, কিন্তু উনি চলে যাওয়ার পর আরো বড় হয়ে দেখা দিয়েছেন। আমাদের সবার ভেতর।"
আব্দুল্লাহ চাচা কিছু বললেন না। শুধু হাসলেন। আকাশে সন্ধ্যা নামছে। শিউলি ফুলগুলো হাতে নিয়ে লাবণ্য উপরে চলে গেল।
রাতে বিছানায় শুয়ে সে আবার খাতাটা খুলল। রহিম চাচার শেষ লেখাটা চোখ বুলিয়ে পড়ল। তারপর নিজের লেখা পাতায় আবার যোগ করল—
"আব্দুল্লাহ চাচা এসেছেন। আমি ওনার নাম জিজ্ঞেস করেছি। ওনার খোঁজ নিচ্ছি। রহিম চাচা, তুমি চলে গেছ, কিন্তু তুমি আমাকে শিখিয়ে গেছ—মানুষ হয়ে মানুষকে দেখা কী জিনিস। আমি ভুলব না। কোনোদিন ভুলব না।"
খাতাটা বন্ধ করে জানালার কাছে দাঁড়াল লাবণ্য। নিচে ফটকের কাছে আব্দুল্লাহ চাচার ঘরে আলো জ্বলছে। রাস্তায় মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। সবাই ব্যস্ত। সবাই আপন গন্তব্যে ছুটছে।
কিন্তু এখন সে জানে, এই চলার পথে কিছু মানুষ থাকে—যারা স্থির, নিঃশব্দ, অথচ সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। তারা অদৃশ্য নয়, আমরা তাদের দেখি না। এই যা পার্থক্য।
আর এই দেখা শেখাটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা। রহিম চাচার খাতা আর শিউলি ফুলের মতো—নীরব, অথচ গভীর। মরে গিয়েও যে মানুষ বাঁচিয়ে রাখে আরেকটি মানুষকে, এই তো জীবন।
জানালার বাইরে একটা শিউলি ফুল ঝরে পড়ল মাটিতে। লাবণ্য দেখল, পরদিন সকালে আব্দুল্লাহ চাচা সেটা কুড়োবেন। আর সে জানে, ফুলগুলো কুড়োতে কুড়োতে তিনি হয়তো রহিম চাচার কথা ভাববেন—যেমন রহিম চাচা ভাবতেন তার বউয়ের কথা, তার গ্রামের কথা, তার হারিয়ে যাওয়া মানুষদের কথা।
এভাবেই জীবন চলে। কেউ যায়, কেউ আসে। শুধু ভালোবাসাটুকু থেকে যায়—শিউলি ফুলের মতো নিঃশব্দে ঝরে, আবার কেউ কুড়োয়, আবার কেউ মনে রাখে। এই তো অমরতা। এই তো অদৃশ্য হওয়ার একমাত্র প্রতিষেধক।
লাবণ্য আলো নিভিয়ে শুতে গেল। কাল সকালে আবার আব্দুল্লাহ চাচাকে দেখবে। আবার জিজ্ঞেস করবে—"কেমন আছেন, চাচা?" আর এই ছোট্ট প্রশ্নটাই বদলে দিতে পারে একটা মানুষের পুরো দিন। এই ছোট্ট প্রশ্নটাই পারে একজন অদৃশ্য মানুষকে দৃশ্যমান করে তুলতে।
কারণ দেখাটাই তো ভালোবাসা। আর ভালোবাসাই শেষ সত্য।
#অদৃশ্য_মানুষ