28/05/2026
সচরাচর আমার ঈদ পালন করা হয় না। কারণ এই উৎসবটা আমার ধর্মেরও না। কিন্তু এবার মনটা কেমন যেন করছে। কারণ গতবারের ঈদটা সাধারণ কোনো ঈদ ছিল না—গতবার আমি ঈদ পালন করেছিলাম জেলখানার ভেতরে।
হ্যাঁ, চার দেওয়ালের ভেতরে, লোহার গেটের আড়ালে, বন্দি অবস্থায়।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো—জেলখানার সেই ঈদটাই হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে মানুষভরা ঈদ ছিল।
আমি ঈদের কয়েকদিন আগেই অ্যারেস্ট হয়েছিলাম। পরিবার জানতেই পারেনি আমি কোন রুমে, কোন ওয়ার্ডে আছি। জানতে জানতে সময় কেটে যায়। তারা খাবার পাঠিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু জেলখানার গেট পেরোতে পেরোতে, রুম নম্বর খুঁজতে খুঁজতে, অনেক খাবারই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
তবুও জেলখানার ভেতরে আমি একা ছিলাম না।
চার নম্বর রুম, পাঁচ নম্বর রুম—কোথা থেকে যেন মানুষ ডাকতে শুরু করল। “এই ভাই, এদিকে আসেন”, “গরম মাংস খাইছেন?”—এই ডাকগুলো এখনো কানে বাজে।
টানা তিন দিন আমি জেলখানার ভেতরে গরম গরুর মাংস খেয়েছি। তখন বুঝেছিলাম, মাংসেরও কত রকম স্বাদ হতে পারে। নতুন গরম মাংসের এক স্বাদ, আবার রাত পার হওয়া মাংসের আরেক স্বাদ। যত পুরোনো হয়, তত নরম হয়, তত মসলাগুলো ভেতরে ভেতরে ঢুকে যায়।
জেলখানার সেই ঈদে এক মুহূর্তের জন্যও মনে হয়নি আমি একা।
মনে হয়নি আমি বন্দি।
মনে হয়েছিল, এই ঢাকা শহরে এখনো কিছু মানুষ আছে যারা নিজেরা স্বজনহারা হয়েও অন্য একজন মানুষকে আপন করে নিতে জানে।
সেই মানুষগুলোর কারও সাথে আমার রক্তের সম্পর্ক ছিল না। কেউ ছিল না আমার আত্মীয়। কিন্তু জেলখানার সেই ঈদে তারাই আমাকে সবচেয়ে বেশি আপন করে নিয়েছিল।
আজ আবার ঈদ আসছে।
বাইরে আছি, মুক্ত আছি—তবুও কেমন জানি লাগে।
কারণ এবার আর সেই জেলখানার চার দেওয়ালের ভেতরের মানুষগুলো নেই, সেই ডাক নেই, সেই ভাগাভাগি করে খাওয়া গরম মাংস নেই।
তবুও তাদের জন্য মন থেকে দোয়া রইল।
ঈদ মোবারক।
ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে সবাই ভালো থাকুক, শান্তিতে থাকুক।