22/12/2025
বিএনপি কি যথেষ্ট মুল্যায়ন করবে জমিয়তকে? —মাবরুরুল হক
দেওবন্দী ও কওমী ধারার আকাবিরে আসলাফের স্মৃতিধন্য, শতবর্ষের রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও সংগ্রামের উত্তরাধিকার বহনকারী দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ আজ সম্ভবত বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনায় অগ্রসর হচ্ছে। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্ত জমিয়তের জন্য কার্যত স্রোতের বিপরীতে অবস্থান নেওয়ার শামিল।
কারণ, জামায়াত নিয়ন্ত্রিত বা সমর্থিত ‘৮ দলের ইসলামি জোট’ ইতোমধ্যেই একটি শক্ত ধর্মীয়, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করেছে, যা জমিয়তের প্রতিটি স্তরের নেতাকর্মীদের জন্য সহজে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। তবুও দেশ ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণ, এবং নিজেদের আদর্শিক অবস্থানকে সুদৃঢ় রাখার স্বার্থে জমিয়ত হয়তো একটি কঠিন, কিন্তু দূরদর্শী সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছে। তারা বিএনপির সাথেই আসন সমঝোতায় যেতে চাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপিকেই জমিয়তের দিকে অন্তত দুই কদম এগিয়ে আসতে হবে, দলীয় স্বার্থের পাশাপাশি জাতীয় রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য হলেও এর বাস্তবতা প্রবলভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে । কারণ, দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকা ‘গুপ্তবাদী রাজনীতি’ সমাজ ও রাজনীতিতে যে আদর্শিক দ্বন্দ্ব উসকে দিয়েছে, তার পরিণতি আগামী দিনে জাতিকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ একটি কওমি মাদরাসা-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল, যার আদর্শিক কাঠামোতে গুপ্তবাদ বা ষড়যন্ত্রমূলক রাজনীতির কোনো স্থান নেই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সংকটময় মুহূর্তে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার নজির জমিয়তের নেই। যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়েছে। ফলে জমিয়তের সঙ্গে রাজনৈতিক সমন্বয়ে বিএনপির রাজনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা একেবারেই নেই। কারণ দুইয়ের মাঝে আদর্শিক দ্বন্দ্ব হওয়ার সম্ভাবনা নাই, কেননা দুইটার অঙ্গন আলাদা হলেও রাজনৈতিক পথ পরিক্রমা একই সুত্রে গাথা।
সুতরাং বাস্তবতা হলো, যদি জমিয়ত ন্যায্য রাজনৈতিক মূল্যায়ন না পায় বিএনপি থেকে, তাহলে সামাজিক ও তৃণমূল চাপের মুখে তারা এককভাবে নির্বাচনের পথে যেতে বাধ্য হতে পারে। এতে জমিয়তের স্বল্পমেয়াদি কিছু ক্ষতি হলেও দীর্ঘমেয়াদে দলটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কিন্তু বিএনপি যদি কেবল স্বল্পমেয়াদি আসন ধরে রাখার হিসাব করে জমিয়তকে উপেক্ষা করে, তাহলে ভবিষ্যতে তারা এক ধরনের সামাজিক ও ধর্মীয় চাপের মুখে পড়তে পারে, যার রাজনৈতিক মূল্য চুকাতে হতে পারে দীর্ঘ সময় ধরে।
দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে বিএনপির বহু অর্গানিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই ঘাটতি পূরণ করতে বাস্তবসম্মতভাবে অন্তত ৩–৪ বছর সময় লাগবে। এই বাস্তবতায়, অন্তত আগামী নির্বাচনে জমিয়তের সঙ্গে আসন সমঝোতা হলে বিএনপির সেই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হবে—ইনশাআল্লাহ।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর আদর্শের উপর। তার রাজনৈতিক দর্শনের সারকথা এক বাক্যে বলা যায় —“বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সুর”— এই দর্শন শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো উপমহাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আজ সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পথনির্দেশনা।
সুতরাং, বিএনপির মতো একটি মধ্যমপন্থী ও জাতীয় দায়িত্বশীল দলের জন্য ‘৮ দলের তথাকথিত ইসলামি জোট’-এর বিপরীতে একটি প্রাতিষ্ঠানিক, ঐতিহ্যবাহী ও আদর্শিকভাবে সুসংহত ইসলামি দলকে সঙ্গে রাখা শুধু প্রয়োজনীয় নয়—বরং অপরিহার্য রাজনৈতিক বাস্তবতা।
বি:দ্র: সিলেট হলো জমিয়তের স্ট্রংহোল্ড, ইসলামী ও ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা বেশি । সিলেটে একটা আসনের কথা আলোচনা হচ্ছে, আমি মনে করি সিলেটে কমপক্ষে যদি দুইটা আসনে জমিয়তের প্রার্থী দেওয়া হয়, তাহলে পুরো সিলেট বিএনপি ও জমিয়তময় হয়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ! সিলেট ৫, ৪, ৬ আসন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জমিয়তের জন্য।