Mind Unlocked

Mind Unlocked Born To Create & Learn

সাহিত্যপ্রেমী ও সৃষ্টিশীল মানুষদের মিলনমেলা "bongosahitto.com" আপনি যদি লিখতে ভালোবাসেন, আপনার মনের সুপ্তবাসনা যদি হয় আপনার সৃজনশীলতা ছড়িয়ে দেবেন সবার মাঝে। আপনি আপনার প্রথম লেখা নিয়ে বসে আছেন এবং আপনার লেখা প্রকাশের মাধ্যম খুজে পাচ্ছেন না, আপনার প্রতিভাকে সবার সামনে তুলে ধরতে আমাদের এক সম্মিলিত প্রয়াস বাংলা সাহিত্য ডট কম। আমরা বিশ্বাস করি পরিবর্তনের জন্য সাহিত্য এবং সাহিত্য মানেই সুন্দর।

20/07/2026

অদৃশ্য মানুষ

সকাল সাতটা বাজতে দশ মিনিট বাকি। রহিম চাচা ঠিক ঠিক এই সময়টায় ঘুম থেকে ওঠেন। পঁয়ষট্টি বছরের শরীরটা এখন নানা অজুহাতে ব্যথা করে, কিন্তু অভ্যাসের কাছে হার মেনে তিনি লেপ সরিয়ে বসেন। ছোট্ট ঘরটা—আয়তনে বড়জোর দশ ফুট বাই আট। সিকিউরিটি গার্ডের রুম বলতে এটাই। তবু পরিপাটি করে গোছানো। এক কোণে তোষক-বালিশ, আরেক কোণে টিনের ট্রাংক, দেয়ালে একমাত্র জানালাটা—যা দিয়ে বাইরের পৃথিবী দেখা যায়।

জানালাটা তার সবচেয়ে প্রিয়। এই জানলা দিয়ে তিনি দেখেন ভোরের আলো ফোটে, পাখিরা উড়ে যায়, রাস্তার ঝাড়ুদার এসে ঝাড়ু দেয়। এই জানলা দিয়েই তিনি দেখেন ফ্ল্যাটের মানুষগুলোকে—কেউ অফিসে যাচ্ছে, কেউ স্কুলে, কেউ বাজারে। সবাই যায়। সবাই ব্যস্ত। কেউ থামে না। কেউ একবার ফিরেও তাকায় না।

রহিম চাচা উঠে প্রথমে অজু করেন। তারপর ফজরের নামাজ পড়েন। নামাজ শেষে তোষকের ওপর বসে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। এই সময়টা তার মন খারাপ করে। বউ মারা গেছেন দশ বছর। ছেলে থাকে ঢাকায়—কিন্তু সে যেন অনেক দূরের মানুষ। বছর ঘুরলেও একবার আসে না। আসলেও থাকে আধঘণ্টা, টাকা নিয়ে চলে যায়। "বাবা, এই মাসে আর পারলাম না"—এই এক কথা। রহিম চাচা বকেন না। জানেন, ছেলের সংসার, অভাব আছে। কিন্তু তবু মনটা কেমন করে। ছেলেটা যখন ছোট ছিল, কত আদর করতেন। এখন সেই ছেলেটাই যেন আরেক গ্রহের মানুষ।

নামাজের পর তিনি বারান্দার মতো ছোট্ট জায়গাটায় গিয়ে দাঁড়ান। এখান থেকে পুরো ফ্ল্যাটবাড়িটা দেখা যায়—সাত তলা। পঁয়ত্রিশটা ফ্ল্যাট। উনার দায়িত্ব এই ফ্ল্যাটবাড়িটার নিরাপত্তা দেখা। কিন্তু তিনি জানেন, নিরাপত্তার চেয়েও তিনি আসলে একটা ঘড়ি—যে ঘড়ি দেখে মানুষ সময় মাপে, কিন্তু ঘড়িটার নিজের কোনো সময় নেই।

---

লাবণ্য ঘুম থেকে ওঠে অ্যালার্মের শব্দে। সকাল আটটা। সে তার ছোট্ট ফ্ল্যাটটায় একা থাকে—চাকরি করে, স্বাধীন জীবন। চোখ মেলেই ফোন হাতে নেয়। হোয়াটসঅ্যাপ, ইন্সটাগ্রাম, অফিসের ইমেইল—একের পর এক স্ক্রল করতে থাকে। সময় নেই তার। অফিস যেতে হবে নটা নাগাদ।

টেবিলের ওপর গতকালকের কাপটা পড়ে আছে। সিঙ্কে জমা প্লেটগুলো ধোয়া হয়নি। বিছানার চাদর এলোমেলো। কিন্তু লাবণ্যের এসবে মন নেই। সে দৌড়ে বাথরুমে যায়, তাড়াতাড়ি রেডি হয়, একটা রুটি মুখে পুরে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দরজা খোলে।

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই চোখ পড়ে গেটের পাশে রহিম চাচার ঘরটার দিকে। রহিম চাচা বসে আছেন। লাবণ্যকে দেখে একটু হাসলেন। বললেন, "আসসালামুআলাইকুম, মা। ভালো আছেন?"

লাবণ্য থামে না। হাঁটতে হাঁটতেই বলে, "ওয়ালাইকুম আসসালাম, চাচা। ভালো আছি।"

উত্তর শোনার অপেক্ষা করে না সে। পায়ের গতি আরো বাড়ে। অফিসের গাড়ি ধরতে হবে।

রহিম চাচা কিছুক্ষণ তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারপর আস্তে করে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। এই ফ্ল্যাটে পঁয়ত্রিশটা পরিবার। সবাইকে তিনি চেনেন। কার সন্তান কেমন, কার অভাব কেমন, কার সংসারে সুখ কেমন—সব জানেন। কিন্তু কেউ তাকে চেনে না। কেউ কখনো জিজ্ঞেস করে না—"চাচা, আপনি কেমন আছেন?"

---

দুপুরে ফ্ল্যাট ফাঁকা হয়ে যায়। স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত সবাই যার যার কাজে বেরিয়ে পড়ে। তখন রহিম চাচা একা হয়ে যান। তখন তার একমাত্র সঙ্গী হয় ফটকের পাশে লাগানো শিউলি গাছটা। গাছটা নিজে লাগিয়েছিলেন বছর পাঁচেক আগে। এখন বড় হয়েছে, ফুল দেয়। রহিম চাচা প্রতিদিন দুপুরে ঝরে পড়া ফুল কুড়োন। কুড়োতে কুড়োতে তার মনে পড়ে গ্রামের বাড়ির কথা—সেখানে তার বউ শিউলি ফুল দিয়ে মালা গাঁথত। এখন সেই গ্রামের বাড়ি নেই, বউ নেই, ছেলে কাছে নেই। শুধু এই ফ্ল্যাটের পঁয়ত্রিশটা সংসার আছে—যেখানে তিনি সবার, অথচ তার কেউ নেই।

তার একটা খাতা আছে। পুরোনো, মলাট ছেঁড়া, দোকানের সাধারণ খাতা। সেই খাতায় তিনি হিসেব রাখেন। কোন ফ্ল্যাটে কে থাকে, কার বাচ্চা কবে জন্মেছে, কে কবে অসুস্থ হয়েছিল, কার বউ কবে বাপের বাড়ি গেছে—এসব। এই অদ্ভুত হিসেব রাখার কারণ একটাই—তার মনে থাকে না এখন। বয়স হয়েছে, স্মৃতি দুর্বল। তাই লিখে রাখেন।

কিন্তু এই খাতার আরেকটা কারণ আছে—যেটা তিনি কাউকে বলেন না। এই মানুষগুলোর কথা লিখতে লিখতে তিনি যেন তাদের কাছাকাছি থাকতে পারেন। তারা তাকে চেনে না, কিন্তু তিনি তাদের চেনেন। এই চেনাটাই এখন তার একমাত্র সম্বল।

আজ দুপুরে খাতা খুলে লিখলেন—

"আজ ১৪ই মার্চ। লাবণ্য মা অফিসে গেছেন সাড়ে আটটায়। বড় তাড়া ছিল। মুখে হাসি নেই। মনে হয় মন খারাপ। দোয়া করি, আল্লাহ মায়ের সব কষ্ট দূর করে দিন।"

এই লেখাটা কেউ পড়বে না। কিন্তু রহিম চাচার মনটা হালকা হয়। যেন কারো কাছে নিজের দিনটার কথা বলতে পারলেন।

---

বিকেলে ফ্ল্যাটে আবার কোলাহল ফেরে। বাচ্চারা খেলতে নামে, মহিলারা ছাদে কাপড় দিতে যান, কেউ বা পাড়ার দোকানে বাজার করতে যান। রহিম চাচা সবার দিকে তাকিয়ে থাকেন। কেউ এলে হাসেন, দোয়া দেন।

চার তলার রাবেয়া বেগম এসে বললেন, "চাচা, একটু পানি দেবেন? লিফট খারাপ, ওঠার শক্তি নাই।"

রহিম চাচা তাড়াতাড়ি পানি এনে দিলেন। রাবেয়া বেগম পানি খেয়ে বললেন, "আপনার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া চাইব, চাচা।"

এইটুকুই। তারপর তিনি চলে গেলেন উপরে। রহিম চাচা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার খাতা খুললেন। লিখলেন—

"রাবেয়া বেগম এসেছিলেন। লিফট খারাপ, কষ্ট হচ্ছে। দোয়া করি, আল্লাহ যেন সমস্যার সমাধান করে দেন।"

তারপর খাতা বন্ধ করে বাইরে তাকিয়ে থাকলেন। সন্ধ্যা নামছে। শিউলি গাছটা ছায়া ফেলছে উঠোনে।

---

রাত নটায় লাবণ্য ফিরল। আজ অফিসে খুব কঠিন দিন গেছে। বসের কাছে বকা খেয়েছে, ক্লায়েন্টের সাথে ঝামেলা হয়েছে, শরীরটাও কেমন যেন খারাপ লাগছে। সে দরজার পাশ দিয়ে ঢোকার সময় রহিম চাচার দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। হাসিটা মুখে এল না।

রহিম চাচা দেখলেন। কিছু বললেন না। শুধু আস্তে করে বললেন, "আল্লাহ মায়ের ভালো করুন।"

লাবণ্য শুনতে পেল না।

রাতে খাওয়া-দাওয়া সেরে লাবণ্য বিছানায় শুয়ে পড়ল। ফোনে স্ক্রল করতে করতে তার মনে পড়ল—আজ কি রহিম চাচাকে একটুও কথা বলেছে? না। উত্তরটাও ঠিক করে দেয়নি। এই লোকটা সারাদিন এখানে বসে থাকে। কত বয়স হবে? কার সাথে থাকে? কিছুই জানে না সে।

কিন্তু এই ভাবনাটা মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল। ফোনের স্ক্রিনে আরেকটা ভিডিও ভেসে উঠল। সে আবার স্ক্রল করতে লাগল।

---

জানুয়ারির এক শীতের রাতে ফ্ল্যাটের মেইন গেটে তালা লাগিয়ে রহিম চাচা নিজের ঘরে ফিরলেন। আজ খুব ঠান্ডা। কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন, তবু ঘুম আসছে না। বুকে কেমন যেন চিনচিন করে। ওষুধ আছে, কিন্তু নেওয়ার ইচ্ছে করছে না। এখন মনে হয় কেউ যদি একটু পাশে বসত—ছেলেটা, নাতিটা...

কিন্তু কেউ আসবে না। তিনি জানেন।

হঠাৎ দরজায় শব্দ হলো। "চাচা?"

রহিম চাচা চমকে উঠলেন। লাবণ্য দাঁড়িয়ে।

"চাচা, ঘুমান নাই?"

"না মা। কী মনে করে এত রাতে?"

লাবণ্য একটু ইতস্তত করে বলল, "আমার ফোনটা অফিসে ফেলে এসেছি। আরেকটা ফোন থেকে ট্র্যাক করছি, দেখাচ্ছে এই বিল্ডিংয়েই আছে। আপনি কি কাউকে ঢুকতে দেখেছেন?"

রহিম চাচা ভাবলেন। "না মা, কেউ ঢোকে নাই। আপনি নিশ্চিত অফিসে ফেলছেন?"

লাবণ্যর মুখটা শুকিয়ে গেল। "হ্যাঁ, তা-ই মনে হচ্ছে। কিন্তু এত রাতে..."

"কাল সকালে গিয়ে আনলেই হবে। আল্লাহ ভরসা। কিছু হবে না। আপনি এখন যান, ঘুমান। ঠান্ডা লাগবে।"

লাবণ্য চলে গেল। রহিম চাচা দরজাটা বন্ধ করে আবার শুতে গেলেন। কিন্তু ঘুম এল না। তার মনে হতে লাগল, এত রাতে একটা মেয়ে একা বেরিয়েছে—কী বিপদই না হতে পারত! এই মানুষগুলো নিজেদের এত ব্যস্ত রাখে যে জীবনের ছোট ছোট বিপদগুলোও দেখতে পায় না। অথচ তিনি বসে বসে দেখেন সব। কিন্তু তাকে কেউ দেখে না।

পরদিন সকালে লাবণ্য অফিসে গিয়ে ফোন পেয়ে গেল। ফিরে এসে রহিম চাচাকে বলল, "পেয়েছি, চাচা।"

রহিম চাচা হাসলেন। "আলহামদুলিল্লাহ।"

লাবণ্য আবার হাঁটা দিল।

"মা, একটু শুনবেন?"

লাবণ্য থামল। অবাক হয়ে তাকাল। এই প্রথম রহিম চাচা তাকে থামতে বললেন।

"কাল রাতে ঠান্ডা খুব ছিল। আপনি একা বেরিয়েছিলেন। পরে আমার খুব চিন্তা হইছিল। এখন থেকে এত রাতে একা বাইর হবেন না। দরকার হইলে আমারে ডাক দিয়েন। আমি যামু।"

লাবণ্য কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। এত দিন এই মানুষটাকে সে দেখেও দেখেনি। রহিম চাচার চোখের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো—এই চোখে কত কথা! কত একাকিত্ব! কত অপেক্ষা!

সে বলল, "ঠিক আছে, চাচা। ধন্যবাদ।"

তারপর হেঁটে চলে গেল। কিন্তু এবার আর আগের মতো নয়। এবার তার মনে একটা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিল—এই মানুষটা কে? কেন সারাদিন এখানে বসে থাকে? তার নিজের কেউ নেই?

প্রথমবারের মতো সে একটু থমকে দাঁড়াল। পেছনে ফিরে তাকাল। রহিম চাচা তখন শিউলি গাছটার দিকে তাকিয়ে আছেন। তার চোখেমুখে একটা অদ্ভুত শূন্যতা—যেন তিনি কোথাও নেই। শরীর এখানে, মন বহুদূরে।

লাবণ্যর বুকটা কেমন করে উঠল। সে ঠিক করল, কাল থেকে রহিম চাচার সাথে একটু কথা বলবে। ভালো করে কথা বলবে।

কিন্তু কাল আসে না। কাল কখনো আসে না।

---

ফেব্রুয়ারি মাসের এক সকাল। ফ্ল্যাটে কোলাহল। আজ রহিম চাচার জানালাটা খোলেনি। সকাল আটটা বেজে গেছে, অথচ তিনি বের হননি। ফটকের তালা এখনো খোলা হয়নি। ফ্ল্যাটের লোকজন ভিড় জমিয়েছে রহিম চাচার ঘরের সামনে।

কেউ বলল, "চাচা, দরজা খোলেন!"

কোনো সাড়া নেই।

শেষমেশ সাত তলার করিম সাহেব দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকলেন। ভেতরে রহিম চাচা তোষকের ওপর শুয়ে আছেন। শরীর ঠান্ডা। হাতে পুরোনো খাতাটা। তিনি আর নেই।

খবর ছড়িয়ে পড়ল ফ্ল্যাটে। সবাই এল। কেউ কাঁদছে, কেউ চুপ। কিন্তু বেশিরভাগের চোখ শুকনো। কারণ রহিম চাচা তাদের কেউ ছিলেন না। তিনি ছিলেন শুধুই দারোয়ান—একজন অদৃশ্য মানুষ, যাকে দেখেও কেউ দেখেনি।

লাবণ্য এসে দাঁড়িয়েছে ভিড়ের মধ্যে। তার চোখ ভিজে উঠেছে। কেন কাঁদছে, সে নিজেও জানে না। এই মানুষটাকে সে চিনত না, জানে না তার জীবন, তার গল্প। তবু কেন জানি কান্না পাচ্ছে।

করিম সাহেব রহিম চাচার হাত থেকে খাতাটা তুলে নিলেন। সবার সামনে খুললেন। এক পাতা, দুই পাতা—সব পাতায় শুধু ফ্ল্যাটের মানুষদের কথা। কে কবে অসুস্থ ছিল, কার বাচ্চা কবে পরীক্ষা দিয়েছে, কে কবে চাকরি হারিয়েছিল, কে কবে বিয়ে করেছে।

সবশেষ পাতাটা খোলা ছিল। তাতে লেখা—

"আজ ২রা ফেব্রুয়ারি। শরীরটা ভালো লাগছে না। বুকের ব্যথাটা বাড়ছে। ছেলেটাকে ফোন করতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু ওর সংসার আছে, টেনশন দিতে চাই না। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, ফ্ল্যাটের সবাই ভালো থাকুক। কেউ যেন অসুস্থ না হয়। আর হ্যাঁ, লাবণ্য মা'র মনটা আজ খারাপ ছিল—কাল সকালে যেন হাসিমুখে অফিসে যেতে পারে, এই দোয়া করি।"

লাবণ্যর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটা তার জন্য দোয়া করতেন! তাকে দেখতেন, তার ভালো-মন্দ বুঝতেন! অথচ সে কখনো একদিনও দাঁড়িয়ে কথা বলেনি।

করিম সাহেব বললেন, "রহিম চাচার ছেলেকে খবর দিতে হবে। কেউ নম্বর জানেন?"

সবাই চুপ। কেউ জানে না। এই পঁয়ত্রিশটা ফ্ল্যাটের কেউ কখনো রহিম চাচার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আগ্রহ দেখায়নি। তিনি কখনো বলেননি, কেউ কখনো জিজ্ঞেসও করেনি।

শেষমেশ তার পুরোনো ফোন থেকে ছেলের নম্বর পাওয়া গেল। ফোন করা হলো। ছেলে এল। কাঁদল। কিন্তু লাবণ্যর মনে হলো, এই কান্নায় প্রকৃত দুঃখ নেই। এই কান্না শুধু কর্তব্যের।

শেষকৃত্য শেষে ছেলে চলে গেল। ফ্ল্যাট আবার আগের মতো হয়ে গেল। শুধু ফটকের পাশের ঘরটা খালি পড়ে রইল। কিছুদিন পর আরেকজন দারোয়ান এল—নতুন মানুষ, নতুন মুখ। পুরোনো মানুষটা ভুলে গেল সবাই।

কিন্তু লাবণ্য ভুলতে পারল না।

---

রহিম চাচার সেই খাতাটা লাবণ্য নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। মলাট ছেঁড়া, পাতা হলদে হয়ে যাওয়া খাতাটা এখন তার শোবার টেবিলে থাকে। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে সে একবার করে পড়ে। পড়তে পড়তে তার মনে হয়, এই লেখাগুলো শুধু কিছু কথার সমষ্টি নয়—একটা মানুষের ভালোবাসার ইতিহাস। একজন অদৃশ্য মানুষের নিঃশব্দ ভালোবাসা।

একদিন রাতে সে খাতাটার শেষ পাতায় নিজের হাতে লিখল—

"রহিম চাচা, আমি দুঃখিত। আপনি আমাদের দেখেছেন, কিন্তু আমরা কখনো আপনাকে দেখিনি। আপনি আমাদের মানুষ ভেবেছিলেন, কিন্তু আমরা আপনাকে শুধু দারোয়ান ভেবেছি। এই সমাজ বড্ড নিষ্ঠুর—আমরা সেই সব মানুষকে ভুলে যাই, যারা আমাদের পাশে থাকে। যারা আমাদের জন্য দোয়া করে। যারা আমাদের দেখে, কিন্তু আমরা যাদের দেখি না।"

লিখে খাতাটা বন্ধ করল। চোখ বন্ধ করে ভাবল, এই শহরে কত রহিম চাচা আছেন—দারোয়ান, গাড়িচালক, ঝাড়ুদার, রিকশাওয়ালা। সবাই অদৃশ্য। সবাই সবার, অথচ কারো না। তারা রোজ আমাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়, কিন্তু আমরা কখনো তাদের দিকে তাকাই না।

পরদিন সকালে লাবণ্য অফিসে যাওয়ার সময় নতুন দারোয়ানকে দেখল। থামল।

"আসসালামুআলাইকুম। আপনার নাম?"

নতুন দারোয়ান অবাক হয়ে তাকাল। ফ্ল্যাটের কেউ তাকে নাম জিজ্ঞেস করেনি।

"ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমার নাম আব্দুল্লাহ।"

"চাচা, আপনি কেমন আছেন?"

আব্দুল্লাহ চাচা আরো অবাক হলেন। হাসলেন। বললেন, "ভালো আছি, মা। আল্লাহর রহমতে।"

লাবণ্য হাসল। বলল, "আমার নাম লাবণ্য। আমি সাত তলায় থাকি। কোনো কিছু দরকার হলে আমাকে বলবেন। আর হ্যাঁ, সকালে নাশতা খেয়েছেন?"

আব্দুল্লাহ চাচা নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। এত দিন এই শহরে আছেন, কেউ তাকে এমন করে কথা বলেনি। তিনি কিছু বলার আগেই লাবণ্য এগিয়ে গেল।

কিন্তু এবার আর আগের মতো নয়। এবার সে পেছনে ফিরে তাকাল। আরেকবার। তারপর হাসল।

আব্দুল্লাহ চাচাও হাসলেন। তার বুকের ভেতর একটু উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। তিনি জানতেন না যে এই মেয়েটির এমন আচরণের পেছনে একজন রহিম চাচা আছেন—একজন অদৃশ্য মানুষ, যার মৃত্যু একটা মেয়েকে চোখ খুলে দিয়েছে।

---

সেদিন বিকেলে লাবণ্য অফিস থেকে ফিরে শিউলি গাছটার দিকে তাকিয়ে দেখল, আব্দুল্লাহ চাচা ফুল কুড়োচ্ছেন। সে কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

"ফুল ভালোবাসেন, চাচা?"

আব্দুল্লাহ চাচা হাসলেন। "ভালোবাসি, মা। এই গাছটা রহিম চাচা লাগিয়েছিলেন। শুনেছি। উনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন।"

"আপনি জানেন?"

"জানি। উনি চলে যাওয়ার পর সবাই ভুলে গেছে, কিন্তু গাছটা মনে রেখেছে। রোজ ফুল ফোটে। যেন উনি ফুলের ভেতর দিয়েও বলতে চাচ্ছেন—আমি আছি।"

লাবণ্যর চোখে জল আসে। সে ফুলগুলো হাতে নেয়। বলে, "চাচা, এই ফুলগুলো দিয়েছিলেন বলেই তো আজ আমি দেখতে শিখেছি। উনি অদৃশ্য ছিলেন, কিন্তু উনি চলে যাওয়ার পর আরো বড় হয়ে দেখা দিয়েছেন। আমাদের সবার ভেতর।"

আব্দুল্লাহ চাচা কিছু বললেন না। শুধু হাসলেন। আকাশে সন্ধ্যা নামছে। শিউলি ফুলগুলো হাতে নিয়ে লাবণ্য উপরে চলে গেল।

রাতে বিছানায় শুয়ে সে আবার খাতাটা খুলল। রহিম চাচার শেষ লেখাটা চোখ বুলিয়ে পড়ল। তারপর নিজের লেখা পাতায় আবার যোগ করল—

"আব্দুল্লাহ চাচা এসেছেন। আমি ওনার নাম জিজ্ঞেস করেছি। ওনার খোঁজ নিচ্ছি। রহিম চাচা, তুমি চলে গেছ, কিন্তু তুমি আমাকে শিখিয়ে গেছ—মানুষ হয়ে মানুষকে দেখা কী জিনিস। আমি ভুলব না। কোনোদিন ভুলব না।"

খাতাটা বন্ধ করে জানালার কাছে দাঁড়াল লাবণ্য। নিচে ফটকের কাছে আব্দুল্লাহ চাচার ঘরে আলো জ্বলছে। রাস্তায় মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। সবাই ব্যস্ত। সবাই আপন গন্তব্যে ছুটছে।

কিন্তু এখন সে জানে, এই চলার পথে কিছু মানুষ থাকে—যারা স্থির, নিঃশব্দ, অথচ সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। তারা অদৃশ্য নয়, আমরা তাদের দেখি না। এই যা পার্থক্য।

আর এই দেখা শেখাটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা। রহিম চাচার খাতা আর শিউলি ফুলের মতো—নীরব, অথচ গভীর। মরে গিয়েও যে মানুষ বাঁচিয়ে রাখে আরেকটি মানুষকে, এই তো জীবন।

জানালার বাইরে একটা শিউলি ফুল ঝরে পড়ল মাটিতে। লাবণ্য দেখল, পরদিন সকালে আব্দুল্লাহ চাচা সেটা কুড়োবেন। আর সে জানে, ফুলগুলো কুড়োতে কুড়োতে তিনি হয়তো রহিম চাচার কথা ভাববেন—যেমন রহিম চাচা ভাবতেন তার বউয়ের কথা, তার গ্রামের কথা, তার হারিয়ে যাওয়া মানুষদের কথা।

এভাবেই জীবন চলে। কেউ যায়, কেউ আসে। শুধু ভালোবাসাটুকু থেকে যায়—শিউলি ফুলের মতো নিঃশব্দে ঝরে, আবার কেউ কুড়োয়, আবার কেউ মনে রাখে। এই তো অমরতা। এই তো অদৃশ্য হওয়ার একমাত্র প্রতিষেধক।

লাবণ্য আলো নিভিয়ে শুতে গেল। কাল সকালে আবার আব্দুল্লাহ চাচাকে দেখবে। আবার জিজ্ঞেস করবে—"কেমন আছেন, চাচা?" আর এই ছোট্ট প্রশ্নটাই বদলে দিতে পারে একটা মানুষের পুরো দিন। এই ছোট্ট প্রশ্নটাই পারে একজন অদৃশ্য মানুষকে দৃশ্যমান করে তুলতে।

কারণ দেখাটাই তো ভালোবাসা। আর ভালোবাসাই শেষ সত্য।

#অদৃশ্য_মানুষ

19/07/2026

ভাঙা স্বপ্নের গান

অভ্রর বয়স চব্বিশ। এই বয়সে দাঁড়িয়ে তার জীবনটা একটা অদ্ভুত মোড়ে এসে ঠেকেছে। গ্রাজুয়েশন শেষ হয়েছে বছরখানেক। চাকরির ইন্টারভিউ দিচ্ছে একটার পর একটা—কোথাও হয় না। রেজাল্ট ভালো ছিল, কিন্তু চাকরির বাজারে রেজাল্টের দাম নেই। দরকার রেফারেন্স, দরকার নেটওয়ার্ক, দরকার "সফট স্কিল"—যে শব্দটা অভ্রর কাছে বিষের সমান।

আজ সকালে আরেকটা রিজেকশন ইমেইল এল। "উই রিগ্রেট টু ইনফর্ম ইউ..."—এই লাইনটাই এখন তার সবচেয়ে পরিচিত বাক্য। অভ্র ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে দিল। চিৎ হয়ে শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। সিলিংয়ের একটা কোনায় মাকড়সা জাল বুনেছে। অভ্রর মনে হলো, এই মাকড়সাটাও তার চেয়ে ভালো আছে—অন্তত ওর একটা কাজ আছে, জাল বোনার কাজ।

মা এসে দরজায় দাঁড়ালেন। "অভ্র, চা খাবি?"

"না।"

"কিছু খেয়ে নে বাবা। সকাল থেকে কিছু খাসনি।"

"খিদে নেই, মা। তুমি যাও।"

মায়ের মুখটা ম্লান হয়ে গেল। তিনি কিছু না বলে চলে গেলেন। অভ্র জানে, মায়ের কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কী করবে? সবার মুখের দিকে তাকাতে পারে না এখন। পাড়ার কাকু-কাকিমারা জিজ্ঞেস করে, "কী, চাকরি পেলে না এখনো?" এই প্রশ্নটা যেন আগুন হয়ে পুড়িয়ে দেয় তাকে।

তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু অনিক চাকরি পেয়ে গেছে গত মাসে। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি। সেলারি ছয় অঙ্কের। এখন অনিকের সাথে দেখা হলে অভ্রর বুকের ভেতরটা কেমন করে। বন্ধুর সাফল্যে খুশি হয়, কিন্তু নিজের ব্যর্থতা যেন আরো বেশি করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

---

অভ্রর একটা স্বপ্ন ছিল। ছোটবেলা থেকেই সে গিটার বাজাতে ভালোবাসত। কলেজে উঠে গান লিখতে শুরু করেছিল। ব্যান্ড করার ইচ্ছে ছিল, মিউজিক নিয়ে পড়তে চেয়েছিল। কিন্তু বাবা রাজি হননি। বাবা বলেছিলেন, "গান-টান করে পেট চলবে না। ইঞ্জিনিয়ার হ। সেটলড হ। তারপর যা খুশি করিস।"

অভ্র ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হলো। কিন্তু মন পড়ে থাকত সেই পুরোনো গিটারটার কাছে। হোস্টেলের ঘরে রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে সে আস্তে করে গিটার বাজাত। দরজা বন্ধ করে, জানালার পর্দা টেনে দিয়ে—যেন অপরাধ করছে। চার বছর এভাবেই কেটেছে। পাশ করেও বেরিয়েছে ভালো নম্বর নিয়ে। কিন্তু চাকরি নেই।

আর এখন বাবা বলেন, "পাস করেও যখন চাকরি পাচ্ছিস না, তখন কী লাভ? গান শিখে চাকরি পেতিস, তাই করতি।"

এই কথাটা সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় অভ্রকে। যখন স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিল, তখন বাধা দেওয়া হয়েছিল। এখন যখন স্বপ্নটা মরে গেছে, তখন সেই স্বপ্নকেই খোঁচা মারা হচ্ছে।

---

বিকেলে অভ্র বেরিয়ে পড়ল। উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছে। শহরের ফুটপাথে ভিড়—সবাই ছুটছে, সবার গন্তব্য আছে। শুধু অভ্রর কোনো গন্তব্য নেই। সে একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসল।

চা দিচ্ছিল যে ছেলেটা, তার বয়স অভ্রর সমানই হবে। হাসিমুখে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল, "ভাই, কিছু মনে করবেন না—আপনার মুখটা খুব চেনা চেনা লাগছে। আপনি কি অভ্র?"

অভ্র অবাক হয়ে তাকাল। "হ্যাঁ। তুমি?"

ছেলেটা হেসে বলল, "আমি শুভ। আমরা একই কলেজে পড়তাম। আপনি তো কালচারাল প্রোগ্রামে গান গাইতেন। দারুণ গাইতেন। আমি আপনার বড় ফ্যান ছিলাম।"

অভ্রর মনে পড়ল না শুভকে। কিন্তু একটা উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল বুকের ভেতর। এত দিন পর কেউ তার প্রতিভার কথা বলল। কেউ মনে রেখেছে তাকে।

"তুমি এখন কী করো?" অভ্র জিজ্ঞেস করল।

শুভ একটু হাসল। "এই যে দেখছেন, চায়ের দোকান দিয়েছি। বাবার দোকান ছিল, উনি মারা যাওয়ার পর আমি চালাচ্ছি। আপনার কী খবর?"

অভ্র কিছু বলতে যাবে, তারপর থেমে গেল। কী বলবে? চাকরি নেই, টাকা নেই, স্বপ্ন শেষ?

শুভ যেন বুঝতে পারল। বলল, "জানেন ভাই, আমি কিন্তু আপনার একটা গান আজও গুনগুন করি। ওই যে, 'ভোরের আলোয় স্বপ্ন ভাঙে'—কী দারুণ লিখেছিলেন! আপনার গানগুলো ইউটিউবে দেন না কেন?"

"ইউটিউব?"

"হ্যাঁ। এখন তো অনেকেই করছে। আপনি গান লিখেন, গান গান, গিটার বাজান—একটা চ্যানেল খুলুন। মানুষ শুনবে।"

অভ্র মুচকি হাসল। "ওসব দিয়ে চলে না। বাবা বলে, গান করে পেট চলবে না।"

শুভ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, "আমার বাবা বলতেন, চায়ের দোকান দিয়ে কিছু হয় না। কিন্তু আমি এখন চলছি। খারাপ না। চাকরি-বাকরি নেই, কিন্তু নিজের ইচ্ছেমতো চলি। কেউ জবাবদিহি করে না। আর জানেন, সবচেয়ে বড় কথা—রাতে ঘুমাতে গিয়ে মনে হয় না যে আমি ভুল কিছু করছি।"

অভ্র চুপ করে রইল। শুভর কথাগুলো যেন মনের ভেতর আটকে গেল।

---

বাড়ি ফিরে অভ্র তার পুরোনো গিটারটা বের করল। কেসে ধুলো জমে আছে। কবে যেন শেষ বাজিয়েছিল—মনে নেই। আঙুলগুলো শক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু গিটারের তারগুলোয় আঙুল ছোঁয়াতেই যেন একটা বৈদ্যুতিক শিহরণ বয়ে গেল। অনেক দিন পর বৃষ্টি নামার আগে যেমন মাটির সোঁদা গন্ধ ওঠে, তেমনই কিছু একটা জেগে উঠল তার ভেতর।

সে বাজাতে শুরু করল। প্রথমে কাঁচা, আড়ষ্ট। তারপর ধীরে ধীরে সুর আসতে লাগল। আঙুলগুলো পুরোনো অভ্যেসে ফিরে যেতে চাইছে। অভ্রর মনে পড়ল কলেজের দিনগুলো—কত গান লিখেছিল, কত সুর করেছিল। সেই সব গান এখন কোথায়? খাতার ভেতর চাপা পড়ে আছে। নাকি হারিয়েই গেছে?

মা দরজার ওপাশ থেকে শুনতে পেলেন গিটারের শব্দ। তিনি কিছু বললেন না। শুধু দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার চোখ ভিজে উঠল। কারণ তিনি জানেন, এই গিটারটাই তার ছেলের আসল ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসাকে হত্যা করেই ছেলে এখন মরচে ধরা জীবন কাটাচ্ছে।

---

পরদিন সকালে অভ্র একটা সিদ্ধান্ত নিল। সে শুভর কথা মতো একটা ইউটিউব চ্যানেল খুলল। নাম দিল "অভ্রর গান"। প্রথম ভিডিওতে সে তার পুরোনো একটা গান গাইল—"ভোরের আলোয় স্বপ্ন ভাঙে"। ক্যামেরা নেই, ভালো ফোনও নেই। শুধু পুরোনো মোবাইলের ক্যামেরায় রেকর্ড করল। আলো কম, শব্দ নিখুঁত নয়। কিন্তু গানটা সত্যি।

ভিডিও আপলোড করে সে ফোনটা রেখে দিল। কোনো আশা নেই। কে শুনবে তার গান? দুনিয়ার এত কনটেন্টের ভিড়ে তার গান কেউ খুঁজে পাবে না।

পরদিন সকালে ফোন খুলে অভ্র চমকে গেল। পাঁচশো ভিউ! পঞ্চাশটা কমেন্ট! কেউ লিখেছে, "অসাধারণ!" কেউ লিখেছে, "একটা সময় থেমে গিয়েছিলাম, আপনার গান শুনে থেমে গেলাম আরেকবার।" কেউ লিখেছে, "আপনি গান ছেড়ে দেবেন না। প্লিজ।"

অভ্রর চোখ ভিজে উঠল। সে বুঝতে পারল, দুনিয়ায় কেউ না কেউ আছে, যে তার গান বোঝে। কেউ না কেউ আছে, যে তার জন্য অপেক্ষা করছে। শুধু সে নিজেকে চিনত না।

সেই শুরু। প্রতিদিন একটা করে গান আপলোড করতে লাগল অভ্র। নিজের লেখা, নিজের সুর। ভিউ বাড়তে লাগল। ফলোয়ার বাড়তে লাগল। একদিন এক ছোটখাটো মিউজিক প্রোডিউসার ফোন করল। বলল, "আমি আপনার সাথে কাজ করতে চাই।"

অভ্রর পা মাটিতে নেই। সে বাবার কাছে গেল। বলল, "বাবা, আমি মিউজিক নিয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চাই। চাকরি নয়।"

বাবার মুখ লাল হয়ে গেল। "পাগল হয়েছিস? এত দিন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়িয়ে লাভ কী হলো? চাকরি করবি না? গান গেয়ে সংসার চলবে? তোর বউ-ছেলেমেয়ে হবে, তাদের খাওয়াবি কী করে?"

অভ্র বলল, "বাবা, যে কাজ ভালোবাসি না, সেটা করে কখনো সফল হতে পারব না। এই চার বছর ইঞ্জিনিয়ারিং করেছি, কিন্তু মন পড়ে ছিল গানে। এখন গানটাই করতে দাও। প্লিজ।"

বাবা রেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। মা এসে অভ্রর পাশে দাঁড়ালেন। বললেন, "তুই কর, বাবা। আমি আছি তোর সাথে।"

অভ্র মায়ের হাত ধরে কাঁদল। এত দিন পর যেন নিঃশ্বাস নিতে পারছে।

---

এরপর শুরু হলো নতুন সংগ্রাম। মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি সহজ নয়। অনেক প্রতিযোগিতা, অনেক রাজনীতি। কিন্তু অভ্র থামেনি। সে গান লিখেছে, গেয়েছে, গিটার বাজিয়েছে। ছোট ছোট কনসার্ট করেছে। একদিন একটা বড় প্ল্যাটফর্ম থেকে ডাক এল—"আপনি আমাদের শোতে পারফর্ম করবেন?"

অভ্র রাজি হয়ে গেল।

শোয়ের দিন। মঞ্চে আলো জ্বলছে। দর্শক সারি সারি বসে আছে। অভ্রর বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে। সে গিটার হাতে মঞ্চে উঠল। আলোটা চোখে পড়ায় কিছু দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু সে জানে, এই তার স্বপ্নের মুহূর্ত। এই তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

সে গান শুরু করল। তার নিজের লেখা গান—"জীবন যেখানে শুরু হয়"।

"হারানো পথের শেষে দাঁড়িয়ে দেখি,/ স্বপ্নগুলো সব পড়ে আছে ঝরে।/ ভেবেছিলাম শেষ, কিন্তু শেষ নয়,/ জীবন যেখানে শুরু হয় সেখানে।"

গান শেষ হলে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর করতালির ঝড় উঠল। অভ্রর চোখে জল। সে মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে শুধু হাসছে আর কাঁদছে। দর্শকদের ভিড়ে সে এক কোণায় বাবাকে দেখতে পেল। বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। চোখ মুছছেন। তারপর আস্তে করে হাততালি দিচ্ছেন।

অভ্রর বুক ফেটে গেল। বাবা এসেছেন। বাবা তার গান শুনেছেন। বাবা হাততালি দিচ্ছেন।

---

সেই রাতে বাড়ি ফিরে অভ্র দেখল, বাবা বসে আছেন বারান্দায়। একা। অন্ধকারে একটা সিগারেট জ্বলছে।

অভ্র কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না।

বাবা বললেন, "বোস।"

অভ্র বসল।

বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, "আমি ভুল ছিলাম।"

অভ্র অবাক হয়ে তাকাল।

"তোর মা আমাকে বলেছিল, তুই গান ভালোবাসিস। আমি শুনিনি। আমি ভেবেছিলাম, জগতের নিয়মই হলো—চাকরি করতে হবে, টাকা কামাতে হবে, সংসার করতে হবে। কিন্তু আজ তোকে মঞ্চে দেখে বুঝলাম, মানুষ বাঁচে তার ভালোবাসা দিয়ে। তুই গান ভালোবাসিস, সেটাই তোর জীবন। আমি তোকে বাধা দিয়েছিলাম বলে আজ তোর চার বছর নষ্ট হয়েছে। আমাকে ক্ষমা করিস, বাবা।"

অভ্রর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। সে বাবার হাত ধরে বলল, "বাবা, তুমি ক্ষমা চেয়ো না। তুমি তো আমার ভালো চেয়েছ। কিন্তু আমি আজ থেকে প্রতিজ্ঞা করছি, আমি আমার সন্তানকে কখনো তার স্বপ্ন থেকে দূরে সরাব না।"

বাবা কিছু বললেন না। শুধু অভ্রর হাতটা চেপে ধরলেন। অন্ধকারে দুজন পাশাপাশি বসে রইলেন। অনেক বছর পর বাবা আর ছেলের মধ্যে কোনো দেয়াল নেই।

---

পাঁচ বছর পর।

অভ্র এখন দেশের নামকরা সুরকার ও গায়ক। তার ফলোয়ার লাখ লাখ। কিন্তু সে এখনো সেই চায়ের দোকানে যায়—যেখানে শুভ চা দেয়। এখনো পুরোনো গিটারটা রেখে দিয়েছে যত্ন করে। এখনো মায়ের কাছে বসে গান শোনায়।

বাবা আর আগের মতো রাগেন না। বরং গর্ব করে বলেন, "আমার ছেলে সুরকার।"

একদিন এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করল, "আপনার সাফল্যের পেছনে কে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে?"

অভ্র মুচকি হেসে বলল, "একজন চা-ওয়ালা, যে একদিন আমাকে বলেছিল—রাতে ঘুমাতে গিয়ে যেন মনে না হয় যে আমি ভুল কিছু করছি। সেই শুভ, যে আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছিল যে আমার স্বপ্নটা এখনো বেঁচে আছে। আর আমার মা, যিনি কখনো আমাকে ছেড়ে যাননি। আর আমার বাবা, যিনি একদিন মঞ্চের কোণে দাঁড়িয়ে কেঁদেছিলেন—সেই অশ্রুই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।"

সাংবাদিক জিজ্ঞেস করল, "নতুন প্রজন্মকে কী বলবেন?"

অভ্র বলল, "একটাই কথা—যে কাজ ভালোবাসো, সেটাই করো। সমাজ তোমাকে অনেক বাধা দেবে। তোমার নিজের পরিবারও দেবে। কিন্তু যদি সত্যি ভালোবাসো, তাহলে একদিন জিতবেই। আর যদি হেরেও যাও, তবু অন্তত রাতে ঘুমাতে গিয়ে মনে হবে না যে তুমি ভুল কিছু করছ।"

---

আজ সন্ধ্যায় অভ্র আবার সেই মঞ্চে গান গাইবে—যেখানে প্রথম বড় শো করেছিল। আজ তার বাবা আবার আসবেন। কিন্তু এবার কোণায় দাঁড়িয়ে নয়, সামনের সারিতে বসে।

অভ্র আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে। পরনে সাদা পাঞ্জাবি। হাতে গিটার। চোখে-মুখে শান্তি। সে জানে, জীবনটা এখনো সহজ নয়। এখনো অনেক চড়াই-উৎরাই বাকি। কিন্তু এখন তার ভেতরে ভয় নেই। কারণ সে জানে, স্বপ্নের পথে হাঁটতে গিয়ে যে কষ্ট হয়, সেটা ভুল পথে হাঁটার কষ্টের চেয়ে অনেক সহজ।

মঞ্চে ওঠার আগে ফোনটা বেজে উঠল। শুভ ফোন করেছে।

"ভাই, আজকের শোয়ের জন্য শুভকামনা।"

"তুই আসছিস না?"

"আসব। দোকান বন্ধ করে আসব। কিন্তু একটা কথা বলতে চাই।"

"কী?"

"তোমার যে গানটা—'ভোরের আলোয় স্বপ্ন ভাঙে'—ওটার লিরিক্স একটু বদলে দিও।"

"কেন?"

"কারণ স্বপ্ন ভাঙে না, ভাই। স্বপ্ন শুধু ঘুমিয়ে থাকে। একটু ডাক দিলেই জেগে ওঠে। তুমিই তো প্রমাণ করলে।"

অভ্র হাসল। বলল, "ঠিক বলেছিস। তাহলে আজকের শোতে নতুন গান গাইব—'ভোরের আলোয় স্বপ্ন জাগে'।"

ফোন রেখে অভ্র মঞ্চের দিকে হাঁটতে লাগল। পেছনে তার জীবনের সব কষ্ট, সব ব্যর্থতা, সব লড়াই পড়ে রইল। সামনে শুধু আলো। আর সেই আলোর দিকেই সে হাঁটছে—হাতে গিটার, মনে স্বপ্ন, চোখে আগামীর ছবি।

কারণ স্বপ্ন সত্যিই ঘুমিয়ে থাকে। শুধু একটু ডাক দিতে হয়। একটু সাহস করতে হয়। আর একবার জেগে উঠলে সেই স্বপ্নই পারে জীবন বদলে দিতে।

অভ্র জানে, তার গল্প শেষ নয়। বরং এখনই শুরু। আর এই গল্প শুধু তার নয়—এ গল্প প্রতিটি মানুষের, যে তার স্বপ্নকে খুঁজে পায়নি এখনো। যে ভয় পায়, দ্বিধা করে, সমাজের চোখে ভয় পায়। তাদের সবার জন্য অভ্রর একটাই বার্তা—

"ভয় নয়। লড়ো। স্বপ্ন দেখো। আর সেই স্বপ্নকে জাগিয়ে তোলো। কারণ জীবন একটাই। আর এই জীবনে দ্বিতীয়বার সুযোগ আসে না।"

মঞ্চের আলো জ্বলে উঠল। অভ্র গিটার হাতে এগিয়ে গেল। করতালির শব্দে কান পাতা দায়। সে হাসল—সত্যি হাসি, বহুদিন পর।

শেষমেশ, স্বপ্ন জেগেছে। আর স্বপ্ন জাগলে পৃথিবী বদলে যায়। ধীরে ধীরে, নীরবে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে।

অভ্রর কণ্ঠে সুর ভেসে উঠল—

"স্বপ্ন ছিল ঘুমিয়ে, ডাক দিলাম আমি,/ অন্ধকার কেটে গেল, এখন আলো নামি।"

#ভাঙা_স্বপ্নের_গান

19/07/2026

ডিজিটাল মানুষ

নীলার ঘুম ভাঙে মোবাইলের অ্যালার্মে। চোখ মেলতেই প্রথম কাজ—ফোনটা হাতে নেওয়া। চোখ কচলে স্ক্রিনে তাকায়। ইনস্টাগ্রামে গত রাতের পোস্টে কত লাইক পড়ল? কত কমেন্ট?

"১২ হাজার লাইক! ২৩৪টা কমেন্ট!"

নীলার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফোটে। সকাল সাতটা বাজার আগেই তার একটা রিল ভাইরাল হয়েছে। গতকাল বানিয়েছিল—সাদা শাড়ি পরে এক কাপ চা হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল। ক্যাপশনে লিখেছিল: "বৃষ্টি মানেই রোমান্স। তাই না?"

কমেন্টে কেউ লিখেছে "গর্জিয়াস", কেউ "কুইন", কেউ বা শুধু আগুনের ইমোজি। নীলা এক নিঃশ্বাসে সব স্ক্রল করে। তার মনে হয়, এই তো জীবন। লাইক, কমেন্ট, শেয়ার—এই তো ভালোবাসা।

বিছানা ছেড়ে ওঠার আগেই আরেকটা রিল বানানোর পরিকল্পনা করতে থাকে সে। কী করলে বেশি ভিউ আসবে? কী করলে ট্রেন্ডিংয়ে থাকবে?

---

বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নীলা নিজের মুখ দেখে। চোখের নিচে কালি পড়েছে। সারারাত ঘুম হয়নি ঠিকমতো—কবে শেষ রাতে একটা ট্রল কমেন্ট পড়েছিল, "এত মেকাপ, আসল চেহারাটা দেখাও না।" কমেন্টটা মুছে দিয়েছে সে, কিন্তু মনের ভেতর থেকে মুছতে পারেনি। কে এই মানুষ? কেন এমন বলে?

আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে নীলার মনে হয়, সত্যিই তো, আসল চেহারাটা কেমন? ফিল্টার ছাড়া, আলো-ক্যামেরার কারিকুরি ছাড়া সে দেখতে কেমন? সে নিজেও জানে না। কারণ ফোনের ক্যামেরা যা দেখায়, তাই-ই এখন তার মুখ। আয়নাটা শুধুই ফিল্টারহীন সত্যিটা মনে করিয়ে দেয়, আর সেই সত্যিটা এখন তার কাছে বড্ড অস্বস্তিকর।

নীলা ফিরে আসে ফোনের কাছে। আয়নাকে পেছনে ফেলে।

---

নীলা এখন পুরোদস্তুর ইনফ্লুয়েন্সার। তিন লাখ ফলোয়ার। প্রতিদিন ভিডিও বানাতে হয়। রেস্টুরেন্টে গিয়ে খেতে হয়, হোটেলে গিয়ে থাকতে হয়, কাপড় পরে ছবি তুলতে হয়। সব কিছু ফ্রি—শুধু একটু পোস্ট করতে হয়। একটু হাসতে হয় ক্যামেরার সামনে।

হাসিটাও এখন প্র্যাকটিস করা। একটু ঠোঁট ফাঁক করে, চোখ সরু করে, যেন খুব স্বাভাবিক হাসি। কিন্তু স্বাভাবিকতা কোথায়? নীলা নিজেও জানে না এখন স্বাভাবিক হাসিটা কেমন। কারণ হাসলেই মনে হয়, ক্যামেরার ফ্রেমটা ঠিক হলো কি না। লাইটিং ঠিক আছে কি না। অ্যাঙ্গেল ভালো হলো কি না।

মা ফোন করলে বলে, "একটু বাড়ি আয় না মা। তোকে দেখছি না কত দিন।"

নীলা বলে, "আসব মা। এখন খুব কাজ।"

মা বলেন, "কাজ? কী কাজ তোর? সারাদিন ছবি তোলা আর ফোন নিয়ে পড়ে থাকা—এটাই কাজ?"

নীলা বিরক্ত হয়। মা বোঝেন না। এই ছবি তোলার জন্যই তো টাকা আসে। এই টাকায় সংসার চলে। মা বুঝবেন কী করে? উনি তো পুরোনো দিনের মানুষ।

কিন্তু একটা সত্যি কথা আছে—শেষ কবে মায়ের সাথে বসে গল্প করেছে, মনে নেই নীলার। শেষ কবে বাবার হাত ধরে হেঁটেছে, তাও না। শেষ কবে স্কুলের বান্ধবী ঐশীর সাথে দেখা করেছে, তাও ভুলে গেছে। বন্ধু বলতে এখন প্রিয়াঙ্কা, রাহুল, অনন্যা—সবাই একই ফিল্ডের। সবাই ইনফ্লুয়েন্সার। সবাই ব্যস্ত নিজেদের লাইক-কমেন্ট নিয়ে।

একবার এক আড্ডায় রাহুল বলেছিল, "দোস্ত, আমরা সবাই তো ভিখারি। ভিক্ষা চাই—লাইকের ভিক্ষা। ভালোবাসার ভিক্ষা।"

সেদিন সবাই হেসেছিল। কিন্তু নীলার ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল। কথাটা সত্যি তো! সে প্রতিদিন সেজেগুজে, হাসি গিলে, জীবনটাকে একটা পণ্যের মতো সাজিয়ে মানুষের সামনে ধরে—আর বিনিময়ে চায় লাইক। ডাবল ট্যাপ। ভালোবাসার আইকন। কিন্তু এই ভালোবাসা কি সত্যি?

---

একদিন সন্ধ্যায় ঘটল ঘটনাটা।

নীলা একটা পার্টিতে গেছে। ফাইভ-স্টার হোটেল। সবাই চেনে তাকে। সবাই হাসছে, সেলফি তুলছে। নীলাও হাসছে, ছবি তুলছে, ইনস্টাগ্রামে আপলোড করছে—"পার্টি নাইট উইথ লাভলি পিপল।"

হঠাৎ একটা মেয়ে এগিয়ে এল। বয়স বোধহয় নীলারই সমান। সাধারণ পোশাক। চোখেমুখে ঔজ্জ্বল্য নেই—বরং কিছুটা যেন বিষণ্ণতা। মেয়েটা বলল, "আপনি নীলা?"

নীলা হাসল। "হ্যাঁ, আমি। আপনি?"

"আমার নাম ঐশী। মনে আছে আপনার?"

নীলা থতমত খেল। ঐশী? হ্যাঁ, ঐশী তো তার স্কুলের বান্ধবী ছিল। সেই যে কবে দেখা, ফোনে শেষ কথা হয়েছিল বছর তিনেক আগে। তারপর আর না।

"ওহ, ঐশী! কী খবর বলো? তুমি এখানে?"

ঐশী একটু হাসল। "একটা ওয়েটারিং জব করি এখানে। কাজ শেষে আপনাকে দেখলাম, ভাবলাম কথা বলি। কিন্তু আপনি তো বড্ড ব্যস্ত।"

নীলার মুখটা গরম হয়ে গেল। চারপাশে এত লোক, এত ক্যামেরা—আর সে দাঁড়িয়ে আছে এক ওয়েট্রেসের সাথে কথা বলে! কেউ দেখলে কী ভাববে? ইনস্টাগ্রামে ভিডিও ভাইরাল হলে?

সে তাড়াতাড়ি বলল, "ও আচ্ছা, ভালো। অনেক কাজ পড়ে আছে এখন। পরে কথা বলি।"

কথাটা বলেই হনহন করে হেঁটে চলে গেল। পেছনে ঐশী দাঁড়িয়ে রইল। নীলা একবারও ফিরে তাকাল না।

সেই রাতে বাড়ি ফিরে নীলা বিছানায় শুয়ে পড়ল। খুব ক্লান্ত লাগছে। পার্টির সব ছবি এডিট করে পোস্ট করবে, ইচ্ছে করছে না। মনের ভেতরটা কেমন যেন করছে।

ঐশী। ছোটবেলায় ওর সাথে কত খেলেছে। কত গল্প করেছে। জীবনের স্বপ্ন ভাগাভাগি করেছিল দুজনে। ঐশী বলত, "নীলা, তুই বড় হয়ে অভিনেত্রী হবি।" নীলা বলত, "আর তুই হবে ডাক্তার।"

অভিনেত্রী হওয়া হয়নি। কিন্তু অভিনয় করছে প্রতিদিন—লাইকের জন্য, ভিউয়ের জন্য, ভ্যালিডেশনের জন্য। আর ঐশী? ও বোধহয় ডাক্তার হতে পারেনি। হোটেলে ওয়েটারিং করে। কিন্তু অন্তত ওর নিজের মুখোশ পরতে হয় না। নিজেকে লুকোতে হয় না।

নীলার চোখ ভিজে উঠল। সে ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রল করতে লাগল। কত অচেনা মানুষ, কত কমেন্ট—সবাই তার সুখী মুখটাই দেখছে। কেউ জানে না ভেতরে কী চলছে।

একটা নোটিফিকেশন এল। একজন লিখেছে, "তুমি আমার অনুপ্রেরণা। তোমার মতো হতে চাই।"

নীলা হাসল। তিক্ত হাসি। অনুপ্রেরণা! যদি জানত এই অনুপ্রেরণার ভেতরটা কতটা ফাঁপা, কতটা একা—তবে কেউ কি তার মতো হতে চাইত?

---

পরদিন নীলা ঠিক করল, একদিনের জন্য কোনো পোস্ট করবে না। ফোন বন্ধ রাখবে। একদিন নিজের জন্য বাঁচবে।

সকালে উঠে বারান্দায় দাঁড়াল। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। শৈশবে এমন বৃষ্টির দিনে সে দৌড়ে বাইরে চলে যেত। মা বকত, "জ্বর হবে।" কিন্তু সে শুনত না। পুকুরের পাড়ে গিয়ে ভিজত। এখন বৃষ্টি মানে শুধুই রিল বানানোর সুযোগ। এখন শাড়ি পরে, মেকাপ করে, ক্যামেরা সেট করে বৃষ্টির শট নিতে হয়। এখন বৃষ্টিটাও আর বৃষ্টি নেই—পোস্টের কনটেন্ট।

হঠাৎ দরজায় বেল বাজল। নীলা অবাক হয়ে দরজা খুলে দেখে, ঐশী দাঁড়িয়ে আছে।

"তুমি?"

ঐশী হাসল। "আসতে পারি?"

নীলা কিছু বলার আগেই ঐশী ভেতরে ঢুকে পড়ল। বসার ঘরে এসে বসল।

"কাল তো তোমার সাথে ঠিক করে কথা বলা হলো না। ভাবলাম, বাড়িতে এসে দেখা করি। তোমার ঠিকানা তোমার মায়ের কাছে নিয়েছি।"

নীলা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ওর মা? ঐশী এখনো ওর মায়ের সাথে যোগাযোগ রাখে?

"মাসির সাথে কথা হয় মাঝে মাঝে। উনি খুব একা। তুমি সময় দাও না বলে মন খারাপ থাকে।"

নীলার গলা শুকিয়ে গেল। সে কিছু বলতে পারে না।

ঐশী বলল, "জানো নীলা, আমি তোমার সব পোস্ট দেখি। তুমি খুব সুন্দর। খুব সফল। কিন্তু আমি তোমাকে চিনি। আসল নীলাকে চিনি। সেই নীলা, যে আমাকে ছাড়া টিফিন খেত না। যে রাতে ঘুমানোর সময় আমার হাত ধরে থাকত। সেই নীলার এই ফিল্টার-ভর্তি পৃথিবীটা দেখলে খুব কষ্ট হয় আমার।"

নীলার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। সে বুঝতে পারছে না কেন কাঁদছে। অনেক দিন কাঁদেনি সে। কারণ কাঁদলে মেকাপ নষ্ট হবে। চোখ ফুলে যাবে। তারপর ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে পারবে না।

কিন্তু আজ মেকাপ নেই। ফিল্টার নেই। ক্যামেরা নেই। শুধু সে আর তার ছোটবেলার বান্ধবী—আর পুরোনো দিনের গন্ধ, পুরোনো দিনের স্মৃতি।

"আমি খুব একা, ঐশী।"

এই কথাটা বলতে বলতেই যেন বুকের ভেতর জমে থাকা পাথরটা নড়ে উঠল। সে হু হু করে কেঁদে ফেলল। বাচ্চা মেয়ের মতো। ঐশী কাছে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।

"আমি জানি। তোর পোস্ট দেখলেই বুঝতে পারি। তুই সারাদিন মানুষকে হাসি দেখাস। কিন্তু তোর নিজের হাসিটা যে হারিয়ে গেছে।"

---

সেদিন সারাটা দুপুর তারা দুজনে বসে গল্প করল। পুরোনো দিনের কথা, স্কুলের কথা, খেলার কথা। নীলার মনে হতে লাগল, অনেক দিন পর সে শ্বাস নিতে পারছে। ফ্রি হয়ে বাঁচতে পারছে। কোনো ক্যামেরা নেই, কোনো অ্যাঙ্গেল নেই, কোনো ক্যাপশন নেই—শুধুই জীবন।

বিকেলে ঐশী চলে গেলে নীলা অনেক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর ফোনটা হাতে নিল। ইনস্টাগ্রাম খুলল। নিজের প্রোফাইলের দিকে তাকিয়ে থাকল।

তিন লাখ ফলোয়ার। হাজার হাজার লাইক। কিন্তু এই তিন লাখ মানুষের কেউ কি জানে সে কেমন আছে? কেউ কি জানে তার মা একা থাকেন? কেউ কি জানে তার হাসিটা নকল? কেউ কি এসে তাকে জড়িয়ে ধরবে?

না। কেউ না। এই তিন লাখ মানুষ শুধু তার ছবি দেখে, ভিডিও দেখে, লাইক দিয়ে স্ক্রল করে চলে যায়। পাঁচ সেকেন্ডের অ্যাটেনশন স্প্যান। তারপর ভুলে যায়। আগামীকাল আরেকজনের ভিডিও ভাইরাল হবে, তখন তাকেও ভুলে যাবে।

নীলা একটা লম্বা শ্বাস নিল। তারপর একটা পোস্ট লিখতে শুরু করল। ফিল্টার করা ছবি নয়। না, এবার শুধুই লেখা।

"আমি নীলা। তিন লাখ ফলোয়ারের ইনফ্লুয়েন্সার। কিন্তু বাস্তবে আমি একা। ভীষণ একা। এই পোস্ট আমি কাল সকালেই মুছে ফেলব। কারণ এটা কোনো কনটেন্ট নয়, কোনো ব্র্যান্ড প্রমোশন নয়। এটা শুধুই সত্যি। আপনারা যারা লাইক দেন, কমেন্ট করেন, তাদের ধন্যবাদ। কিন্তু আরেকটা লাইকের প্রয়োজন নেই আমার। প্রয়োজন ছিল একটু বাস্তব ভালোবাসা। একজন মানুষ, যে ফিল্টার ছাড়া আমাকে দেখতে পারে। আজ সেটা পেয়েছি। কাল থেকে আমি বদলাতে চাই। জানি না পারব কি না। কিন্তু চেষ্টা করব।"

পোস্টটা দিয়ে নীলা ফোনটা সাইলেন্টে রেখে দিল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে আয়নার সামনে গেল। আয়নায় নিজেকে দেখল—ফিল্টারহীন, কাঁদা চোখ, এলোমেলো চুল। অনেক দিন পর নিজেকে সত্যি বলে মনে হলো।

---

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল দরজার বেল শুনে। নীলা দরজা খুলে দেখে, মা দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে টিফিন ক্যারিয়ার।

"মা! তুমি এখানে?"

মা বললেন, "তোকে দেখতে এলাম। তোর ঐশী কাল ফোন করেছিল। বলল, তুই একা। আমার মেয়ে একা, আর আমি শহরে থাকি, এটা কি হয়?"

নীলা মাকে জড়িয়ে ধরল। সেই কবে ছোটবেলায় এমন জড়িয়ে ধরত। এখন তার মনে হচ্ছে, এই জড়িয়ে ধরাটাই জীবন। লাইক না, কমেন্ট না, শেয়ার না—শুধুই এই উষ্ণতা। এই স্পর্শ। এই ভালোবাসা।

মা বললেন, "আয়, তোর পছন্দের ইলিশ মাছ রান্না করে এনেছি। ভাত খাবি চল।"

নীলা টেবিলে বসল। ফোনটা এক পাশে পড়ে রইল। অনেক দিন পর সে মায়ের হাতের রান্না খাচ্ছে। কোনো ছবি তুলছে না। কোনো পোস্ট করছে না। শুধু খাচ্ছে আর মায়ের সাথে গল্প করছে।

মা বললেন, "জানিস, তোর পোস্টগুলো দেখলে আমার খুব গর্ব হয়, আবার খুব কষ্টও হয়। তুই হাসিস, কিন্তু আমি জানি হাসিটা ঠিক সত্যি না।"

নীলা অবাক হলো। মা কী করে জানেন?

মা যেন মন পড়তে পারলেন। বললেন, "মা যে। মায়ের চোখকে ফিল্টার দিয়ে ঠকানো যায় না। আমি তোর জন্ম থেকে চিনি। তোর কান্না, তোর হাসি—সব সত্যি না নকল, আমি বুঝি।"

নীলার চোখে জল আসে। সে মায়ের হাত ধরে বলে, "আমি আর কোনো দিন একা থাকব না, মা। তুমিও না।"

---

সেই রাতে নীলা অনেক্ষণ জেগে রইল। ফোনটা খুলে দেখল, গতকালের পোস্টটা মুছে ফেলেনি এখনো। কত কমেন্ট পড়েছে—কেউ লিখেছে "স্ট্রং", কেউ লিখেছে "ইউ আর ব্রেভ", কেউ আবার ট্রল করেছে। কিন্তু এসবের আর কোনো দাম নেই তার কাছে।

সে একটা নতুন ভিডিও বানাতে পারে। এক কাপ চা হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখার ভিডিও। কিন্তু এখন তার ইচ্ছে করছে না। বরং বারান্দায় গিয়ে সত্যি করে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতে ইচ্ছে করছে। ক্যামেরা ছাড়া। ফিল্টার ছাড়া। শুধু নিজের জন্য।

সে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তায় কেউ নেই। দূরের বাতিগুলো জ্বলছে আবছা আলোয়। নীলা হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির পানি ছুঁল। কত বছর পর বৃষ্টির পানি ছোঁয়া!

জীবনটা এত সহজ হতে পারে—এটা সে ভুলেই গিয়েছিল। সহজ জিনিসই তো আসল। বৃষ্টি, মায়ের হাতের রান্না, বান্ধবীর আলিঙ্গন। এসবের কোনো লাইক লাগে না, কোনো ভিউ লাগে না। এসব শুধু অনুভব করতে হয়।

---

এক সপ্তাহ পর।

নীলা এখনো ফোন চালায়। এখনো পোস্ট করে। কিন্তু আগের মতো সারাদিন ধরে নয়। দিনে একবার, কী প্রয়োজনীয় কিছু থাকলে। কিন্তু এখন সে যখন হাসে, তখন সত্যি হাসে। যখন কাঁদে, তখন সত্যি কাঁদে। এখন তার কনটেন্টে ফিল্টার থাকে, কিন্তু জীবনে নয়।

মায়ের সাথে দেখা করে নিয়মিত। ঐশীর সাথে যোগাযোগ রেখেছে। ছোট ছোট জিনিস উপভোগ করতে শিখেছে—এক কাপ চা, বৃষ্টির শব্দ, বিকেলের রোদ্দুর।

ফলোয়ার কমেছে বটে। তিন লাখ থেকে আড়াই লাখে নেমেছে। কিন্তু নীলার কিছু যায় আসে না। বরং যারা টিকে আছে, তারা এখন তার সত্যিটা জানে, সত্যিটা ভালোবাসে।

একদিন এক তরুণী মেসেজ করল: "তোমার পোস্ট দেখে আমি অনুপ্রাণিত হই। আগে ভাবতাম, তোমার মতো সুন্দর হতে গেলে অনেক কিছু করতে হবে। এখন বুঝি, নিজের মতো থাকাই সবচেয়ে সুন্দর।"

নীলা উত্তর দিল: "ঠিক বলেছ। নিজের মতো থাকো। কারণ তুমি যখন নিজের মতো থাকো, তখন তোমার মতো আর কেউ হয় না।"

মেসেজটা পাঠিয়ে নীলা হাসল। সত্যি হাসি। ফিল্টার ছাড়া।

সে জানে, এই সমাজ এখনো একই আছে। এখনো লাইকের ভিখারিতে ভরা। এখনো মানুষ ফিল্টার আর ফ্রেমের পেছনে ছুটছে। কিন্তু একটাই জীবন। আর এই জীবনে একটাই সত্যি—ভালোবাসা, যা কোনো অ্যাপে ডাউনলোড করা যায় না। যা শুধু অনুভব করা যায়।

নীলা আবার জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়। বাইরে সূর্য ডুবছে। আকাশ রাঙা হয়ে উঠেছে। সে ফোনটা পকেটে রাখে। এই মুহূর্তটা শুধু তার। ফোনের ক্যামেরায় বন্দি করার জন্য নয়।

শুধু বেঁচে থাকার জন্য।

শেষ বিকেলের রোদ্দুর জানলা দিয়ে এসে পড়ে তার মুখে। নীলা চোখ বন্ধ করে। শান্তি। সত্যি শান্তি।

অবশেষে।

#ডিজিটাল_মানুষ

Address

Bashundhara Residential Area
Dhaka-1216

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Mind Unlocked posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category