23/04/2021
মিনিকেট চালের ভাতের রসনা তৃপ্তির জন্য ব্যাকুল মানুষ। অথচ দেশে ‘মিনিকেট’ নামে কোনো ধানের জাত না থাকলেও এই নামে প্রতারণার মাধ্যমে রমরমা বাণিজ্য চলছে দীর্ঘকাল ধরে। এক শ্রেণির চালকল মালিক মোটা চাল ছেঁটে সরু করে ‘মিনিকেট’ বলে বাজারজাত করে বিপুল পরিমাণ মুনাফা লুটে নিচ্ছে। প্রায় ১ মাস ধরে অনুসন্ধানে বের হয়েছে এমন তথ্য।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত জাতগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকার ভারতীয় জাতের ধান চাষ হয়। কিন্তু মিনিকেট নামে কোনো ধানের জাত বাংলাদেশ কিংবা ভারতেও নেই।
স্থানীয়ভাবে কৃষকরা এটাকে মিনিকেট বললেও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট থেকে এই ধানের কোনো স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। ভারত থেকে আসা কথিত এই ধানই মিনিকেট বলে চাষ করেন স্থানীয় কৃষকরা। এ কারণে এই উপজেলায় সাড়ে ২২ হাজার হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে বেশিরভাগই কথিত মিনিকেট ধান দিয়ে ভরা থাকে।
সম্প্রতি বাংলাদশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট ব্রি-৫৭ নামের একটি ধান অনুমোদন দিয়েছে। এই ধান কথিত মিনিকেটের মতোই চিকন। ফলনও হয় বেশি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অটোরাইস মিলে রয়েছে একটি অতি বেগুনি রশ্নির ডিজিটাল সেন্সর প্লান্ট। এরমধ্যে দিয়ে যেকোনো ধান বা চাল পার হলে সেটি থেকে প্রথমে কালো, ময়লা ও পাথর সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর মোটা ধান চলে যায় অটোমিলের বয়লার ইউনিটে। সেখানে পর্যায়ক্রমে ৫টি ধাপ পার হওয়ার পর লাল কিংবা মোটা চাল সাদা রঙ ধারণ করে। এরপর আসে পলিশিং মেশিং। অতি সুক্ষ এই মেশিনে মোটা চালের চারিপাশ কেটে চালটিকে চিকন আকার দেয়া হয়। এরপর সেটি আবারও পলিশ ও স্টিম দিয়ে চকচকে শক্ত আকার দেয়া হয়। শেষে সেটি হয়ে যায় কথিত এবং আকর্ষণীয় মিনিকেট চাল।
কীভাবে এলো মিনিকেট
মিনিকেট নামের উৎপত্তি নিয়ে আরেক কৃষিবিদ সিরাজুল করিম চমৎকার তথ্য দেন। তিনি জানান, ১৯৯৫ সালের দিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ভারতের কৃষকদের মাঝে সে দেশের ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট নতুন জাতের চিকন ‘শতাব্দী’ ধানের বীজ বিতরণ করে। মাঠপর্যায়ে চাষের জন্য কৃষকদের এ ধান বীজের সাথে কিছু কৃষি উপকরণসহ একটি ‘মিনিপ্যাকেট’ দেয়া হয়। মিনিপ্যাকেটে করে দেয়ায় ভারতীয় কৃষকদের কাছে এ ধান শেষমেশ মিনিপ্যাকেট শব্দটির ‘প্যা’ বাদ দিয়ে মিনিকেট বলে পরিচিতি লাভ করে। এটিই পরে চলে আসে বাংলাদেশে।
কৃষি বিভাগের অন্য একটি সূত্র জানায়, ৯৫ পরবর্তী সময়ে বোরো মৌসুমে সেই মিনিপ্যাকেটের শতাব্দী ধানের বীজ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের কৃষকদের হাতে পৌঁছে যায়। ঝিনাইদহ জেলার সীমান্তবর্তী মহেশপুর উপজেলার চাষিরা এনে সর্বপ্রথম এ ধানের চাষ শুরু করেন। আমাদের দেশে আগে নাজিরশাইল, পাজাম ও বালাম ধানের চাষ হত। এসব দেশি সরু ধানের চালের ব্যাপক চাহিদা ছিল।
বরিশালের বালামের সুনাম ছিল ভারত উপমহাদেশব্যাপী। কালের বিবর্তনে সব সরু জাতের ধান চাষ উঠে যায়। সরু চালের সন্ধান করতে থাকেন ক্রেতারা। এ সময় বাজারে কথিত মিনিকেটের আবির্ভাব ঘটে। ক্রেতারা লুফে নেয় এ সরু জাতের চাল। সুযোগ বুঝে এক শ্রেণির মিল মালিক মাঝারি সরু বি আর-২৮, বিআর-২৯ ও বি আর-৩৯ জাতের ধান ছেঁটে ‘মিনিকেট’ বলে বাজারজাত করতে শুরু করেন। বর্তমানে সারা দেশে চিকন চাল বলতে এখন ‘মিনিকেট’ই বোঝায়, যার দামও চড়া। দেখতেও চকচকে, আকর্ষণীয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, একমাত্র পশ্চিমের জেলা যশোর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গাতে ভারত থেকে আসা কথিত সেই ‘মিনিকেট’ ধানের চাষ হয়। বিগত মৌসুমে যশোর জেলায় ৩০ হাজার হেক্টরে, ঝিনাইদহ জেলায় ১৮ হাজার হেক্টরে, চুয়াডাঙ্গা জেলায় তিন হাজার হেক্টরে ও মাগুরা জেলায় এক হাজার হেক্টর কথিত এ মিনিকেট ধানের চাষ হয়।
এর বাইরে যেসব জেলায় মিনিকেট ধান বা চালের কথা বলা হয় সেটি পুরোপুরি ভুয়া। মোটা চাল ছেঁটে তৈরি করা চালই মিনিকেট নামে সেখানে পরিচিত।
দেশব্যাপী মিনিকেট চালের নামে যে প্রতারণা চলছে তা কেবল ক্রেতাদের মাঝে সচেতনা বৃদ্ধি হলেই নিরসন সম্ভব।
বিষয়টি নিয়ে কৃষিবিদ ড. শমসের আলী জানান, মিনিকেট নামে কোনো জাতেরধান বাংলাদেশে নেই। এটা প্রতারণা। এই প্রতারণার হাত থেকে বাঁচতে হলে সচেতনতার পাশাপাশি আমাদের সৎ হতে হবে। চাল ব্যবসায়ীরা আসল পরিচয়ে চাল বিক্রি করলে ক্রেতারা প্রতারিত হবেন না। আমাদের চাল বাজারগুলো ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে। এ কারণে তারা ইচ্ছামতো নাম দিয়ে বাজারে চাল বিক্রি করেন।
বগুড়ার তালোড়া, দুপচাঁচিয়া ও শেরপুর বাজারের একাধিক চালকল ব্যবসায়ী জানান, উত্তরের সীমান্তবর্তী জয়পুরহাট, নওগাঁ, বগুড়া, দিনাজপুর জেলায় ‘মিনিকেট’ ধান উৎপাদন হয় না। এখানকার এক শ্রেণির অসাধু চালকল মালিক বিআর-২৯ ও বিআর-৩৯ জাতের চাল ফিনিশিং করে মিনিকেট বলে বাজারজাত করছে।